ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ৯ অগ্রহায়ণ ১৪২৪, ২৩ নভেম্বর ২০১৭
Risingbd
সর্বশেষ:

বিকাল বেলার পাখি- আমাদেরই গল্প

আমিনুল ইসলাম শান্ত : রাইজিংবিডি ডট কম
 
   
প্রকাশ: ২০১৭-০৭-০৩ ১:৫৪:৪৬ পিএম     ||     আপডেট: ২০১৭-০৭-০৩ ৪:৩১:০৩ পিএম
বিকাল বেলার পাখি নাটকের দৃশ্য

আমিনুল ইসলাম শান্ত : ‘পাঙাস কত কইরা?’ ‘স্যার, সকালবেলায় একটা রুই ধরছি, রুইটা দেখাবো? রুইটা খুব ভালো হবে।’ ‘রুই মাছ খাই না কাঁটা বেশি।’ ‘অ্যাকবারে ফ্রেশ আছে ভালো আছে আঙ্কেল।’ মাছের বাজারে দোকানির সঙ্গে এভাবে কথা বলেন অভিনেতা ফজলুর রহমান বাবু। এ সময় তার সঙ্গে থাকা ছেলে অ্যালেন শুভ্র বলেন, ‘আব্বা, প্রত্যেকদিন পাঙাস খাইতে ভাল্লাগে না।’ এমন কথোপকথনের মাধ্যমে শুরু হয় ঈদুল ফিতরে প্রচারিত আদনান আল রাজীব পরিচালিত ‘বিকাল বেলার পাখি’ নাটকটি।

নাটকটির প্রথম দৃশ্যের সংলাপ খুব সাধারণভাবে মধ্যবিত্ত পরিবারের চিত্রকে নির্দেশ করে। হ্যাঁ, এ নাটকের গল্পটি মধ্যবিত্ত একটি পরিবারের। যে পরিবারের সদস্য পাঁচজন। স্বামী-স্ত্রী আর দুই মেয়ে এক ছেলে নিয়ে তাদের সংসার। এ পরিবারের কর্তা ব্যক্তি আনিস। তিনি একমাত্র কর্মক্ষম ব্যক্তি। একটি ইন্সুরেন্স কোম্পানিতে ১৮ হাজার টাকা বেতনে চাকরি করেন তিনি। গল্পের প্রেক্ষাপট গড়ে উঠেছে ঢাকা শহরকে কেন্দ্র করে। যে শহরে এই ১৮ হাজার টাকা দিয়ে ৫ সদস্যের পরিবার চালাতে হয় আনিসকে। যেখানে তিন ছেলে-মেয়ের পড়াশোনা, বাসা ভাড়া, খাওয়া-দাওয়ার খরচও অন্তর্ভুক্ত।

এমন পরিস্থিতিতে প্রিয় সন্তানদের কোনো আবদার রক্ষা করা আনিসের জন্য বিলাসিতা। কারণ ঠিকমতো তাদের পরীক্ষার ফির টাকা জোগাড় করতে হিমশিম খেতে হয় তাকে। কোম্পানির কমিশনের আশায় আনিস পলিসি করানোর জন্য ছুটে বেড়ান প্রতিবেশী ও পরিচিতজনদের দুয়ারে। তারা আশা দিলেও পলিসি করাতে পারেন না তিনি। এদিকে মেয়ের বিয়ের সম্বন্ধ আসে। পাত্র ভালো হওয়ায় বিয়ে দিতে রাজিও হন আনিস। কিন্তু টাকা জোগাড় না হওয়ায় তার জমানো শেষ সম্বল ব্যাংক থেকে তোলেন আনিস। টাকা নিয়ে ফেরার পথে তার ব্যাগটি বাস থেকে চুরি হয়ে যায়। তারপর চূড়ান্তভাবেই ভেঙে পড়েন আনিস ও তার পরিবার। সর্বশেষ বাসার মোটামুটি দামের জিনিসপত্র বিক্রি করে দেন তিনি। এমনকি মেয়ের বিয়েও ভেঙে দেন এবং বাসাটা ছেড়ে দিয়ে কম ভাড়ার বাসায় পরিবার নিয়ে ওঠেন তিনি।

গল্পটা এমন একেবেঁকে এগিয়েছে। যার প্রতিটা বাঁকে মধ্যবিত্ত পরিবারের দৈনন্দিন জীবনের টানাপোড়েন, বেঁচে থাকার যুদ্ধ দেখতে পান দর্শক। অর্থের টানাপোড়েনে সব যেখানে ছিন্নভিন্ন হয়ে যায়- ঠিক সেখানেও পারিবারিক বন্ধন, পিতা-পুত্রের ভালোবাসা, ভাই-বোনের খুনসুটি, পরস্পরের প্রতি মমত্ববোধ, দরদ তাদেরকে আরো শক্ত বন্ধনে আবদ্ধ করে দেয়। একত্রিত করে। যেন ছোট্ট একটি ভেলায় ভেসেই যুদ্ধ করে জীবন নদী পাড়ি দেয়ার অঙ্গীকারাবদ্ধ তারা। যা আমাদের বাঙালি সমাজের খুব চেনা চিত্র। যে দৃশ্য আমাদের দেশের ৮০ ভাগ পরিবারের। যে গল্প আমার আপনার। নাটকের কাহিনি এতটা সাবলীলভাবে এগিয়েছে যে, নাটক শেষ না করে দর্শক উঠতে পারবেন না বলে আমার বিশ্বাস। কারণ গল্প কোথায় গিয়ে শেষ হবে অর্থাৎ পরিণতি কী হবে তা নাটক শেষ না করা পর্যন্ত আঁচ করা যায় না। যা গল্পকারের বড় স্বার্থকতা। 

নাটকে আনিস চরিত্রটি রূপায়ন করেছেন গুণী অভিনেতা ফজলুর রহমান বাবু। তার অনবদ্য অভিনয় নিয়ে বিশেষ কিছু বলার দুঃসাহস করছি না। তবে এটুকু বলতে চাই- গল্পের চরিত্রের সঙ্গে মিশে যাওয়া বাবুর মাঝে আমি আমার বাবাকেই খুঁজে পাই। আর গৃহিণী চরিত্রে অভিনয় করেছেন ইলোরা গহর। খুব সাধারণ পরিবারের গৃহিণী বলতে যা বোঝায়- তাই ইলোরার চরিত্রটি। তবে তার অভিব্যক্তিতে কিছুটা ঘাটতি ছিল। কারণ আনিস টাকা হারিয়ে যখন ক্লান্ত, দিশেহারা হয়ে বাসায় ফিরেন তখন ইলোরার চরিত্রে খুব একটা উদ্বিগ্নতার ছাপ চোখে পড়েনি। যা একটু অস্বাভাবিক মনে হয়েছে। এমন টুকটাক ঘাটতি তার চরিত্রে মনে হয়েছে। আনিসের একমাত্র পুত্র অপু। তার চরিত্রটি রূপায়ন করেছেন এ সময়ের উঠতি তরুণ অভিনেতা অ্যালেন শুভ্র। পুরো নাটক দেখে মনে হয়েছে- এ চরিত্রটি তৈরি হয়েছে অ্যালেন শুভ্রর জন্য। এছাড়া আনিসের দুই মেয়ের চরিত্রে অভিনয় করেছেন ইফাত তৃষা ও সাফা নমনি। পুরো নাটকে তাদের সাবলীল অভিনয়শৈলী মুগ্ধ করবে যে কোনো দর্শককে।

গল্প আর অভিনয় যেখানে দুর্বার গতিতে ছুটে চলে সেখানে অন্য কিছুর জন্য অপেক্ষা করার অবকাশ বোধহয় থাকে না। তবে বরাবরের চেয়ে এবার নির্মাতা আদনান আল রাজীব কান্ডারির দায়িত্বটা আরো বেশি দক্ষতার সঙ্গে পালন করেছেন। নাটকে কিছু দৃশ্য রয়েছে যা হাজারটা সংলাপকেও হার মানায়। ‘রুই মাছ খাই না কাঁটা বেশি।’ নাটকে আনিসের এমন সংলাপ সত্যি প্রশংসার দাবিদার। চিত্রনাট্য অনেক শক্তিশালী। যার জন্য ৪০ মিনিট দৈর্ঘ্যের মধ্যে এমন একটি স্পর্শকাতর কাহিনি চিত্রায়ন করা সম্ভব হয়েছে।

আসলে চিন্তাশীল দর্শক, পাঠক মাত্রই সমালোচক। তিনি দেখেন, পড়েন, বোঝেন। তারপর যা দেখেন বা পড়েন তা নিয়ে ভাবেন। আমার বিশ্বাস- একজন চিন্তাশীল দর্শককে এ নাটকটি ভাবাবে, ভেতর থেকে নাড়া দেবে।

 

 

 

 

রাইজিংবিডি/ঢাকা/৩ জুলাই ২০১৭/শান্ত/মারুফ

Walton
 
   
Marcel