ঢাকা, শুক্রবার, ৬ শ্রাবণ ১৪২৪, ২১ জুলাই ২০১৭
Risingbd
সর্বশেষ:

এই সাংবাদিক হওয়ার স্বপ্ন দেখেছিলাম?

রুহুল আমিন : রাইজিংবিডি ডট কম
প্রকাশ: ২০১৭-০৭-০৭ ৫:১৩:৪৭ পিএম     ||     আপডেট: ২০১৭-০৭-০৮ ৪:১৪:১৯ পিএম

রুহুল আমিন : কিছুদিন আগে পল্টন থেকে বাসে কারওয়ান বাজার যাচ্ছিলাম। প্রেসক্লাবের সামনে দেখি মানববন্ধন করছে কোনো একটি ইসলামিক দল। মানববন্ধন থেকে এক বক্তা তার বক্তব্যে বলছেন, এখানে সাংবাদিক ভাইয়েরা আছেন, সাংবাদিকরা হলেন সমাজের বিবেক। নিজের পেশার প্রতি এমন কমপ্লিমেন্ট শুনতে কার ভাল না লাগে।

সাংবাদিকতাকে শুধু পেশা হিসেবে বিচার করা যায় না। অন্তত আমি ব্যক্তিগতভাবে সাংবাদিকতাকে কখনো পেশা হিসেবে বিবেচনা করিনি। সাংবাদিকতা বিষয়ে পড়াশোনা করতে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির সময় থেকে এখন পর্যন্ত সাংবাদিকতা আমার কাছে একাট প্যাশনের নাম। ৭/৮ বছরের পেশাগত জীবনে এক দিনের জন্যও মনে হয়নি সাংবাদিকতা ছাড়া অন্য কোনো কাজ করা যায়। অবশ্য অন্য কোনো কাজ করতে পারবো বলে মনেও হয় না আজকাল। বন্ধুদের অনেকে সাংবাদিকতা ছেড়ে অন্য পেশায় চলে গেছেন। তারা আমাকেও ভবিষ্যৎ অর্থনৈতিক নিরাপত্তার কথা বলে সাংবাদিকতা ছাড়ার পরামর্শ দিয়েছেন। কিন্তু বরাবরই তাদেরকে বলেছি, আমি তো সাংবাদিকতাকে পেশা হিসেবে বেছে নিইনি। কারণ সাংবাদিকরা হলেন সমাজের অগ্রগামী মানুষদের অন্যতম। তারা সমাজের ও রাষ্ট্রের কল্যাণে এবং যে কোনো অশুভ শক্তির বিরুদ্ধে শক্ত হাতে কলম ধরেন। তারা কখনো অন্যায়ের কাছে, অর্থের কাছে, পেশি শক্তির কাছে,  রাজনৈতিক শক্তির কাছে মাথা নত করেন না। আমার কাছে সাংবাদিকতা একটা অহংকারের নাম। আমি সাংবাদিক হিসেবে নিজের পরিচয় দেই এই অহংকার নিয়েই।

বর্তমানে সাংবাদিকতা আগের যে কোনো সময়ের চেয়ে সহজ। এই সহজ বলতে স্বাধীন। রাষ্ট্রীয় কোনো খড়গ ঝুলানো নেই সাংবাদিকতার ওপর। সাংবাদিকতা সহজ এই জন্য বলছি যে, আইনগত অধিকার আছে- এমন কোনো ক্ষেত্রে সরকার পক্ষ থেকে দৃশ্যত কোনো বাধা আসছে বলে মনে হয় না। অথচ ষাটের দশকে কিংবা পাকিস্তানি শাসকরা যখন এই দেশ শাসন করেছে, কিংবা স্বাধীনতার পরও কোনো কোনো সময় সাংবাদিকদেরকে সঠিক তথ্য তুলে ধরার ক্ষেত্রে বেশ কাঠখড় পোড়াতে হয়েছে। এমনও হয়েছে যে, কোনো জনগুরুত্বপূর্ণ সংবাদ সাংবাদিক দিতে পারছেন না কড়া বিধি নিষেধের কারণে। তখন সম্পাদক বা সাংবাদিক পত্রিকার একটা নির্দিষ্ট জায়গা ফাঁকা রেখে পত্রিকা বের করতেন। পাঠক বুঝে নিতেন সেখানে কোনো একটা গুরুত্বপূর্ণ সংবাদ ছিল কিন্তু শাসকদের চাপে তা ছাপানো যায়নি। আর মঙ্গায় মানুষ মারা গেছে কিন্তু সরাসরি বলার কোনো সুযোগ নেই- এমন অবস্থায় সাংবাদিক লাশ উদ্ধারের সংবাদ দিতেন। সংবাদে লেখার সময় উদ্ধারকৃত লাশের ময়নাতদন্তের অংশে গিয়ে বলতেন, লাশের ময়নাতদন্ত রিপোর্টে দেখা যায় মৃতের পাকস্থলিতে কোনো খাবার নেই। বিশেষ করে দৈনিক ইত্তেফাকে এমন কৌশলী রিপোর্ট দেখা যেত। তারপরও সাংবাদিকরা চেষ্টা করতেন বস্তুনিষ্ঠ খবর/সংবাদ পাঠকের কাছে, জনগণের কাছে পৌঁছে দিতে।

বর্তমান সময়ে অন্তত কোনো তথ্য বা জনগুরুত্বপূর্ণ সংবাদ পাঠকের কাছে পৌঁছাতে এতো কসরত করতে হয় না সাংবাদিকদের। আর অনলাইনের যুগে তো তথ্যের আদান-প্রদান আরো সহজ হয়েছে। অনলাইন মাধ্যম সাংবাদিকতার ক্ষেত্রে নতুন এক সংযোজন। বিশ্বের নানা প্রান্তে ঘটে যাওয়া ঘটনা মুহূর্তের মধ্যে কম ঝক্কি-ঝামেলায় কেবল মোবাইল ফোন সেটের সাহায্যেই পাঠক পড়তে, দেখতে ও শুনতে পাচ্ছেন। সব মিলিয়ে বর্তমান সময়ে সাংবাদিকদের সবচেয়ে সম্মানজনক জায়গায় থাকার কথা। কিন্তু সাংবাদিকরা কি সে জায়গায় আছেন?

বিভিন্ন দল ও উপদলে বিভক্ত এবং রাজনৈতিক আদর্শ ধারণ ও রাজনৈতিক দলের প্রতি সমর্থন সাংবাদিকদের ভেতরে এক ধরনের ‘সেল্ফ সেন্সরশিপ’ দাড় করিয়ে দিয়েছে। যে কারণে দুর্নীতি বা অন্যায়ের বিরুদ্ধে কথা বলতে পারেন না তারা। অথবা যেখানে সেন্সর করা দরকার সেখানে সেন্সর না করে অবাধে তথ্য সরবরাহ করছেন। বিশেষ করে অনলাইন ও টেলিভিশন মিডিয়া এই ভুল করছে বারবার। পাঠক বাড়ানো ও পাঠক ধরে রাখার জন্য এইসব করে বেড়াচ্ছেন তারা। যেমন সাম্প্রতিক সময়ে দেশের বিভিন্ন স্থানে জঙ্গি আস্তানার খোঁজ পেয়ে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী অভিযান চালাচ্ছে। অনলাইনগুলো প্রতিমুহূর্তে আপডেট দিচ্ছে। টেলিভিশনগুলো প্রায় সময়ই লাইভ দেখাচ্ছে। কখন সোয়াত যাচ্ছে, কখন কাউন্টার টেররিজম ইউনিট ঘটনাস্থলে পৌঁছাচ্ছে, কোথায় কখন অভিযান চালানো হবে, এইসব। যদি জঙ্গিরা ইচ্ছে করে তবে শুধু সংবাদপত্রে চোখ রেখে কখন কি হচ্ছে তার ওপর নজর রাখতে পারবে। পুলিশ প্রশাসন থেকে বার বার বলা সত্বেও তা মানা হচ্ছে না। বুঝে না বুঝে বার বারই তা করা হচ্ছে। এই সবের বিরুদ্ধে এখন পর্যন্ত সরকারের পক্ষ থেকে বড় কোনো পদক্ষেপ বা অ্যাকশন নিতে দেখা যায়নি। তাই বলছিলাম, আগের যে কোনো সময়ের চেয়ে সাংবাদিকরা এখন স্বাধীন।

প্রশ্ন আসতে পারে আগে যারা সাংবাদিকতা করতেন তাদের কি কোনো রাজনৈতিক সমর্থন বা পক্ষপাতিত্ব ছিল না? ছিল, তবে তারা জনগুরুত্বপূর্ণ ইস্যুগুলোতে নিজেদের রাজনৈতিক পরিচয় ভুলে যেতেন। সত্য প্রকাশে তার কখনো পক্ষপাতিত্ব করতেন না। পেশাদারিত্বের জায়গায় কখনো আপোষ করতেন না, ছাড় দিতেন না। রাজনীতিবিদরাও ছিলেন তেমনই। সৎ ছিলেন, জনগণের প্রতি প্রতিশ্রুতিদ্ধ ছিলেন। তারা রাজনীতি করতেন মানুষের জন্য। তাই অন্যায় হলে সাংবাদিকদের সহযোগিতা করতেন।

তাহলে কি এখন যারা রাজনীতি করেন তারা মানুষের জন্য রাজনীতি করেন না? হ্যাঁ করেন। তবে তাদের জবাবদিহিতার কোনো ব্যবস্থা নেই। আগে সাংবাদিকদের বস্তুনিষ্ঠ সাংবাদিকতার কারণে রাজনীতিবিদদের জবাবদিহিতার পথ উন্মু্ক্ত হতো। বর্তমানে সেই সুযোগ আর নেই। এখন সাংবাদিকদের যেন পেশার প্রতি কেনো দায় নেই, ভাবটা এমন।

এখন যারা সাংবাদিকতা করেন তাদের সবার অবস্থা এক না। তবে বেশির ভাগই পেশার প্রতি কোনো প্রেম অনুভব করেন না। এর কারণও আছে। পুরো সংবাদপত্র ইন্ডাস্ট্রি জুড়ে একটা নৈরাশ্য ভাব আছে। বেশিরভাগ সাংবাদিক নির্দিষ্ট সময়ে বেতন-ভাতা পান না। বাজার মূল্যের সঙ্গে সঙ্গতি রেখে বেতন কাঠামো নির্ধারিত হচ্ছে না। হাতে গোনা কয়েকটি পত্রিকা ছাড়া অন্যগুলো মানছে না সরকারের দেওয়া ওয়েজবোর্ড নীতি। জীবনযাত্রার ব্যয় বাড়লেও সে হারে বাড়ছে না সাংবাদিকদের বেতন-ভাতা। সরকারের সদিচ্ছা আছে বিশ্বাস করি কিন্তু কোথাও একটা ফাঁক রয়ে গেছে। সব মিলিয়ে একটা হতাশা তৈরি হয়েছে এই পেশাকে ঘিরে।

গেল ঈদে বাড়ি গেলাম ছুটিতে। ছুটির দ্বিতীয় দিন শুনি পাশের বাড়ির এক তরুণী প্রেম সংক্রান্ত ঘটনায় স্বেচ্ছামৃত্যুর পথ বেছে নিয়েছে। একটা অনলাইন পত্রিকার মফস্বল বিভাগে কাজ করার সুবাদে এই রকম স্বেচ্ছামৃত্যুর ঘটনার সঙ্গে মোটামুটি পরিচিত। প্রায়ই এমন সংবাদ আসে। আমার গ্রামের বন্ধুরা বলল, সংবাদ প্রকাশ করতে। আমি জানতে চাইলাম তরুণীর বাবা-মা কি চান? খোঁজ নিয়ে জানলাম, তারা মান-সম্মানের বিষয়টিকে গুরুত্ব দিচ্ছেন। তারা চাচ্ছেন না এই নিয়ে কোনো সংবাদ প্রচার বা প্রকাশ হোক। তারা যা চাইলেন তাই হলো। কিন্তু বাধ সাধলেন দ্বিতীয় সারির এক টেলিভিশনের উপজেলা সাংবাদিক। তিনি হাজির হলেন ঘটনাস্থলে, সঙ্গে ক্যামেরাম্যান। মৃত তরুণীর বাবা-মাসহ ওই বাড়ির সবাই যেন হঠাৎ আতঙ্কগ্রস্ত হয়ে গেলেন। আমাকে ডেকে নিলেন। আমি গিয়ে আগত সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বললাম। ব্যাপারটা বোঝানোর চেষ্টা করলাম, ভিক্টিমের পরিবার চাচ্ছে না কোনো নিউজ হোক। শেষে তারা আমার কথা মনে হলো মেনে নিলেন। বললাম, চলেন একসঙ্গে চা খাওয়া যাক। এই বলে আমি হাঁটা শুরু করলাম। তারা পেছনে পেছনে এলেন। তাদেরকে হালকা আপ্যায়নও করা হলো।

তারা চলে যাওয়ার পর শুনলাম দেড় হাজার টাকা দেওয়া হয়েছে তাদের। ঘটনার পর গ্রামের এক বাজারে বসে আছি। যে বাড়ির ঘটনা সে বাড়িরই একজন একটা মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক। তিনি বললেন, এখনকার সাংবাদিকরা কি কোনো মানুষ ? তারা নষ্ট হয়ে গেছে। ঘুষ-টাকা ছাড়া আর কিছু বোঝে না। আরো কিছু কথা তিনি বললেন। অনেকের সঙ্গে তার কাছে আমিও বসে ছিলাম। মনে হলো তিনি খুব কষে কয়েকটা চড় বসালেন আমার গালে। সাংবাদিকতায় আসার পর এতোটা অসহায় আর কোনোদিন লাগেনি। সমাজের বিবেক সাংবাদিকের এই পরিণতি হচ্ছে দিন দিন? এই সাংবাদিক হওয়ারই স্বপ্ন দেখেছিলাম? নিজেই নিজের কাছে প্রশ্ন করি, উত্তর মিলবে কিনা জানি না।

 

 

 

রাইজিংবিডি/ঢাকা/৭ জুলাই ২০১৭/রুহুল/শাহনেওয়াজ

Walton Laptop