ঢাকা, মঙ্গলবার, ৭ অগ্রহায়ণ ১৪২৪, ২১ নভেম্বর ২০১৭
Risingbd
সর্বশেষ:

বখাটে দমনে প্রয়োজন একটি ‘হটলাইন’

হাসান মাহামুদ : রাইজিংবিডি ডট কম
 
   
প্রকাশ: ২০১৭-০৭-৩১ ১২:৩০:০৩ পিএম     ||     আপডেট: ২০১৭-০৯-০৬ ১:৩০:৫৩ পিএম

হাসান মাহামুদ : রাজধানীতে বসবাসকারী অধিকাংশ নাগরিক পাবলিক পরিবহনে যাতায়াত করেন। ঢাকার রাস্তায় যানজট একটি নিত্যকার দৃশ্য। এর অন্যতম কারণ, রাস্তার তুলনায় পরিবহনের সংখ্যা বেশি। এই বাড়তি পরিবহন কিন্তু আবার নগরবাসীর তুলনায় নিতান্তই কম। তাই তো আমরা হরহামেশা বাদুরঝোলা যাত্রী দেখতে পাই। 

এর সঙ্গে যে দৃশ্যটি প্রায়শই আমাদের চোখে পড়ে, তা হলো নারী যাত্রীদের ভোগান্তি। পুরুষ যাত্রীর সঙ্গে ধাক্কাধাক্কি করে বাসে চড়তে হয়, মহিলা সিট কম থাকায় দাঁড়িয়ে থাকতে হয় ভিড়ের মধ্যে। আবার মহিলা সিটে পুরুষ বসে থাকেন, এ নিয়ে তর্কও জুড়ে দেন কোনো কোনো পুরুষ যাত্রী। একবার ভাবুন, বাসের সংখ্যা যাত্রীর তুলনায় কম, বিষয়টি ছাড়া বাকী সমস্যাগুলো একটু সচেতনতা আর মানিয়ে নেওয়ার মানসিকতায় থাকলে সমাধান সম্ভব।

শুধু পাবলিক পরিবহনের সমস্যা নয় আমাদের একটু নাগরিক সচেতনতা অসংখ্য সমস্যার তড়িৎ সমাধান এনে দিতে পারে। এই যে, গত কয়েকদিন আগে মাত্র কয়েক ঘন্টার বৃষ্টিতে পুরো রাজধানী জলমগ্ন হয়ে গেল। এর জন্য সিটি কর্পোরেশন কি শতভাগ দায়ী? আমাদের কি কোনো দায় বা দায়িত্ব নেই? আমাদের চারপাশ পরিষ্কার রাখলে, চলার পথের উচ্ছিষ্ট পথে না ফেলে যথাস্থানে ফেললে, ড্রেনগুলো নিশ্চয়ই এতোটা ভরাট হয়ে থাকতো না। পরিষ্কার থাকা, পরিষ্কার রাখা এবং নাগরিক সচেতনতার সাথে সাম্প্রতিক সময়ে সবচেয়ে আলোচিত চিকুনগুনিয়ারও সর্ম্পক রয়েছে। এক্ষেত্রেও সিটি কর্পোরেশনের মতো আমাদেরও দায়িত্ব কম নয়।

নাগরিক সচেতনতার শক্তি অনেক। নাগরিক সচেতনতার কারণে একটি দেশের শাসনব্যবস্থা, গণতন্ত্রও পরিবর্তন হতে পারে। এই নাগরিক সচেতনতার সঙ্গে সরকারি একটু সাপোর্টের মাধ্যমে সমাজ ও রাষ্ট্র থেকে ক্যান্সারের মতো জেঁকে বসা নানা অনিয়ম, অবৈধ কর্মকাণ্ড উৎপাটন করা সম্ভব। তেমনি একটি ক্যান্সার এসিড সন্ত্রাস। এই ক্যান্সার অনেকটাই কমেছে। তবে এখনো নির্মূল হয়নি। ইভটিজিং, আরেক ক্যান্সারের নাম। মেয়েদের উত্ত্যক্ত করা, মানসিক নির্যাতন, শারীরিক নির্যাতন, যৌন নির্যাতন, নির্যাতন পরবর্তী হত্যা- এসবই সমাজের ক্যান্সার।

সমাজের এ সব ক্যান্সার বা দুষ্ট ক্ষত সারানো যায় শক্ত হাতে বখাটে দমন করে। স্থানীয় পর্যায়ে আইনের শাসন নিশ্চিতসহ আরো অসংখ্য বিকল্পের কথা হয়তো কেউ কেউ বলতে পারেন। এসব কিছুকে একীভূত করেও সমন্বিত পদক্ষেপ নেওয়া সম্ভব।

এই তো মাত্র কয়েক মাস আগের কথা। সারাদেশ স্তব্দ হয়ে গিয়েছিল সিলেটের বদরুলের নৃশংসতা দেখে। খাদিজা যদি শুরু থেকেই স্থানীয় প্রশাসনের সাহায্য পেতেন তাহলে তাকে এভাবে অত্যাচার সহ্য করতে হতো না। কিংবা এই যে রোববার কুমিল্লার ছাত্রী স্মৃতি আত্মহত্যা করেছে, সেও বেঁচে থাকতো।

২০০৮ সাল থেকে মূলত ইভটিজিং বিষয়টি মাথাছাড়া দিয়ে উঠে। তখন থেকে প্রশাসন এ বিষয়ে আন্তরিকতার সাথে কাজ করে আসছে। কিন্তু সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে বদরুলরা ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে। তাই সেই ইভটিজিং এখনো আমাদের ভাবাচ্ছে, কাঁদাচ্ছে।  সেই ২০১০ সালের মে মাসে শিক্ষামন্ত্রী কোনো একজন নির্যাতিত ছাত্রীকে দেখতে গিয়ে ঘোষণা দিয়েছিলেন, প্রয়োজনে আইন করে বখাটে-সন্ত্রাসীদের দমন করা হবে। এরপর আমরা মন্ত্রণালয়ের কিংবা অন্য সংস্থার বিভিন্ন উদ্যোগ দেখেছি, কিন্তু আইন আর হয়নি। আমরা শিগগির এই বিষয়ে একটি কঠিন আইন চাই।

আর, শুধু আইন করলেই হবে না, এটি বাস্তবায়নের জন্য বিধি করতে হবে। মাঠপর্যায়ে ইভটিজিং দমনের সবধরনের নির্দেশনা থাকতে হবে। কারণ গ্রামের মেঠোপথের বালিকা থেকে শুরু করে রাজধানীর অভিজাত শপিং মলে যাওয়া নারীও এখন ইভটিজিংয়ের বাইরে নেই। কাউকে কানে শুনতে হচ্ছে, আর কেউ প্রতিনিয়ত দৃষ্টিধর্ষণে পড়ছে।

আইনের বাইরে এক্ষেত্রে নাগরিক সচেতনতার গুরুত্ব অনেক। তাহলে বিস্তৃত আকারে আইনের শাসন কার্যকর করা যাবে। ধরুন, প্রত্যন্ত অঞ্চলে যে মেয়েটিকে প্রতিনিয়ত কোনো এক বদরুল উত্ত্যক্ত করছে, সে কিভাবে প্রশাসনের সাহায্য পাবে? কিংবা বগুড়ার যে তুফান ক্ষমতার অপব্যবহার করে মেয়েদের সর্বনাশ করছে, তার হাত থেকেও বা কিভাবে নিস্তার পাওয়া যাবে!

এজন্য সহজ এবং সুলভ একটি মাধ্যম প্রয়োজন, যার মাধ্যমে অত্যন্ত দুর্বল এবং নিপীড়িত একটি মেয়ে সাহায্য চাইতে পারে, সাহায্য পেতে পারে।

বিভিন্ন ধরনের হটলাইন চালু করছে সরকার- দুর্নীতি জানাতে, ভোগান্তি জানাতে, প্রভৃতি। বলতে গেলে, সবকিছু এখন আমাদের হাতের মুঠোয়। ফোনেই কেটে ফেলা যাচ্ছে বাস-রেলের টিকিট। কারো কর্মকান্ডে আপনার মনে হচ্ছে, জঙ্গিবাদের গন্ধ আছে, তার ব্যাপারে নিমিষে খবর দেওয়া যাচ্ছে। কিন্তু শুধুমাত্র সমাজের অন্যতম ক্যান্সার হয়ে দাঁড়ানো বখাটেদের বিরুদ্ধে অভিযোগ জানানোর জন্য সরাসরি কোনো মাধ্যম নেই। অনেকে হয়তো থানার কথা বলবেন, অভিভাবকদের জানানোর কথা বলবেন। কিন্তু এসবে সমাধান হচ্ছে কী?  যে বখাটে সমাজপতির ছেলে, যে বখাটে রাজনৈতিক কর্মী, তাকে দমাবে কে?

এজন্য সরকারিভাবে একটি হটলাইন চালু করা যেতে পারে। কেউ জানবে না, কারো কাছে সাহায্যের জন্য যেতে হবে না- নির্দিষ্ট একটি নাম্বারে ফোন করেই অভিযোগ জানানো যাবে বখাটের বিরুদ্ধে। যে কোনো মোবাইল থেকে বিনা খরচে এই ফোনের সুবিধা চালু থাকবে। আমরা এই হটলাইন চালুর বিষয়ে সরকারের সংশ্লিষ্ট দপ্তরের কাছে ‘নাগরিক প্রস্তাবনা’ আকারে এটি পেশ করতে চাই।

দেশের যে প্রান্তেই যে নিপীড়িত হবে বা ইভটিজিংয়ের শিকার হবে, সে এই হটলাইনে অভিযোগ জানাবে। কেন্দ্রিয় ভাবে একটি নিয়ন্ত্রক ও তদারকি সেল থাকবে। তারা অভিযোগের স্থান অনুযায়ী স্থানীয় প্রশাসন ও থানায় জানিয়ে দিবে। তার ভিত্তিতে যাচাই-বাছাই সাপেক্ষে তড়িৎ ব্যবস্থা নেওয়া হবে। সবচেয়ে ভাল হয়, ডিজিটাল বাংলাদেশে বিনির্মানে অবদান রেখে যাওয়া আইটি খাতের বিষয়গুলো দেখভাল করে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের এক্সেস টু ইনফরমেশন বা এটুআই প্রকল্পের মাধ্যমে। এক্ষেত্রে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে এটুআইয়ের মতো একটি সেল খোলা যেতে পারে। কারণ অন্যান্য স্থানের কোনো সেলের ওপর জনগণের অতোটা আস্থা নেই।

এক্ষেত্রে বিষয়টি এরকম হতে পারে- যে কেউ ফোন করতে কিংবা অভিযোগ জানাতে পারবে হটলাইনে। শুধু ইভটিজিংয়ের শিকার মেয়ে নয়, অন্য যে কেউ সামাজিক দায়িত্ব থেকেও ফোন করে বখাটের বিরুদ্ধে অভিযোগ তুলে ধরতে পারে। পরিচয় গোপন রাখতে চাইলে, তা গোপন রেখেই ক্লু দিয়ে স্থানীয় প্রশাসনে তথ্য দিতে পারবেন। কারণ সরকারি নিয়ম অনুযায়ী পত্রযোগে অভিযোগ তদন্তের জন্য পাঠানো হলে সময়ক্ষেপন হবে বেশি। এরপর অভিযোগের ভিত্তিতে ব্যবস্থা নিবে স্থানীয় প্রশাসন। ব্যবস্থা নেওয়ার ক্ষমতা থাকবে নির্বাহী এবং জুডিশিয়াল উভয় ম্যাজিস্ট্রেটের হাতেও। নিয়মিত পরিচালনা করা হবে ভ্রাম্যমান আদালত।

আমরা আর কোনো খাদিজা, স্মৃতি দেখতে চাই না। আমাদের সম্মিলিত প্রয়াসে, অনায়াসেই দেশ থেকে বখাটে নামের ক্যান্সার উৎখাত হতে পারে। ছিনতাইকারী, ছেঁচড়া চোর, পকেটমার- এসবের থেকেও বখাটেরা ভয়ংকর। কারণ এদের কারণে অনেক মেয়ে সম্ভ্রম হারিয়েছে, প্রাণ গেছে। কত পরিবার যে নিঃস্ব হয়েছে, হিসাব নেই। আসুন আমরা নাগরিক সচেতনতায় ‍উদ্বুদ্ধ হই। সব ধরনের অমঙ্গল বিতাড়িত করি।

সমাজকে এমন অরাজকতা থেকে রক্ষা করতে ব্যর্থ হলে দেশের উন্নয়ন-অগ্রগতির চাকা থেমে যাবে। তাই বখাটেদের অপতৎপরতা দমনে প্রশাসনকে নিরপেক্ষভাবে কঠোর হতে হবে। বিচার প্রক্রিয়ায় গতি আনতে হবে। আইন প্রয়োগের পাশাপাশি বখাটেপনার বিরুদ্ধে সামাজিক ও সাংস্কৃতিক জাগরণ সৃষ্টি করতে হবে। আর এই জাগরনের হাতিয়ার হতে পারে একটি হটলাইন নাম্বার।

লেখক: সাংবাদিক।

(মতামত লেখকের নিজস্ব)

 

 

রাইজিংবিডি/ঢাকা/৩১ জুলাই ২০১৭/হাসান/এনএ

Walton
 
   
Marcel