ঢাকা, মঙ্গলবার, ১১ আশ্বিন ১৪২৪, ২৬ সেপ্টেম্বর ২০১৭
Risingbd
সর্বশেষ:

পানি কমছে, এবার চ্যালেঞ্জ ত্রিমাত্রিক ক্ষতি কাটিয়ে ওঠার

হাসান মাহামুদ : রাইজিংবিডি ডট কম
 
   
প্রকাশ: ২০১৭-০৮-২৬ ৫:৩৫:০৩ পিএম     ||     আপডেট: ২০১৭-০৮-২৬ ৫:৩৫:০৩ পিএম

হাসান মাহামুদ : দেশের প্রায় অর্ধেক জুড়ে বন্যা। উত্তরাঞ্চলের সব জেলার পাশাপাশি দেশের মধ্যাঞ্চলেও বন্যা হয়েছে। সেই মধ্য জুলাই থেকে বন্যায় দেশের বিভিন্ন জেলার বিস্তীর্ণ এলাকা প্লাবিত হয়। আগস্টে এসে বন্যা যেন ভয়াবহ রূপ ধারণ করে। ভাল লাগার বিষয় হচ্ছে, বিভিন্ন স্থানে পানি কমতে শুরু করেছে। এর সঙ্গে নতুন এক চ্যালেঞ্জের সামনে পড়তে যাচ্ছে ক্ষতিগ্রস্ত এলাকার মানুষগুলো। বন্যার পানি নেমে যাওয়ার পরের প্রভাব বন্যা থেকে খুব একটি কম নয়।

চলমান বন্যায় এরই মধ্যে প্রায় এক শ জনের বেশি মানুষ প্রাণ হারিয়েছে। গত দু’মাসে নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে দশ হাজারের মতো বাড়ি। বন্যাকবলিত ২৭ জেলায় ছয় লাখ ১৮ হাজার ৭০৯ হেক্টর ফসলি জমি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ৫৭ লাখ আট হাজার ৭৫০ জন মানুষ। ১০০ কিলোমিটারের বেশি রেলপথ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বিধ্বস্ত হয়েছে দুই হাজার ৮০০ কিলোমিটার দৈর্ঘ্য সড়কপথ। ক্ষতির শিকার হয়েছে উত্তর, মধ্য ও উত্তর-পূর্বাঞ্চল। এসবই সরকারি হিসাব।

বন্যায় পানিবন্দি হয়ে দিনের পর দিন দুঃসহ কষ্টে পরিবারসহ দিনাতিপাত, খাদ্য ও পানির অভাব, রোগের প্রাদুর্ভাব ইত্যাদি বন্যা-কবলিত এলাকায় মানুষের প্রধান সমস্যা। এরইমধ্যে ভেঙে পড়েছে অধিকাংশ বন্যাকবিলত এলাকার বিভিন্ন অবকাঠামো, তৈরি হচ্ছে ভয়াবহ স্বাস্থ্য ঝুঁকি৷ একই সঙ্গে রয়েছে সামনের দিনগুলোর খোরাকির অনিশ্চয়তা। ধান ও ফসল উৎপাদন ব্যাহত হওয়ায় এই খাদ্যঝুঁকির স্থায়িত্বকাল বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা যায়। তাই আশু বিপর্যয় ঠেকাতে এখন থেকেই উদ্যোগ ও পরিকল্পনা নেওয়ার কোনো বিকল্প নেই।

ভয়াবহ এই বন্যায় সড়ক ও রেল অবকাঠামো যেভাবে ধ্বংস হয়েছে সেটা সংস্কারও সরকারের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। তবে সবচেয়ে ক্ষতির মুখে পড়তে যাচ্ছে আসন্ন ঈদ। দেশের উত্তর, মধ্য ও উত্তর-পূর্বাঞ্চলে বন্যার কারণে এবার বিরূপ প্রভাব পড়তে পারে। কেননা রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে কোরবানির পশুর বড় অংশের জোগান আসে উত্তরাঞ্চল থেকে। কিন্তু বন্যার কারণে তা ব্যাহত হতে পারে। এছাড়া ঈদের আনন্দ ভাগাভাগি করতে রাজধানীর কর্মজীবীদের কত শতাংশ এবার বাড়ি যেতে পারবে, তা নিয়ে যথেষ্ট সংশয় রয়েছে। বন্যার কারণে এবার উত্তরাঞ্চলের ১৭ জেলায় বাসের ট্রিপ কমানো হয়েছে। মোটামুটি কাছাকাছি চিত্র অন্যান্য জেলারও। ফলে এবার যারা বাড়ি যাবেন, তাদের অনেকেই ভোগান্তির শিকার হবেন- এটা সহজেই অনুমান করা যায়। আর বিষয়টি সরকারের সামনে চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

অস্ট্রেলিয়া এবং যুক্তরাজ্যের একদল বিজ্ঞানী ১৯৯০ এবং ২০০০ সালের মধ্যে ৫৬ উন্নয়নশীল দেশের বন্যার ঘটনা বিশ্লেষণ করে দেখেছেন যে, উক্ত দশকে দেশগুলোতে প্রায় এক লাখ মানুষ বন্যার কারণে মৃত্যুবরণ করেছেন এবং প্রায় ৩২০ মিলিয়ন মানুষ পরিবেশ-উদ্বাস্তুতে পরিণত হয়েছেন। বাংলাদেশের সাম্প্রতিক বন্যার ক্ষয়-ক্ষতি দেখে আশঙ্কা করা হচ্ছে বড় ধরনের বিপর্যয়ের সামনে পড়তে যাচ্ছি আমরা।

আর এই বিপর্যয়ে সবচেয়ে বেশি ক্ষতির শিকার হবে শিশু ও নারীরা। বিশ্ব ঝুঁকি প্রতিবেদন ২০১২ অনুযায়ী, বিশ্বের সর্বাধিক দুর্যোগপ্রবণ ১৭৩টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের স্থান পঞ্চমে। বন্যা, ঘূর্ণিঝড়, নদী ভাঙন, খরা, কালবৈশাখী, টর্নেডো, জলোচ্ছ্বাসসহ বজ্রপাতের মতো দুর্যোগ এ দেশে বারবারই আঘাত হানে। ১৯৮০ সাল থেকে এ পর্যন্ত বাংলাদেশে দুইশ’র বেশি প্রাকৃতিক দুর্যোগের ঘটনা ঘটেছে। এসব বিপর্যয়ে দুই লাখের বেশি মানুষের প্রাণহানি এবং প্রায় ১৭ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের সমপরিমাণ সম্পদের ক্ষতি হয়েছে। সবচেয়ে বেশি দুর্ভোগের শিকার হয়েছে নারী ও শিশুরা। আর প্রাণহানিও বেশি ঘটেছে এদেরই।

বন্যাকবলিত এলাকাগুলোতে বন্যা ও বন্যা-পরবর্তী সময়ে নানা ধরনের রোগবালাইও দেখা যায়। এর মধ্যে পানি ও কীটপতঙ্গবাহিত রোগের সংখ্যাই বেশি। বন্যার সময় ময়লা-আবর্জনা, মানুষ ও পশুপাখির মলমূত্র এবং পয়োনিষ্কাশনব্যবস্থা একাকার হয়ে এসব উৎস থেকে জীবাণু বন্যার পানিতে মিশে চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে। এভাবে বন্যায় সংক্রামক ব্যাধির বিস্তার বেড়ে যায়। বন্যা ও বন্যা-পরবর্তী সময়ে মানুষের ক্ষেত্রে জ্বর-সর্দি, ডায়রিয়া, কলেরা, রক্ত আমাশয়, টাইফয়েড, প্যারাটাইফয়েড, ভাইরাল হেপাটাইটিস, পেটের পীড়া, কৃমির সংক্রমণ, চর্মরোগ, চোখের অসুখ প্রভৃতি সমস্যা মহামারি আকার ধারণ করে। বন্যা-পরবর্তী সময়ে কীটপতঙ্গের আধিক্য দেখা যায়। ফলে এসব কীটপতঙ্গ দ্বারা ডেঙ্গু, চিকুনগুনিয়া, ম্যালেরিয়া কিংবা ডায়রিয়া হয়।

পানিবাহিত রোগ থেকে রক্ষা পেতে অবশ্যই সুপেয় পানির ব্যবস্থা করতে হবে এবং সব কাজে নিরাপদ পানির ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে। বন্যার পানি বা বন্যায় তলিয়ে যাওয়া নলকূপ, কুয়া বা অন্য কোনো উৎসের পানি জীবাণু দ্বারা দূষিত থাকায় কোনো অবস্থাতেই এসব পানি দিয়ে হাত-মুখ ধোয়া, কুলি করা বা পান করা যাবে না। বন্যার পানিতে গোসল করা, কাপড়চোপড় ধোয়া, থালাবাসন পরিষ্কার করা চলবে না। যতটা সম্ভব বন্যার পানি এড়িয়ে চলতে হবে। গবাদিপশুর ক্ষেত্রেও এসব পানি ব্যবহার করা থেকে বিরত থাকতে হবে।

এছাড়া দুর্যোগের সময় শিশুদের আবদ্ধ অবস্থায় থাকতে হয়, তাদের স্বাভাবিক জীবন বাধাগ্রস্ত হয়। নানাবিধ কারণে নারীদের মানসিক ও শারীরিক সমস্যার সৃষ্টি হয়। প্রাকৃতিক দুর্যোগের পর দ্রব্যমূল্য স্থিতিশীল রাখা আরেকটি বড় চ্যালেঞ্জ। ২০০৭ ও ২০০৮ সালে এদেশে দ্রব্যমূল্য অসহনীয় পর্যায়ে চলে যায়। এ বিষয়েও সরকারের তড়িৎ পদক্ষেপ নেওয়া জরুরী।

পরিশেষে, এমন মাত্রায় বন্যা ভয়াবহ প্রাকৃতিক দুর্যোগের পর্যায়ে পড়ে। বিষয়টি নীতি-নির্ধারকদের গুরুত্বের সঙ্গে নিয়ে দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন।

লেখক: সাংবাদিক।
(মতামত লেখকের নিজস্ব)




রাইজিংবিডি/ঢাকা/২৬ আগস্ট ২০১৭/হাসান/শাহনেওয়াজ

Walton Laptop