ঢাকা, সোমবার, ৮ মাঘ ১৪২৫, ২১ জানুয়ারি ২০১৯
Risingbd
সর্বশেষ:

খান আতা নিয়ে বিতর্ক: আরো কিছু বলার আছে

অজয় দাশগুপ্ত : রাইজিংবিডি ডট কম
 
     
প্রকাশ: ২০১৭-১০-১৬ ২:৩০:২২ পিএম     ||     আপডেট: ২০১৮-০৩-০৪ ১:৪৪:০৮ পিএম

|| অজয় দাশগুপ্ত ||

নাসির উদ্দীন ইউসুফ বাচ্চু নাট্যনির্দেশক বা থিয়েটার ব্যক্তিত্বের পাশাপাশি একজন কঠিন মুক্তিযোদ্ধা। তিনি আমাদের গেরিলা যুদ্ধের পথিকৃৎ। তাঁর নির্মিত দুটি মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক ছবির একটির নাম ‘গেরিলা’ও বটে। ইদানীং তাঁর ভূমিকা যত বেশি দেশপ্রেমময় আর মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসনির্ভর হয়ে উঠছে তত বেশি তর্ক করছি আমরা। কারণ আমাদের হাঁড়-মজ্জা আর রক্তে রয়েছে বেঈমানী।

যে-দেশের জন্ম না হলে আমরা পাকিদের অধীনে সেবক বা সেবাদাস ছাড়া আর কোনো কাজ করতে পারতাম না, সেই মাটির প্রতি অকৃতজ্ঞ আর তাকে নিয়ে মশকরা করাই এখন প্রগতিশীলতা! বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও তাজউদ্দীনের মতো নেতারা থাকায় এ-দেশের স্বাধীনতা ত্বরান্বিত হয়ে গিয়েছিল। তারচেয়েও বড় কথা, সে সময় আমেরিকা চীন আর পাকিস্তানের ভাই-ভাই সম্পর্কে ফাটল ধরানো বা তাদের পরাজিত করা আমাদের একার কাজ ছিলো না। তেমন হলে এই যুদ্ধ কত বছর চলতো আর তার পরিণতি কী হতো ভাবলেও ভয় লাগে বৈকি। মুক্তিযুদ্ধের সহায়ক ভারত ও রাশিয়ার প্রতি আমাদের সাধারণ মানুষে বিদ্বেষ ছড়ানোর কাজটি ভালোভাবেই করেছে এ-দেশের বুদ্ধিবৃত্তি। ভারতের তো অনেক দোষ। আমরা বলি না তারা ধোয়া তুলসী পাতা। বরং এখন তাদের সাথে আমাদের সম্পর্ক বা লেনদেন নিয়ে দুর্ভাবনা থাকবেই। সেখানে নিজেদের দেশ্রপেম বা ঐক্যহীন আমরা ভারতকে হিন্দুদেশ মেনে নিয়ে মুক্তিযুদ্ধের অতীত গৌরবে পেরেক ঠুকতেও এক পা এগিয়ে। আজ অনেককাল পর বাচ্চু ভাই খান আতার ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তুলে যে কাজটি করেছেন তাতে তাঁকে সাধুবাদ দিয়ে বলতে চাই, যারা বিরোধিতা করছেন বা এটিকে অন্যায় মনে করছেন তারা আগে ইতিহাস জানুন তারপর মুখ খুলুন।

আমাদের কৈশোরে একটা চালু গল্প ছিলো এমন- খান আতাউর রহমান নাকি বিলেতে এক শ্বেতাঙ্গ রমণীর সাথে প্রেম করে দেশে চলে এসেছিলেন। আর সেই রমণীর বদ্ধমূল ধারণা তিনি তাঁকে বিয়ে করবেন। বিয়ের আশায় ঢাকায় আগত সেই রমণী অনেক খুঁজে আমাদের আদালত ভবনটি দেখিয়ে দেখিয়ে মানুষের কাছে প্রশ্ন করতো- এর মালিক কে? তাকেই তিনি খুঁজতে এসেছেন। বেশ কিছুদিন পর যখন জানলেন বাড়ি বলে চালিয়ে দেয়া ছবিটি আসলে সরকারি ভবন তখন নিশ্চয়ই ভগ্ন মন নিয়ে তিনি দেশে ফিরে গিয়েছিলেন। ঘটনা সত্য কিনা জানি না। তবে ব্যক্তিজীবনে খান আতার বিবাহ বিলাসের কথা আমরা সবাই জানি। সেটাও কোনো ব্যাপার না। সেটা তাঁর ব্যক্তিগত বিষয়। মুশকিল হচ্ছে আজ যখন আমরা পেছন ফিরে দেখি, দেখবো আগাগোড়া স্ববিরোধী এই তুখোড় অভিনেতা, পরিচালক, সুরকার পঁচাত্তরে এক বিষধর সাপের ভূমিকা পালন করেছিলেন।

বঙ্গবন্ধুর হত্যাকাণ্ডের পর ফটাফট বেতারে গিয়ে যে গানগুলো রচনা করেছিলেন তার কথাগুলো পড়ে দেখুন। আমরা দেশ স্বাধীন করেছিলাম কাহাদের জন্য?- এমন জাতীয় কথা আপাত নির্দোষ মনে হলেও আসলে এর ভেতর প্রচণ্ড মুক্তিযুদ্ধ বিরোধিতা লুকিয়ে রয়েছে। মনে রাখতে হবে, তখন মোশতাক সরকার, জিয়াউর রহমানও গদীতে আসেননি। দেশের কী হবে বা আমাদের দেশের নাম বাংলাদেশ থাকবে কি না, জাতীয় সংগীত, পতাকা এসব বহাল থাকবে কি না এমন সব দ্বন্দ্ব তখন সবার মনে। মোশতাকের সাথে লোভী বেঈমান মীরজাফর ছাড়া কেউ যায়নি। খান আতা গেলেন। লিখলেন, আবার জমবে মেলা হাটতলা বটতলা অঘ্রাণে নব্বানে উৎসবে, সোনার বাংলা ভরে উঠবে সোনায় ...।

এর অর্থ বঙ্গবন্ধু ও মুক্তিযুদ্ধের সময় এগুলো ছিলো না। কথার চেয়েও বড় তার দৃষ্টিভঙ্গী। যে-মানুষ ‘জীবন থেকে নেয়া’য় অভিনয় করলেন, যার কাছে আমাদের চলচ্চিত্র ও গানের অপরিসীম ঋণ তিনি কীভাবে রাতারাতি পাল্টে গেলেন? আসলে পাল্টানোটা হয়ত ভেতরেই ছিলো। তাই যদি না হবে ‘আবার তোরা মানুষ হ’ নামের ছবি বানালেন কী করে? আবারো বলি, আপাত দৃষ্টিতে মনে হবে আহা কত ভালো ছবি! সবাইকে মানুষ হবার ডাক দিয়েছেন তো কী হয়েছে তাতে? কিন্তু বাস্তবে তিনি মুক্তিযোদ্ধাদের চরিত্র হননে নেমেছিলেন। এখনো মনে আছে, ছবির তরুণদের দেখানো হয়েছিল পথভ্রষ্ট হিসেবে। ভাবখানা এই, তারা দেশ স্বাধীন করার পর লুটপাট আর ডাকাতিকেই আরাধ্য মেনে নিয়েছিল। অথচ আজ এত বছর পর আপনি যদি অতীত ইতিহাসের দিকে তাকান, এ-দেশের মুক্তিযোদ্ধারা যে কোনো দেশের তুলনায় ছিল নীরিহ ও অসুবিধাভোগী। আজ যারা ভূয়া মুক্তিযোদ্ধা বা মুক্তিযুদ্ধের নাম ভাঙিয়ে চলেন তখন তাদের জন্ম হয়নি। কেউ তখন স্বপ্নেও ভাবেনি এই দেশে মুক্তিযুদ্ধ একদিন পণ্য হতে পারে। অথচ সে আমলেই চরিত্র হননে নেমে গেলেন এই জনপ্রিয় নির্মাতা। জানি না কেন কেউ এর বিরুদ্ধে তখন কিছু বলেনি। সদ্য স্বাধীন দেশে মুক্তিযোদ্ধাদের প্রতি এমন অনাচার ও অবিচারের জন্য তখনই তাকে জবাবদিহি করা ছিল যৌক্তিক। কোথায় তিনি বা তার মতো মানুষেরা এ দেশের পুর্নগঠনমূলক ছবি বানাবেন, তা না করে তিনি গেলেন চরিত্র হননের কাজে।

সম্প্রতি চিকিৎসাধীন মেয়র আনিসুল হকের অনবদ্য সঞ্চালনায় পুরনো একটি টিভি-শো দেখছিলাম। সেখানে হাজির ছিলেন খান আতা, নিলুফার ইয়াসমীন, রেজওয়ানা চৌধুরী বন্যাসহ অনেক তারকা। সেই আয়োজনে অকারণে রবীন্দ্রবিরোধী বক্তব্য রাখলেন খান আতা। বললেন, তাঁর গান নাকি সীমিত সীমাবদ্ধ। ভবিষ্যতেও বদলের কোনো সুযোগ নাই। ধন্যবাদ দেই বন্যাকে। সেই তরুণী বয়সেও তিনি তখনকার বড় তারকা খান আতাউর রহমানকে ছেড়ে কথা বলেননি ওই অনুষ্ঠানে। স্পষ্ট মুখের ওপর বলে দিয়েছিলেন- এটা সঠিক কথা না।

যা বলছিলাম, আমাদের সমাজের বড় দোষ, আমরা যাদের মনে করতাম অভিভাবক বা পথ দেখাবেন, তারাই সময় মতো পাল্টে যেতেন; এখনো যান। মজার বিষয় এই অন্তরে হয়তো মুক্তিযুদ্ধ আর পাকিস্তানের বিভক্তি মানতে না পারা এদের ব্যক্তিচরিত্র ও ছবির চরিত্র একেবারে অনাদর্শিক। ‘মনের মত বৌ’ ছবির কথাই ধরুন। পুত্র বধূর সামনে মদ্যপ শ্বশুড়ের কত ভালো ভালো কথা। আর গান শোনা। ব্যক্তিগত জীবনের কষ্ট ভোলার নামে এমন অহরহ মদ্যপানরত চরিত্রের নায়কেরাই আমাদের ইতিহাসের বারোটা বাজিয়েছেন।

বলে রাখা উচিত, বাংলাদেশের আধুনিক গানে যদি একটি গানও টেকে তবে তা হবে, ‘একি সোনার আলোয় জীবন ভরিয়ে দিলে’। তার প্রতিভা, মেধা, সম্মান নিয়ে আমার কোনো সন্দেহ নাই। আমি তার অভিনয়গুণও শ্রদ্ধা করি। তাই বলে তিনি যে ভূমিকা পালন করতে পারেননি, বা যা করে আমাদের মুক্তিযুদ্ধকে অপমান করেছিলেন তা ভুলবো কোন সুখে? খান আতাউর রহমান একা না, এমন অনেককে আমরা চিনি, জানি যারা সময় মতো সুযোগ পেলেই আমাদের ইতিহাস ও মুক্তিযুদ্ধের প্রতি অসম্মান বা তা নিয়ে খেলতে কসুর করেননি। একটা জায়গাতেই বাচ্চু ভাইয়ের সাথে হয়তো একমত হবো না, খান আতা ‘রাজাকার’ ছিলেন কি না জানি না। তবে দেশ স্বাধীনের পর তিনি মাঝে মাঝে সে ভূমিকায় অভিনয় করেছেন।

আজ আমাদের সামনে এমন একটা গুরুত্বপূর্ণ বিষয় তুলে ধরার পর আমরা না জেনে, না শুনে, বা না খবর নিয়ে নাসিরুদ্দীন ইউসুফ বাচ্চুকে মন্দ বলছি। আগে জানতে হবে। এখনো এমন অসংখ্য মানুষ, অসংখ্য বুদ্ধিজীবী আছেন যারা দেশের আগপাশ তলা ভোগ করার পর মুক্তিযুদ্ধের সুফল খেয়ে আমাদের জাতিকে নিয়ত বিষফল ধরিয়ে দেবার কাজে লিপ্ত। এতে একটাই লাভ, প্রজন্মের পর প্রজন্ম ভুল আর মিথ্যার আবরণে জড়িয়ে থাকবে। তাই সঠিক মূল্যায়ন বা ইতিহাসের কাছে যাওয়া ছাড়া বিকল্প নেই। দেশের বয়স মধ্যচল্লিশ পেরিয়েছে। এখনও দেশে এ বিষয়ে তর্ক করতে হয়। সত্যি সেলুকাস...

লেখক: সাংবাদিক, প্রবন্ধকার

 

 

 

রাইজিংবিডি/ঢাকা/১৬ অক্টোবর ২০১৭/তারা

Walton Laptop
 
     
Marcel
Walton AC