ঢাকা, মঙ্গলবার, ৩ মাঘ ১৪২৪, ১৬ জানুয়ারি ২০১৮
Risingbd
সর্বশেষ:

প্রাথমিক শিক্ষায় বেতন বৈষম্য ও মান- দুদিকেই নজর দিন

মাছুম বিল্লাহ : রাইজিংবিডি ডট কম
 
   
প্রকাশ: ২০১৭-১২-৩১ ১২:৫৩:৩২ পিএম     ||     আপডেট: ২০১৭-১২-৩১ ১:১৬:৪০ পিএম
আন্দোলনরত শিক্ষকদের একাংশ

মাছুম বিল্লাহ: প্রাথমিক শিক্ষা যদিও সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব পাওয়ার কথা, আমরা দেখছি গুরুত্ব পাওয়ার পরিবর্তে এখানে সমস্যা যেন আরও ঘণীভূত হচ্ছে। এই সমস্যার বলি হচ্ছেন কোমলমতি সোনামণিরা, যারা এক সময় দেশের নেতৃত্ব দেবে। যে কোনো মূল্যে আমাদের এই অবস্থা থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। মাত্র কিছুদিনের মধ্যেই শিক্ষার্থীদের হাতে পৌঁছে যাওয়ার অপেক্ষায় নতুন বই, শুরু হবে নতুন শিক্ষাবর্ষ। কিন্তু সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষকগণ ২৩ ডিসেম্বর, ২০১৭ থেকে প্রধান শিক্ষকদের সাথে তাদের তিন ধাপ বেতন বৈষম্যের কারণে আন্দোলনে নেমেছেন। পাঁচটি শিক্ষক সমিতির পতাকাতলে তারা দলে দলে ছুটছের ঢাকায়। এখন প্রশ্ন হচ্ছে শিক্ষকদের এ সময় আন্দোলনে নামার যৌক্তিকতা কী? আবার এটিও ঠিক যে, আমাদের শিক্ষা কর্তৃপক্ষ সব ক্ষেত্রেই দেখা যায় দেয়ালে পিঠ না ঠেকা পর্যন্ত নড়েচড়ে বসেন না। ফলে শিক্ষকগণ এই মোক্ষম সময়কেই শিক্ষার্থীদের জিম্মি করে আন্দোলনে নামেন। আর এর ফল ভোগ করে গোটা শিক্ষাব্যবস্থা।

আমাদের দেশের প্রাথমিক শিক্ষকদের সেই করুণ অবস্থার চিত্র ফুঠে ওঠে যদি আমরা একটু পেছনে তাকাই। ১৯৭০ থেকে ১৯৭৩ সাল পর্যন্ত প্রধান শিক্ষক ও সহকারী শিক্ষক উভয়েই ১৩৫ টাকা করে মূল বেতন পেতেন। তবে প্রধান শিক্ষকরা কার্যভার ভাতা হিসেবে দশ টাকা বেশি পেতেন। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ১৯৭৩ সালে প্রাথমিক শিক্ষা জাতীয়করণ করেন। এরপর ১৯৭৭ সাল পর্যন্ত প্রধান শিক্ষক ও সহকারী শিক্ষক উভয়েই মূল বেতন হিসেবে মাসে ২৩০ টাকা পেতেন। ১৯৭৭ সাল থেকে ১৯৮৫ সাল পর্যন্ত প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষকগণ পেতেন ১৬তম গ্রেডে মূল বেতন ৪৩০ টাকা। সহকারী শিক্ষকগণ ১৭তম গ্রেডে ৪০০টাকা হারে মূল বেতন পেতেন। এরপর ১৯৮৫ সাল থেকে ১৯৯১ সাল পর্যন্ত একজন প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক ১৬তম গ্রেডে মূল বেতন পেতেন ৭৫০ টাকা আর সহকারী শিক্ষক ৬৫০টাকা। পরে ২০০৫ সাল পর্যন্ত প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক ১৬তম গ্রেডে বেতন পেতেন ৩১০০টাকা, আর সহকারী শিক্ষক পেতেন ১৭তম গ্রেডে মূল বেতন ৩০০০টাকা।

কিন্তু ২০০৬ সালে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক ১৩তম গ্রেডে ৩৫০০ টাকা এবং সহকারী শিক্ষকদের ১৫তম গ্রেডে ৩১০০ টাকা মূল বেতন নির্ধারণ করা হয়। এতে বৈষম্য সৃষ্টি হয় দুই ধাপ। আমাদের প্রাথমিক শিক্ষা সেই ‘প্রায় মরি’ অবস্থা থেকে আজ একটা অবস্থানে এসে দাঁড়িয়েছে বটে কিন্তু সার্বিক অবস্থা যেন আরও নড়বড়ে হয়ে পড়েছে। ১৯৭৭ সাল পর্যন্ত সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক ও সহকারী শিক্ষকদের মধ্যে কোনো বেতন বৈষম্য ছিল না। তবে ১৯৭৭ সাল থেকে প্রধান শিক্ষক ও সহকারী শিক্ষকদের বেতন স্কেলে এক ধাপ পার্থক্য তৈরি হয়। সঙ্গত কারণেই সেটি সহকারী শিক্ষকগণ মেনে নিয়েছিলেন। কিন্তু এই পার্থক্য ২০০৬ সালে এসে তৈরি হয় দুই ধাপে। এরপর ২০১৪ সালে প্রধান শিক্ষকদের পদমর্যাদা দ্বিতীয় শ্রেণিতে উন্নীত করা হলে এই পার্থক্য এসে দাঁড়াল তিন ধাপে। বর্তমানে প্রধান  শিক্ষকগণ বেতন পান একাদশতম গ্রেডে আর সহকারী শিক্ষকগণ চৌদ্দতম গ্রেডে। এদিকে দ্বিতীয় শ্রেণির অন্যান্য বিভাগে যারা চাকরি করেন তারা দশম গ্রেডে বেতন পান, তাই প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয় সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষকদেরকেও দশম গ্রেডে নেওয়ার চিন্তাভাবনা করছে। বিষয়টি যুক্তিসঙ্গত কারণ শিক্ষা বিভাগে চাকরি করেন বলে কেন তারা অন্যান্য বিভাগ থেকে পিছিয়ে থাকবেন? তাই মন্ত্রণালয় এটিকে দশম গ্রেডে উন্নীত করার চিন্তা করছে। এটি অবশ্যই খুশীর সংবাদ। কিন্তু বিষয়টি সহকারী শিক্ষকদের চাপা ক্ষোভে ঘি ঢেলেছে। তারা দেখছেন এটি হলে তাদের সাথে প্রধান শিক্ষকদের তফাৎ হবে অনেক। আসলে প্রধান শিক্ষক এবং সহকারী শিক্ষকদের মধ্যে তফাৎ তো স্বাভাবিক কারণেই থাকার কথা। সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের দিকে তাকালেই তার প্রমাণ পাওয়া যায়। এটি শিক্ষকদের মেনেও নেয়া উচিত। মেনে নেয়ার অবস্থায় নেই বিধায় তারা আন্দোলনে নামলেন।

আসলে প্রাথমিক শিক্ষার পুরো বিষয় আমরা গুরুত্ব সহকারে দেখছি না একেবারেই। এক এক সময় এক এক স্রোতের কারণে, রাজনৈতিক কারণে এক একটি ঘোষণা আমরা দিয়ে ফেলি, তারপর কী হবে বা না হবে, বিষয়টি কতটা যৌক্তিক এসব নিয়ে চিন্তা করি না। তাই কোনো সমস্যা সমাধানের পরিবর্তে সমস্যা আরও বেড়ে যায়। আমরা যদি দেশের প্রকৃত কল্যাণ চাই তাহলে প্রাথমিক শিক্ষাকে একেবারে একটি আদর্শ শিক্ষাবিভাগে রূপান্তর করতে হবে। কিন্তু আমাদের প্রাথমিক শিক্ষার ক্ষেত্রে হচ্ছেটা কী? দেশে ৬৪ হাজার সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় আছে। সরকারি অন্যান্য বিভাগের কথা না হয় বাদ দিলাম, সরকারি শিক্ষা বিভাগে কতজন কর্মকর্তা তাদের ছেলেমেয়েদের এইসব বিদ্যালয়ে পড়াশোনার জন্য পাঠান? দেখা যাবে, একান্ত ঠেকায় না পড়লে কেউ ছেলেমেয়েকে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পাঠান না। কারণ এখানকার অধিকাংশ শিক্ষার্থী না-পারে বাংলা দেখে পড়তে, না-পারে ইংরেজি পড়তে, না-পারে সাধারণ যোগ-বিয়োগ করতে। সহপাঠক্রমিক কাজকারবার এসব স্কুলে তো অপরিচিত একটি বিষয়। ফলে, দেশের আনাচে-কানাচে গড়ে উঠছে ব্যক্তি ও বেসরকারি পর্যায়ে কিন্ডারগার্টেন। এসব কিন্ডারগার্টেনের অধিকাংশরই আদর্শ ক্লাসরুম নেই, উপযুক্ত প্রশিক্ষণসহ শিক্ষক নেই কিন্তু রাষ্ট্রকর্তৃক পরিচালিত পাবলিক পরীক্ষার ফল সরকারি প্রাথমিকের চেয়ে বহু গুণ ভালো। এখানকার শিক্ষার্থীরা নাচ, গান, কবিতা, আবৃত্তিসহ সব ধরনের সহপাঠক্রমিক কাজের সাথে সংযুক্ত। ফলে অভিভাবকগণ তাদের বাচ্চাদের এখানেই পাঠিয়ে থাকেন। অভিভাবকদের অনেক অর্থ গুনতে হয় যদিও, তারপরও তারা এখানেই ছেলেমেয়েকে ভর্তি করান। এখানকার পরিবেশ আদর্শ নয়, ইনফ্রাস্ট্রাকচার ভালো নয়, তারপরও বিকল্প হিসেবে তারা বাচ্চাদের এখনেই পাঠিয়ে থাকেন। আরও ভালো ফল করানোর জন্য তারা ছোটেন প্রাইভেট টিউটরের কাছে এবং কোচিং সেন্টারে।

অধিকাংশ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলো যদিও বিল্ডিং কিংবা ভালো একটি টিনের ঘরে প্রতিষ্ঠিত এবং খেলার মাঠ আছে কিন্তু এগুলোর যথাযথ ব্যবহার নেই। ক্লাসরুমগুলো কোনোভাবেই চাইল্ড ফ্রেন্ডলি নয়, কোনোভাবেই এগুলো বাচ্চাদের আকর্ষণ করে না। দায়সাড়া গোছের প্রাথমিক শিক্ষা। তার মধ্যে তিন ভাগের একভাগ বিদ্যালয়ে প্রধান শিক্ষক নেই। সহকারী শিক্ষকদের মধ্যে অনেকেই থাকেন মাতৃত্বজনিত ছুটিতে, সহকারী শিক্ষক যারা, তারা বেশির ভাগ সময় ব্যস্ত থাকেন উপজেলা শিক্ষা অফিসসহ বিভিন্ন ধরনের একাডেমিক বহির্ভূত কর্মকাণ্ডে। এ ধরনের চিত্র এলাকাভিত্তিক বিভিন্ন পত্র-পত্রিকা প্রায়ই ছেপে থাকে। কোথাও কোথাও একজন শিক্ষক কয়েকটি ক্লাস একত্র করে ক্লাস পরিচালনা করেন, কোথাও কোথাও দু’একটি ক্লাস করার পরেই ছুটি দিয়ে দেওয়া হয়। সহকারী শিক্ষকগণ ভোটার তালিকা, উপবৃত্তির কাজ, পরিবার পরিকল্পনা ও জনসংখ্যা গণনা করাসহ বহু ধরনের কাজ করে থাকেন। তাহলে বোঝাই যাচ্ছে যে, কী পড়ানো হয় সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়সমূহে।

এগুলো যেনতেনভাবে চললে হবে না কারণ প্রাথমিক শিক্ষা হতে হবে সবচেয়ে মজবুত, সবচেয়ে আকর্ষণীয়। এখানে রাষ্ট্রের খেয়াল থাকতে হবে সর্বোচ্চ পর্যায়ের। কিন্তু প্রাথমিক শিক্ষার অবস্থা দেখলে মনে হয় যে, সরকার যেন ধরেই নিয়েছে অবস্থাপন্ন বা সচেতন নাগরিক যারা তাদের সন্তান কিন্ডারগার্টেন কিংবা ব্যক্তি পর্যায়ের প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পড়াশোনা করবে আর যারা অবহেলিত বা যাদের কিছু বলার নেই, তারা পড়বে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে। তাই, সরকারি বিদ্যালয়গুলোতে যা হচ্ছে তা নিয়ে তেমন কোনো মাথাব্যথার কারণ নেই। এদিকে ৩৫ কোটির অধিক বই বিনামূলে বিতরণ করা হচ্ছে সারাদেশে। এ নিয়ে আবার আলাদা হৈ চৈ। একদিকে প্রশ্নপত্র ফাঁসের মহড়া, ক্লাসে পড়াশোনা নেই, শিক্ষকরা যখন তখন যাচ্ছেন আন্দোলনে, কোচিং-এর পসার দিন দিন বাড়ছে, পরীক্ষাপদ্ধতির দুর্বলতার কারণে আর আমরা সবাই ব্যস্ত বিনামূল্যের বই বিতরণ নিয়ে। শিক্ষাবিভাগের সবাই ব্যস্ত কাগজ ক্রয়, টেন্ডার দেওয়া, বই ছাপানো, প্রেস ঠিক করা, ট্রাক ঠিক করা আর বই বিতরণ নিয়ে। কোথায় শিক্ষকদের নিয়ে চিন্তা করা, কোথায় শিক্ষার মান নিয়ে চিন্তা করা, কোথায় প্রশ্নপত্র ফাঁস নিয়ে চিন্তা করা আর শিক্ষকদের চাকরিতে যে সিঁড়ি তৈরি করতে হবে, একে একটি আকর্ষণীয় পেশা হিসেবে তৈরি করতে হবে সেসব চিন্তা করার সময় আমাদের নেই! শিক্ষা বিভাগের সবকিছু যদি ঠিকঠাকভাবে চলতো, শিক্ষার মান যদি কাঙ্খিত পর্যায়ে থাকত, মূল্যায়ণ পদ্ধতি যদি সঠিক হতো তাহলে বিনামূল্যে বই বিতরণ প্রশংসা করার মতো বিষয় ছিল। কোনোদিকেই আমরা ম্যানেজ করতে পারছি না। তার মধ্যে সবাই বিনামূল্যে বই বিতরণ নিয়ে ব্যস্ত।

প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলো হতে হবে সমস্ত বাচ্চাদের আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দু। সেজন্য বিদ্যালয়গৃহ থাকবে খেলাধুলা সমগ্রীতে ভর্তি, আকর্ষণীয় ও শিক্ষাবিষয়ক ছবি ও অন্যান্য শিক্ষা সামগ্রীতে ভর্তি থাকবে শ্রেণিকক্ষগুলো, শিক্ষার্থীদের বাড়িতে ধরে রাখা যাবে না, তারা স্কুলের দিকে দৌঁড়ে আসবে। সেই ধরনের প্রাথমিক শিক্ষা আমরা কবে উপহার দিতে পারব জাতিকে? সরকার যদি বিষয়টি না পারে তাহলে সুশৃঙ্খলভাবে প্রাইভেট পর্যায়ে এর ব্যাপ্তি ঘটাতে হবে। কিন্তু এখন যেটি হচ্ছে তা হলো ‘ধরি মাছ না ছুই পানি’ অবস্থা, ‘দেখেও না দেখার ভান’ করার মতো অবস্থা। প্রাথমিক শিক্ষা যে যে ভাবে পারে চালিয়ে যাক। এই অবস্থা হলে চলেব না। এখানে প্রয়োজন গভীর মনোযোগের। এটি শুধু রাজনৈতিক বিষয় নয়, এটি শুধুমাত্র করার জন্য করতে হবে এমন বিষয় নয়। প্রাথমিকের একজন শিক্ষক হবেন আদর্শবান। চমৎকার এক মূল্যায়ন পদ্ধতির মধ্য দিয়ে তাদের নির্বাচিত করতে হবে। তারপর নিবিড় প্রশিক্ষণের মধ্য দিযে তাদের প্রকৃত শিক্ষকে রূপান্তর করতে হবে। আজকের শিশু আগামী দিনের ভবিষ্যত, তারা পুরোটাই তাদের প্রাথমিকের শিক্ষকের কাছ থেকে শিখবে। তারা যা শিখবে জাতিকে তাই উপহার দেবে সামনের দিনগুলোতে। কাজেই এখানে আমাদের অবশ্যই সুদৃষ্টি দিতে হবে। প্রাথমিকের একজন শিক্ষক প্রশিক্ষণ পাবেন দেশে-বিদেশে। তিনি প্রধান শিক্ষক হবেন, শিক্ষা অফিসার হবেন, মাধ্যমিকের শিক্ষক হবেন, কলেজের শিক্ষক হবেন, উপজেলা, জেলা এবং বিভাগীয় পর্যায়ে শিক্ষা অফিসার হবেন, শিক্ষা বিভাগের পরিচালক, মহাপরিচালক হবেন। এসব বিষয়ে আমরা খেয়াল করি না একেবারই। আমরা হঠাৎ একজন কলেজের শিক্ষক যার রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতা আছে কিংবা প্রশাসনিক এক কর্মকর্তাকে ধরে এনে প্রাথমিকের সর্বোচ্চ পদটিতে বসিয়ে দেই। তাতে কি প্রাথমিক শিক্ষায় কোনো উন্নয়ন ঘটার সম্ভাবনা থাকে? তাতে রাজনৈতি বা অন্য কোনো বিষয়ের উদ্দেশ্য হয়তো সফল হয় কিন্তু শিক্ষার উদ্দেশ্য কোনোভাবেই সফল হয় না। আমাদের বুঝতে হবে প্রাথমিক শিক্ষা নিয়ে কোনো রাজনীতি করা ঠিক হবে না। কারণ শিশুদের মধ্যে রাজনীতি নেই। আমরা কলেজ শিক্ষাকে এবং বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষাকে রাজনীতিতে জড়িয়ে ফেলেছি। যার ফলও দেশ দেখছে, সমাজের বর্তমান অবস্থা আমরা প্রত্যক্ষ করছি সেই অপরাজনীতির মারাত্মক পরিণতিতে! আমরা কি এভাবেই চলতে দেব না নতুন কিছু চিন্তা করব?

 

প্রায় বিশ হাজার সরকারি প্রাথমিকের প্রধান শিক্ষকগণ সম্প্রতি তাদের পাওনা তিনটি টাইম স্কেল পেয়েছেন। ফলে তাদের কেউ কেউ নবম বা দশম গ্রেডে চলে গেছেন। এটি তো আসলে আনন্দের সংবাদ। কিন্তু সহকারী শিক্ষকগণ যখন দেখছেন যে, তাদের মধ্যে একাডেমিকগত বা অন্য কোনো বিষয়ে এত বিশেষ কোনো পার্থক্য নেই অথচ তারা এত উপরে চলে যাবেন কেন? তাদের বেতন বৈষম্য এত বেশি কেন? এসব প্রশ্নের উত্তর না পেয়ে তারা আন্দোলনে নেমেছেন।

২০১৪ সালে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা প্রাথমিক শিক্ষকদের বেতন ও পদমর্যাদা বাড়ানোর ঘোষণা দেন। যা কার্যকর করা হয় ২০১৩ সাল থেকে। তখন প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষকদের বেতন দ্বিতীয় শ্রেণির মর্যাদাসহ নির্ধারণ করা হয় ১১তম গ্রেডে, বেতন ৬৪০০টাকা। প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত সহকারী শিক্ষকদের তৃতীয় শ্রেণির কর্মচারী হিসেবে ১৪তম গ্রেডে বেতন হয় ৫২০০টাকা। এ সময় মূল বেতনের ব্যবধান দাঁড়ায় ১২০০ টাকা। ২০১৫ সালে অষ্টম জাতীয় পে-স্কেল ঘোষণা করা হলে তা আরও বেড়ে যায়। এখন একজন প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক ১১তম গ্রেডে বেতন পাচ্ছেন ১২৫০০টাকা। আর প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত সহকারী শিক্ষক ১৪ গ্রেডে বেতন পাচ্ছেন ১০২০০ টাকা (মূল বেতন)। তবে প্রশিক্ষণবিহীন প্রধান শিক্ষক ও সহকারী প্রধান শিক্ষক উভয়েই বেতন পান ১৫তম গ্রেডে। আমরা আবারও সরকারকে অনুরোধ করছি, প্রাথমিক শিক্ষার দিকে গভীরভাবে মনোনিবেশ করুন জাতিকে একটি সুন্দর ভবিষ্যত উপহার দিতে। প্রাথমিকের প্রধান শিক্ষকদের পদ প্রথম গ্রেডে উন্নীত করুন। সহকারী শিক্ষকদের দ্বিতীয় গ্রেডে উন্নীত করুন প্রকৃত মূল্যায়ণ পদ্ধতির মাধ্যমে। তাদের নির্বাচন প্রক্রিয়া আরও অর্থবহ করুন। তাদের কোয়ালিফিকেশন নির্দিষ্ট করুন, গভীর প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করুন। বর্তমানের প্রাইমারী ট্রেনিং ইনস্টিটিউটগুলোকে আদর্শ শিক্ষক প্রশিক্ষণের আলয়ে পরিণত করুন এবং তাদের যেন শুধুমাত্র প্রাথমিক শিক্ষক হিসেবে নিয়োগ ও প্রাথমিকে সহকারী শিক্ষক হিসেবেই অবসরে যেতে না হয় সেদিকে দৃষ্টি দিন। তাদের জন্য সুযোগ অবারিত রাখুন। তাহলে আমরা মেধাবীদের প্রাথমিক শিক্ষকতায় আকৃষ্ট করতে পারব এবং জাতিকে একটি সুন্দর ও সুস্থ প্রাথমিক শিক্ষা উপহার দিতে পারব। বিষয়টি সরকারের একার পক্ষে সম্ভব না হলে বেসরকারি পর্যায়েও এই কাজে অন্তর্ভুক্ত করুন অর্থবহভাবে।

প্রধান শিক্ষকের পদ যদি প্রকৃত পরীক্ষার মাধ্যমে নির্দিষ্ট মানদণ্ডের উল্লেখ করে নেয়া হতো তাহলে কিন্তু এত ঝামেলা থাকতো না। সহকারী শিক্ষকগণও মেনে নিতেন। আবার সহকারী শিক্ষকগণ যদি দেখতেন যে, তারাও একটি নির্দিষ্ট সময়ান্তে প্রধান শিক্ষক হবেন এবং তখন তারা ঐ ধরনের স্ট্যাটাস ও বেতন স্কেল প্রাপ্য হবেন তাহলে কিন্তু তারা আন্দোলনের চিন্তা করতেন না। তারা বিষয়গুলো নিয়ে বারবার শিক্ষা বিভাগের উর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের তাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছিলেন কিন্তু কেউ তাতে কর্ণপাত করেননি। আমাদের দেশের বিষয়গুলো এমনই হয়। তাই রবিঠাকুর বলেছেন: ‘সঠিক সময়ে সঠিক কাজটি করিতে কাহারও মনে পড়ে না, পরে বেঠিক সময়ে বেঠিক সিদ্ধান্ত লইয়া হাতরাইয়া মরি।’

লেখক: শিক্ষা-গবেষক, ব্র্যাক শিক্ষা কর্মসূচিতে কর্মরত



রাইজিংবিডি/ঢাকা/৩১ ডিসেম্বর ২০১৭/তারা

Walton
 
   
Marcel