ঢাকা, শনিবার, ৯ আষাঢ় ১৪২৫, ২৩ জুন ২০১৮
Risingbd
সর্বশেষ:

পাবলিক পরীক্ষাগুলোর ফল কি বিশ্বাসযোগ্যতার দিকে এগুচ্ছে?

মাছুম বিল্লাহ : রাইজিংবিডি ডট কম
 
   
প্রকাশ: ২০১৮-০১-০৩ ২:৫৯:৫৮ পিএম     ||     আপডেট: ২০১৮-০১-০৩ ৩:২৩:২৬ পিএম

মাছুম বিল্লাহ: নবম প্রাথমিক সমাপনী ও অষ্টম ইবতেদায়ি সমাপনী পরীক্ষার ফল প্রকাশিত হয়েছে গত ৩০ ডিসেম্বর। এই পরীক্ষাগুলো গত ১৯ নভেম্বর শুরু হয়ে শেষ হয়েছে ২৬ নভেম্বর। ওই একই দিন জুনিয়র স্কুল সার্টিফিকেট পরীক্ষা ও জুনিয়র দাখিল সার্টিফিকেট পরীক্ষার ফলও প্রকাশিত হয়েছে। তাতে দেখা যায়, মান নির্ণায়ক চারটি সূচকেই এই চারটি পরীক্ষার ফল নিম্নগামী। জিপিএ-৫ পাওয়া শিক্ষার্থীর সংখ্যা কমেছে, শতভাগ পাস করা প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা কমেছে, শতভাগ অকৃতকার্য হওয়া প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা বেড়েছে এবং সর্বোপরি পাসের হার কমেছে।

শোনা যাচ্ছে স্কুলগুলোর ওপর নজরদারী বাড়ায় এবার পরীক্ষায় পাসের হার কমেছে। তবে সংশ্লিষ্টরা আশাবাদী আগামী বছর আবার শতভাগ পাস করবে। কারণ আমাদের শিক্ষার্থীরা মেধাবী। তবে এটা ঠিক যে, স্কুলগুলোর দিকে নজর দেওয়া দরকার। সেখানে সঠিকভাবে পড়াশোনা হচ্ছে কি-না, বিষয়টি গভীরভাবে খতিয়ে দেখা জরুরি। আমার এই কথায় সংশ্লিষ্টরা ভুল বুঝবেন না। আগের বছরগুলোতে যা হতো, পাসের হার শতভাগে পৌঁছাতেই হবে, শিক্ষার্থীরা খাতায় কিছু লিখুক আর না লিখুক- এমন একটি কথা চালু আছে। শিক্ষাবিদসহ বিভিন্ন মহলের আলোচনা, সমালোচনার পর সম্ভবত শিক্ষা বিভাগ কিছুটা হলেও খাতা মূল্যায়নের বিষয়টি গুরুত্ব সহকারে দেখতে শুরু করেছে। বিষয়টি গুরুত্ব না পেলে জাতীয় এই মূল্যায়নকে আর কেউই গুরুত্ব সহকারে দেখবে না। ধন্যবাদ শিক্ষা মন্ত্রণালয়কে তাদের এই অনুধাবনের জন্য।

কুমিল্লা বোর্ডে ইংরেজি ও গণিতে পাসের হার কম হয়েছে। উদারভাবে খাতা না দেখে কড়াকড়ি করে খাতা দেখা হয়েছে। কুমিল্লা বোর্ডে পাসের হার ৬২.৮৩ শতাংশ আর বরিশাল বোর্ডে সর্বোচ্চ অর্থাৎ ৯৬.৩২ শতাংশ।এতে পার্থক্য দেখা যায় ৩৩ শতাংশের বেশি। কয়েকটি বোর্ডের চেয়ারম্যান ও পরীক্ষা নিয়ন্ত্রকগণ মত প্রকাশ করেন যে, যদি প্রশ্নফাঁস রোধ, ঠিকমতো খাতা দেখা নিশ্চিত এবং পরীক্ষার হলে অসাধু শিক্ষকদের নকল সরবরাহ বন্ধ করা যায়, তাহলে পাসের হার আরও অন্তত ১০ শতাংশ কমবে। মাননীয় চেয়ারম্যানগণ বিষয়গুলো অনুধাবন করছেন এজন্য তাদেরকেও ধন্যবাদ দিচ্ছি। আসলে শিক্ষার যে কি হাল হয়েছে তারা যদি গ্রাম-গঞ্জে গিয়ে দেখার সুযোগ পান তাহলে বুঝতে পারবেন যে, অবস্থা আসলেই কতটা করুণ! আসলে দশ শতাংশ নয়, এই হার অনেক কমে যাবে। আমাদের দেশে পাবলিক পরীক্ষায় মূল্যায়নের ক্ষেত্রে উল্লেখিত বিষয়গুলো মহামারী আকার ধারণ করেছে। প্রশ্নপত্র ফাঁস হচ্ছে- এখানে আর কোনো লুকোচুরি নেই। অবশেষে মাননীয় শিক্ষামন্ত্রীও বলেছেন সে কথা। তিনি বলেছেন, ১৯৬১ সালেও প্রশ্নপত্র ফাঁস হতো। এখানে আমার প্রশ্ন হলো, তখন হতো বলে কি এখনও প্রশ্নফাঁস হবে? আমরা স্বাধীনতা অর্জন করলাম কেন যদি সেই পাকিস্তান আমলের অভ্যাসই অনুসরণ করতে হয়?

আমি বাস্তব অভিজ্ঞতায় দেখেছি, কিছু শিক্ষক জীবনে প্রথমবার খাতা পরীক্ষণ করছেন। অথচ তার অভিজ্ঞতা নেই, প্রশিক্ষণ নেই। কিন্তু তিনি বোর্ডের পরীক্ষক! অনেক শিক্ষক আট-দশ বছর চাকরি করেও প্রকৃত মূল্যায়ন করার দক্ষতা অর্জন করেন না। আর বোর্ডের খাতা মূল্যায়ন করা মানে বিশাল, মহান ও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব যা অনেকের পক্ষেই সম্ভব নয়। অথচ তাড়াহুড়ো করে ফল প্রকাশ করার জন্য যাকে তাকে পরীক্ষক বানিয়ে স্বল্প সময়ের মধ্যে ফল প্রকাশ করার মধ্যে কি মাহাত্ম্য আছে এখনও আমাদের কাছে বোধগম্য নয়। তার চেয়েও বড় কথা একজন শিক্ষার্থী, পরিবারের আনন্দ বেদনা, শিক্ষার্থীর ভবিষ্যত অনেক কিছুই নির্ভর করে খাতা মূল্যায়নের ওপর। অথচ একজন অনভিজ্ঞ শিক্ষক কীভাবে খাতা দেখলেন, মূল্যায়ন করলেন তার উপরই নির্ভর করছে এসব। তাই পাবলিক পরীক্ষার খাতা কমপক্ষে দ্বিতীয় একজন পরীক্ষক দ্বারা মূল্যায়ন করার বিধান রাখা উচিত। আর পরীক্ষার হলে নকল করা, বলে দেওয়া, তথাকথিত ‘সুযোগ-সুবিধা’ থাকার কারণে একটি হলের সবাই প্রায় সম পর্যায়ের ফল লাভ করে। এই বিষয়গুলো সবার জানা। একজন চেয়ারম্যান বলেছেন, আগে উদারভাবে খাতা দেখতে বলা হতো। এবার হয়তো সেভাবে বলা হয়নি। আর একটি বিষয় হচ্ছে, ২০১৭ সালের  এসএসসি ও এইচএসসি পরীক্ষা থেকে ১২ শতাংশ উত্তরপত্র নিয়ে পরীক্ষা উন্নয়ন ইউনিট (বেডু) গবেষণা করছে। জেএসসির খাতাও গবেষণার জন্য নেয়া হবে এমন ধরনের প্রচারণা থাকায় অধিকাংশ শিক্ষকই আগের তুলনায় বেশি মনোযোগ সহকারে খাতা দেখেছেন। তাই লাগামহীনভাবে নম্বর দেয়া অনেকটা কমেছে। বিষয়টি আনন্দের। এসব কারণেই হয়তো পবালিক পরীক্ষার ফল ধীরে ধীরে বিশ্বাসযোগ্যতার দিকে যাচ্ছে বলে মনে করি।

দু’একটি বোর্ডের ফল এখনও তদন্ত করে দেখা উচিত বলে একজন চেয়ারম্যান মন্তব্য করেছেন। এবার শারীরিক শিক্ষা ও স্বাস্থ্য, কর্মমুখী শিক্ষা ও চারু ও কারুকলার মতো তিনটি বিষয় ধারাবাহিক মূল্যায়নের অধীনে স্কুলে পরীক্ষা নিয়ে নম্বর দেয়া হয়েছে। মূল ফল তৈরিকালে ওই ফল গণনায় আনা হয়নি, যদিও তা ট্রান্সক্রিপ্টে দেয়া হবে। এটি পাসের হার কমার ক্ষেত্রে ভূমিকা রেখেছে। মাদ্রাসা শিক্ষার্থীদের নিকট আররি, ইংরেজি ও গণিত কঠিন বিষয়। এসব বিষয়ে খারাপ করায় পাসের হার ও জিপিএ-৫ দুটোতেই প্রভাব পড়েছে। শিক্ষামন্ত্রী বলেছেন, শিক্ষার মান উন্নয়নে শিক্ষাবিদদের একটি কমিটি আছে। ওই কমিটির পরামর্শে নানা পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে। পরীক্ষার ফল ও পদ্ধতি নিয়েও বেডু গবেষণা করছে। তাদের সুপারিশ ধীরে ধীরে বাস্তবায়িত হচ্ছে। ফলে আমরা পরিবর্তনের দিকে যাচ্ছি। এগুলোও ভালো সংবাদ।

বিপুলসংখ্যক পরীক্ষার্থী এবার অনুত্তীর্ণ হয়েছে এবং উত্তীর্ণ অনেকে আবার কাঙ্খিত ফল পেতে ব্যর্থ হওয়ায় ফল নিয়ে শিক্ষার্থীদের এবারের আনন্দ-উচ্ছ্বাসের ভাটা পড়েছে যা আমরা কোনোভাবেই অস্বীকার করতে পারব না। পরীক্ষার ফলে হঠাৎ এ ছন্দপতনের কারণ হিসেবে শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান বলেন, ‘এ বছর থেকে সহজ তিন বিষয় বোর্ড পরীক্ষা থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে। বিষয় তিনটি হচ্ছে শারীরিক শিক্ষা ও স্বাস্থ্য, কর্মমুখী শিক্ষা, চারু ও কারুকলা। এ তিনটি বিষয় বিদ্যালয়ের ধারাবাহিক মূল্যায়নের আওতায় নেওয়ায় শিক্ষার্থীদের বোর্ড পরীক্ষা থেকে তা বাদ দেওয়া হয়। অপেক্ষাকৃত সহজ তিনটি বিষয় বিদ্যালয়ে বাদ দেওয়ায় পরীক্ষার্থীদের নম্বর প্রাপ্তি কমে গেছে। এর সঙ্গে কুমিল্লা, ঢাকা, চট্টগ্রাম, দিনাজপুর বোর্ডে গণিত ও ইংরেজির ফল খারাপ হওয়ায় সার্বিক ফলে প্রভাব ফেলেছে। একই সঙ্গে পাসের হার কমেছে পঞ্চম শ্রেণির প্রাথমিক শিক্ষা সমাপনী পরীক্ষাতেও। প্রাথমিক সমাপনী ও ইবতেদায়ি সমপানীতে এবার পাসের হার কমেছে ৩শতাংশ।

প্রাথমিক স্তরের এ পরীক্ষায় এবার ফলের শীর্ষে রয়েছে বরিশাল বিভাগ। এ বিভাগের তিনটি উপজেলায় কোনো ফেল নেই। উপজেলাগুলো হচ্ছে কাউখালী, বামনা ও পাথরঘাটা। জেলা হিসেবে ফলের দিক থেকে প্রথম হয়েছে গোপালগঞ্জ। সবচেয়ে পিছিয়ে ঝালকাঠি। আসলে এগুলো কি আমাদরে জন্য কোনো বার্তা বহন করে? হঠাৎ এক বোর্ডের ফল নিচে নেমে যায়, পরবর্তী বছর দেখা যায় সেই বোর্ড সকল বোর্ডের উপরে থাকে। এ জাদুর কারণ তো অন্য রকম মনে হচ্ছে। আমরা কি তা খতিয়ে দেখছি? ছাত্রদের চেয়ে ছাত্রীরা এবার এ পরীক্ষায় এগিয়ে আছে। জেএসসি ও জিডিসির ফল বিশ্লেষণে দেখা যায় যে, এবার সারাদেশে ৫৯টি স্কুল ও মাদ্রাসার সব শিক্ষার্থী ফেল করেছে। অন্যদিকে, ৫ হাজার ২৭৯টি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সবাই পাস করেছে। গতবারের চেয়ে এবার পরীক্ষার্থী ফেলের সংখ্যা বেড়েছে ১ লাখ ৬৫ হাজার ৭০৪জন। শতভাগ পাস করা শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা কমে ৫২৭৯ থেকে ৪১৭১-এ এসে দাঁড়িয়েছে। অন্যদিকে শূন্য পাস করা শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা গতবারের চেয়ে ৩১টি বেড়েছে। আটটি শিক্ষা বোর্ডে পাসের হার প্রায় ১০ শতাংশ কমে গেছে আর মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ডে পাসের হার কমেছে ৭ দশমিক ২২ ভাগ। কুমিল্লা বোর্ডে ইংরেজি ও গণিতেই ফেল করেছে ১লাখ ২৫ হাজার শিক্ষার্থী। সবগুলোই কিন্তু চিন্তার বিষয়, সিরিয়াস গবেষণার বিষয়। আমরা কি বিষয়গুলো নিয়ে চিন্তা করছি?

লেখক: শিক্ষা-গবেষক, ব্র্যাক শিক্ষা কর্মসূচিতে কর্মরত

 

 

রাইজিংবিডি/ঢাকা/৩ জানুয়ারি ২০১৮/তারা

Walton Laptop
 
   
Walton AC