ঢাকা, মঙ্গলবার, ৩ মাঘ ১৪২৪, ১৬ জানুয়ারি ২০১৮
Risingbd
সর্বশেষ:

ফেলানীর ঘাতক অমিয় ঘোষের সাজা কবে হবে?

নজরুল মৃধা : রাইজিংবিডি ডট কম
 
   
প্রকাশ: ২০১৮-০১-০৮ ৪:৩৫:০০ পিএম     ||     আপডেট: ২০১৮-০১-০৮ ৪:৩৫:১৯ পিএম

নজরুল মৃধা: দেখতে দেখতে ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বিএসএফ’র গুলিতে নিহত ফেলানী হত্যার ৭ বছর পেরিয়ে গেল। কুড়িগ্রাম সীমান্তে ঘটে যাওয়া এই হত্যা দেশ-বিদেশে ব্যাপক আলোচিত হলেও এখনো ন্যায় বিচার পায়নি নিহতের পরিবার। ন্যায় বিচারের আশায় ফেলানীর বাবা নুরুল ইসলাম ভারতের সর্বোচ্চ আদালতে দুটি রিট পিটিশন দাখিল করেন যা বর্তমানে বিচারাধীন।

ফেলানীকে হত্যার ঘটনায় করা মামলায় দু’দফা নির্দোষ বলে বিবেচিত হয়েছেন ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনীর (বিএসএফ) অভিযুক্ত সদস্য অমিয় ঘোষ। বিএসএফ’র নিজস্ব আদালতে জেনারেল সিকিউরিটি ফোর্সেস কোর্ট (জিএসএফসি) প্রথমে অমিয় ঘোষকে নির্দোষ রায় দেন। পুনর্বিবেচনার পরও তারা সেই রায় বহাল রেখেছেন। ২০১৫ সালের ২ জুন বৃহস্পতিবার ভারতের কোচবিহারে বিএসএফ’র ১৮১ ব্যাটালিয়নের সদর দপ্তরের সোনালি ক্যাম্পে আদালত বসে। কোর্ট মার্শাল সমতুল্য এই নিজস্ব আদালত অভিযুক্তকে বেকসুর খালাস দেন। আদালতের প্রধান ছিলেন বিএসএফ আধিকারিক সি পি ত্রিবেদী। পাঁচজন সদস্য মূল মামলার শুনানিতে বিচারক ছিলেন। ২০১৩ সালের ৬ সেপ্টেম্বর জিএসএফসি ফেলানী হত্যা মামলায় অভিযুক্ত অমিয় ঘোষকে নির্দোষ বলে রায় দেন। সেই রায় যথার্থ মনে না হওয়ায় পুনর্বিবেচনার আদেশ দিয়েছিলেন বাহিনীর মহাপরিচালক। পুনর্বিবেচনার কাজ শুরু করতে প্রায় এক বছর লেগেছিল। এ সময় তিনবার পুনর্বিবেচনার কাজ স্থগিতও করা হয়।

কিশোরী ফেলানী হত্যার আড়াই বছর পর যখন প্রথম বিচার শুরু হয় তখন আমরা ভেবেছিলাম, হত্যাকারীর যদি শাস্তি হয় তা হলে হয়তো সীমান্তে এ ধরনের ঘটনা কমবে। কিন্তু তা হয়নি। যা হয়েছে তা হলো বিচারের নামে প্রহসন। অভিযুক্ত অমিয় ঘোষ হত্যার দায় থেকে মুক্তি পেলেও ভারত সরকার কি এই দায় এড়াতে পারবে? এমন প্রশ্ন এখন অনেকের মাঝে। অমিয় ঘোষকে মুক্তি দেয়ায় নিঃসন্দেহে সীমান্তে এ ধরনের ঘটনাকে আরো উৎসাহিত করবে। যদিও ফেলানীর পরিবার এই রায় প্রত্যাখান করেছেন। তারা আর্ন্তজাতিক আদালতে এই হত্যাকাণ্ডের বিচার চেয়েছেন। এই রায়কে ঘিরে বিভিন্ন মানবাধিকার সংগঠন ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নিন্দার ঝড় উঠেছে। রায়ের খবরে হতাশা প্রকাশ করে ফেলানীর বাবা বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে বলেছেন, বিএসএফ’র আদালতে তিনি ন্যায় বিচার পাননি। অমিয় ঘোষের ফাঁসি হওয়া উচিত ছিল।

কুড়িগ্রামের নাগেশ্বরী উপজেলার দক্ষিণ রামখানা ইউনিয়নের বানার ভিটা গ্রামের নুরুল ইসলাম প্রায় ১০ বছর ধরে দিল্লি ছিলেন। সেখানে তার সঙ্গেই থাকতো ফেলানী। দেশে বিয়ে ঠিক হওয়ায় ২০১১ সালের ৭ জানুয়ারি কুড়িগ্রামের অনন্তপুর সীমান্ত দিয়ে বাবার সঙ্গে ফেরার পথে কাঁটাতারের বেড়ায় কাপড় আটকে যায় ফেলানীর। এতে ভয়ে চিৎকার দিলে বিএসএফ তাকে গুলি করে হত্যা করে এবং পরে লাশ নিয়ে যায়। কাঁটাতারের বেড়ায় ফেলানীর ঝুলন্ত লাশের ছবি গণমাধ্যমে প্রকাশিত হলে বিশ্বজুড়ে আলোড়ন সৃষ্টি হয়। পরে বাংলাদেশ সরকার ও মানবাধিকার সংস্থাগুলোর কড়া প্রতিবাদে বিচারের ব্যবস্থা হলেও আসামি বেকসুর খালাস পেয়ে যায়। ফেলানীর পরিবারের আপত্তিতে বিএসএফ মহাপরিচালক রায় পুনর্বিবেচনার আদেশ দিলে ২০১৪ সালের ২২ সেপ্টেম্বর নতুন করে শুনানি শুরু হয়। কিন্তু পুনর্বিচারে আদালত তাদের পুরোনো রায় বহাল রাখে। এ মামলায় দুই দফা কোচবিহারে গিয়ে সাক্ষ্য দেন ফেলানীর বাবা নুরুল ইসলাম।

বহুল আলোচিত এই হত্যা মামলার রায়ে অসন্তোষ প্রকাশ করে ভারতীয় বিচারব্যবস্থা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন মামলার আইন সহায়তাকারী কুড়িগ্রামের পাবলিক প্রসিকিউটর অ্যাডভোকেট আব্রাহাম লিংকন। তিনি সংবাদ মাধ্যমে জানান, সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতি ফেলানীর বাবা নুরুল ইসলাম নুরুর দুটি রিট গ্রহণ করে একাধিকবার শুনানীর দিন পেছালেও চলতি বছরের ১৮ জানুয়ারি শুনানীর দিন ধার্য্য করেছে। আমরা আশা করতে পারি ভারতের সর্বোচ্চ আদালত ফেলানী হত্যা মামলায় একটা ইতিবাচক সিদ্ধান্ত দেবে যা উভয় রাষ্ট্রের জন্য মঙ্গলকর। তিনি আরো বলেন, আগের রায় ভারতীয় বিচার ব্যবস্থাকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে। এর ফলে সীমান্ত হত্যার ক্ষেত্রে বিএসএফ আরো বেপরোয়া হয়ে উঠবে। যা সীমান্ত ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে চরম সঙ্কট তৈরি করবে। পূর্বের ওই রায়ের মধ্য দিয়ে বিএসএফ’র মতো একটা শৃঙ্খলাবদ্ধ বাহিনীর একজন সদস্যের অপকর্মের দায় গোটা বাহিনীর কাঁধে গিয়ে পড়েছে। আর এর দায়ভার এখন রাষ্ট্র হিসেবে ভারতের কাঁধে বর্তালো।

ভারতের সীমান্ত রক্ষাকারী বাহিনী বিএসএফ মহাপরিচালক রমন শ্রীবাস্তব বাংলাদেশ সফরে এসে কথা দিয়েছিলেন সীমান্তে আর মানুষ হত্যা হবে না। তার সেই সফরে সীমান্তে চোরাচালান, মাদক পাচার, নিরস্ত্র বাংলাদেশিদের হত্যাসহ বিভিন্ন ইস্যু নিয়ে আলোচনা হয়। আলোচনার পর সীমান্তবাসী আশায় বুক বেঁধেছিল হয়তো সীমান্তে মানুষ হত্যা বন্ধ হবে। কিন্তু অল্পদিনেই সেই আশা ভঙ্গ হয়েছে। সীমান্তে মানুষ হত্যা বন্ধ হয়নি। এর আগে এবং পরে দুই দেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রী পর্যায়ে সীমান্তে বাংলাদেশিদের হত্যা না করার বিষয়ে চুক্তি হয়েছিল। কিন্তু সীমান্তে নিরীহ মানুষ হত্যা বন্ধ হয়নি। লাশের মিছিল থামাতে যখন ফেলানী হত্যার বিচার কিছুটা আশার আলো জাগিয়েছিল, সেই আশা ধূলিসাৎ হয়ে গেছে ঘাতক বেকসুর খালাস পাওয়ায়।

২০১১ সালের ৭ জানুয়ারি ভোরে পশ্চিমবঙ্গের কোচবিহার জেলার অন্তর্গত চৌধুরীহাট সীমান্ত চৌকির কাছে কাঁটাতারের বেড়া পার হওয়ার সময় ফেলানী কনস্টেবল অমিয় ঘোষের গুলিতে মারা যান। দীর্ঘক্ষণ তাঁর দেহ বেড়ার ওপরেই ঝুলে ছিল। মি. ঘোষের বিরুদ্ধে ভারতীয় দণ্ডবিধির ৩০৪ ধারায় অনিচ্ছাকৃত খুন এবং বিএসএফ আইনের ১৪৬ ধারায় অভিযোগ আনা হয়েছিল। ফেলানি হত্যা মামলায় সাক্ষ্য দিতে বাংলাদেশ থেকে তাঁর বাবা ও মামা ভারত গিয়েছিলেন। বিএসএফ’র কয়েকটি সূত্র সাক্ষ্য গ্রহণের দিন জানিয়েছিল, চোখের সামনে মেয়েকে মারা যেতে দেখার বর্ণনা দিয়েছিলেন ফেলানীর বাবা নুরুল ইসলাম। তিনি বিএসএফ কোর্টকে জানিয়েছিলেন, ফেলানীর বিয়ে ঠিক হয়েছিল দেশে, তাই মেয়েকে নিয়ে এক দালালের মাধ্যমে বেড়া পেরিয়ে দেশে ফেরার চেষ্টা করেছিলেন তিনি। সেই দালালের কথা মতো ভোরের আজানের সময় তাদের বেড়া টপকানোর কথা ছিল। স্থানীয় কয়েকজনের মাধ্যমে সেই দালাল বেড়া টপকানোর জন্য কাঠের পাটাতনের ব্যবস্থা করেছিলেন। বিএসএফ সূত্রগুলো ফেলানীর বাবা নুরুল ইসলামের উদ্ধৃতি দিয়ে জানিয়েছিল, প্রথমে ফেলানীর বাবা বেড়া টপকে বাংলাদেশের দিকে চলে যান। তারপর ফেলানী যখন একটি বেড়া টপকে অন্য বেড়ার দিকে এগোচ্ছিল, তখন তাঁর জামা কাঁটাতারে আটকে যায়। সে সময় বিএসএফ’র এক সদস্য দেখে ফেলেন ও তাঁকে সাবধান করেন। দালালের সঙ্গে থাকা লোকজন বিএসএফ’র ওই সদস্যর দিকে ঢিল ছুঁড়তে শুরু করে। তখনই গুলি করা হয়। দীর্ঘক্ষণ কাঁটাতারের বেড়াতেই ঝুলে ছিল ফেলানীর মৃতদেহ। সেই ছবি ছড়িয়ে পড়তেই শুধু ভারত বা বাংলাদেশে নয় আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠনগুলোও বিএসএফ’র কড়া নিন্দা করেছিল। নিন্দা ঝড়ে বিএসএফ বাধ্য হয়ে বিচার বসিয়েছিল। বিচারের নামে যা হলো তা মানবাধিকার লঙ্ঘনের ক্ষত আরো দীর্ঘ করেছে।

পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মতে, দেশের অভ্যন্তরে কাজের ঘাটতি ও সীমান্তের মানুষের প্রতি সরকারের অনাগ্রহ সীমান্ত হত্যার হার বাড়াচ্ছে। এমন হত্যাকাণ্ড বেড়ে যাওয়ায় সেখানে কাজের অভাবও কারণ হতে পারে বলে মনে করছেন সেখানকার কর্মকর্তারা। এই মনে করা পর্যন্তই কর্মকর্তাদের দায়ভার। সীমান্তে এ ধরনের ঘটনা ঘটলেও এখনও কোনো কার্যকর ভূমিকা লক্ষ্য করা যায়নি সরকারের পক্ষ থেকে। সীমান্তহত্যা প্রসঙ্গে সরকারের একটি সূত্র জানায়, সরকারের কূটনৈতিক পর্যায়ে হত্যাকাণ্ডের রিপোর্ট উল্লেখ করে প্রতিবাদ জানানো হয়।

দেশের মানবাধিকার সংগঠনগুলো ও কূটনৈতিকদের মধ্যে সীমান্তহত্যা বন্ধে ভিন্ন মত লক্ষ্য করা যাচ্ছে। মানবাধিকার সংগঠনগুলো চাইছে কূটনৈতিকভাবে এর মোকাবেলা করতে। আর কূটনৈতিক সূত্র মনে করছে, সীমান্তে চোরাচালান বন্ধ করে সীমান্তহত্যা দূর করতে। কিন্তু সীমান্তবাসীর জীবন রক্ষায় সরকারের তেমন কোনো পদক্ষেপ নেই বলে কূটনৈতিক মহল মনে করছে। সীমান্তে নিহতের সংখ্যা শূন্যে নামিয়ে আনার আশ্বাস সত্ত্বেও গত ৫ বছরে প্রায় ১০০ জনের বেশি বাংলাদেশিকে হত্যা করা হয়েছে। সীমান্তে বাংলাদেশিদের ওপর নির্যাতন-নিপীড়নের প্রায় প্রতিটি ক্ষেত্রেই বাংলাদেশের সীমান্তরক্ষী বাহিনী বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) তাৎক্ষণিকভাবে প্রতিবাদ জানিয়েছে। কিন্তু কাজের কাজ কিছুই হয়নি।

সূত্র মতে গত পাঁচ বছরে বাংলাদেশের সীমান্তে প্রায় দুইশ বাংলাদেশীর মৃত্যু হয়েছে।  বিএসএফ’র গুলিতে গত ১৩ বছরে এই সংখ্যা প্রায় দুই হাজার। অধিকাংশ ঘটনায় প্রথমে বাংলাদেশের সীমান্তরক্ষীরা চিঠি পাঠায়, এরপর পতাকা বৈঠক হয় এবং বিএসএফ দুঃখ প্রকাশ করে। লাশ ফেরত পেতে লেগে যায় কয়েকদিন। তারপর সবাই সব কিছু ভুলে যায়। এছাড়া বিনা উস্কানিতে সীমান্তবর্তী গ্রামগুলোতে ঢুকে লুটপাট, অগ্নি সংযোগ, অপহরণের মতো ঘটনাও ঘটছে। ভারতের সীমান্তে মানুষ হত্যা বন্ধে ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানিয়ে বিবৃতি দিয়েছে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস। বাংলাদেশ ও ভারতের স্বরাষ্টমন্ত্রী পর্যায়ে বৈঠক হয়েছে সীমান্ত ব্যবস্থাপনা নিয়ে। বৈঠকে চুক্তি করা হয়। চুক্তিতে বিজিবি মহাপরিচালক ও বিএসএফ প্রধান স্বাক্ষর করেন। বৈঠকে সীমান্তে বিএসএফ গুলি করে আর মানুষ মারবে না বলে অঙ্গীকারও করে। এত কিছুর পরেও থেমে নেই সীমান্তে মানুষ হত্যা।

আইন বিশেষজ্ঞরা জানিয়েছেন, এসব ইস্যুতে বাংলাদেশী সীমান্তরক্ষীদের পক্ষে যথেষ্ট যুক্তি থাকলেও তারা সবসময় ধৈর্যের পরাকাষ্ঠা দেখিয়ে চলেছেন। নিয়মের বাইরে কোনো পদক্ষেপে যায় না বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি)। কিন্তু বিএসএফ নিয়ম এবং দুই দেশের সরকার ও কর্মকর্তা পর্যায়ের বৈঠকের সিদ্ধান্তগুলোর প্রতি অনেক ক্ষেত্রে শ্রদ্ধা প্রদর্শন করে না। এর মধ্যে অভিযুক্ত বিএসএফ সদস্য ফেলানীকে হত্যা মামলা থেকে খালাস পেল। এ ঘটনা বিএসএফ’র প্রতি আমাদের শ্রদ্ধা আরো কমাবে এ কথা বলার অপেক্ষা রাখে না।

লেখক: কবি ও সাংবাদিক




রাইজিংবিডি/ঢাকা/৮ জানুয়ারি ২০১৮/তারা

Walton
 
   
Marcel