ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ১ ভাদ্র ১৪২৫, ১৬ আগস্ট ২০১৮
Risingbd
শোকাবহ অগাস্ট
সর্বশেষ:

টেলিভিশন নাটকে আমাদের প্রত্যাশা

মুহাম্মদ ফরিদ হাসান : রাইজিংবিডি ডট কম
 
     
প্রকাশ: ২০১৮-০১-১৮ ৮:১৯:৩৮ এএম     ||     আপডেট: ২০১৮-০১-১৮ ১২:৩৭:৪০ পিএম
দর্শকপ্রিয় নাটক ‘বড় ছেলে’র একটি দৃশ্য

মুহাম্মদ ফরিদ হাসান: টেলিভিশন বা টিভি নাটক আমাদের জীবনযাপন, উৎসব ও উদযাপনের সাথে জড়িত। বিনোদনের অফুরান উৎস হিসেবে  নাটকগুলো জনজীবনকে নানাভাবে কেবল আন্দোলিত করেনি, প্রভাবিত করেছে বহুভাবে। নাটক আপামর মানুষকে কখনো হাসিয়েছে, কাঁদিয়েছে, কখনোবা সমাজ ব্যবস্থা সম্পর্কে ভাবনা জুগিয়েছে। বছরে দুটো ঈদ। ঈদ-আনন্দে যেমন দর্শকদের নাটক দেখা চাই, তেমনি বিজয় দিবস, শহীদ দিবসের মতো জাতীয় দিবসগুলোতেও নাটক দর্শকদের কাছে বিশেষ অনুষঙ্গ হিসেবে দাঁড়িয়েছে। সেজন্যেই নাটক শুধুমাত্র বিনোদনের মাধ্যম হয়ে থাকেনি, অনেক সময় হয়ে উঠেছে প্রতিবাদের হাতিয়ার। বিনোদনের গণ্ডি পেরিয়ে নাটক মানুষের মন ও বোধের জগৎ শক্তিশালী করতে ভূমিকা রেখেছে। সেইসঙ্গে সামাজিক অসঙ্গতি ও কুসংস্কারের দেয়ালও ভেঙেছে। আর এ কারণেই আমাদের জীবনে নাটকের প্রয়োজন ছিলো। দিন দিন এই প্রয়োজনীয়তা বৃদ্ধি পেয়েছে। এর প্রমাণ প্রতি বছর শত শত নাটক নির্মাণ ও প্রচারিত হচ্ছে। যদিও এসব নাটকের মান নিয়ে প্রশ্ন থাকাটা অস্বাভাবিক নয়। তবু এই পরিসংখ্যান জানান দিচ্ছে যে, নাটকের জনপ্রিয়তা রয়েছে।

নাটক নিয়ে সমালোচনা আগেও ছিলো, এখনও আছে। অনেকেই এই সমালোচনা নেতিবাচকভাবে দেখেন। কিন্তু তারা ভুলে যান, শিল্পের জন্যে সমালোচনা  প্রয়োজনীয় বিষয়। একজন আদর্শ সমালোচক শিল্পের উৎকর্ষের জন্যেই এর ভালো-মন্দ তুলে ধরেন। টিভি নাটকও এই সমালোচনার বাইরে নয়। তবে অন্যান্য সময়ের চেয়ে গত কয়েক বছর নাটক নিয়ে প্রচুর সমালোচনা হয়েছে। এই সমালোচনা যে কেবল সমালোচক, দর্শক করছেন তা নয়, আমাদের অনেক প্রবীণ শিল্পীও নাটকের মান নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। অনেকে হতাশ হয়েছেন টিভি নাটকের ভবিষ্যৎ নিয়ে। কেননা, বছরের শত শত নাটকের ভিড়ে আট-নয়টি ভালো নাটকের দেখা পাওয়া যায়। এটা কাম্য হতে পারে না। স্পষ্টতই আমাদের টিভি নাটকের সংখ্যা বেড়েছে কিন্তু মান বাড়েনি।

২০১৭ সালের ঈদের নাটক নিয়ে মন্তব্য করতে গিয়ে আবুল হায়াত বলেছেন, ‘সেই একই গল্প, একই মুখ ঘুরে ফিরে এসেছে। দর্শকদের অভিযোগ ছিলো, একঘেঁয়েমিতে ভুগেছে। তবে ভালো কিছু নাটকও হয়েছে।’ অন্যদিকে প্রবীণ অভিনেতা হাসান ইমামও মনে করেন ‘একই রকম’ নাটক হচ্ছে। তবে বরাবরের মতো ঈদে ভালো নাটকের অভাব রয়ে গেছে। দর্শক বিরক্তির কারণ হিসেবে তিনি ‘অতিরিক্ত’ বিজ্ঞাপনের প্রসঙ্গ টেনেছেন। এই অতিরিক্ত বিজ্ঞাপনের অভিযোগটিও পুরনো হয়ে গেছে। এই অভিযোগটি এতই তীব্র যে, অনেকেই বলেন, নাটকের ফাঁকে ফাঁকে বিজ্ঞাপন দেখি না, বরং বিজ্ঞাপনের ফাঁকে ফাঁকে নাটক দেখি! যার কারণে অনেকেই বিজ্ঞাপনের অত্যাচারে নাটক দেখতে চান না। কেবল নাটক নয়, অন্যান্য অনুষ্ঠানগুলোতেও একই সমস্যা। ভারতীয় টিভি চ্যানেলের প্রতি বাংলাদেশের মানুষের ঝোঁকার এটাও একটি কারণ। বিজ্ঞাপনের আধিক্যজনিত সমস্যা ভয়াবহ হলেও এ সমস্যার সমাধান সেভাবে মেলেনি। তবে আশার কথা হলো, অনেক টিভি চ্যানেলই কিছু কিছু বিরতিহীন নাটক পরিবেশন করেছে।

নাটক নিয়ে সচেতন দর্শকের আরো অভিযোগ রয়েছে। ভাঁড়ামি আর শিল্প এক বিষয় নয়। অথচ অনেক নাট্যনির্মাতা এই দুয়ের পার্থক্য বুঝতে পারছেন না। তারা দর্শকের কাছে ভাঁড়ামিকেই বিনোদনের মাধ্যম হিসেবে তুলে ধরছেন। যেখানে নাটক দর্শকরুচি নির্মাণে কাজ করার কথা, সেখানে এখন অনেক নাটকই দর্শকরুচিকে নিম্নদিকে ধাবিত করছে। এক শ্রেণির নাটকে ভাষার বিকৃতি বাড়ছে। বাড়ছে ‘কাতুকুতু’ দিয়ে দর্শক হাসানোর প্রবণতা। এটি খুবই দুঃখজনক। নাট্যকার থেকে শুরু করে নাটকের সাথে সংশ্লিষ্ট সবাই সাধারণ মানুষ নন। তাদের সামাজিক দায়িত্ব অনেক বেশি। প্রত্যেক শিল্পীরই তাদের কাজের প্রতি দায়বদ্ধ থাকা উচিত। কেউ কেউ হয়তো বলবেন, সাধারণ দর্শক তো এসব নাটক নিচ্ছে। তারা উপভোগ করছে। সমস্যা কী? আমাদের কথা হলো, দর্শক যা দেখতে চায় তা দেখানো কি নাট্যকারের কাজ? নাটকের অভিপ্রায়? নাকি নাট্যকার ও নাটকের নিজস্ব গতিপথ এবং অভিরুচি রয়েছে? নাট্যকারের রুচিই যদি দর্শক রুচি হয়, তবে সেখানে বলার কিছু থাকে না। কেননা, এ দৃষ্টিতে নাট্যকার ও জনতা একই কাতারের মানুষ। দর্শকের একাংশ ভাঁড়ামি নিচ্ছে বলে নাট্যকার সেদিকে দৃষ্টি দিচ্ছেন, অনেক দর্শক অশ্লিল বিষয়ও দেখতে আগ্রহী। তাহলে নাট্যকার বা নির্মাতা কি সেগুলোও দেখাবেন? দর্শক দেখতে চায় বলে দায়িত্ব এড়ানো যায় না। কেননা, এতে নাট্যকারের সক্ষমতা নিয়েও প্রশ্ন ওঠে। নাট্যকারের ভাবা উচিত, দর্শক যা দেখতে চায় আমি কি তাদের সেটা দেখাবো? নাকি, আমি কী দেখাতে চাই তা দর্শকদের সামনে উপস্থাপন করবো?

আজকালের অনেক নাটকে গল্প থাকছে না। অথচ সুন্দর একটি গল্প নাটকের প্রাণ। গল্প ভালো না হলে পরিচালক, অভিনেতা সবাই চেষ্টা করেও একটি সুন্দর নাটক দর্শকদের উপহার দিতে পারেন না। সেজন্যে নাটকের জন্যে ভালো গল্পের ওপর গুরুত্ব দিতে হবে। নাটকে সাহিত্য নির্ভরতা বাড়াতে হবে। আমাদের প্রবীণ লেখকদের কাছ থেকে নাটকের জন্যে গল্প নেয়া যেতে পারে। প্রত্যেকটি নাটকই স্বতন্ত্র্য। তাই নাটকে, নাটকে প্রার্থক্য থাকবে। গল্পগুলো আলাদা হবে। অনেক নাট্যকারকে একই গল্প ঘুরিয়ে ফিরিয়ে ব্যবহার করতে দেখা যায়। এই গণ্ডি থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। টিভি চ্যানেল, প্রযোজকদেরও দায়িত্ব নিয়ে কাজ করতে হবে। তাহলেই আমরা দর্শকনন্দিত ও আলোড়িত আরো নাটক দেখতে পারবো।

এটা বলে দেয়া যায়, ২০১৭ সালে কয়েকশ নাটক টিভিতে প্রচারিত হয়েছে। দর্শক এসব নাটক দেখেছেন ঠিকই, কিন্তু সবগুলো মনে রাখেননি। মনে রেখেছেন কয়েকটি নাটকের কথা। যেমন ‘বিকেল বেলার পাখি’ ‘মার্চ মাসের শ্যুটিং’ ‘দাস কেবিন’ ‘চিকন পিনের চার্জার’ ‘বড় ছেলে’ ‘আমাদের গল্পটা এমনও হতে পারতো’ ‘গোল্ডেন এ প্লাস’ ‘হোটেল অ্যালবাট্রোস’-এর মতো কিছু ভিন্ন ধারার নাটক। এ নাটকগুলো আলোচিত-সমালোচিত হয়েছে। তাহলে বাকি নাটকগুলোর কি হলো? প্রচারিত হওয়ার সাথে সাথেই এর আবেদন ফুরিয়ে গেল? বেদনার কথা হলো, এতসব মানহীন নাটকের ভিড়ে ভালো নাটকগুলোও হারিয়ে যাচ্ছে। ভালো নাটক না হওয়া যে সার্বিকভাবে আমাদেরই ক্ষতি সেটা আমরা কবে বুঝবো? উৎকর্ষের লক্ষ্যেই নাট্যকার, অভিনয় শিল্পীদের শিল্পের দায় নিয়ে কাজ করা উচিত। নিজেদের টিকে থাকার স্বার্থেই অভিনয় শিল্পীদের বেছে বেছে মানসম্মত কাজগুলো করতে হবে। শুধু টাকা জন্যে, শুধু ব্যবসা হিসেবে, কেবলমাত্র টিআরপি বাড়ানোর জন্যে কোনো নাটক পরিবেশিত হোক আমরা তা চাই না। আমরা ‘ঢাকায় থাকি’ ‘সংশপ্তক’ ‘আজ রবিবার’ ‘কোথাও কেউ নেই’-এর মতো নাটক পুনরায় দেখতে চাই। আমরা চাই, নাটকের জন্যে দর্শক তুমুল আগ্রহ নিয়ে অপেক্ষা করুক। দর্শক মন ও চিন্তার উৎকর্ষে নাটক ভূমিকা রাখুক। এক-একটি ভালো নাটকের আলোচনা হোক সর্বত্র।

 


রাইজিংবিডি/ঢাকা/১৮ জানুয়ারি ২০১৮/তারা

Walton Laptop
 
     
Walton