ঢাকা, শনিবার, ৩ ভাদ্র ১৪২৫, ১৮ আগস্ট ২০১৮
Risingbd
শোকাবহ অগাস্ট
সর্বশেষ:

আক্রান্ত ভাষা, কর্পোরেশনের উদ্যোগ ও প্রশ্নবিদ্ধ আন্তরিকতা

হাসান মাহামুদ : রাইজিংবিডি ডট কম
 
     
প্রকাশ: ২০১৮-০২-০১ ১০:০৪:১৪ পিএম     ||     আপডেট: ২০১৮-০২-০১ ১০:০৪:১৪ পিএম

হাসান মাহামুদ : ২০১৪ সালের ১৭ ফেব্রুয়ারি উচ্চ আদালতের নির্দেশনা এবং পরে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে দেশের সকল সংস্থাকে দায়িত্ব বন্টন করে চিঠি পাঠানোর পর, অনেকেই মনে করেছিলেন, এবার সম্ভবত বাংলার ‘সম্মান রক্ষা’ হতে চলেছে। বলা হলো, নির্দেশনা বাস্তবায়ন হতে হতে ২০১৫ সালের ফেব্রুয়ারি লেগে যাবে। তখন কিছু মিডিয়ায় এমনও সংবাদ প্রকাশ হয়েছিল, ‘এবারের একুশ পেতে যাচ্ছে অন্যরকম এক বাংলা’। কিন্তু আমরা তখন হেরে গেছি।

এরপর ২০১৬ সালের ২৮ জানুয়ারি পুনরায় জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়কে অনুরোধ জানিয়ে আরেকটি চিঠি পাঠায়। এতে দেশের সব সাইনবোর্ড, বিলবোর্ড, ব্যানার, গাড়ির নম্বরপ্লেটে বাংলা ভাষার ব্যবহার নিশ্চিত করার অনুরোধ জানানো হয়। একইসঙ্গে অনুরোধ জানানো হয়, গণমাধ্যমে ইংরেজি বিজ্ঞাপন ও মিশ্র ভাষার ব্যবহার বন্ধ করার। সেবারও আমরা হেরেছি। আমরা হেরেছি, কথাটা বলার কারণ হলো- বাংলা এখন দেশের গণ্ডি পেরিয়ে আন্তর্জাতিক অঙ্গণে ঠাঁই পেয়েছে, অথচ আমরা সর্বস্তরে বাংলার ব্যবহার এখনো নিশ্চিত করতে পারিনি। আমাদের দেশের বয়স ৪৭, অথচ ভাষার বয়স ৬৬। প্রাপ্তির সাথে বর্তমান পরিস্থিতি তুলনা করতে গেলে, পরাজয়ের বিষয়টিই কি প্রাসঙ্গিক নয়?

আমাদের সবচেয়ে বড় নৈতিক পরাজয় হচ্ছে, উচ্চ আদালতের নির্দেশের প্রায় তিন বছর পরও সাইনবোর্ড ও বিলবোর্ডে বাংলা লেখা নিশ্চিত করা যায়নি। এ ক্ষেত্রে কে দায়ী সে বিতর্কে যাওয়ার আগে যদি সাধারণ নাগরিকের কাতার থেকে অভিযোগ করা হয়- ‘সরকারের তরফ থেকে এ বিষয়ে শুধু আদেশ বা চিঠি দিয়েই দায়িত্ব শেষ করা হয়। সেই আদেশ বাস্তবায়িত হচ্ছে কি না, কিংবা চিঠির বিষয়ে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে কি না, তার তদারকি নেই’- তাহলে কী খুব ভুল বলা হবে?

তবে এটাও ঠিক এ বিষয়ে মাঝে মাঝে তদারকি হয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে সাফল্যও আছে। কিন্তু ব্যর্থতার পাল্লাই বেশি ভারি। রাস্তায় বের হলে আমরা হতাশই হই বেশি। ভিনদেশী ভাষার চাপে বাংলা যেন কোণঠাসা হয়ে পড়েছে। কর্মক্ষেত্র, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান, উচ্চ আদালত ও উচ্চ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের প্রায় সর্বত্রই বাংলার প্রতি অবজ্ঞা ও অবহেলার ভূরি ভূরি নজির রয়েছে।

এখন সাংস্কৃতিক আগ্রাসনের যুগ চলছে বললে হয়তো খুব বেশি ভুল বলা হবে না। কিছু ক্ষেত্রে বাইরের সংস্কৃতিকে আমরা গ্রহণ করছি কোনো বিকল্প না থাকায়, কিন্তু যে সংস্কৃতি আমাদের একেবারে নিজস্ব ছিল, আছে, সেগুলোতে কি আমরা সফল হতে পেরেছি? দেশীয় ভাষা-সংস্কৃতি আমরা কতটা লালন করতে পারছি? দোকানপাটের নাম থেকে শুরু করে বিভিন্ন সাইনবোর্ড, চিকিৎসকদের ব্যবস্থাপত্র, আদালতের রায়, বিয়ে, জন্মদিন, বউভাত কিংবা কোনো উদ্বোধনী অনুষ্ঠানেও ইংরেজির আধিপত্য লক্ষ্য করা যায়। ভাষার ব্যবহার এখন চরম নৈরাজ্যিক অবস্থায় রয়েছে। সঠিক শব্দের ব্যবহার, নির্ভুল ব্যবহার, সঠিক ভাষার ব্যবহার, নির্ভুল উচ্চারণে কথা বলা কোনও দিক থেকেই বাংলা ভাষা ভালো অবস্থানে নেই এখন।

এফএম রেডিও কিংবা বাইরের ব্র্যান্ড ফুড শপগুলো সময়ের চাহিদার কারণে আমাদের দেশে আসছে। বাইরের পোশাকের ব্র্যান্ডগুলোও এখন বাংলাদেশে ফ্রাঞ্চাইজি করছে। নামকরণের ক্ষেত্রে তারা মূল ব্র্যান্ডকে প্রাধান্য দেবে এটাই নিয়ম। কিন্তু আমাদের দেশের হাতে গোণা কয়েকটি খাবারের দোকান আর ড্রেস সপ ছাড়া বাকী সব দেশীয় দোকানের নামই তো ইংরেজিতে। এই বিষয়টি নিশ্চিত করতে সিটি কর্পোরেশনের রাতারাতি বদল করার জন্য নির্দেশনা দেওয়ার কোনো প্রয়োজন পড়ে না। অনুমোদন বা লাইসেন্স প্রদাণের সময় বিষয়গুলো কেন তদারকি করা হবে না?

ট্রেড লাইসেন্স (ব্যবসা করার অনুমতি) নেওয়ার সময় সিটি করপোরেশনের পক্ষ থেকে সাইনবোর্ডে বাংলা ব্যবহারের বিষয়ে সুনির্দিষ্ট নির্দেশনা দেওয়া হয়। অতিরিক্ত একটি সিল দিয়ে ট্রেড লাইসেন্সে লেখা থাকে, ‘সাইনবোর্ড/ব্যানার বাংলায় লিখতে হবে’। কিন্তু লাইসেন্স নেওয়া প্রতিষ্ঠানগুলো বাংলায় সাইনবোর্ড লিখছে কি না সে বিষয়ে খুব বেশি তদারকি করা হয় না।

যদিও এ বিষয়ে নাগরিক সচেতনতাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু নাগরিক সচেতনতার জন্য সরকারিভাবে প্রচার-প্রচারণাও কখনোই চালানো হয়নি।

দেশের কোনো বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলা বিষয়ে পড়ানো হয় না, এমন অভিযোগ সেই ২০১০ সালে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় আইন করার পর থেকেই শুনে আসছি আমরা। কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশনের ওয়েবসাইটে গিয়ে একটু দেখে নিতে পারেন, ৯৫টি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের সবকটির নাম ইংরেজিতে লেখা। এর মধ্যে মাত্র ২৩টি বিশ্ববিদ্যালয়ের নাম বাংলা শব্দের। বাকী সবই ইংরেজি নামের। অথচ দেশের ৪০টি সরকারি ও স্বায়ত্তশাসিত বিশ্ববিদ্যালয়ের সবগুলোর নাম বাংলায়। বাংলায় নাম দেওয়ার এসব সরকারি ও স্বায়ত্তশাসিত বিশ্ববিদ্যালয়ের গ্রহণযোগ্যতা কী কোনো অংশে কমেছে? কোনো ভাবেই নয়। এসব উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানের গ্রহণযোগ্যতার বিষয়ে কথা বলাই বরং ভুল।

বৈশাখী, ঝলক, রমণী, স্মৃতি, বধুয়া- এসব কিছু পোশাকের দোকানের নাম এবং ব্র্যান্ড। খাঁটি বাংলায় লেখা এসব সাইনবোর্ড অবশ্যই দেশের সুনাম বৃদ্ধি করছে। কিন্তু চমৎকার বাংলায় লেখা এসব সাইনবোর্ডের মাঝে মাঝে ইংরেজিতে লেখা সাইনবোর্ডও কিন্তু কম নয়। অনন্যা কিংবা নাভিলা এগুলোও বাংলা শব্দ। কিন্তু সাইনবোর্ডে ঠিকই ইংরেজিতে লেখা। এসব ব্রান্ডকে অনুমোদন দেওয়ার সময় যদি নির্দেশনাই দেওয়া থাকে যে, ইংরেজিতে সাইনবোর্ড ব্যবহার করা যাবে না এবং মাঝে মাঝে তদারকি করা হতো, তাহলে নিশ্চয়ই ইংরেজিটা এমন ক্যানসারের মতো ছড়িয়ে যেত না।

গুলশান ১ নম্বর মোড়ে দাঁড়ালেই মনে হবে এ যেন ভিনদেশের ব্যস্ত একটি এলাকা। চারদিকে ইংরেজি ভাষা। যেখানে বাংলা পুরোপুরি নিখোঁজ একটি ভাষা। মোড়ে লাইটিং প্যালেস নামে একটি দোকানের চারটি সাইনবোর্ডের সব কটি ইংরেজিতে লেখা। যমুনা ব্যাংকের সাইনবোর্ডের ওপরে ইংরেজিতে ব্যাংকের নাম লেখা, নিচে বাংলায় লেখা। জনতা ব্যাংক ছাড়া বাংলায় লেখা সাইনবোর্ড খুঁজে পাওয়া যাবে না। ক্ল্যাসিক লাইটিং, ফ্যাশন অপটিকস, ইনডেক্স গ্রুপ, বেঙ্গল এজেন্সিস, সনি, র্যাং গস, ফিটনেস প্লাস জিম, এন আই টিসহ প্রায় সব সাইনবোর্ডই ইংরেজিতে লেখা।

সংবিধানের ৩ অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, প্রজাতন্ত্রের রাষ্ট্রভাষা বাংলা। এ ছাড়া বাংলা ভাষা প্রচলন আইন, ১৯৮৭-এর ৩ ধারায়ও সরকারি অফিস, আদালত, আধা সরকারি ও স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানে চিঠিপত্র, আইন-আদালতের সওয়াল-জবাব এবং অন্যান্য কাজে বাংলার ব্যবহার বাধ্যতামূলক করা হয়। কিন্তু অনেকেই জানেন না আদালতের এ রকম আদেশের কথা।

সাইনবোর্ড ও বিলবোর্ডে বাংলা ব্যবহারের যে নির্দেশ হাইকোর্ট জারি করেছিলেন, তাতে এক মাসের মধ্যে নির্দেশ বাস্তবায়ন এবং বাস্তবায়নের অগ্রগতি জানাতে মন্ত্রিপরিষদ, আইন, স্বরাষ্ট্র, সংস্কৃতি, তথ্য ও শিক্ষাসচিবকে বলা হয়।

আদালতের আদেশের তিন মাস পর ২০১৪ সালের ১৪ মে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় সিটি করপোরেশন, পৌরসভা ও ক্যান্টনমেন্ট বোর্ডগুলোকে আদেশটি কার্যকর করতে বলে। কিন্তু তা না হওয়ায় ২০১৫ সালের ১৮ আগস্ট আদালত কড়া ভাষায় মন্তব্য করেন, বাংলা ব্যবহারে দৃশ্যত কোনো অগ্রগতি নেই। পরে ২০১৬ সালের ২৩ ফেব্রুয়ারি এক চিঠির মাধ্যমে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়কে সাইনবোর্ড, বিলবোর্ড, ব্যানার, গাড়ির নম্বরপ্লেটে বাংলা ভাষার ব্যবহার নিশ্চিত করার অনুরোধ জানায় জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়। স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের সচিব বরাবর লেখা ওই চিঠিতে বলা হয়, সাইনবোর্ড, বিলবোর্ড, ব্যানার ইংরেজির স্থলে বাংলায় প্রতিস্থাপিত হয়েছে বলে দেখা যায় না। এটা বাংলা ভাষা প্রচলন আইন, হাইকোর্টের রুল ও আদেশের পরিপন্থী।

সর্বশেষ ২৮ জানুয়ারি ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন (ডিএনসিসি) এলাকায় যেসব প্রতিষ্ঠানের (দূতাবাস, বিদেশি সংস্থা ও তৎসংশ্লিষ্ট ক্ষেত্র ব্যতীত) নামফলক, সাইনবোর্ড, বিলবোর্ড, ব্যানার ইত্যাদি বাংলায় লেখা হয়নি তা অবিলম্বে নিজ উদ্যোগে অপসারণ করে আগামী সাত দিনের মধ্যে বাংলায় লিখে প্রতিস্থাপন করার জন্য অনুরোধ জানানো হয়েছে। এবার আমরা হারতে চাই না। আমরা চাই এবারের নির্দেশনার বিষয়ে কর্তৃপক্ষ কঠোর হবে। আরেকটি ফেব্রুয়ারির শুরু হলো আজ। আরেকটি একুশ আসছে। এবার অন্তত বাংলার ‘সম্মান রক্ষা’ হোক। হয়তো এই ফেব্রুয়ারিতে সর্বক্ষেত্রে বাংলার ব্যবহার নিশ্চিত করা যাবে না। এটি সময়সাপেক্ষ বিষয়। কিন্তু শুরুটা দেশের এই ৪৭তম ফেব্রুয়ারিতে হোক।

লেখক: সংবাদকর্মী



রাইজিংবিডি/ঢাকা/১ ফেব্রুয়ারি ২০১৮/তারা

Walton Laptop
 
     
Walton