ঢাকা, সোমবার, ৯ আশ্বিন ১৪২৫, ২৪ সেপ্টেম্বর ২০১৮
Risingbd
সর্বশেষ:

ঈদযাত্রা নিরাপদ হোক

কমলেশ রায় : রাইজিংবিডি ডট কম
 
     
প্রকাশ: ২০১৮-০৬-০২ ২:৩৯:০২ পিএম     ||     আপডেট: ২০১৮-০৬-০২ ২:৪১:৪৯ পিএম

কমলেশ রায়: শেকড়ের টান বড় টান। মানুষ তাই ঘরে ফেরে। ঘরে ফিরতে চায়, ঘরে ফেরার টান অনুভব করে। বিশেষ করে উৎসবে, পার্বণে। সামনে ঈদ। মুসলিমদের সবচেয়ে বড় ধর্মীয় উৎসব। ঈদে ঘরমুখো মানুষের ঢল নামে। সবাই চায় প্রিয়জনের সঙ্গে ঈদের আনন্দ ভাগাভাগি করে নিতে। নগর, বন্দর, শহর থেকে জনস্রোত ছোটে গ্রামের দিকে। শেকড়ের দিকে। উৎসমূলে। ঈদযাত্রা নিয়ে তাই এত প্রস্তুতি। এত আগ্রহ, এত চিন্তাভাবনা।

ঈদযাত্রার প্রস্তুতি শুরু হয়ে গেছে। লক্কড়-ঝক্কড় বাসে পড়ছে রঙের প্রলেপ। পুরাতন লঞ্চে রঙ করা হচ্ছে। সারাই আর রঙে ঝকঝকে হচ্ছে ট্রেনের বগি। বাসের অগ্রিম টিকিট বিক্রি শুরু হয়ে গেছে। বিভিন্ন কোম্পানির কাউন্টারের সামনে লম্বা সারি। হাতে অগ্রিম টিকিট, মুখে বিজয়ীর হাসি। আকর্ণবিস্তৃত চওড়া হাসি। বাড়তি টাকা নেওয়ার অভিযোগও করছেন কেউ কেউ। লঞ্চের অগ্রিম টিকিট বিক্রি হচ্ছে। চলছে কেবিন বুকিং। ট্রেনের অগ্রিম টিকিটের জন্যও হয় দীর্ঘ লাইন (বিক্রি শুরু ১ জুন)। সেহরির পর রেলস্টেশনে গিয়ে বসে থাকা। দীর্ঘ অপেক্ষা। বিরক্তিকর অপেক্ষা। কাঙ্ক্ষিত টিকিটের জন্য। টিকিট হাতে পেলে বিরক্তি উধাও। মুখে তখন তৃপ্তির হাসি।

এগুলো তো প্রথম রাউন্ডের বিষয়াদি। এরপরই দ্বিতীয় রাউন্ড। কেনাকাটা, ব্যাগ গোছানো, বাসার নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। নক আউট পর্বটা হলো যানজট উজিয়ে সময়মতো বাস টার্মিনাল, রেলস্টেশন বা লঞ্চঘাটে পৌঁছানো। সময়সূচি অনুযায়ী বাস, লঞ্চ বা ট্রেনের দেখা পাওয়াটা কোয়ার্টার ফাইনালের মতোই গুরুত্বপূর্ণ। সিট খুঁজে পেয়ে তাতে বসতে পারাটা সেমি ফাইনাল। বাস ছাড়ল, ট্রেন ছাড়ল, লঞ্চ ছাড়ল। খানিকটা স্বস্তি। এরপরই ফাইনাল ম্যাচ। মূল ঈদযাত্রা শুরু। সামনে পদে পদে উত্তেজনা। গন্তব্যে যেতে কত সময় লাগবে? কতটা ভোগান্তি হবে? পথে যানজট নেই তো? ফেরিঘাটের কী অবস্থা?

‘পথে হলো দেরী’, অনেকেরই পছন্দের সিনেমা। উত্তম-সুচিত্রার কী অনবদ্য রসায়ন। ঈদযাত্রায় পথে হলো দেরি কারও পছন্দ নয়। কাম্যও নয়। প্রিয়জনের কাছে যত দ্রুত যাওয়া যায় ততই শান্তি। ছোট্ট করে একটু পরিসংখ্যান দেওয়া যাক। ঈদের ছুটিতে রাজধানী ঢাকা ছাড়বে প্রায় ৮০ লাখ মানুষ (অনুমান করি সংখ্যাটা হয়ত আরও বড়)। গাজীপুর আর নারায়ণগঞ্জ যোগ করলে এ সংখ্যা দাঁড়াবে প্রায় ১ দশমিক ৩ কোটি। চট্টগ্রামসহ অন্য নগরী থেকে আরও লাখো মানুষ ঘরমুখো হবে। শেষপর্যন্ত সংখ্যাটা কত দাঁড়াবে ভাবুন একবার। এক পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, ঈদে ঘরমুখো মানুষের শতকরা ৫৫ ভাগ ব্যবহার করে সড়কপথ। রেলপথ ব্যবহার করে ২০ ভাগ। আর পানিপথে যায় বাকি ২৫ ভাগ। এবার ঈদযাত্রায় বৃষ্টি আর রাস্তার অবস্থার ওপর নির্ভর করবে অনেক কিছু। চ্যালেঞ্জের মধ্যে আরও রয়েছে যানবাহনের বাড়তি চাপ সামলানো, যানজট নিয়ন্ত্রণ, ঢাকার প্রবেশদ্বারগুলোকে সচল রাখা, মহাসড়কগুলোকে ফাঁকা রাখা ও সেগুলো থেকে অবৈধ স্থাপনা অপসারণ।

ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে ঈদযাত্রায় ভোগান্তির শঙ্কায় ভুগছেন অনেকে। একেবারে স্বস্তি নয়, ভোগান্তির মাত্রা কতটা কম হবে সেটা নিয়েই কেবল ভাবতে শুরু করেছেন এই রুটের যাত্রীরা। কাঁচপুর, শীতলক্ষ্যা, মেঘনা ও গোমতী সেতুর আগে-পিছে গাড়ির গতি অবধারিতভাবেই কমে যাবে। মেঘনা সেতুর টোল প্লাজায় অনেকটা সময় বসে থাকতে হয়, এমন অভিযোগ তো বরাবরই করে থাকেন গাড়িচালকরা। ঢাকা থেকে চট্টগ্রাম, ২৬৫ কিলোমিটারের এই যাত্রা ঈদের সময় কত ঘণ্টায় শেষ হবে? এ প্রশ্ন এখনই জেগেছে অনেকের মনে। কেউ কেউ আলগা মন্তব্যও করে ফেলছেন: ১৫ ঘণ্টার মানসিক প্রস্তুতি নিয়ে রাখো হে। ঢাকা-সিলেট মহাসড়ক নিয়েও অনেকের কপালে চিন্তার ভাঁজ। মাত্র দুই লেনের ২১৪ কিলোমিটার মহাসড়ক ঈদে যানবাহনের বাড়তি চাপ নিতে পারবে তো? নারায়ণগঞ্জের রূপসী এলাকায় যানবাহনের অনিয়ন্ত্রিত চলাচল ও ভুলতায় ফ্লাইওভারের চলমান নির্মাণকাজ বেশি করে ভাবিয়ে তুলছে। চালক ও যাত্রীদের অভিযোগ এই মহাসড়কের ভুলতা থেকে গাউসিয়া মার্কেট পর্যন্ত সড়কটুকু পার হতে লাগে তিন থেকে চার ঘণ্টা। ঈদের সময় অবস্থাটা কী হবে সেটা অনুমান করেই চুপ হয়ে যাচ্ছেন অনেকে।

ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়ক দীর্ঘ যানজটের জন্য প্রায়ই শিরোনাম হয়। ঈদযাত্রায় সেই শঙ্কা আরও বাড়ে। এবং সেটা অতীত অভিজ্ঞতার কারণেই। জয়দেবপুর-চন্দ্রা-টাঙ্গাইল-এলেঙ্গা সড়কে জোরেশোরে কাজ চলছে। আশা, যথাসময়ে সড়ক প্রস্তুত হয়ে যাবে। তিক্ত অভিজ্ঞতা এবার কম হোক এমনটিই মনেপ্রাণে চাইছেন এই রুট ব্যবহারকারীরা। ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কের টঙ্গী থেকে জয়দেবপুর পর্যন্ত সংস্কার কাজ চলছে। এই ১৩ কিলোমিটার নিয়েই বেশি চিন্তা। অনেকটা কী হয়, কী হয়, এমন টাইপের ভয় যাত্রী ও চালকদের মাঝে। সড়কের অবস্থা তত ভালো নয়, তার ওপর রয়েছে ১০ থেকে ১২টা মোড় বা সংযোগস্থল। গাড়ির গতি কমিয়ে দেওয়ার জন্য আর কী লাগে? ঢাকা-খুলনা মহাসড়কে বড় বাধা পাটুরিয়া-দৌলতদিয়া নৌরুট। আমিনবাজার, সাভার, নবীনগরের ঝক্কি তো আছেই। এইসব ঝক্কি পার হয়ে পাটুরিয়ায় গিয়ে ফেরির জন্য অপেক্ষা করতে হয় ঘণ্টার পর ঘণ্টা। দুর্ভোগ পোহান যাত্রীরা।

ঢাকা থেকে দক্ষিণাঞ্চলের জেলাগুলোতে যেতে ব্যবহার করতে হয় ঢাকা-মাওয়া মহাসড়ক। এই পথে গেলে বুড়িগঙ্গার দুই সেতু পার হতে বেশ সময় লাগবে বলে শঙ্কা প্রকাশ করছেন যাতায়াতকারীদের অনেকে। এছাড়া ভোগান্তির শঙ্কা রয়েছে শিমুলিয়া-কাঁঠালবাড়ি নৌরুটে। ঈদে বাড়তি চাপের কারণে এই নৌরুটে ফেরি পার হতে অনেকটা সময় অপেক্ষা করতে হতে পারে। বরাবরই এ রুটে লঞ্চ পারাপারও যাত্রীদের জন্য হয় যথেষ্ট ঝামেলাপূর্ণ।

বাসে বাদুড়ঝোলা। সিট নেই, ছাদই সই। লঞ্চের ছাদে কেবলই মাথা আর মাথা। ট্রেন তো নয়, যেন বসে থাকা সর্পিল মানুষের স্রোত। ঝমাঝম শব্দে লাইন ধরে একেবেঁকে যাচ্ছে। পদে পদে ভোগান্তির শঙ্কা। তারপরও তো যেতে হবে। একেবারে শান্তির ঈদযাত্রার কথা কেউ আশা করে না। মানে আশা করতে সাহস করে না। ঈদযাত্রার সঙ্গে সহনীয় ভোগান্তির একটা মানসিক প্রস্তুতি কমবেশি সবারই থাকে। তো ঈদযাত্রার ভোগান্তি যাতে সহনীয় বা তার চেয়েও কম হয় সেজন্য কী করতে হবে? এককথায় অনেককিছু। ঈদের এক সপ্তাহ আগে সড়কে বা মহাসড়কের সংস্কার কাজ বন্ধ করে দিতে হবে। কমপক্ষে তিনদিন আগে বন্ধ করে দিতে হবে পণ্যবাহী ট্রাক ও লরি চলাচল। ওভারকেটসহ অন্যান্য অনিয়ম বন্ধে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর আরও বেশি সদস্য মোতায়েন করতে হবে। ফেরি ও লঞ্চ চলাচল সঠিক ও কার্যকরভাবে নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। রাস্তার পাশে বাজার বসতে দেওয়া যাবে না, সরিয়ে ফেলতে হবে অবৈধ দোকানপাট। ফেরিঘাটে লঞ্চ ও ফেরির সংখ্যা বাড়াতে হবে, ফায়দা লুটার জন্য কৃত্রিমভাবে কোনো সিন্ডিকেট যাতে দীর্ঘ যানজট তৈরি করতে না পারে সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে।

এবার সরকারের পরিকল্পনা ও উদ্যোগের দিকে একটু নজর দেওয়া যাক। ৮ জুনের মধ্যে মহাসড়কের সংস্কার কাজ শেষ করার পরিকল্পনা রয়েছে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের। ঈদের তিনদিন আগ থেকে মহাসড়কে পণ্যবাহী ট্রাক ও লরি চলাচল বন্ধ করে দেওয়া হবে বলে জানা গেছে। এছাড়াও ঈদের সময় আটদিন সিএনজি স্টেশনগুলো ২৪ ঘণ্টা খোলা থাকবে। আর আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর বাড়তি সদস্যও নিয়োজিত থাকবে ঈদযাত্রাকে নির্বিঘ্ন করতে। পাটুরিয়া-দৌলতদিয়া নৌরুটে সাধারণত ১৪ থেকে ১৬টা ফেরি এবং ৩০/৩৫টা লঞ্চ চলাচল করে। ঈদের সময় ফেরির সংখ্যা বাড়িয়ে ১৯ করা হবে বলে নির্ভরযোগ্য সূত্রে জানা গেছে। বিভিন্ন নৌরুটে বাড়বে চলাচলকারী লঞ্চের সংখ্যাও। রেলপথেও যোগ হবে বাড়তি ট্রেন। আকাশপথে যারা গন্তব্যে যাবেন তারা অনেকটা ভাগ্যবান। তাদের সামর্থ আছে, দুর্ভোগটাও তাই অনেকটা কমাতে পারবেন। শহর বা নগরের যানজটটুকু পেরিয়ে বিমানবন্দরে গিয়ে উড়োযানে চেপে বসতে পারলেই হলো, খানিক বাদে অনায়াসে পৌঁছে যাবেন গন্তব্যে। ঈদ উপলক্ষে আকাশপথের যাত্রায়ও নানান সুযোগ-সুবিধা যোগ হয়েছে বলে জানা গেছে।

অতীতের লঞ্চ ট্রাজেডি চাপা শঙ্কা জাগায় মনে। সংশ্লিষ্ট সবার প্রতি অনুরোধ:  ‘অতিরিক্ত লোভ করবেন না। ধারণক্ষমতার বেশি একটি যাত্রীও তুলবেন না। ঝড়ের মৌসুম চলছে। সতর্ক হোন, সচেতন হোন। সবচেয়ে বড় কথা মানবিক হোন।’

গত বছরে ঈদযাত্রায় ১৩ দিনে সড়ক দুর্ঘটনায় মারা যায় কমপক্ষে ৩১১ জন। আহত হয় ৮৬২ জন। কেন এত দুর্ঘটনা? কেন এত প্রাণহানি? বেহাল সড়ক, ঝুঁকিপূর্ণ বাঁক, ফিটনেস বিহীন গাড়ি, অদক্ষ চালক, বেপরোয়া গাড়ি চালনা, বাড়তি ট্রিপ, চালকদের বিশ্রাম স্বল্পতা- এমনি আরও অনেক বিষয় উঠে আসে আলোচনায়, গবেষণায়। অতি সাধারণ এক পরিচিত ব্যক্তি আলাপ প্রসঙ্গে সেদিন বললেন, ‘যত যাই হোক শেষপর্যন্ত চালকের হাতেই সবকিছু। তাই চালকদেরকেই সতর্ক হতে হবে। সচেতন হতে হবে।’

মনে পড়ে, আরেক বৈঠকে এক বিশিষ্ট বিজ্ঞজনের কথা শুনে থ মেরে যাওয়ার জোগাড়। তাকে বলা হয়েছিল, ঈদের চারদিনের ছুটিতে সড়ক দুর্ঘটনায় মারা গেছে অর্ধশতাধিক। বিজ্ঞজন নির্লিপ্ত গলায় মন্তব্য করেছিলেন, ‘তাহলে তো ঠিকই আছে। এমনিতেও তো প্রতিদিন আট-দশজন মারা যায়। ঈদের সময় এটা আর এমন বেশি কী।’ অর্ধশতাধিক প্রাণ ঝরে গেছে, তারপরও কী নির্লিপ্ততা। আমরা কী মন থেকে মেনে নিয়েছি প্রতিদিন সড়ক দুর্ঘটনা হবে? প্রতিদিন প্রাণহানি হবে। আমরা কী আসলে এই বিষয়টায় অভ্যস্ত হয়ে পড়ছি?

রহস্যময় এই পৃথিবীতে কত কিছুই তো ঘটে। এবার গণমাধ্যমে শিরোনাম হোক: ‘ঈদের ছুটিতে সড়কে একটি প্রাণও ঝরেনি’। আহ্, এমন যদি হতো!

পথে দেরি হলে হোক। যানজট হোক। হোক দুর্ভোগ। তারপরও ঈদযাত্রা নিরাপদ হোক। এই আনন্দ-উৎসবের প্রাক্কালে দুর্ঘটনায় প্রাণহানি কোনোভাবেই কাম্য নয়। যে প্রিয়জন হারায় সেই বোঝে হারানোর বেদনা কাকে বলে। কোনো আহাজারি নয়, হারানোর হাহাকার নয়, আনন্দের হোক ঈদযাত্রা। ঈদযাত্রা হোক নিরাপদ এক আনন্দযাত্রা। শুধুই আনন্দযাত্রা।

খুশির ঈদ প্রত্যেকের জন্যই অপার আনন্দের হোক।

লেখক: সাংবাদিক ও সাহিত্যসেবক।




রাইজিংবিডি/ঢাকা/২ জুন ২০১৮/তারা

Walton Laptop
 
     
Walton