ঢাকা, শুক্রবার, ৬ বৈশাখ ১৪২৬, ১৯ এপ্রিল ২০১৯
Risingbd
সর্বশেষ:

সরগরম পাথরাইলের তাঁতপল্লী

শাহরিয়ার সিফাত : রাইজিংবিডি ডট কম
     
প্রকাশ: ২০১৮-০৬-০৯ ৩:৪১:২৪ পিএম     ||     আপডেট: ২০১৮-০৬-১৬ ৪:৫০:৫০ পিএম

টাঙ্গাইল প্রতিনিধি : ঈদকে সামনে রেখে টাঙ্গাইলের পাথরাইল তাঁতপল্লী এখন সরগরম। এখানকার কারিগররা ভীষণ ব্যস্ত সময় কাটাচ্ছেন।

তাঁতপল্লীর কয়েকশ’ কারখানায় দিনরাত বিরামহীন উৎপাদন চলছে। প্রায় ২৫ হাজার কারিগরের পদচারণা ও কর্মতৎপরতায় তাঁতপল্লী জুড়েই উৎসব আমেজ। অব্যাহত পাইকারি ক্রেতাদের আসা-যাওয়া। এমন অবস্থা চলবে ঈদের আগের দিন পর্যন্ত।

এবার ঈদে তসর, এনডি, ডেনু সিল্ক, জামদানীর উপর চুমকির কাজসহ বাহারি অন্তত ২০০টি ডিজাইনের শাড়ি তৈরি হচ্ছে এই তাঁতপল্লীতে।

পাথরাইলের তাঁতপল্লী ঘুরে দেখা যায়, আলো-আঁধারির ছোট ছোট তাঁতশাড়ির কারখানায় অবিরাম তাঁত বুনে যাচ্ছেন কারিগররা। ভোর হতে তাঁতের খটখট শব্দে মুখরিত থাকছে পুরো পল্লী। পুরো এলাকায় শুধু মাকু আর শানার ঠোকাঠুকির শব্দ। খটাখট শব্দে পরস্পর জড়িয়ে যাচ্ছে লম্বালম্বি ও আড়াআড়ি রাখা সুতাগুলো। লম্বালম্বি রাখা সুতাকে বলা হয় টানা। আড়াআড়ি সুতাগুলো পোড়েন। টানা পোড়েন মিশ্রন আর তাঁতির হাত ও পায়ের ছন্দে তৈরি হচ্ছে বর্ণিল টাঙ্গাইল শাড়ি। ঈদ উপলক্ষে তাঁতীরা সেই ভোর থেকে গভীর রাত পর্যন্ত বুনে চলেছেন টাঙ্গাইল শাড়ি।

তাঁতিরা ব্যস্ত সময় পার করছেন কাটিং, গ্যাস, হাইব্রিড, জামদানি, সুতি, সিল্কসহ নানা ঘরানার মনকাড়া শাড়ি তৈরিতেও।

একসময় টাঙ্গাইলের তাঁতে শুধু সাধারণ মানের শাড়ি তৈরি হতো। কিন্তু এখন বাহারি ডিজাইনের শাড়ি তৈরি হচ্ছে টাঙ্গাইলে। ঈদের মার্কেটে এবার সফ্ট সিল্ক, জামদানী, সূতি, ধানসিঁড়ি, আনারকলি, গ্যাস সিল্ক, একতারি, দোতারি ও রেশম শাড়ীর চাহিদা বেশি। টাঙ্গাইলের তাঁত শাড়ি কিনতে দূর-দূরান্ত থেকে আসছেন সাধারণ ক্রেতা ও পাইকাররা।

মোহাম্মদ আরজু মিয়া নামের এক তাঁত শ্রমিক বলেন, ‘গত ১০ বছর ধরে টাঙ্গাইলের তাঁত শাড়ি বুনছি। সিল্ক আর জামদানীই বেশি বুনি। এই শাড়িগুলো ভালো দামের। কিন্তু শাড়ি দামী হলে কি হবে, আমরা যে পরিশ্রম করি সেই পরিশ্রমের মূল্য আমরা পাই না। একটা শাড়ি বুনতে আমাদের ৩-৪ দিন লাগে। সকাল ৬টা থেকে রাত ৮টা পর্যন্ত এই শাড়ি বুনে মুজরি পাই দুই থেকে আড়াই হাজার টাকা। এই টাকা দিয়ে আমাদের পোষায় না। কিন্তু এই একটা কাজই শিখেছি বলে অন্য কিছুতে যেতেও পারি না।’

 



রুবেল মিয়া নামের আরেক তাঁত শ্রমিক বলেন, ‘সারা বছর তাঁত বুনলেও, ঈদের সময় এই তাঁত বুননে আমাদের অন্যরকম আনন্দ হয়। শাড়ি বুনে ভালো মজুরি না পেলেও, আমরা যে শাড়িটা বুনি, সেই শাড়ি পরে যখন বাঙালী মেয়েরা ঈদের আনন্দে মেতে উঠে তখন আমাদেরও আনন্দ হয়।’

এখানে আসা ফারহানা নামের এক ক্রেতা বলেন, ‘ঢাকায় অনেক বড় বড় শপিং মল আছে ঠিকই। সেখানে বিভিন্ন শাড়িও পাওয়া যায়। কিন্তু পাথরাইলের এই তাঁতপল্লীতে এক জায়গায় সব শাড়ি পাওয়া যায়। তা ছাড়া ঢাকা থেকে এখানে শাড়ির মূল্যও অনেক কম। ডিজাইন আর মানও উন্নত। তাই ঢাকা থেকে নিজের আর পরিবারের সবার জন্য ঈদের শাড়ি কিনতে এখানে আসা।’

রাজধানী থেকে আসা আনিসুল নামে এক পাইকারী শাড়ি ক্রেতা বলেন, ‘দেশের অন্যান্য তাঁতপল্লী থেকে এখানকার শাড়িগুলো সুতা আর রঙে ভালো। পাশাপাশি টেকসইও। তাই ঈদ আর অন্যান্য উৎসবে এখান থেকেই শাড়ি নিয়ে যাই।’

ঐতিহ্যবাহী টাঙ্গাইল শাড়ি দেশের সীমানা পেরিয়ে চলে যাচ্ছে দেশের বাইরে। মন জয় করে নিচ্ছে বিদেশের হাজার হাজার রমণীর। ভারতের মার্কেটেও যাচ্ছে টাঙ্গাইলের তাঁতের শাড়ি।

টাঙ্গাইল তাঁত শাড়ী পল্লীখ্যাত পাথরাইল, চন্ডি, বেলতা ও পুটিয়াজানি, বাজিতপুরের তাঁত প্রধান এলাকাগুলো ঘুরে দেখা গেছে চাহিদা অনুযায়ী শাড়ি সরবরাহ করতে হিমশিম খেতে হচ্ছে তাঁতীদের।

টাঙ্গাইলের পাথরাইলের তাঁত শাড়ি ডিজাইনার খোকন বসাক বলেন, ‘আগে টাঙ্গাইলের শাড়ির যে চাহিদা ছিলো এখনও সেটা আছে। তবে নতুন করে চাহিদা বাড়ানো যাচ্ছে না। কারণ, ক্রেতাদের আমরা নতুন কোন ডিজাইন দিতে পারছি না। ২ বছর আগের ঈদে যে শাড়ি মার্কেটে এসেছে, এখনও সেই একই শাড়ি মার্কেটে চলছে।’

পাথরাইলের শাড়ি বিক্রেতা রঘুনাথ বসাক বলেন, ‘দক্ষ শ্রমিকের অভাবে এবং শাড়ির চাহিদা কমে যাওয়ায় গত ১০ বছরে প্রায় ৬০ ভাগ তাঁত বন্ধ হয়ে গেছে।’



রাইজিংবিডি/টাঙ্গাইল/৯ জুন ২০১৮/শাহরিয়ার সিফাত/টিপু/শাহনেওয়াজ

Walton Laptop
     
Walton AC
Marcel Fridge