ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ১ ভাদ্র ১৪২৫, ১৬ আগস্ট ২০১৮
Risingbd
শোকাবহ অগাস্ট
সর্বশেষ:

সোনার মেয়ে, তোমাদের দিলাম ধন্যবাদের ডালি...

জাফর সোহেল : রাইজিংবিডি ডট কম
 
     
প্রকাশ: ২০১৮-০৬-১২ ২:০০:৪৭ পিএম     ||     আপডেট: ২০১৮-০৬-১৩ ১০:০৪:০০ এএম

জাফর সোহেল : একটি বিকেলের এত মায়া! বাঙালি কবে আর পেয়েছে এমন মায়াবি বিকেল? আকাশের কোলে মুদৃ অন্ধকার, সেখান থেকে যে কোনো সময় নেমে আসবে বৃষ্টি, আলো-আঁধারীর আয়েশি বিকেলে সবাই গোল হয়ে বসে টেলিভিশনের সামনে। রোজাক্লান্ত দেহমন, তবু কী এক অমোঘ টানে সবারই চোখ টিভি পর্দায়। একটুও নড়ে না কেউ! এমন মুহূর্তের রঙে কে না মাখাতে চায় নিজেকে? খেলা শেষ হয়ে যায়, তবু রেশ রয়ে যায়। সবাই বুঁদ হয়ে বসে থাকে টেলিভিশনের সামনে, হাইলাইটস দেখে, ভাষ্যকারের বিবরণ শোনে। বিস্ময়, প্রশংসা, আর শ্রদ্ধায় অবনত হয় মন। কাদের জন্য? এদেশের মেয়েদের জন্য। এমন আবেগী বিকেল বাঙালি খুব কমই পেয়েছে সাম্প্রতিক কালে। একটি কেমন শান্তি শান্তি পরিবেশ চারদিকে ‘যাক, একটা কিছু পেলাম’ সবার চোখেমুখে এমনই প্রশান্তি!

সত্যি, বাংলাদেশের মেয়েরা মালয়েশিয়ার কুয়ালালামপুরে যে ইতিহাস সৃষ্টি করল, তা না দেখতে পারা, না অনুভব করতে পারা সত্যি দুর্ভাগ্য। সুখের বিষয়, রোববারের মায়াবি দুপুর-বিকেলে বেশিরভাগ বাঙালিই দেখেছেন জাহানারা-রুমানাদের অবিশ্বাস্য সাফল্যের গল্প। ভারতকে হারিয়ে এশিয়া কাপের শিরোপাটা যেভাবে জয় করল সালমা বাহিনী, তা এক কথায় অসাধারণ। মাঠে এক মুহূর্তের জন্যও মনে হয়নি বাংলদেশ হারবে। আত্মবিশ্বাস ঠিকরে বেরুচ্ছিল প্রত্যেকের চোখে মুখে। খেলা দেখতে দেখতেই অনেকে বলছিলেন- আহা, যদি আমাদের ছেলেদের টিমটাও এমন খেলত!

শেষ ওভারে যখন ৯ রানের সমীকরণ আসে, তখন মনের অজান্তেই ঘাপটি মেরে বসে ভয়, কাঁপতে থাকে ভেতরটা- হবে তো? নাকি আবারো ফাইনালের আক্ষেপ? ছেলেদের দলের ভূত না আবার মেয়েদের কাঁধেও চড়ে বসে! না, শেষ পর্যন্ত তা আর হয়নি। শেষ ওভারে ৯ আর শেষ বলে দুই রানের সমীকরণ কীভাবে মেলাতে হয় তা মুশফিক-মাহমুদুল্লাহদের দেখিয়ে দিলেন জাহানারা-রুমানারা। শ্বাসরূদ্ধকর ম্যাচের ফল নিজেদের পক্ষে আনার টোটকা এখান থেকেই পেতে পারেন সাকিবরা। অবশ্য এই টোটকা তারা এরই মধ্যে নিয়ে নিয়েছেন বলেই মনে হলো টেলিভিশনের খবর দেখে। সাকিব-তামিমরা সালমা্-রুমানাদের অবিশ্বাস্য এই জয় দারুণ উপভোগ করেছেন এবং ম্যাচ শেষে লাফিয়ে আনন্দ ভাগাভাগি করেছেন! উচ্ছ্বাসের এই হাওয়া খেলার মাঠেও ছুটে যাবে, ছেলেদের ক্রিকেটে বড় টুর্নামেন্ট জেতার খরাটাও কেটে যাবে শীঘ্রই- এই প্রত্যাশা এখন করতেই পারি আমরা।

টুর্নামেন্টে ভারতের মতো দলকে দুবার হারিয়েছে বাংলার বাঘিনীরা। এটাও এক বিস্ময়কর ব্যাপার! বাংলাদেশের নারী ক্রিকেটের যে অবকাঠামো, সুযোগ-সুবিধা আর বিপরীতে ভারতীয়দের যে অবস্থা, তা বিবেচনায় নিলে অসাধ্য সাধন করেছে বলতে হবে। এদেশের নারী ক্রিকেটারদের জন্য বিশেষ কোন সুবিধাই নেই বলতে গেলে। আজই পত্রিকায় দেখলাম, এ’ গ্রেডের সর্বোচ্চ পর্যায়ের ক্রিকেটারের বেতন নাকি মাত্র ৩০ হাজার টাকা! আর ৩য় গ্রেডে মাত্র ১০ হাজার টাকা বেতন জাতীয় পর্যায়ের নারী ক্রিকেটারদের! আছে সামাজিক সীমাবদ্ধতা, বাঁকা চোখে দেখার যন্ত্রণা- ‘মেয়ে মানুষ ক্রিকেট খেলার কী দরকার!’ ইভটিজিংয়ের মতো ঘটনাও সামলাতে হয় কাউকে কাউকে। এমন সব পরিস্থিতি উতরে ভালো খেলার মানসিকতা তৈরিটাই ছিল একটা চ্যালেঞ্জ। কিন্তু দেখুন কী দারুণভাবেই আমাদের মেয়েরা সব চ্যালেঞ্জেই জয়ী হলো! তারা কেবল ভালো ক্রিকেট খেলেনি, ভালো দল হিসেবে নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করে ফেলেছে। এখন নারী ক্রিকেটেও বাংলাদেশকে সমীহ করতে বাধ্য হবে অপরাপর শক্তিধর দলগুলো।

যে শিরোপা আজ বাংলার মেয়েরা এনে দিয়েছে এর মাহাত্ম্য অনেক। একটা আন্তর্জাতিক শিরোপার জন্য বাঙালি ক্রিকেট ভক্তদের অপেক্ষা কেবল পিছিয়েই যাচ্ছিল বারবার। সেই ২০১২ এশিয়া কাপ থেকে শুরু, সবশেষ শ্রীলংকার মাটিতে নিদাহাস ট্রফি- বাঙালি এক একটা শিরোপার কাছোকাছি যায়, ভক্তরা ভাবে এই বুঝি পেলাম কাঙ্ক্ষিত শিরোপা। কিন্তু শিরোপা আর ধরা দেয় না। হাত ফসকে বারবার পড়ে যায়। সে শুধু মরীচিকার মতো ধোঁকা দেয়। অবশেষে মেয়েদের হাতে ঠিকই ধরা পড়ল আন্তর্জাতিক শিরোপা। এখন বাংলাদেশ এশিয়ায় চ্যম্পিয়ন দল- হোক না সেটা মেয়েদের ক্রিকেটে। মেয়েরা খরাটা কেটে দিয়েছে, এবার ছেলেদের পালা। সামনে অনেক টুর্নামেন্ট আছে, বিশ্বকাপের মতো আসর আছে। খরা যেহেতু কেটে গেছে, আগামীর যেকোন আন্তর্জাতিক টুর্নামেন্টেই আমরা শিরোপার জন্য লড়ব, এই বিশ্বাসের পালে নতুন করে হাওয়া লেগেছে। বাংলার মেয়েরা আজ পথ দেখিয়েছে আমাদের।

সবচেয়ে শান্তি লাগছে এই ভেবে যে, আমাদের মেয়েরা কঠিন সময়ে জাতিকে এক পরম সুখের পরশ দিল। জাতীয় জীবনে নানা বিষয় নিয়ে রমজানের এই পবিত্র মাসেও বেশ অস্বস্তিকর একটা সময়ের মধ্য দিয়ে যেতে হচ্ছিল গোটা জাতিকে। ক্রসফায়ার, একরাম ইস্যু, খালেদা জিয়ার জামিন-অসুস্থতা, খাদ্য আর ফলমূলে ভেজাল, ট্রেনের টিকিট, রাস্তাঘাটের বেহাল দশা- ইত্যকার নানা নেতিবাচক বিষয়ে বিষিয়ে উঠছিল নাগরিক মন। অস্থিরতা যেন কোনভাবেই কাটছিল না। এর মধ্যেই আফগানিস্তানের কাছে হোয়াইট ওয়াশ হয়ে এসেছে সাকিব-মুশফিকরা! মানুষের মন খারাপের যেন আর সীমা রইল না। এরকম একটা সময়ে এমন বিশাল প্রাপ্তি, সত্যিই কৃতজ্ঞতা জানানোর ভাষা হারিয়ে ফেলেছি।

প্রিয় বিজয়ীনী নারীরা, আমরা জানি, তোমাদের হৃদয়ে কোনো অংশেই কম নেই দেশপ্রেম, তবু আমরা তোমাদের অবহেলা করেছি, আমরা তোমাদের কিছুই দিইনি- প্রাপ্য সুযোগ-সুবিধা, প্রযোজনীয় অবকাঠামো, এমনকি প্রাপ্য অর্থ। তারপরও তোমরা দিয়েছ ডালিভরে। অকৃতজ্ঞ যদি আমরা না হই, তবে এবার তোমাদের স্বীকৃতি দেব, দেব সম্মান। আমাদের সোনার মেয়েরা, তো্মরা যা করেছ, তা কেউ করেনি আগে; তোমরা আমাদের মাথা উঁচু করে দিয়েছ আকাশের সমান; তোমরা দেখিয়েছ, কী করে কম পেয়েও বেশি দিতে হয়; কী করে অবজ্ঞা আর অবহেলাকে জয় করে দেশমাতৃকাকে ভালোবাসতে হয়; ভালোবেসে শিরোপা উপহার দিতে হয়! আমরা তোমাদের কাছে চির কৃতজ্ঞ। ধন্যবাদ আমাদের সত্যিকারের তারকারা; তোমাদের চেয়ে বড় কেউ নয়, তোমাদের চেয়ে বড় তারকা কেউ নয়- উই স্যালুট ইউ।

লেখক: সাংবাদিক



রাইজিংবিডি/ঢাকা/১২ জুন ২০১৮/তারা

Walton Laptop
 
     
Walton