ঢাকা, বুধবার, ৩ শ্রাবণ ১৪২৫, ১৮ জুলাই ২০১৮
Risingbd
সর্বশেষ:
সড়ক দুর্ঘটনা

এত মৃত্যু আমাদের অপরাধী করে না?

কমলেশ রায় : রাইজিংবিডি ডট কম
 
     
প্রকাশ: ২০১৮-০৬-২৫ ২:২৭:০৮ পিএম     ||     আপডেট: ২০১৮-০৬-২৫ ৩:০৮:৫০ পিএম

|| কমলেশ রায় ||

‘সড়কে ঝরল ৫২ প্রাণ।’

চমকে ওঠার মতো শিরোনাম! এই প্রাণহানি ঘটেছে একদিনে, গত শনিবার, ২৩ জুন। পরদিন মানে গত রোববার প্রতিটি পত্রিকায় প্রথম পৃষ্ঠায় শিরোনাম হয়েছে সড়ক দুর্ঘটনার খবর। অন্যসময় হলে এই বিয়োগান্তক খবরটি হয়ত প্রধান শিরোনাম হতো। রাশিয়ায় ফুটবল বিশ্বকাপ চলছে। সবার মনোযোগ এখন সেদিকে। বিশ্বকাপ নিয়ে মেতে আছে গোটা বিশ্ব। আমরাও মেতে আছি, উত্তেজনায় আছি। দ্বিতীয় রাউণ্ডে বাকি কোন কোন দল যাবে সেই ব্যবচ্ছেদ করছি। বিশ্বকাপ উত্তেজনার ডামাডোলে চাপা পড়ে যাচ্ছে নাড়া দেওয়ার মতো অনেক খবর। সড়কে অর্ধশতাধিক প্রাণহানির খবরও তাই গণমাধ্যমে প্রাপ্য, ন্যায্য ও যথাযথ গুরুত্ব পায়নি।

ঈদের ছুটি শেষে ফিরছিল মানুষ। সপ্তাহের শেষ দিন। প্রতিটি রুটেই ছিল বাড়তি চাপ। এই একদিনে ১৬ জেলায় ঘটেছে দুর্ঘটনাগুলো। শুধু গাইবান্ধায় বেপরোয়া গতির বাস উল্টে নিহত হয়েছে ১৮ জন। রংপুরে মারা গেছে ৭ জন। এসব দুর্ঘটনায় আহত হয়েছে কমপক্ষে ১৫০  জন। যাত্রীরা জানিয়েছেন, এ সব দুর্ঘটনার বেশির ভাগের পেছনে চালকের বেপরোয়া গাড়ি চালনাই দায়ী। সাম্প্রতিক সময়ে একদিনে সড়কে এত মৃত্যু আর দেখেনি দেশ। বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতির তথ্য অনুসারে, ২০১৫ সালের ঈদযাত্রায় একদিনে সড়ক দুর্ঘটনায় ৪৬ জন নিহত হয়েছিল। উল্লেখিত সমিতির মহাসচিব মোজাম্মেল হক চৌধুরী বলেন, ‘এবার নিহতের সংখ্যা সেটাকেও ছাড়িয়ে গেল। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে একদিনে এত মানুষ আর মারা যায়নি।’

ঈদের সময় কেন সড়ক দুর্ঘটনা বাড়ে? সড়ক নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞদের এ বিষয়ে কী অভিমত? তাঁদের মতে, বেহাল সড়ক, সড়কে গাড়ির সংখ্যা বৃদ্ধি (তালিকায় ভটভটি, ইজিবাইক, মোটরচালিত যানও রয়েছে), বেপরোয়া গতিতে গাড়ি চালনা, ফিটনেস বিহীন গাড়ি ও মহাসড়কে পর্যাপ্ত নজরদারির অভাবেই ঘটছে দুর্ঘটনা। এছাড়াও সড়কে ঝুঁকিপূর্ণ বাঁক, অদক্ষ চালক, বাড়তি ট্রিপ, চালকদের বিশ্রাম স্বল্পতা- এমনি আরও অনেক বিষয়ও প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে দায়ী বলে অভিমত বিশেষজ্ঞদের। বুয়েটের সড়ক দুর্ঘটনা গবেষণা ইনস্টিটিউটের (এআরআই) তথ্য মতে, ৪৭ শতাংশ দুর্ঘটনা ঘটে বেপরোয়া গাড়ি চালানোর কারণে। ৩৭ শতাংশ দুর্ঘটনার পেছনে রয়েছে গাড়ির অতিরিক্ত গতি। বাকি ১৬ শতাংশ ঘটে বিবিধ কারণে।

গাইবান্ধার পলাশবাড়ীতে ঢাকা-রংপুর মহাসড়কে গত শনিবার ভোরে ঘটে যাওয়া দুর্ঘটনার কারণ চালকের বেপরোয়া মনোভাব। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক যাত্রী জানিয়েছেন এ তথ্য। তিনি বলেন, ‘ঢাকা থেকে ঠাকুরগাঁও যাচ্ছিল বাসটি। শুক্রবার বেলা তিনটার দিকে বাসটি রওনা দেয়। চালকের চোখে ঘুম-ঘুম ভাব ছিল। বাস চলছিল বেপরোয়া গতিতে। এক পর্যায়ে যাত্রীরা আতঙ্কিত হয়ে পড়ে। চালককে অনেকবার সতর্ক করে দেন। কিন্তু তিনি কারও কথা কানে তোলেননি। ফলে যা হওয়ার তাই হয়েছে। হঠাৎ বিকট আওয়াজ। চিৎকার-চেঁচামেচি। কান্না-আহাজারি। আহা, কতগুলো প্রাণ ‘নাই’ হয়ে গেল। অকালে ঝরে গেল। আহতও তো হয়েছে অনেক। সৃষ্টিকর্তাকে ধন্যবাদ, বেঁচে আছি।’

গোবিন্দগঞ্জ হাইওয়ে থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আকতারুজ্জামান বলেন, ‘চালকের ঘুম-ঘুম ভাব, অতিরিক্ত যাত্রী বহন ও বেপরোয়া গতিতে বাস চালানোর কারণেই এই দুর্ঘটনা ঘটেছে বলে প্রাথমিক তদন্তে জানা গেছে। ধারণা করা হচ্ছে, চালকও মারা গেছে।’বিআরটিএ’র তথ্য হলো : ‘গড়ে ১০ লাখ গাড়ির মধ্যে সাড়ে ৬ লাখ গাড়ি বার্ষিক ফিটনেস সনদ নেয়। এ বছর মে মাস পর্যন্ত নিবন্ধন করা গাড়ির সংখ্যা ৩৫ লাখ ৩ হাজার ৯২২ । আর এপ্রিল পর্যন্ত ড্রাইভিং লাইসেন্স দেওয়া হয়েছে সাড়ে ২৪ লাখ।’ উপরের শেষ দুটো অঙ্ক  বিয়োগ করলেই ধারণা মিলবে কমপক্ষে কত লাখ গাড়ি অদক্ষ চালকরা  চালাচ্ছে। আর তাই সড়কে ঝুঁকি বাড়ছে।

শুধু চালকদের কথা বললেই কী দায় শেষ হয়ে যায়? তাদের পাশাপাশি যাত্রীদেরও সচেতন হতে হবে। পথে ঝুঁকি নিয়ে চলাচল করার প্রবনতা থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। জীবন একটাই। জীবন অমূল্য। এই কঠিন সত্যটা প্রতিক্ষণ আমাদের মাথায় রাখতে হবে খুব ভালো করে। আর ছুটির একদম শেষদিনে কর্মস্থলে যাওয়ার মনোভাবটাও বাদ দিতে হবে। একদিনে এত প্রাণহানির পরিপ্রেক্ষিতে জ্যেষ্ঠ এক সাংবাদিক ফেসবুকে স্ট্যাটাস দিয়েছেন। তাঁর স্বল্প পরিসরের স্ট্যাটাসে অনেক গভীর তাৎপর্য রয়েছে। তাই হুবহু তুলে দিলাম। তিনি লিখেছেন : ‘ঈদের ছুটিতে গ্রামের বাড়ি যাওয়া একাধিক ব্যক্তিকে অনুরোধ করে বলেছিলাম সপ্তাহান্ত মানে শনিবারে না ফিরতে। কাউকে কাউকে বলেছিলাম নিতান্ত নিরুপায় না হলে কথিত মহাসড়কে ছোট গাড়ি, এমনকি মাইক্রোবাস ব্যবহার না করতে। তাদের খোঁজখবর নিতে হবে এখন। কোনো খারাপ খবর এ পর্যন্ত পাইনি, তবু। যাদের সঙ্গে এ নিয়ে কথাবার্তা হয়নি, তারাও যেন নিরাপদে কর্মস্থলে ফেরে। শনিবারেই নাকি সারাদেশে ৫০ জনের মতো মারা গেছে গ্রামের বাড়ি থেকে সড়কপথে ফেরার সময়। কান্ড আর কী !’ তাঁর স্ট্যাটাসের নিচে আরেক সাংবাদিক মন্তব্য করেছেন, ‘এত দিন আমাদের শেখানো হয়েছে, সময়ের চেয়ে জীবনের মূল্য অনেক বেশি। এখন এ কথাও শেখানো দরকার, উৎসব উদযাপনের চেয়ে জীবনের মূল্য অনেক বেশি।’

আমাদের সড়ক যেন মৃত্যুফাঁদ। কাব্য করে আমরা বলি, সড়কে মৃত্যুর মিছিল।  মৃত্যু কেন মিছিল করে আসবে? অতর্কিতে কেড়ে নেবে স্বজনকে? আমাদের সড়ক কী কোনোদিনও নিরাপদ হয়ে উঠবে না? ছোট ছোট সব কারণে ঘটছে বড় বড় দুর্ঘটনা। প্রতিদিনই প্রাণ হারাচ্ছে কেউ না কেউ। এক পলকেই একটি স্বপ্নের মৃত্যু ঘটছে। নিঃস্ব হচ্ছে পরিবার। শুধু তাই নয়, দেশও হারাচ্ছে দক্ষ মানবসম্পদ। শনিবার সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত ৫২ জনের মধ্যে ৩৯ জনই ছিলেন কর্মক্ষম ব্যক্তি। এই পরিবারগুলোর এখন কী হবে? উপার্জনক্ষম ব্যক্তিকে হারিয়ে হঠাৎ করেই অন্ধকার নেমে এসেছে তাদের জীবনে। বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতির মহাসচিব মোজাম্মেল হক চৌধুরী বলেন, ‘জনসংখ্যার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো কর্মক্ষম মানুষ। তারাই বেশি প্রাণ হারাচ্ছেন সড়ক দুর্ঘটনায়। এর প্রভাব অর্থনীতিতে পড়তে বাধ্য। মধ্যম আয়ের দেশ হওয়ার যে যাত্রায় আমরা আছি, তাতে এই প্রানহানি একটা হোঁচট বৈকি। নজরদারি বাড়ানো না হলে অবস্থার কিন্তু উন্নতি হবে না।’

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সড়ক নিরাপত্তা সংক্রান্ত বৈশ্বিক প্রতিবেদনে সড়ক দুর্ঘটনায় ক্ষতির একটা চিত্র পাওয়া যায়। ২০১৫ সালের ওই বৈশ্বিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ‘সড়ক দুর্ঘটনায় বাংলাদেশের আর্থিক ক্ষতি মোট জিডিপির (দেশজ জাতীয় উৎপাদন) ১ দশমিক ৬ শতাংশের সমান।’বুয়েটের সড়ক দুর্ঘটনা গবেষণা ইনস্টিটিউটের আরও কিছু তথ্য এক্ষেত্রে উল্লেখ করা যেতে পারে। তাদের গবেষণা মতে, ‘বাংলাদেশে সড়ক দুর্ঘটনায় নিহতদের ৫৪ শতাংশেরই বয়স ১৬ থেকে ৪০ বছরের মধ্যে। এছাড়াও সাড়ে ১৮ শতাংশ হলো ১৫ বছরের নিচের শিশু।’ দেশের অর্থনীতি ও ভবিষ্যতের মূল চালিকা শক্তি বিবেচনা করা হয়ে থাকে জনসংখ্যার এই দুই শ্রেণীকেই। আর তাই সড়ক দুর্ঘটনায় কতটা সর্বনাশ বা ক্ষতি হচ্ছে সেটা সহজেই অনুমেয়।

বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতির তথ্য মতে, ‘এ বছর জানুয়ারি থেকে এপ্রিল পর্যন্ত সড়ক দুর্ঘটনা ঘটেছে ১৮৭১ টি। নিহত হয়েছে ২১২৩ জন। আহত ৫৫৫৮ জন। আর গত বছর ৪৯৭৯টি সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছে ৭৩৯৭ জন। আহত হয়েছে ১৬১৯৩ জন।’ এত মৃত্যু কী করে আমরা মেনে নিচ্ছি?

ঈদের আগে বড় আশা করে লিখেছিলাম : ‘পথে দেরি হলে হোক। যানজট হোক। হোক দুর্ভোগ। তারপরও ঈদযাত্রা নিরাপদ হোক।’ কিন্তু হলো কই? শেষরক্ষা তো হলো না। যাওয়াটা খানিকটা স্বস্তির হলেও ফেরাটা তো বড় বেদনার হলো। একদিনেই এত প্রাণ ঝরে গেল ! অনেকের বুকে এখন স্বজন হারানোর হাহাকার। অনেক বাড়িতে এখন আহাজারি। কত ঘরে যে কান্না থামছেই না। জলজ্যান্ত মানুষ। বাড়িতে এলো। ঈদে কত আনন্দ করল। অথচ এখন কেবলই স্মৃতি। এই রূঢ় সত্য কি মেনে নেওয়া যায়? স্বজনদের পক্ষে তা কী করে সম্ভব?

সড়কে প্রতিদিনই ঘটছে প্রাণহানি। যেন চলছে। চলবে! দায় কার? এত মৃত্যু, তবুও আমাদের বোধ জাগছে না। আমাদের অপরাধ বোধ কী শীতনিদ্রা গেছে? নাকি এই সব মৃত্যু এখন আর আমাদের অপরাধী করে না? এ ক্ষেত্রে বিবেকের চেয়ে বড় কিছু নেই। আমাদের বিবেক জাগুক। মানবতা বোধ জেগে উঠুক। প্রতিটি অস্বাভাবিক মৃত্যুতে অপরাধবোধ কুঁড়ে কুঁড়ে খাক আমাদেরকে। যারা পরিবহন খাতের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট তাদের সবার শুভ বুদ্ধির উদয় হোক। প্রাণের মূল্য আমরা বুঝতে শিখি। আমরা মানুষ হয়ে উঠি। প্রকৃত মানুষ হয়ে উঠি। প্রতিটি মানুষের জীবন অপার সম্ভাবনার। কারও জীবনই মোটেও হেলাফেলার নয়। কারণ মানুষ সৃষ্টির সেরা জীব। ‘মানুষের চেয়ে বড় কিছু নাই...’। ভেতরে-বাইরে-সবখানে এই সত্যটা সবাইকে আলোকিত করুক।

লেখক: সাংবাদিক ও সাহিত্যসেবক




রাইজিংবিডি/ঢাকা/২৫ জুন ২০১৮/তারা

Walton Laptop
 
     
Walton