ঢাকা, বুধবার, ৩ শ্রাবণ ১৪২৫, ১৮ জুলাই ২০১৮
Risingbd
সর্বশেষ:

বাঙালির ফুটবল এখনো গাছে ধরে

জুয়েল কবির : রাইজিংবিডি ডট কম
 
     
প্রকাশ: ২০১৮-০৬-২৮ ১:৪৬:৩৩ পিএম     ||     আপডেট: ২০১৮-০৬-২৮ ১:৫৩:১৬ পিএম

|| জুয়েল কবির ||

ফুটবল কি গাছে ধরে? এই প্রশ্নের উত্তরে কে কী বলবেন আমি জানি না। তবে আমি বলবো, হ্যাঁ আমার ফুটবল গাছে ধরে। প্রথমে ধরে ফুল, তারপর সেটা রূপান্তরিত হয় ফুটবলে। একটা দুটো নয়, এ ফুটবল গাছে ধরে থোকায় থোকায়। সে ফুটবল বিস্বাদ নয়, খেতেও লাগে বেশ, একটু টকটক মিষ্টি মিষ্টি স্বাদ। আহা! ভাবতেই জল এসে যায় জিভে। লবণ, তেল আর কাঁচামরিচ দিয়ে মেখেও খাওয়া যায় আমার ফুটবল। কি হলো কারোর কি চক্ষু কপালে উঠে গেলো এ বক্তব্যের কারণে? ভুলক্রমে উঠে গিয়ে থাকলে দয়া করে নিজ দায়িত্বে চোখ দুটো নামিয়ে আনুন যথাস্থানে। কারণ কপালে উঠে যাওয়া চোখের অপারেশন খরচের ব্যয়ভার বহন করার সাধ্যি আমার নেই। নেমেছে চোখ? যাক বাঁচা গেলো!

এবার বলছি শুনুন- আমার সে ফুটবলের নাম বাতাবি লেবু। এ ফুটবলে লাথি দিয়েই বড় হয়েছিলো আমাদের শিশুকাল, আমাদের শৈশব। আমাদের সংস্কৃতির ধারক, বাহক যে সমস্ত খেলা, সেগুলোর কমন একটা ধরন আছে। আর সেটা হচ্ছে কোনো ধরনের আলাদা আনুষাঙ্গিক বিষয়বস্তুর আড়ম্বর নেই ওতে, প্রয়োজনও পড়ে না। যেমন দাঁড়িয়াবান্দা খেলা: ফসল কাটা শেষে সে মাঠেই দাগ কেটে দাঁড়িয়ে যায় ছেলেপেলে। ব্যস, এ খেলায় মানুষ ছাড়া আর কিছুর কি প্রয়োজন পড়ে? ঠিক একইভাবে গোল্লাছুট, বউচি, পলান্তি, কাবাডি ইত্যাদি খেলার কথাই যদি বলি তবে একই বৈশিষ্ট্য লক্ষ্যণীয়। অন্যদিকে সামান্য আনুষাঙ্গিক বিষয়বস্তুর প্রয়োজন পড়ে আমাদের কুতকুত খেলায়। তবে সেটা কিনতে হয়না পয়সা খরচ করে। এতে লাগে মাটির চারা, যেটা মূলত ভাঙা হাড়ির অংশ। ষোলো গুটি খেলায় ব্যবহৃত হয় খেয়ে ফেলা খেঁজুরের বিচি। আর ডাংগুলি খেলায় লাগে গাছের ডাল। প্রকৃতি নির্ভর এসব অঞ্চলের মানুষের খেলাতেও ভীষণ প্রকৃতি নির্ভরতা। যেমন আমাদের পিছলা পাটটুয়া খেলাতে খসে পড়া সুপারি গাছের ডগায় একজন বসে তো আরেকজন টেনে নেয় পর্যায়ক্রমে। সেই আমাদের কাছে এসে একসময় ধরা দেয় ভিনদেশী ফুটবল খেলা। আমাদের পিতামাতা পড়ে যান বিপাকে। খেলার জন্যে আবার করতে হবে আলাদা খরচ? কিনতে হবে ফুটবল? গোলপোষ্টের জন্যে জাল আর পরিধানের জন্যে জার্সি আর বুট? অসম্ভব। যে পরিবারে নুন আনতে পানতা ফুরোয় অবস্থা, তারা স্রেফ খেলার জন্যে এতো টাকা খরচ করবে সেটা প্রত্যাশা করা অকল্পনীয়। অথচ ছেলেমেয়েদের চাহিদা পূরণে বাবা মায়ের সদিচ্ছার অভাব নেই। তবে আর্থিক অসঙ্গতি একটা বড় ফ্যাক্ট।

অগত্যা আমাদের মাঝে ধরা দেয় বাতাবিলেবু। অনেকে এ ফলটাকে জাম্বুরা বলেও ডেকে থাকেন। সেই জাম্বুরাই হয়ে গেলো ফুটবলের বাংলা সংস্করণ। পরনের লুঙ্গিটা কাছা দিয়ে হয়ে গেলো জার্সির প্যান্ট সদৃশ আর কাদা মাখা শরীর হয়ে গেলো জার্সি। আচ্ছা বুট কি বেশি প্রয়োজন এ খেলায়? যে জাতির জুতো পরার ইতিহাস বেশি দিনের নয়, তারা বুট কিনবে স্রেফ ফুটবল খেলার জন্যে? খড়ম হলে তাও কথা ছিলো। কিন্তু খড়মে কি ফুটবল খেলা সম্ভব? অতঃপর খালি পায়েই চললো আমাদের জাম্বুরা খেলা। অঝর বৃষ্টির মাঝে মাখামাখি করে কেটে গেলো আমাদের শৈশবের ফুটবল কাল। কিছুটা বড় হওয়ার পর জাম্বুরা দিয়ে ফুটবল খেলতে গিয়ে আমাদের অস্বস্তি তৈরি হয়। অবশেষে বুদ্ধি করে চার বন্ধু যার যার বাড়িতে শুরু করি কান্নাকাটি। বিশ টাকা বিশ টাকা করে চারজনে চাঁদা দিয়ে কিনে ফেলি একটা ফুটবল। মনে পড়ে কেনার পরপরই চার বন্ধুতে সে ফুটবলে কষে চারটা চুমো খাই। যথারীতি কিনে বাড়িতে আনার পর চলে আমাদের ফুটবল প্রদর্শনী। অসমর্থদের দেখিয়ে দেখিয়ে ফুটবল খেলা। এ জিনিস কেনার পর আমাদের হাঁটাচলার ভঙ্গিতেও যেন কিছুটা পরিবর্তন আসে। আমরা অন্যদের চেয়ে কিছুটা আলাদা ভাবতে শুরু করি নিজেদের। সবাইকে দেখিয়ে দেখিয়ে ফুটবল খেলি আমরা চারজন। কালেভদ্রে দয়া পরবশ হয়ে কাউকে কাউকে খেলার সুযোগ দিই আমাদের সাথে। খেলা শেষ হলে ফুটবলখানা পালাক্রমে থাকে একেকদিন একেকজনের বাড়িতে। যেদিন যার বাড়িতে সে ফুটবল থাকে সেদিন তার সেকি আনন্দ! খেতে বসে, পড়তে বসে, এমন কি বিছানায় ঘুমোতে গিয়েও জড়িয়ে ধরে রাখা হয় সে ফুটবল। অতঃপর পরদিন যথারীতি আরেকজনের কাছে হস্তান্তরের আগে খুব মন খারাপ। আবার অপেক্ষা করতে থাকা চতুর্থদিবস শেষের। কারণ চারদিন শেষ হলেই ফুটবল বেড়াতে আসবে আমার বাড়ি। বস্তুতপক্ষে সে ফুটবল আমার হয়েও যেন পুরোটা আমার হতে পারেনি কেবল আর্থিক সঙ্গতির অভাবে।

অভাবে স্বভাব নষ্ট হয়। একদিন আমাদের এক বন্ধু ফুটবলটাকে নিজের কাছে বারবার রাখার অংশ হিসেবে চালায় দুষ্টবুদ্ধির খেল। বলে, এখন থেকে ফুটবলটি একেকজনের কাছে থাকবে টানা সাতদিন ধরে। তার এ প্রস্তাবে সবাই সম্মত হলেও ঝামেলা পাকায় জিম্মাধারীর পর্যায়ক্রম নির্ণয় নিয়ে। কার বাড়ি থেকে শুরু হবে এ কার্যক্রম সেটা নিয়ে বাধে বিস্তর ঝগড়া। ঝগড়ার পরিণতি ধ্বংসাত্নক। বলা হয় যার যার অংশ নিয়ে যাবে সে সে। অর্থাৎ কেটে ফেলা হবে প্রাণের ফুটবল। বাড়ি থেকে আনা হলো ধারালো দা। কাটা হলো ফুটবল। বৃষ্টির পানি আর চোখের জলে ভেসে গেলো কাটা ফুটবলের চামড়াখণ্ড। পরদিন আবারো গাছ থেকে পেরে আনা হলো কয়েকটা বাতাবি লেবু। খাওয়া শেষে বাতাবিলেবুর খোসা দিয়ে বানানো হলো চারখান মস্তকবন্ধনী-হেলমেট। আর বাকি একখান বাতাবিলেবু নেমে গেলো ফুটবল মাঠে। আমাদের এই ফুটবল উন্মাদনার একটা বড় অংশের যোগানদার পাশের বাড়ির সাদাকালো টিভি। বিশ্বকাপ শুরু হলে দয়াপরবশ হয়ে মড়ল বাড়ির লোকেরা তাদের কাঠের বাক্সবন্দী টিভিটা বের করে দিতেন বাড়ির উঠোনে। শহর থেকে আনা চার্জ দেয়া ব্যাটারির শক্তিতে চলতো ফুটবল দর্শন। পাড়ার ছেড়েবুড়ো একত্রে হুমড়ি খেয়ে পড়তো সেখানে। পাটি বিছিয়ে রাত জেগে চলতো খেলা দেখা। কখনো সখনো সরিষার তেলে মেখে মুড়িও পরিবেশন করা হতো সবার জন্যে। কালেভদ্রে পছন্দের দলের জয়োৎসবে চলতো জিলাপী খাওয়া।

আহা! সেসব দিন। মোটকথা আমাদের ফুটবল উন্মাদনার একটা বড় অংশের বহিঃপ্রকাশ ঘটতো সেই মোড়ল বাড়ির বাক্স ঘিরে। বলা চলে বিশ্বকাপ শুরু হওয়ার মাধ্যমে যে উন্মাদনার শুরু, বিশ্বকাপ শেষ হওয়ার মাধ্যমেই যেন ক্রমে সে উন্মাদনার শেষ হয়ে যেতো। কালোভদ্রে বিশ্বকাপ উন্মাদনার রেশ ধরে দুএকটা লোকাল টুর্নামেন্টের আয়োজন হলেও ফুটবল নিয়ে বড় কোনো পরিকল্পনা তেমন চোখে পড়তো না। না আঞ্চলিক পর্যায়ে, না জাতীয়ভাবে। সে কারণেই সম্ভবত বাংলাদেশের ফুটবলের ক্রমাবনতিই কেবল ঘটছে দিনকে দিন। বিশ্ব তালিকায় বাংলাদেশের অবস্থান এখন দুইশো ছুঁইছুঁই। অথচ আমরা মূলত যেসব দেশের ফুটবল নিয়ে উন্মাদনায় মাতি সেই ব্রাজিল আর্জেন্টিনার বর্তমান বিশ্ব তালিকা দুই পাঁচ। তারাই যদি আমাদের পছন্দ হয়, তাদের ফুটবলকেই যদি আমরা আদর্শ জ্ঞান করি তবে আমরা তাদের মত কিংবা তারচেয়ে অধিক হওয়ার চেষ্টা চালাই না কেনো? বস্তুত আমাদের ফুটবল এখনো গাছেই ধরে। এখনো বিশ্বকাপ এলে গাছে গাছে ঝুলে থাকে পছন্দের দলের রঙ-বেরঙের সুদৃশ্য পতাকা। গাছগুলোকে মনে হয় পতাকা ফল ধরা গাছ। যে পতাকা ক্রয়ের অর্থের উৎস বিক্রি করা বাড়ি গাড়ি গরু ছাগল জমিজামা। অথচ টাকা খরচ করে বাচ্চাকে ফুটবল কিনে দিতে আমাদের কুণ্ঠাবোধ। ফুটবলকে পেশা হিসেবে নিতে চাওয়া সন্তানদের প্রতি আমাদের সমর্থনের নিতান্তই অভাব। বলাই বাহুল্য এই সমর্থনের অভাব দূর না হলে আমাদের ফুটবলের মান উন্নত হওয়া অসম্ভব। কারণ যেসব দেশ ফুটবলে উন্নতি সাধন করেছে, সেসব দেশের ফুটবলাররা কিন্তু উঠে এসেছে তৃণমূল পর্যায় থেকেই। আমার এক আত্নীয় একবার মজা করে বলেছিলো, ফুটবল হলো গরীব মানুষের খেলা। এখানে একটা ফুটবল নিজের করে পেতে দৌড়ায় বাইশজন মানুষ। আহারে ওদের জন্যে মায়াই হয়! সত্যিকার অর্থেই তাই। আন্তর্জাতিক অন্যান্য খেলা যেমন হকি, ক্রিকেট, গলফ, লং টেনিস, টেবিল টেনিস ইত্যাদির খরচের সাথে তুলনা করলে কিন্তু ফুটবলকে গরীবের খেলা বলাই যায়। অন্তত একটা ফুটবল কিনতে পারলেই চর্চা করা যায় এ খেলার। গোলপোস্ট বানানোর জন্যে বাঁশেরও অভাব নেই এদেশে। অথবা দুপাশে দুখণ্ড কাঠ রেখে দিলেই তো মেপে দেয়া যায় গোলপোস্ট। তাই না?

বিশ্বকাপ এলেই বোঝা যায় বাংলাদেশের ফুটবলপ্রেমীদের কী পরিমাণ উন্মাদনা! প্রতিবারই প্রাণিত হই। আমাদের এ উন্মাদনা নিঃসন্দেহে ধনাত্নক। তবে এ ধনাত্নক প্রবণতা গাছে ঝুলিয়ে রাখলে তো হবে না। একে নামিয়ে আনতে হবে আমাদের মগজে। আনতে হবে রক্তকণিকায়, কোষে কোষে। সর্ববৃহৎ পতাকা উড়িয়ে বাজিমাত করতে চাওয়ার মহোৎসব নয়, চেষ্টা চালাতে হবে সবচেয়ে বেশি গোল দিয়ে অন্যদেশকে পরাভূত করবার মত মনোবল আর মানসিকতায়। নিজেদের চেষ্টা, সাধনা আর একাগ্রতায় তাক লাগিয়ে দিতে হবে বিশ্ববাসীকে। এখন বিশ্বকাপ চলছে। চলছে আমাদের উন্মাদনা। চলছে মাত্রাতিরিক্ত ব্রাজিল-আর্জেন্টিনার সাপোর্ট। মনে রাখতে হবে এ উন্মাদনা কখনো যেন না রূপ নেয় দাঙ্গা-হাঙ্গামায়। যেন বিশ্বকাপ উপলক্ষ্যে নিজ দলের উৎসব আয়োজনে শুরু না হয় চাঁদাবাজি। হিংসা-বিদ্বেষে খুন-জখমে আক্রান্ত না হয় আর কেউ। এগুলো কখনোই কাম্য নয়। তারচেয়ে বরং চলুন আমাদের ফুটবলকে এগিয়ে নিতে সত্যিকার অর্থেই চেষ্টা করি সবাই। গাছে ধরা ফুটবলকে নামিয়ে আনুন মাটিতে। চলুন শুরু করি- কিক। নিজের দেশ বিশ্বকাপ খেললে আমরা তো একটা দেশেরই সাপোর্টারই হয়ে যাবো, তাই না?

লেখক : সাহিত্যিক, নাট্যকার



রাইজিংবিডি/ঢাকা/২৮ জুন ২০১৮/তারা

Walton Laptop
 
     
Walton