ঢাকা, শুক্রবার, ৩ কার্তিক ১৪২৫, ১৯ অক্টোবর ২০১৮
Risingbd
সর্বশেষ:

কিডনি গায়েবের অভিযোগ: দ্রুত ব্যবস্থা নিন

রাহাত সাইফুল : রাইজিংবিডি ডট কম
 
     
প্রকাশ: ২০১৮-০৯-২৪ ৩:১২:০৮ পিএম     ||     আপডেট: ২০১৮-০৯-২৪ ৪:৪৫:২৯ পিএম

রাহাত সাইফুল: ‘মায়ের একধার দুধের দাম, কাটিয়া গায়ের চাম/পাপশ বানাইলে ঋণের শোধ হবে না/এমন দরদি ভবে কেউ হবে না আমার মা গো।’ জন্মদাত্রী হিসেবে প্রত্যেকের জীবনে মায়ের স্থান সবার ওপরে। মায়ের মতো দরদি পৃথিবীতে আর কেউ হবে না। বিষয়টি প্রত্যেকেই কম-বেশি উপলব্ধি করেন। ভাই-বোন, কাকা-কাকীর মতো সর্ম্পক একাধিক হলেও মা-বাবা একজনই হন। এর বিকল্প হিসেবে সৃষ্টিকর্তা পৃথিবীতে আর কিছু রাখেননি। পৃথিবীতে একমাত্র মায়ের ভালোবাসা ও দানই নিঃস্বার্থ ও বিনিময়হীন। বড় হয়ে সু-সন্তান মায়ের মুখে হাসি ফোটাতে কত কি না করেন। এমনই এক সন্তান রফিক সিকদার।

রফিক ঢাকায় বাস করলেও মন পড়ে থাকে মায়ের কাছে। মায়ের জন্য মন পুড়লে ছুটে যান পাবনা। মায়ের সুখে-দুঃখে সব সময় পাশে থাকার চেষ্টা করেন। মা রওশন আরার বাম কিডনিতে সমস্যার কথা শুনেই চিকিৎসকের শরণাপন্ন হয়েছেন। ঢাকায় এনে মাকে চিকিৎসা করিয়েছেন। কিডনির রোগ ছাড়া তার অন্য কোনো বড় ধরনের সমস্যা ছিল না।  ঈদুল আজহার পর হঠাৎ একদিন হাসপাতাল থেকে ফোন করে রফিক সিকদারকে জানানো হয়- আপানার মায়ের বাম কিডনিটা ফেলে দিতে হবে। ফেলে দিলে পুরোপুরি সুস্থ হবেন তিনি। না হলে পরবর্তী সময়ে সমস্যা হতে পারে। ডাক্তারের প্রতি অগাধ বিশ্বাস আর মা সুস্থ হয়ে যাবেন, কোনো সমস্যা থাকবেন না- এই আশায় সাত-পাঁচ না ভেবেই তিনি সম্মতি দেন। 

গত পাঁচ সেপ্টেম্বর- কে জানত এই পাঁচ তারিখটাই রফিকের জন্য বেদনার দিন হয়ে দাঁড়াবে! কারণ এদিনই রফিক সিকদারের মায়ের অপারেশন করা হয়। ফেলে দেয়া হয় রওশন আরার বাম কিডনি। অপারেশনের পর প্রথমে ভালোই ছিলেন রওশন আরা। এরপর তিনি হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়েন। কর্তব্যরত চিকিৎসক রফিককে জানান, তার মাকে এখনই অন্য কোনো হাসপাতালের আইসিইউতে নিতে হবে। কারণ ওই হাসপাতালে আইসিইউ খালি নেই। সময় কম। কথা শুনে দ্রুত রাজধানীর আরেকটি হাসপাতালে মাকে নিয়ে আসেন তিনি। সেখানে ভর্তির পর ডাক্তার রওশন আরার সিটি স্ক্যান করাতে বলেন। এরপরই আসলে রফিকের মাথায় আকাশ ভেঙে পড়ে।  সিটি স্ক্যান করার পর ডাক্তার জানান, রওশন আরার শরীরে কোনো কিডনিই নেই। প্রথমে বিষয়টি বিশ্বাসই করতে পারছিলেন না রফিক। রিপোর্ট নিয়ে রফিক ছুটে যান আগের হাসপাতালে। সেখান থেকে একই কথা জানানো হয়। কিন্তু দেয়া হয় না কোনো সমাধান। কীভাবে এমন হলো মেলে না উত্তর।

পাঠক, আপনারা এতক্ষণ ঘটনার যে অংশটুকু পড়লেন তা দেশের জাতীয় দৈনিক এবং অনলাইন নিউজ পোর্টালগুলোতে প্রকাশিত হয়েছে। আমিও সেখান থেকেই সংবাদটি জেনেছি। বিষয়টি নিয়ে ২০ সেপ্টেম্বর ‘একাত্তর’ টেলিভিশনে একটি ভিডিও প্রতিবেদন প্রচারিত হয়। পারভেজ রেজার এই প্রতিবেদনে বলা হয়- ‘রওশন আরার বাম কিডনিটি কাজ করছিল না। পরীক্ষায় ধরা পড়ে সেটি অকেজো। তবে ভালো ছিল ডান পাশের কিডনি। গত ৫ সেপ্টেম্বর অকেজো কিডনিটি ফেলে দেয়ার জন্য রাজধানীর সরকারি একটি হাসপাতালে অপারেশন হয় রওশন আরার। অপারেশনের পর রাতেই তার অবস্থা খারাপ জানিয়ে, তাকে বাইরের কোনো হাসপাতালের আইসিইউতে নিয়ে যেতে বলেন দায়িত্বরত চিকিৎসক। পরে তিনি ভর্তি হন একটি বেসরকারি হাসপাতালে। সিটি স্ক্যানে জানা যায়, রওশন আরার দুটি কিডনির একটিও নেই। সেই কারণে তার প্রস্রাব বন্ধ হয়ে গেছে।পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর ডাক্তারও নিশ্চিত; তার দুই কিডনির একটাও শরীরে নেই। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ডা. হাবিবুর রহমান এ অপারেশন করেন। তার দাবি, অকেজো কিডনি সিটি স্ক্যানে দেখা যাচ্ছে না। তবে এই কথা মানতে নারাজ অন্য চিকিৎসকরা। রওশন আরার ছেলে জানান, অপরেশনের আগে সব পরীক্ষাতেই তার ডান পাশের কিডনি ভালো বলে রিপোর্টে উল্লেখ আছে। আর সেটি দিয়েই তিনি বাকি দিনগুলো বেঁচে থাকতে পারবেন, এমন নিশ্চয়তা পেয়েই তারা বাম কিডনি ফেলে দিতে রাজি হয়েছিলেন। এই ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্ত দাবি করেছেন রফিক।’

এরপর শুরু হলো অভিযোগ, পাল্টা অভিযোগ। ওদিকে হাসপাতালের বিছানায় মৃত্যু যন্ত্রণায় কাঁতরাচ্ছেন মা রওশন আরা। মাকে কীভাবে সুস্থ করবেন রফিক? এই প্রশ্নের উত্তর নেই তার কাছে। দিশেহারা রফিকের এখন সময় কাটছে সংবাদমাধ্যমগুলোতে প্রশ্নের উত্তর দিতে দিতে। উত্তর না দিয়েও পারছেন না তিনি। কারণ বিষয়গুলো প্রকাশ না হলে বিচার তিনি পাবেন না। কিন্তু মায়ের চিকিৎসার অগ্রগতি কী? অভিযুক্তকে কতটা দোষী প্রমাণ করতে পারবেন রফিক সিকদার? মায়ের ভালো কিডনি ফেলে দেয়া বা অপসারণ করা নিয়ে হয়তো মামলা হবে, সংবাদমাধ্যমগুলাতে ফলাও করে খবর প্রকাশিত হবে। দুই পক্ষ অভিযোগ পাল্টা অভিযোগ করে যাবেন। এরই মধ্যে বিষয়টি তদন্ত করার জন্য গঠন করা হয়েছে তদন্ত কমিটি। সেই কমিটির রিপোর্ট প্রকাশও  সময়সাপেক্ষ বিষয়। তাতে কি মা সুস্থ হবেন? তিনি যে জীবন মরণ সংকটে। এই সংকট যাদের গাফিলতির কারণে তারা কি ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে যাবেন? অনেক প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হচ্ছে অসহায় মায়ের এই সন্তানকে। এটা ইচ্ছাকৃত নাকি অনিচ্ছাকৃত ভুল, নাকি সিটি স্ক্যানের ভুল। বিষয়টি এখনো পরিষ্কার নয়। তবে এ ধরণের একটি ভুল সারা জীবনের কান্না- এ নিয়ে কোনো সংশয় নেই।

আমরা বিশ্বাস করি, দেশের চিকিৎসা ব্যবস্থা এখনও এতটা রসাতলে যায়নি। সৃষ্টিকর্তার পর মানুষ বিশ্বাস করেন চিকিৎসককে। সেই চিকিৎসক এ ধরনের কাজ করবেন এটা কখনও কাম্য নয়। তবে এটাও ঠিক, যে কোনো কারণেই হোক মানুষ এ দেশের চিকিৎসকদের ওপর থেকে আস্থা হারাতে শুরু করেছেন। পত্রিকার পাতা খুললেই চিকিৎসায় অবহেলা, ভুল চিকিৎসায় রোগীর মৃত্যু, হাসপাতালে নানান অব্যবস্থাপনার চিত্র চোখে পড়ে। খবরে প্রকাশিত হয় ডাক্তাররূপী কসাইদের কর্মকাণ্ড। দেশের চিকিৎসাসেবা নিয়ে এমন খবর আমাদের আতঙ্কিত করে। কিছু ক্ষেত্রে দোষী চিকিৎসকদের বিচারের কাঠগড়ায় দাঁড় করানো হলেও অধিকাংশ ঘটনার বিচার হয় না। রোগী পান না সুষ্ঠু সমাধান। কিছুদিন আগেও ভুল চিকিৎসায় রোগীর মৃত্যু হলে চট্টগ্রামে বিচার চাইতে গিয়ে উল্টো চিকিৎসকরা হুমকি দিয়েছেন। যানবাহন শ্রমিকদের মতো তারাও কথায় কথায় এখন ধর্মঘটের হুমকি দেন। এ থেকেই এদের দৌরাত্ম্য বোঝা যায়। কিন্তু করার যেন কিছুই নেই। রাজপথের নৈরাজ্যের চেয়ে চিকিৎসাসেবা খাতে অব্যবস্থাপনা আরো ভয়াবহ। কারণ এটি সরাসরি মানুষের জীবন-মরণের সঙ্গে জড়িত। তাই আমরা আশা করছি, এই ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত হওয়া প্রয়োজন। এবং দ্রুত দোষী চিকিৎসককে বিচারের আওতায় নিয়ে আসা হোক।

 

 

 

রাইজিংবিডি/ঢাকা/২৪ সেপ্টেম্বর ২০১৮/রাহাত/তারা

Walton Laptop
 
     
Walton