ঢাকা, বুধবার, ৮ ফাল্গুন ১৪২৫, ২০ ফেব্রুয়ারি ২০১৯
Risingbd
সর্বশেষ:
গ্রন্থাগার দিবস

গ্রন্থাগারে বই পড়ি, আলোকিত মানুষ গড়ি

মাছুম বিল্লাহ : রাইজিংবিডি ডট কম
 
     
প্রকাশ: ২০১৯-০২-০৫ ১:২৯:২৫ পিএম     ||     আপডেট: ২০১৯-০২-০৫ ১:২৯:২৫ পিএম

মাছুম বিল্লাহ: ‘গ্রন্থাগারে বই পড়ি, আলোকিত মানুষ গড়ি’ শ্লোগানের মধ্য দিয়ে দেশে দ্বিতীয়বারের মতো আমরা জাতীয় গ্রন্থাগার দিবস পালন করছি। ২০১৮ সালের ৫ ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশে প্রথম জাতীয় গ্রন্থাগার দিবস পালিত হয়। দেশের  গ্রন্থাগারগুলো নতুন অনুপ্রেরণায় উদ্দীপ্ত করার নিমিত্তে এবং  সরকারি বেসরকারি গ্রন্থাগার, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে বিদ্যমান গ্রন্থাগার, এনজিও পরিচালিত গ্রন্থাগার ইত্যাদির মধ্যে একটি কার্যকর এবং ফলদায়ক সমন্বয়ের সুযোগ সৃষ্টির লক্ষ্যে এ দিনটি জাতীয় গ্রন্থাগার দিবস ঘোষণা করা হয় গত বছর। এমন সমন্বয়ের ফলে বাংলাদেশের গ্রন্থাগার সেবার মান ও কার্যকারিতা দুই-ই আরও বৃদ্ধি পাবে বলে সংশ্লিষ্টদের বিশ্বাস।

‘বই পড়ি, স্বদেশ গড়ি’ শ্লোগানের মধ্য দিয়ে জাতীয় গ্রন্থাগার দিবস পালিত  হয়েছিল গত বছর। এজন্য উদ্যোক্তা ও সংশ্লিষ্টরা বিশেষ ধন্যবাদ পাওয়ার উপযুক্ত। সভ্যতা টিকিয়ে রাখতে হলে গ্রন্থাগারগুলোকে টিকিয়ে রাখতে হবে। গ্রন্থাগার হচ্ছে সভ্যতার বাহন। ১৯৫৪ সালের ৫ ফেব্রুয়ারি কেন্দ্রীয় পাবলিক লাইব্রেরির ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করা হয়েছিল। তাই এ দিনটিকে ‘জাতীয় গ্রন্থাগার দিবস হিসেবে ঘোষণা করা হয়। দিবসটি ঘিরে সারাদেশের গ্রন্থ ও গ্রন্থাগার অঙ্গনগুলো নানামুখী কর্মকাণ্ডে মুখরিত থাকে। দিবসটির তাৎপর্য তুলে ধরে সকালে র‌্যালি ও বিকেলে সেমিনার, সিম্পোজিয়াম, পাঠচক্র, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান অনুষ্ঠিত হয় রাজধানী ঢাকাসহ সব জেলায়। অসংখ্য ভাবনা এবং নবতর ধারণার মধ্য দিয়ে গ্রন্থাগারগুলোর কার্যক্রম এখন সম্মুখের দিকে নিরন্তর ধাবিত হবে বলে প্রত্যাশা সংশ্লিষ্টদের। দেশে সরকারি পর্যায়ে বিভাগীয়, জেলা ও দুটি উপজেলাসহ মোট ৭১টি গণগ্রন্থাগার পরিচালিত হচ্ছে। বেসরকারি পর্যায়ে বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র ৯০ লাখ ছাত্রছাত্রীকে বই পড়াচ্ছে। চার হাজার স্কুলে যেখানে কোনো লাইব্রেরি ছিল না, সেখানে লাইব্রেরি করেছে বিশ্ব সাহিত্য কেন্দ্র। এ ছাড়াও আরও দুই হাজার বিদ্যালয়ে বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র লাইব্রেরি স্থাপন করেছে। ব্র্যাক শিক্ষা কর্মসূচি প্রায় তিনহাজার গণকেন্দ্র ও পাঁচহাজার কিশোর-কিশোরী ক্লাবের মাধ্যমে লাইব্রেরি কার্যক্রম পরিচালনা করে প্রায় চৌদ্দ লক্ষ পাঠক-পাঠিকা তৈরি করেছে দেশব্যাপী। এসব কেন্দ্রগুলোতে বছরব্যাপী বিভিন্ন ধরনের কর্মকাণ্ড পরিচালিত হয়। জ্ঞান ও তথ্য জনগণের কাছে পৌঁছে দেয়ার জন্য ব্রিটিশ কাউন্সিল সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে যৌথভাবে পরিচালনা করছে ‘লাইব্রেরিজ আনলিমিটেড’ কর্মসূচি। জাতীয় গ্রন্থাগার দিবস ঘোষণার মাধ্যমে সরকারি বেসরকারি সব পর্যায়ের গ্রন্থাগার সংক্রান্ত কার্যাবলী আরও বেগবান হবে বলে আমরা মনে করি।

গ্রন্থাগার হলো সভ্যতার দর্পণ। মানবজাতির শিক্ষা, রুচিবোধ ও সংস্কৃতির কালানুক্রমিক পরিবর্তনের সঙ্গে গ্রন্থাগারের নিবিড় সম্পর্ক রয়েছে। সে কারণে গ্রন্থগার হচ্ছে অতীত ও বর্তমান শিক্ষা-সংস্কৃতির সেতুবন্ধন। জ্ঞানার্জন, গবেষণা, চেতনা ও মূল্যবোধের বিকাশ, সংস্কৃতিচর্চা ইত্যাদির মাধ্যমে মানুষকে আলোকিত করে তোলা এবং পাঠাভ্যাস নিশ্চিতকরণে গ্রন্থাগারের ভূমিকা অপরিসীম। মনের স্নিগ্ধরূপ গঠনে গ্রন্থের একটি বিরাট প্রভাব বিদ্যমান। মনের তৃপ্তি ও দীপ্তি গ্রন্থপাঠের মাধ্যমেই সম্ভব। গ্রন্থ মানুষকে দেয় জীবনীশক্তি। গ্রন্থ নির্বাচনে পাঠককে গ্রন্থাগার ও  দোকানে গিয়ে পরিশ্রম করতে হয়। জ্ঞানের জায়গায় যদি তথ্য প্রতাপ তৈরি করে তাহলে সভ্যতার সংকট তৈরি হতে পারে। তবে, কাগজের বই পড়ার যে আনন্দ তা অন্য কোনো মাধ্যমে পাওয়া সম্ভব নয়। এটিই আসল সত্য কথা। বাংলাদেশের মানুষের গভীর আবেগ, ভালোবাসা ও গ্রন্থপ্রীতি যুক্ত হয়ে অমর একুশে গ্রন্থমেলা ধীরে ধীরে বাঙালীর সাংস্কৃতিক জাগরণ আর রুচি নির্মাণের এক অনন্য প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পরিগ্রহ করেছে। মেলায় অনেকব বই প্রকাশিত হলেও মানসম্পন্ন বইয়ের যে অভাব রয়েছে, পাঠকদের সে বিষয়ে সচেতন হতে হবে। একইভাবে দেশের গ্রন্থাগারগুলোতেও মানসম্পন্ন বইয়ের সমাবেশ ঘটাতে হবে। একখানা বই শত শত বছর টিকে থাকে, যদি তেমন বই হয় অর্থাৎ এখানে মানের কথা বলা হয়েছে। অনেক নতুন বই বাজারে আসে; কিছু বইয়ের মান ভালো, আবার কিছু বই হয়তো সে রকম মানসম্পন্ন নয় কিন্তু বিজ্ঞাপনের ভারে পাঠকের কাছে পৌঁছে যায়। তবে ভালো বই কিভাবে পাঠকের কাছে পৌঁছানো যায় তার ব্যবস্থা প্রকাশক সংস্থাগুলোসহ জাতীয় গ্রন্থাগার কর্তৃপক্ষকেও নিতে হবে। বইয়ের প্রতি তরুণদের আগ্রহ যদি বেশি থাকে তাহলে প্রকাশকেরা নিম্নমানের বই প্রকাশে তেমন উৎসাহিত হবেন না। কাজেই পাঠকদেরও রয়েছে এখানে বিরাট দায়িত্ব। পাঠক যাতে শুধু বইয়ের বিজ্ঞাপন দেখে এবং শুধুমাত্র প্রতিষ্ঠিত লেখকদের বই  না পড়েন সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে। প্রতিষ্ঠিত লেখক হলেই যে, তারা সব সময় একই মানের বই লিখবেন  তা কিন্তু নয়। তারা প্রকাশকদের চাপাচাপিতে অনেক সময় দ্রুত বই বের করেন আর প্রকাশকগণও তাদের নাম দিয়ে মোটামুটি বাণিজ্য করার চেষ্টা করেন। কাজেই বইয়ের মান বিচারের মূল দায়িত্ব পাঠকদের।

যে পরিবারে গ্রন্থাগার আছে তা ঐ পরিবারে আলাদা জ্যোতি ছড়ায়। ঐ পরিবারে অসামাজিক ও জঙ্গীবাদী কাজ হতে পারে না। প্রতিটি সচেতন পরিবারেরই উচিত একটি পারিবারিক লাইব্রেরি প্রতিষ্ঠা করা। শিশুদের বই পড়ায় উদ্বুদ্ধ করা। ছোট হলেও প্রতিটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে গ্রন্থাগার চালু করা উচিত।  প্রতিটি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে গ্রন্থাগার আছে কিনা, থাকলে চালু আছে কিনা, শিক্ষার্থী ও শিক্ষকগণ সেখানে বই পড়েন কিনা ইত্যাদি বিষয়গুলো খোঁজখবর রাখতে হবে সংশ্লিষ্টদের। দুঃখের বিষয় অনেক বিদ্যালয়ের শিক্ষক, প্রধান শিক্ষক এবং অনেক অভিভাবক বলে থাকেন- বাইরের বই পড়ে সময় নষ্ট করার সময় নেই আমাদের শিক্ষার্থীদের। প্রচলিত শিক্ষা পদ্ধতিতে কি শিখছে আমাদের শিক্ষার্থীরা তার প্রমাণ আর নতুন করে দেয়ার প্রয়োজন নেই। সবাই আমরা পত্যক্ষ করছি গভীর উদ্বেগের সাথে। কলেজ পর্যায়েও বই পড়া, প্রতিষ্ঠানে গ্রন্থাগার স্থাপন ও সচল রাখার উপর  গুরুত্ব দিতে হবে। শিক্ষার্থীদের যদি আমরা সঠিক জ্ঞানের রাজ্যে নিয়ে যেতে পারি, বই পড়ার মধ্যে ডুবিয়ে রাখতে পারি তাহলে তাদের আত্মা পরিশুদ্ধ হবে, তারা জঙ্গীবাদে জড়াবে না, ইভটিজিং করবে না, মাদকাসক্ত হবে না, হাতে হকিস্টিক আর পিস্তল নিয়ে প্রতিপক্ষকে তাড়া করবে না। বই পড়লে তারা আলোয় উদ্ভাসিত হবে, অন্যায় করবে না। তাদের মনের দিগন্ত প্রসারিত হবে। তাদের পরিচয় করিয়ে দিতে হবে বিশিষ্ট লেখকদের ও মহামানবদের সাথে। আর সেটি সম্ভব তাদেরকে বই পড়ানোর মাধ্যমে। বই পড়লেই তারা দেশ গড়তে পারবে, দেশকে ভালোবাসতে শিখবে। প্রথম জাতীয় গ্রন্থাগার দিবসের শ্লোগান ‘বই পড়ি, স্বদেশ গড়ি’ সার্থক হোক। দ্বিতীয় জাতীয় গ্রন্থাগার দিবস উপলক্ষে আমরা শপথ নিই- আমরা বই পড়ে দেশ গড়ব, বই পড়ে জীবন পাল্টাবো এবং বই পড়ে সমাজ পাল্টাবো।

লেখক: ব্র্যাক শিক্ষা কর্মসূচিতে কর্মরত




রাইজিংবিডি/ঢাকা/৫ ফেব্রুয়ারি ২০১৯/তারা

Walton Laptop
 
     
Marcel
Walton AC