ঢাকা, বুধবার, ৮ ফাল্গুন ১৪২৫, ২০ ফেব্রুয়ারি ২০১৯
Risingbd
সর্বশেষ:

কল্পনাতীত এক সমাজচিত্র

জাফর সোহেল : রাইজিংবিডি ডট কম
 
     
প্রকাশ: ২০১৯-০২-০৯ ৪:১৯:০৮ পিএম     ||     আপডেট: ২০১৯-০২-০৯ ৪:৩৩:৩২ পিএম

জাফর সোহেল: একটি জাতীয় দৈনিকের অনলাইন ভার্সনে গত ৭ ফেব্রুয়ারি সংবাদের শিরোনাম দেখে চমকে গেলাম! সংবাদটি পড়ে জানলাম- মসজিদের বয়স্ক এক ইমাম আরবি পড়ানোর নাম করে ডেকে নিয়ে কিশোরীকে ধর্ষণ করেছেন! সেই কিশোরী এখন অন্তঃসত্ত্বা। পুলিশ ইমামকে গ্রেপ্তার করেছে। ইমাম তার অপকর্ম স্বীকার করেছেন। মনে মনে স্বস্তি পেলাম এই ভেবে যে, ইমাম তার অপরাধ স্বীকার করেছেন। কিন্তু অন্তঃসত্ত্বা সেই কিশোরীর কী হবে? সে নিজেই তো এখনও অনেক ছোট। এই ছোট দেহে আরেকটি দেহ নিয়ে সে এখন কী করবে? এই অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতি তার মনোজগতে অবশ্যই নেতিবাচক পরিবর্তন ঘটাবে। অথচ এ জন্য তাকে মোটেই দায়ী করা যাবে না।

এর আগের দিন বুধবার রাতে সহকর্মী রিপোর্টার আরেকটি সংবাদ শোনালেন; এটিও কিশোরী ধর্ষণের ঘটনা। ঘটেছে ঢাকাতেই। শুনলাম, স্ত্রীকে তালাক দিয়ে কিশোরী মেয়েকে নিজের কাছে রেখে দেন বাবা। সেই তালাকপ্রাপ্ত স্ত্রী থানায় অভিযোগ করেছেন- মেয়েকে তার স্বামী নিজের কাছে রেখে ধর্ষণ করেছে। অর্থাৎ বাবা মেয়েকে ধর্ষণ করেছে। এই খবর পরদিন কম-বেশি প্রতিটি গণমাধ্যমেই প্রকাশিত হয়েছে। এখানেই শেষ নয়। রংপুরে কিন্ডার গার্টেনের প্রধান শিক্ষক ক্লাস শেষে প্রাথমিকের এক শিশু শিক্ষার্থীকে যৌন নির্যাতন করেছেন। এ খবরও পড়তে হলো। আশার কথা লোকজন তাকে জুতাপেটা করে পুলিশের হাতে তুলে দিয়েছে।

পাঠক, অনুভূতি ভোঁতা হয়ে যাওয়া সব সংবাদ। গা শিউরে ওঠে! কী এক ভয়াবহ, মানসিক বিকারগ্রস্ত সমাজে বাস করছি আমরা। জগতে পাপ-পুণ্য থাকবে, তাই বলে একটা সীমারেখা থাকবে না। এমন ঘটনা অতীতে কখনো শুনেছি বলে মনে হয় না। শিক্ষক শিশু শিক্ষার্থীর দিকে, বয়োজ্যেষ্ঠ ইমাম নাবালিকা মেয়ের দিকে, এমনকি পিতা কন্যার দিকে লোলুপ দৃষ্টি দেবেন- এ যেন কল্পনাতীত এক অসভ্য সমাজের চিত্র। কিন্তু নির্মম বাস্তবতা হলো, এগুলো এড়িয়ে যাওয়ারও উপায় নেই। আমাদের সমাজ, আমাদের একান্ত নিজেদের সমাজেই এসব ঘটনা ঘটছে। কেন ঘটছে এসব ঘটনা, কেন এত বেশি বেশি ঘটছে? সাদা চোখে কেউ হয়ত বলতে পারেন- এসব বিচ্ছিন্ন ঘটনা। এগুলো যার যার ব্যক্তিগত চারিত্রিক দুর্বলতা। কিন্তু একটু কি ভেবে দেখা দরকার নয়? বাংলাদেশের সমাজ ব্যবস্থা তো এমন ছিল না। বাবা কখনও নিজের মেয়ের সামনে ধর্ষকরূপে কখনো হাজির হয়নি। শিশুকে নিপীড়ন করেনি এ সমাজের শিক্ষক। তাহলে এখন কেন হচ্ছে? রাষ্ট্র ও সমাজে এমন কী হয়ে গেল আমাদের সকলের অগোচরে, যে  কারণে সমাজ তার স্বাভাবিক রূপ বদলে ফেলছে?

প্রশ্নের পর প্রশ্ন জাগে মনে, কিন্তু উত্তর কই? ভেবে কূল পাই না! গত জানুয়ারির হিসাবের খাতা বলছে, ধর্ষণ হয়েছে সত্তরেরও বেশি! এরমধ্যে মেরে ফেলা হয়েছে অনেককে। অঙ্ক বলে, এদেশে দিন যত যাবে, ধর্ষণ বাড়বে; আমরা কোন মতেই এ আপদ দমিয়ে রাখতে পারব না। আসলেই কি পারব না? তাহলে কী হবে এইদেশে? কী রূপ নেবে এই সমাজ ও রাষ্ট্র? সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে সাধারণ মানুষের উদ্বেগ-আকুল ভাষাগুলো পড়ে সত্যিই অসহায় বোধ করি। আমাদের এই দেশটি অনেক দামে কেনা। আমরা উন্নতির চরম শিখরে আরোহনের পণ করেছি; আমরা প্রবৃদ্ধি বৃদ্ধির যুদ্ধে নেমেছি কোমর বেঁধে; আমাদের অনেক দূর যেতে হবে। আমি স্বীকার করি উন্নয়নের বিকল্প নেই। সেদিক দিয়ে আমরা সঠিক পথেই চলেছি। কিন্তু পাশাপাশি আমাদের একটি সুন্দর সমাজও প্রয়োজন। এজন্য আমাদের তাড়া কই? আমরা কি তবে আদর্শ শব্দের সঙ্গে আপস করে ফেলেছি?

শুরুর সংবাদে যাই। ওই নিউজ পোর্টালের খবরের প্রতিক্রিয়ায় একজন পাঠক লিখেছেন: ‘হারকিউলিসকে ডেকে আনতে হবে’! সেই পাঠক নিশ্চয়ই এই সমাজেরই কেউ। তার উপলব্ধি আমাকে ভীষণ ভাবনায় ফেলে দিয়েছে। কেবল তিনি নন, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমেও অনেককেই দেখেছি কয়েক দিন ধরে হারকিউলিসের হস্তক্ষেপ প্রত্যাশা করছেন! প্রশ্ন হলো কে এই হারকিউলিস? বাংলাদেশের ধর্ষণকামী জনতাকে কি হারকিউলিস পবিত্র করে দেবে? নতুন তর্ক সমাজে প্রবেশ করেছে। কেউ বলছেন, হারকিউলিসকেই দরকার ধর্ষক ও দুর্বৃত্ত দমনে। কেউ বলছেন, না এভাবে নতুন বিপদ দেখা দেবে। কারণ আইন নিজের হাতে তুলে নেয়াটাও অপরাধ। একটা অপরাধ দমন করতে আরেকটি অপরাধ করা অন্যায়।

যাই হোক, আমরা হারকিউলিসের ইতিহাসে ফিরে তাকাই। তিনি ছিলেন প্রাচীন গ্রিক পুরাণের এক চরিত্র। যিনি সমাজপতিদের কু-কর্ম থেকে, অন্যায় অবিচার থেকে জনগণকে রক্ষা করতে অভিযানে নামেন। এবং বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই সফল হন। বাংলাদেশেও হারকিউলিসের আবির্ভাব ঘটেছে! তিনি এদেশের দুশ্চরিত্র ধর্ষকদের মেরে ফেলার পণ করেছেন। এতে আমি যথেষ্ট অবাক এবং ক্ষুব্ধ হয়েছি। কারণ হারকিউলিসের আবির্ভাব এবং তার কারণে ধর্ষকরা আর রেহাই পাবে না- এই ভাবনা হাস্যকর। অথচ এই দৃষ্টিভঙ্গি অনেকের মধ্যেই দেখা যাচ্ছে। এর আরেকটি কারণ হতে পারে, বিচার ব্যবস্থার প্রতি মানুষের অনাস্থা। সুতরাং হারকিউলিস এসেছে বলে যেমন ধর্ষণ কমে যাবে না, তেমনি হারকিউলিস দমন করলেও বিচার ব্যবস্থার প্রতি মানুষের আস্থা ফিরে আসবে না। দরকার হলো, হারকিউলিস যেন গ্রিক পুরাণ থেকে ইটভাটায় না নেমে আসে সেজন্য পদক্ষেপ নেয়া।  সেজন্য সবার আগে রাষ্ট্রকে তার নাগরিকদের চারিত্রিক উন্নতির প্রতি গুরুত্বারোপ করতে হবে। বাড়াতে হবে সামাজিক সচেতনতা। বদলাতে হবে দৃষ্টিভঙ্গি। আইন ও বিচার ব্যবস্থার প্রতি মানুষের অনাস্থা দূর করার জরুরি প্রয়াস নিতে হবে। তাহলেই কেবল সমাজে অপরাধ কমবে, ধর্ষণ ও হত্যা কমবে। এর বিকল্প নেই। মনে রাখতে হবে হারকিউলিস কোনো সমাধান নয়।

লেখক: সাংবাদিক

 

 

রাইজিংবিডি/ঢাকা/৯ ফেব্রুয়ারি ২০১৯/তারা

Walton Laptop
 
     
Marcel
Walton AC