ঢাকা, শুক্রবার, ৯ অগ্রহায়ণ ১৪২৪, ২৪ নভেম্বর ২০১৭
Risingbd
সর্বশেষ:

আবুল কালামের মধু ভারত ও জাপানে রপ্তানি

মুহাম্মদ নূরুজ্জামান : রাইজিংবিডি ডট কম
 
   
প্রকাশ: ২০১৭-০৩-১৭ ৭:৫৮:৩৭ পিএম     ||     আপডেট: ২০১৭-০৩-১৭ ৭:৫৮:৩৭ পিএম
সরিষাখেত থেকে সংগৃহীত বাক্সবন্দি মৌচাকের সামনে আবুল কালাম

মুহাম্মদ নূরুজ্জামান, খুলনা : খুলনার ফুলতলা উপজেলার দামোদর গ্রামের আবুল কালাম সরদারের উৎপাদিত মধু দেশের সীমানা পেরিয়ে ভারত ও জাপানে রপ্তানি হচ্ছে।

প্রতি মৌসুমে তিনি প্রায় ২০০ মণ মধু উৎপাদন করে বছরে প্রায় ৭ লাখ টাকা আয় করছেন। আধুনিক প্রযুক্তিতে মৌমাছি পালন ও মধু উৎপাদন করে স্বাবলম্বী হয়েছেন তিনি। শুধু নিজেই নন, গ্রামের অন্যদেরকেও স্বাবলম্বী করতে নিজ উদ্যোগে গড়ে তুলেছেন ‘খুলনা মৌচাষি কল্যাণ সমবায় সমিতি লিমিটেড’।

১৯৮৩ সালে এসএসসি পরীক্ষা দিয়ে ফুলতলা উপজেলার দামোদর গ্রামের মৃত আকাম সরদারের ছেলে আবুল কালাম সরদার বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুঠির শিল্প করপোরেশনের (বিসিক)  আওতায় মৌচাষ (মৌমাছি পালন ও মধুবিষয়ক উৎপাদন)  দুই মাসের প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেন। প্রশিক্ষণ শেষে তাকে মৌমাছিসহ একটি বাক্স প্রদান করা হয়।

এদিকে আর্থিক অস্বচ্ছলতার কারণে বাবার ছোট্ট মুদি দোকানে তাকে সময় দিতে হয়। ফলে তার লেখাপড়া বন্ধ হয়ে যায়। ২০০২ সালে তিনি বিসিক থেকে ২৮ হাজার টাকা দিয়ে ১১টি বাক্স অর্থাৎ ৩৩টি ফ্রেম মৌমাছিসহ কেনেন। প্রথম বছর মধু মৌসুমে তার ৬০ হাজার টাকা লাভ হয়। পরের বছর আরো ৩৫টি বাক্স তৈরি করে মৌমাছি পালন ও মধু উৎপাদনে নেমে পড়েন। সেবারও লাভের পরিমাণ ছিল লক্ষাধিক টাকা। এভাবে পর্যায়ক্রমে ২৫০ বাক্সে ফ্রেম সংখ্যা দাঁড়িয়েছে আড়াই হাজারে।  বার্ষিক মধু উৎপাদনের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ২০০ মণ।

আবুল কালাম সরদার জানান, মধু মৌসুম শুরু ডিসেম্বর মাসে, চলে এপ্রিল মাস পর্যন্ত। বিভিন্ন ফুলের মৌসুম বিভিন্ন সময়ে ও স্থান থেকে সংগ্রহ করতে হয়। সরিষা ফুলের মৌসুম ডিসেম্বর থেকে জানুয়ারি। এটি পাওয়া যায় সিরাজগঞ্জ, টাঙ্গাইল, মানিকগঞ্জ, জামালপুর ও কুড়িগ্রামে। ধনিয়া ফুলের মধু সংগ্রহ করতে হয় জানুয়ারি ও ফেব্রুয়ারিতে। কালোজিরা ফুলের মধু ফেব্রুয়ারি ও মার্চ মাসে শরীয়তপুর, ফরিদপুর, ও রাজবাড়ী থেকে সংগ্রহ করতে হয়। লিচু ফুল শুরু হয় মার্চ মাসে।এ সময় ঢাকা, গাজীপুর, পাবনা, নাটোর, দিনাজপুর ও যশোর থাকতে হয়। মার্চ মাসের শেষ থেকে এপ্রিলের শেষ পর্যন্ত সুন্দরবন সাতক্ষীরা রেঞ্জের শ্যামনগর, বুড়িগোয়ালিনি থেকে গোলাখালি পর্যন্ত খোলপেটুয়া নদীর এপারে মৌমাছির বাক্স রেখে অবস্থান করতে হয়।

 


সুন্দরবনকেন্দ্রিক পর্যায়ক্রমে খলিসা ফুল, গরাণ, কেওড়া ও বাইন ফুল থেকে মধু সংগ্রহ হয়ে থাকে। তবে সেপ্টেম্বর ও অক্টোবর মাসে সাতক্ষীরা এলাকায় বরই ফুল থেকে কিছু মধু সংগৃহীত হয়। বছরের বাকি ৬ মাস মৌমাছিকে তোলা খাবার হিসেবে চিনি ও মিছরির রস খাইয়ে বাঁচিয়ে রাখতে হয়। গত বছরে ৫০ মণ চিনি ও মিছরি কিনতে হয়েছিল। সেটিও মৌমাছির খাদ্য। এ সময় নারায়ণগঞ্জ, মুন্সীগঞ্জ ও কুমিল্লা এলাকায় বিভিন্ন ধরনের সবজি ও ধনিয়া ফুল থেকে কিছু মধু সংগ্রহ করেন।

আবুল কালাম বলেন, বিভিন্ন মৌসুমে বিভিন্ন ফুল থেকে সংগ্রহকৃত মধুর রং ও  স্বাদে ভিন্নতা রয়েছে। ফলে দামও ভিন্ন। সলিড মধু নামে তার প্রতিষ্ঠানে সরিষা ফুলের মধুর খুচরা মূল্য কেজিপ্রতি ২০০ টাকা, লিচু ফুলের ২৫০ টাকা, সুন্দরবনের মধু ৩০০ টাকা, ধনিয়া ফুলের ২০০ টাকা, কালোজিরা ৫০০ টাকা, বরই ফুল ২০০ টাকা।

পাইকারি গড়ে বিক্রি মূল্য কেজিপ্রতি ২০০ টাকা। গত মৌসুমে তার উৎপাদিত ২০০ মণ মধুর গড় ২৫০ টাকা কেজি হিসেবে পাইকারি মূল্য ছিল প্রায় ২০ লাখ টাকা। এর মধ্যে ৬ জন কর্মচারীর বেতন, ভরণ-পোষণ বাবদ ৭ লাখ ২০ হাজার টাকা, পরিবহন বাবদ খরচ ২ লাখ টাকা এবং খাবারসহ মৌমাছি পালন ৩ লাখ টাকা, স্থানের জন্য ১ লাখ টাকা ও আয়কর প্রদানসহ খরচ পড়ে ১৩ লাখ ২০ হাজার টাকা। ফলে তার নিট মুনাফা ছিল ৬ লাখ ৮০ হাজার টাকা।

তিনি জানান, তার উৎপাদিত মধু দেশীয় বাজারের চাহিদা মিটিয়ে এখন দেশের বাইরেও রপ্তানি হচ্ছে। ভারত গত বছর বাংলাদেশ থেকে ২০০ টন এবং জাপান ৩০০ টন অপরিশোধিত মধু আমদানি করেছে। এই মধুর মধ্যে তার উৎপাদিত মধুও রয়েছে। তবে দেশে আধুনিক প্রযুক্তিতে প্রক্রিয়াজাতকরণ, প্যাকেজিং ও সুষ্ঠু বাজারজাতের ব্যবস্থা না থাকায় স্বল্পমূল্যে বিদেশে মধু রপ্তানি করতে হয়।

মৌচাষি আবুল কালাম সরদার বলেন, তিনি নিজে স্বাবলম্বী হয়ে অন্যদেরকেও স্বাবলম্বী করতে নিজ উদ্যোগে গড়ে তুলেছেন ‘খুলনা মৌচাষি কল্যাণ সমবায় সমিতি লিমিটেড’ নামে রেজিস্ট্রেশনকৃত একটি সমিতি। নারী ও পুরুষ মিলিয়ে ৩৫ সদস্যের প্রত্যেকের রয়েছে স্বল্প পরিসরে মৌচাষ। আবুল কালাম নিজেই তাদেরকে মৌমাছি পালন, মধু উৎপাদন ও বাজারজাতকরণের সব কলাকৌশল হাতে কলমে শিখিয়েছেন।

 

 

রাইজিংবিডি/খুলনা/১৭ মার্চ ২০১৭/মুহাম্মদ নূরুজ্জামান/রিশিত

Walton
 
   
Marcel