ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ১০ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৫, ২৪ মে ২০১৮
Risingbd
সর্বশেষ:

‘পথের পাঠশালা’

সৌরভ পাটোয়ারী : রাইজিংবিডি ডট কম
 
   
প্রকাশ: ২০১৮-০২-০১ ৩:২৮:২৭ পিএম     ||     আপডেট: ২০১৮-০৫-০১ ৪:২৬:৩৭ পিএম

ফেনী সংবাদদাতা : পথের পাঠশালা। যেমন নাম তেমনই কার্যক্রম।পথের শিশুদের শিক্ষা উপযোগী করে গড়ে তুলতেই এই পাঠশালার জন্ম।

উদ্যোক্তারা সবই তরুণ।যারা নিজেরাই শিক্ষার্থী। পড়াশোনা করছে ফেনী সরকারী কলেজে।সম্পূর্ণ তারুণ্যভরা ভাবনারই ফসল এই প্রাকপ্রাথমিক শিক্ষার আয়োজন।

পথশিশুদের জন্য কিছু করার কথা ভাবছিল এই তরুণরা। একসময় মাথায় এলো- এমন একটা পাঠশালার। যেখানে পথশিশুরা পড়বে, লিখবে। আর এ স্কুল থেকে প্রাক প্রাথমিক শিক্ষা লাভ করে ভর্তি হবে সাধারণ স্কুলে। যেই ভাবা, সেই কাজ। একসময় শুরু হয়ে গেল পথশিশুদের জন্য স্কুল ‘পথের পাঠশালা’।

‘পথের পাঠশালা’ নামে সংগঠনের মাধ্যমে তরুণরা এই পাঠশালা চালাচ্ছেন। অন্যতম উদ্যোক্তা ও সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক ফখরুল ইসলাম ফাহাদ জানালেন, ২০১৬ সালের ডিসেম্বরে তারা বিষয়টি ভাবলেও ২০১৭ সালের জানুয়ারিতে এর আনুষ্ঠানিক কার্যক্রম শুরু হয়। ছিন্নমূল পথশিশুদের পড়ানোর মধ্য দিয়ে যাত্রা শুরু। প্রথমে ৭ জন শিশুকে নিয়ে শুরু করা হলেও পরে তা ৫৫ জনে উন্নীত হয়। এখন গড়ে ৩২ থেকে ৩৫ শিশু নিয়মিত ক্লাশ করছে। এসব শিক্ষার্থীরা পরিবারকে সহায়তা করেই তারপর পাঠশালায় আসে।

 


ফাহাদ জানান, ‘পথের পাঠশালা’র পড়ুয়াদের প্রায় সকলেই সমাজের সুবিধাবঞ্চিত শিশু। এদের পরিবারের পড়াশোনা করানোর সামর্থ্য নেই। এর আগে অনেকেই এখানে-ওখানে ভিক্ষা করে বেড়াতো। এরা ফেনী শহরের বিরিঞ্চি, রেলওয়ে ষ্টেশন এলাকা, সহদেবপুরসহ বিভিন্ন বস্তি এলাকার অধিবাসী, শ্রমজীবিদের সন্তানরাই এখানে পড়ছে। এদের বাড়ি খুলনা, বাগেরহাট, লক্ষীপুর, কুমিল্লার লাঙ্গলকোট এলাকায়। কর্মের সুবাদে ফেনীতে এরা বসবাস করছে।

সংগঠনের সভাপতি মোর্শেদা আক্তার হ্যাপি বলেন, ‘শুরুতে আমরা বিভিন্ন বস্তি এলাকা ঘুরে ছাত্র সংগ্রহ করি। শুরুর দিকে অনেকে আগ্রহ দেখাননি। কিন্তু পরে আস্তে আস্তে শিক্ষার্থীর সংখ্যা বাড়তে থাকে। সংগঠনের সদস্যরা পালা করে এদের পড়াচ্ছেন এবং মাঝে মাঝে ওদের নানা শিক্ষা উপকরণও দেওয়া হচ্ছে।’

হ্যাপি জানান, এ পর্যন্ত পাঠশালার শিক্ষার্থীদের মধ্যে ১০ জনকে বিভিন্ন সরকারি প্রাইমারি স্কুলে ভর্তির সুযোগ করে দেওয়া হয়েছে।

হ্যাপি জানান, প্রথমে ‘পথের পাঠশালা’র শ্রেণী কার্যক্রম ফেনী সরকারী কলেজ ক্যাম্পাসে শুরু হলেও পরে তা স্থানান্তর করে পূর্ব পাশের কবি নবীন চন্দ্র সেন পাবলিক লাইব্রেরির সামনে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানেও  সমস্যা দেখা দেওয়ায় রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটির পুরাতন অস্থায়ী কার্যালয়ের বারান্দা বেছে নেওয়া হয়। পরে আবার চলে যেতে হয় পাবলিক লাইব্রেরির আঙিনায়। এভাবে এখানে-ওখানে অস্থায়ীভাবে চলছে স্কুল কার্যক্রম।

১১ সদস্যের কার্যকরী কমিটির মাধ্যমে সংগঠনটির কর্মকান্ড পরিচালিত হচ্ছে। এর সভাপতি হিসেবে আছেন মোর্শেদা আক্তার হ্যাপী, সিনিয়র সহ সভাপতি সৈকত চৌধুরি, সহ সভাপতি নুর নবী হাসান, সাধারণ সম্পাদক ফখরুল ইসলাম ফাহাদ, যুগ্ম সম্পাদক ফয়সাল ইসলাম রাহাত, সাংগঠনিক সম্পাদক মেহেরুল ইসলাম অনিক, প্রচার সম্পাদক শুভ নাথ, সাংস্কৃতিক সম্পাদক আদিবা তাবাসসুম, মহিলা বিষয়ক সম্পাদক মাহবুবা তাবাসসুম, দপ্তর সম্পাদক আব্দুস সোবহান রনি, শিক্ষা বিষয়ক সম্পাদক সানজিদা শহিদ, ক্রীড়া বিষয়ক সম্পাদক বেনজীর তাবাসসুম, ধর্ম বিষয়ক সম্পাদক মুসা পারভেজ, কোষাধ্যক্ষ তোফায়েল আহমেদ মিতুল ও সদস্য হিসেবে দীপ্ত পাল, জেরিন মাহমুদ, মো. রবিন ও আজহার কাজ করছেন। উপদেষ্টা হিসেবে আছেন সংগঠক ও ব্যাবসায়ী ইমন উল হক।

 


নিজেদের সন্তানরা ভিক্ষা ছেড়ে পড়াশোনার সুযোগ পাওয়ায় খুশি তাদের বাবা-মায়েরা। আবার মাঝে মাঝে কিছু দরকারী সামগ্রী উপহার পাওয়ায় ‘পথের পাঠশালা’র প্রতি কৃতজ্ঞও তারা। শিক্ষার্থী সাহিদুল এর বাবা শাহিন মিয়া বলেন, ‘আমাগো হোলা আগে মাইনছের (মানুষের) কাছে  টেয়া (টাকা) চাইতো, আপনাগো স্কুলে (পথের পাঠশালায়) যাইয়া অনেক কিছু জানে, হেতেরে হেতেরা স্কুলেও ভর্তি করি দিছে। আবার বই খাতাও কিনি দিছে।’

পাঠশালার শিক্ষার্থী ফাতেমার বাবা আব্দুর রশিদ বলেন, ‘আঁই টেয়ারলাই (টাকার জন্য) মাইয়ারে হড়ালেহা (পড়া-লিখা) করাইতাম হারিনা,  হিতির মা মাইনছের বাড়িতে কাজ করে। আঁই রিক্সা চালাই, কোনো মতে ভাত দুগা খাই, হেতেরা আঁর (আমার) মাইয়ারে স্কুলে ভর্তি করি দিছে।’

সামি আক্তারের বাবা মমিনুল হক বলেন, ‘আমি ঠিয়া কাম (যখন যা পাই, সেই কাজ) করি। আনগো সামিরে হেতেরা স্কুলে ভর্তি করাই দিছে, বই খাতা কলম আবার নতুন জামাও দিছে।’

 

 

রাইজিংবিডি/ফেনী/১ ফেব্রুয়ারি ২০১৮/সৌরভ পাটোয়ারী/টিপু

Walton Laptop
 
   
Walton AC