ঢাকা, সোমবার, ৩ পৌষ ১৪২৫, ১৭ ডিসেম্বর ২০১৮
Risingbd
সর্বশেষ:
ডিজিটাল উপকূল-৩

প্রান্তিকের মানুষ সংবাদ পেতে ঝুঁকছেন অনলাইনে

রফিকুল ইসলাম মন্টু : রাইজিংবিডি ডট কম
 
     
প্রকাশ: ২০১৮-০৪-১৮ ৪:১৪:২৭ পিএম     ||     আপডেট: ২০১৮-০৫-০১ ৪:২৩:৫৭ পিএম

উপকূলের প্রান্তিকে লেগেছে তথ্যপ্রযুক্তির ছোঁয়া। জীবনধারায় এসেছে পরিবর্তন। শিক্ষা, ব্যবসা-বাণিজ্য, কৃষি জীবনযাত্রার সকল ক্ষেত্রেই প্রযুক্তির ঢেউ। দ্বীপ-চরের মানুষও কেন্দ্রের সঙ্গে যুক্ত সার্বক্ষণিক। খবরাখবর আদান প্রদানের মধ্যদিয়ে কমে এসেছে দুর্যোগের ঝুঁকি। প্রান্তিকের গ্রামের কৃষকেরা জেলা-উপজেলা কিংবা রাজধানীর বাজার যাচাই করে ন্যায্যমূল্যে পণ্য বিক্রির সুযোগ পাচ্ছেন। তথ্যপ্রযুক্তির সঙ্গে সম্পৃক্ত হয়ে যুবক-তরুণেরা জীবিকার পথ খুঁজে নিচ্ছেন। বিষয়গুলো নিয়ে ধারাবাহিক প্রতিবেদনের আজ প্রকাশিত হলো তৃতীয় পর্ব। উপকূলের প্রান্তিক জনপদ ঘুরে লিখেছেন রফিকুল ইসলাম মন্টু

চাষাবাদের ফাঁকে শেষ খবরটা জানতে ইচ্ছা করলে মোবাইলে বাটন টিপে অনলাইনে চোখ বুলিয়ে নেন চরফ্যাসনের কুকরীমুকরীর চাষি আবদুর রহমান। বললেন, খবর জানতে অনলাইন দেখি। অনলাইনেই সবার খবর পৌঁছায় আমাদের কাছে। বাজেটে চাষির ভাগ্যে কী জুটেছে, ঝড়ের গতিবেগ কোনদিকে ধাবিত হচ্ছে- এমনসব তথ্য এখন এই চাষির হাতের মুঠোয়।

আবদুর রহমানের মত আরও বহু চাষি-জেলের দেখা মেলে উপকূলের বিচ্ছিন্ন জনপদে, যারা অনলাইনে ভরসা রাখেন। মোবাইল থেকে অনলাইনে গিয়ে শেষ খবরটা জেনে নেন। এইসব মানুষেরা বলছিলেন, তথ্য তাদের জীবন কিছুটা হলেও সাচ্ছন্দ্যময় করে তুলেছে।

উপকূলের বিচ্ছিন্ন অনেক এলাকায় খবরের কাগজ পাওয়া ভাগ্য নির্ভর, তাই তথ্য আদান-প্রদানে একমাত্র ভরসা অনলাইন সংবাদমাধ্যম। ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী থেকে শুরু করে ফসলের ক্ষেতে কর্মরত চাষি প্রায় সবাই অনলাইনে জেনে নেন সর্বশেষ সংবাদ। নিত্যকার হাজার কাজের ভিড়ে হাতে হাতে তাই দেখা যায় মোবাইল ইন্টারনেট। দেশের সর্বদক্ষিণে পটুয়াখালী জেলার রাঙ্গাবালী উপজেলার দ্বীপ ইউনিয়ন চরমোন্তাজের চিত্রটাও এমন। রাজধানী ঢাকা থেকে নদীপথে প্রায় চব্বিশ ঘন্টারও বেশি সময়ের দূরত্বের এই এলাকার মানুষের খবরের কাগজ দেখা ভাগ্যের ব্যাপার। বরিশাল হয়ে এখানে কিছু জাতীয় ও স্থানীয় সংবাদপত্র এলে তা নিয়মিত নয়। ফলে পাঠক সংবাদপত্রের ওপর ভরসা রাখতে পারেন না। তাই বলে এখানকার মানুষ তথ্য শূন্যতায় থাকেন না। মোবাইল ইন্টারনেটের সুবাদে সাগরপাড়ের গ্রামের মানুষের কাছেও ইন্টারনেট সুবিধা রয়েছে।

রাঙ্গাবালী ইউনিয়নের বাইলাবুনিয়ার বাসিন্দা মো. মহিউদ্দিন বলছিলেন, এই প্রত্যন্ত গ্রামেও বিশ্বের খবর পৌঁছে যায় মুহূর্তের মধ্যে। মাঠে চাষিরাও মোবাইলে ইন্টারনেট ব্যবহার করে। অনেক সময় তাদের কাছ থেকেও শেষ খবরটা পাই। এই গ্রামে খবরের কাগজ পাওয়া ভাগ্যের ব্যাপার।



চায়ের দোকানে স্মার্ট মোবাইলে খবর দেখার আড্ডা জমে সকালে-দুপুর-বিকালে। একজন খবর খুলে বসলে পাশের জনের চোখ যায় সেদিকে। তাদের দেখাদেখি এসে ভিড় জমান আরও কয়েকজন। একজনে খবর পড়ছেন, অন্যরা শুনছেন। এমন দৃশ্য চোখে পড়ে উপকূলের বিভিন্ন হাটেবাজারে। যেন গ্রামের হাটে কান পাতলেই সব খবর পাওয়া যায়। আর সে খবর আসে তথ্যপ্রযুক্তির মাধ্যমে। আগে যেটা দ্বীপাঞ্চলের মানুষজন একেবারেই কল্পনা করতে পারতেন না। সরেজমিনে গিয়ে ভোলার চরফ্যাসনের ঢালচরে। চায়ের দোকান, হোটেল, রেষ্টুরেন্টে নানামূখী সংবাদ নিয়ে আলোচনার ঝড়। আলোচনায় বিভিন্ন শ্রেণী-পেশার মানুষ। আবদুস সালাম হাওলাদার বাজারে জান্টু মিয়ার হোটেলে বেশ কয়েকজন চাষি-জেলে-মজুরের আড্ডা হচ্ছিল। আলোচনার বিষয়বস্তু অনলাইনে প্রকাশিত সংবাদ। কি আছে আজকের সংবাদে? জেনে নিচ্ছেন একে অপরের কাছ থেকে। কেউ আবার টেলিভিশনের পর্দায় চোখ রাখছেন। ডিশ লাইনের মাধ্যমে এই দ্বীপে এখন সব চ্যানেল দেখা যায়। তবে অনলাইন যে টেলিভিশনের চেয়েও এগিয়ে থাকে; সেটা সবারই জানা।

রাজধানী থেকে বহু দূরে সন্দ্বীপের দ্বীপ ইউনিয়র উড়িরচর। এখানকার হাটবাজারে ভিড় থাকে অধিক রাত পর্যন্ত। রাত জেগে শেষ খবরটা নিয়েই মানুষগুলো বাড়ি ফিরতে চান। গ্রামের বয়োবৃদ্ধ মানুষটি থেকে শুরু করে শিশুকিশোর পর্যন্ত সবার আগ্রহ তথ্য জানার। রাজনীতির গতিপ্রকৃতি কোনদিকে, অর্থনীতির হালচাল কী, প্রধান দুই নেত্রী সর্বশেষ কী বললেন, নির্বাচনের পথে এখনও কী কী বাঁধা আছে- সব খবর চাই তাদের। আলাপে বোঝা গেল তথ্যপ্রযুক্তি এই দ্বীপের মানুষদের তথ্য জানার ক্ষুধা বাড়িয়ে দিয়েছে।

উড়িরচরের বাসিন্দা রবিউল আলম বলেন, ‘সৌর বিদ্যুত আর ইন্টারনেট সুবিধা পৌঁছে যাওয়ায় গ্রামের মানুষ নিত্যপ্রয়োজনীয় সব চাহিদার সঙ্গে তথ্য জানার অধিকারকেও গুরুত্ব দিচ্ছে। আগে তো আমাদের এ সুযোগ ছিল না। আমাদের ভালো থাকা না থাকার সঙ্গে দেশের অবস্থাও জড়িত। তাই সব মানুষই এখন কমবেশি অনলাইন থেকে খবর জানার চেষ্টা করে। তথ্যপ্রযুক্তির কল্যাণে আমাদের জীবন অনেক সহজ হয়ে গেছে।’

লক্ষ্মীপুরের কমলনগরের চরফলকন ইউনিয়ন ডিজিটাল সেন্টারে দেখা গেল ভিন্ন চিত্র। সেন্টারে বসে সংবাদ পড়ে শোনান পাঠকদের। কোন এক আশ্বিনের দুপুরে সেই দৃশ্যই চোখে পড়লো। সংবাদ পাঠের সময় আশপাশে ভিড় জমালো অনেকজন। স্কুলের ছাত্র, চাকরিজীবীসহ গ্রামের শ্রমজীবী মানুষজন শুনছিলেন সে খবর। ল্যাপটপের পর্দায় একসঙ্গে অনেকজনের সংবাদ দেখতে অসুবিধা, তাই প্রোজেক্টরের সংযোগে বড় পর্দায় অনলাইনের সংবাদ দেখানো হয়। এমন দৃশ্য চোখে পড়ে উপকূলের বিভিন্ন এলাকায়। উদ্যোক্তারা জানালেন, ল্যাপটপ কিংবা কম্পিউটারের ছোট পর্দায় সংবাদ পড়তে সমস্যা হয় বলে বড়পর্দায় সংবাদ দেখার এই আয়োজন।

সন্দ্বীপ উপজেলার আইটি-বান্ধব শিক্ষা প্রতিষ্ঠান পূর্বসন্দ্বীপ বহুমূখী মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে দেখা গেলো ক্লাসের ফাঁকে বিদ্যালয়ের ছেলেমেয়েরা বড় পর্দায় সকলে খানিকক্ষণ অনলাইনে নজর রাখছে। শিক্ষার্থীরা জানালেন, তথ্য পাওয়ার এই সুবিধা তাদের জীবনকে অনেকটাই সহজ করে দিয়েছে। নতুন কিছু ভাবার সুযোগ করে দিয়েছে। কমলনগরের চরফলকন ইউনিয়ন ডিজিটাল সেন্টারের উদ্যোক্তা আরিফুর রহমান বলেন, ‘ইন্টারনেটের কল্যাণে গোটা বিশ্বের সঙ্গে সার্বক্ষণিকই সংযুক্ত থাকছে প্রত্যন্তের এই চরফলকন। সব খবরাখবর জানতে পেরে তারা সিদ্ধান্ত নিতে পারছে। বদলে গেছে তাদের জীবনধারা। বড়পর্দায় সংবাদ দেখে তারা সহজে বুঝতে পারছে অনেক কিছু।’

উপকূলের বিভিন্ন এলাকার পাঠকেরা বলছিলেন, অনলাইনের প্রসারে স্থানীয় খবরে তাদের আগ্রহ বেড়েছে। অনলাইনে নিজের এলাকার খবরটা দেখতেই তারা বেশি পছন্দ করেন। এলাকার কোনো খবর অনলাইনে দেখতে পেলে এলাকার পাঠকদের মাঝে ব্যাপক আলোচনা হয়। তারা অপেক্ষা করেন এলাকার আরও একটি খবর দেখার জন্য। পাঠকদের আড্ডায় কান পেতে শোনা গেলো, কেউ মোবাইলে দেখে আলোচনা করছে, কেউবা দেখছে কম্পিউটারে। সংবাদ পাঠক আবু হোসেন বলেন, ‘এই বিচ্ছিন্ন জনপদে সংবাদপত্র নিয়মিত পাওয়া যায় না। কিন্তু ইন্টারনেটের সুবাদে অনলাইন এখন আমাদের হাতের কাছে। সংবাদ সাইটগুলো থেকে আমরা খবর পাই। এসব খবর জনমত গঠনে বিশেষ সহায়ক হচ্ছে। মানুষ সচেতন হচ্ছে। ফলে পিছিয়ে পড়া এই জনপদ সামনের দিকে অগ্রসর হচ্ছে।’



দ্বীপ জেলা ভোলায় কর্মরত বাংলানিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম-এর জেলা প্রতিনিধি ছোটন সাহা বলেন, ‘অনলাইনের কল্যাণে সংবাদ প্রচার এবং যথাসময়ে যথাযথ কর্তৃপক্ষের কাছে সংবাদগুলো পৌঁছাচ্ছে। প্রান্তিকের কোন খবরই এখনই আড়ালে থাকছে না। প্রশাসন ব্যবস্থা নিতে পারছে, সাধারণ মানুষও উপকৃত হচ্ছে।’ তিনি আরো বলেন, ‘উপকূলের বিচ্ছিন্ন জনপদে খবরের কাগজ যেতে অনেক সমস্যা। এমনিতেই এসব এলাকায় খবরের কাগজ অনেক কম যেতো। অনলাইন সংবাদমাধ্য্যমগুলোর কারণে পাঠক ঝুঁকছেন অনলাইনে। তারা খবর জানতে এক নজর অনলাইনে চোখ বুলিয়ে নেন। তথ্যপ্রযুক্তির সহজলভ্যতার কারণে তথ্য জানাটাও তাদের জীবনের জন্য অপরিহার্য হয়ে পড়েছে।’

পটুয়াখালীর দ্বীপ ইউনিয়ন চরমোন্তাজের সোনারচর নিউজ ডটকম-এর সম্পাদক আইয়ূব খান বলেন, ‘অনলাইনের কারণে এখানে ঢাকা থেকে আসা সংবাদপত্রের সংখ্যা অনেক কমেছে। অনলাইনের মাধ্যমে পাঠক এখন খবর সহজেই পায়। আর আপডেট তথ্যও পাওয়া যায়। ফলে পরদিন আসা খবরের কাগজ তাদের কাছে অনেকটা বাসি। তথ্যপ্রযুক্তির প্রসার আর স্মার্ট ফোন প্রান্তিকের মানুষদেরও অনেকটা স্মার্ট করেছে।’



রাইজিংবিডি/ঢাকা/১৮ এপ্রিল ২০১৮/তারা

Walton Laptop
 
     
Marcel
Walton AC