ঢাকা, সোমবার, ৩ পৌষ ১৪২৫, ১৭ ডিসেম্বর ২০১৮
Risingbd
সর্বশেষ:
ডিজিটাল উপকূল-৮

তথ্যপ্রযুক্তি হচ্ছে উপকূলের তরুণদের জীবিকার মাধ্যম

রফিকুল ইসলাম মন্টু : রাইজিংবিডি ডট কম
 
     
প্রকাশ: ২০১৮-০৪-২৪ ২:২৪:৪৬ পিএম     ||     আপডেট: ২০১৮-০৪-২৪ ৯:০৪:৩১ পিএম

উপকূলের প্রান্তিকে লেগেছে তথ্যপ্রযুক্তির ছোঁয়া। জীবনধারায় এসেছে পরিবর্তন। শিক্ষা, ব্যবসা-বাণিজ্য, কৃষি জীবনযাত্রার সকল ক্ষেত্রেই প্রযুক্তির ঢেউ। দ্বীপ-চরের মানুষও কেন্দ্রের সঙ্গে যুক্ত সার্বক্ষণিক। খবরাখবর আদান প্রদানের মধ্যদিয়ে কমে এসেছে দুর্যোগের ঝুঁকি। প্রান্তিকের গ্রামের কৃষকেরা জেলা-উপজেলা কিংবা রাজধানীর বাজার যাচাই করে ন্যায্যমূল্যে পণ্য বিক্রির সুযোগ পাচ্ছেন। তথ্যপ্রযুক্তির সঙ্গে সম্পৃক্ত হয়ে যুবক-তরুণেরা জীবিকার পথ খুঁজে নিচ্ছেন। বিষয়গুলো নিয়ে ধারাবাহিক প্রতিবেদনের আজ প্রকাশিত হলো শেষ পর্ব। উপকূলের প্রান্তিক জনপদ ঘুরে লিখেছেন রফিকুল ইসলাম মন্টু

মফিজুল ইসলাম। বয়সে তরুণ। কুড়ি ছুঁয়েছে মাত্র। আর্থিক অনটনে লেখাপড়া এগোয়নি। পঞ্চম শ্রেণী পাস। তারপরও উপকূলের প্রত্যন্ত দ্বীপে কাজের সুযোগ করে নিয়েছে সে। আর এ ব্যাপারে তার অবলম্বন হয়েছে তথ্যপ্রযুক্তি। পটুয়াখালীর দ্বীপ ইউনিয়ন চরমোন্তাজের বাসিন্দা নিতান্তই নিম্ন আয়োর মানুষ সেরাজ ফকিরের ছেলে মফিজুল। জীবিকার তাগিদে লেখাপড়া ছেড়ে কাজের সন্ধানে ঢাকা যাওয়ার উদ্যোগ নিয়েছিল। এজন্য জন্ম নিবন্ধন ফটোকপি করতে গিয়েছিল চরমোন্তাজ ইউনিয়ন ডিজিটাল সেন্টারে (তৎকালীন ইউনিয়ন তথ্যসেবা কেন্দ্র)। কেন্দ্রের পরিচালক আল-মামুনের নজরে এলে মফিজুলকে তথ্যসেবা কেন্দ্রে কাজের জন্য উৎসাহিত করে। সেই থেকে শুরু। তথ্যপ্রযুক্তির কাজে ভর করে মফিজুল তার বাবার সংসার টেনে নিয়ে যাচ্ছে। এখন সে কাজ করছে গলাচিপার বন্যাতলীর একটি কম্পিউটার সেন্টারে।  

দ্বীপে থেকেই তথ্যপ্রযুক্তির মাধ্যমে কাজের সুযোগ করে নিয়েছেন চরমোন্তাজ ইউনিয়ন ডিজিটাল সেন্টারের পরিচালক আল-মামুন। ২০১১ সাল থেকে সেন্টারের দায়িত্ব পান তিনি। সবে এসএসসি পাস করেছিলেন। এরই মধ্যে সুযোগ এসে যায়। ইউনিয়নের কেন্দ্র বলে পরিচিত স্লুইজ বাজারে এই সেন্টারে প্রতিদিন ভিড় করেন বহু মানুষ। বিভিন্ন সেবা পান তারা। শুধু আল মামুন নয়, এখানে কাজ করেন আরও কয়েকজন তরুণ। সবারই জীবিকার অবলম্বন তথ্যপ্রযুক্তি। আল-মামুন বলেন, ‘এসএসসি পাসের পর এলাকায় ছিলাম। লেখাপড়া অব্যাহত রাখার চেষ্টা করছিলাম। ২০১১ সালে ইউনিয়ন ডিজিটাল সেন্টারে কাজের জন্য আমাকে মনোনীত করা হয়। এলাকার বিভিন্ন শ্রেণীর মানুষ আমার কাজে সহযোগিতা করেছে। সেন্টারের পরিসর আগের চেয়ে বেড়েছে। তথ্যপ্রযুক্তি আমার জীবিকার পথ করে দিয়েছে। এই সেন্টারের মাধ্যমে এলাকার আরও বহু যুবক-তরুণ জীবিকার সন্ধান পেয়েছে।’ এভাবেই উপকূলের প্রত্যন্ত এলাকায় জীবিকার পথ দেখাচ্ছে তথ্যপ্রযুক্তি। তথ্য আদান-প্রদান আর সেবামূলক কার্যক্রমে কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হচ্ছে। সামাজিক নেটওয়ার্ক যুবক, তরুণদের কাছেও দ্রুত পৌঁছে যাচ্ছে। ইন্টারনেট প্রতিনিয়তই সহজ করে দিচ্ছে গ্রামের সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রা। একই সঙ্গে দিন দিন বাড়ছে উদ্যোক্তাদের আয়-রোজগার।

সংশ্লিষ্টদের কথা বলে জানা গেছে, পিছিয়ে থাকা এই গ্রামে বিদ্যুত আর ইন্টারনেট সংযোগ গ্রামবাসীকে অনেক এগিয়ে দিয়েছে। খবর জানা থেকে শুরু করে নানা প্রয়োজনে এই কেন্দ্র মানুষকে সহায়তা করছে। সংবাদ জানতে মানুষ এখানে আসেন। খবর ছাড়াও তথ্য ও সেবা কেন্দ্রে কৃষকদের জন্য এখানে কৃষি পরামর্শ দেয়া হয়। ছাত্রছাত্রীদের জন্য পরীক্ষার সময়সূচি, পরীক্ষার ফল, বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি তথ্য জানায় ইউনিয়ন ডিজিটাল সেন্টারে। চাকরিজীবীদের জন্য চাকরির খবর ছাড়াও এখানে নানা ধরনের বাণিজ্যিক সেবা রয়েছে। শুধু ইউনিয়ন ডিজিটাল সেন্টার নয়, এসব সেবা এখন ব্যবসায়িক পর্যায়েও দেওয়া হচ্ছে। আর এর সাথেই যুক্ত হচ্ছে গ্রামের যুবক-তরুণেরা।
 


লক্ষ্মীপুরের রামগতির যুবক মিসু সাহা নিক্কন জীবিকার অবলম্বন হিসেবে বেছে নিয়েছেন তথ্যপ্রযুক্তিকে। বাবা হারাধন সাহার অকাল প্রয়াণে পারিবারিক বোঝা কাঁধে চাপে মিসু সাহার ওপর। এসএসসি পাসের পর থেকেই তথ্যপ্রযুক্তির সাথে সম্পৃক্ত হয়। পর্যায়ক্রমে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান থেকে তথ্যপ্রযুক্তি বিষয়ে প্রশিক্ষণ নেয়; পাশাপাশি লেখাপড়া অব্যাহত রাখে। লেখাপড়া শেষ করে তথ্যপ্রযুক্তির খাতকেই জীবিকার প্রধান অবলম্বন হিসে বেছে নেয় মিসু। তার ছোট প্রতিষ্ঠান এখন ক্রমেই বড় হচ্ছে। রামগতির প্রাণকেন্দ্রে ‘জননী টেলিকম এন্ড ইন্টারনেট সার্ভিস’ নামের প্রতিষ্ঠানটি ২০০৮ সালে গড়ে তোলেন মিসু। একটি বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা থেকে ৪০ হাজার টাকা ঋণ নিয়ে প্রাথমিক কাজ শুরু করেন। পর্যায়ক্রমে প্রতিষ্ঠান বড় হতে থাকে। ছোটবেলা থেকে তথ্যপ্রযুক্তির দিকে ঝোঁক ছিল মিসুর। একই সঙ্গে ঝোঁক ছিল লেখালেখির প্রতি। নিজের চেষ্টা এবং বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান থেকে প্রশিক্ষণ নিয়ে কম্পিউটার বিষয়ে জ্ঞান আহরণ করেন। দশ বছর ধরে এই ব্যবসায়ের উপর ভর করে চলছে মিসুর সংসার। তার প্রতিষ্ঠানে চাকরির তথ্যের জন্য লোকজন আসে, ভিডিও কলিং, সাইবার ক্যাফে, কম্পিউটার প্রশিক্ষণসহ বিভিন্ন ধরণের কাজ হয়। মিসু জানালেন, প্রায় শ’ খানের ছেলেমেয়ে তার প্রতিষ্ঠান থেকে প্রশিক্ষণ পেয়েছেন। এদের মধ্যে অনেকে কাজের সুযোগ করে নিয়েছেন। মিসু তার প্রতিষ্ঠান আরও বড় করতে চান।

তথ্যপ্রযুক্তির প্রতি যুবক, তরুণদের আগ্রহ বেড়ে যাওয়ায় লক্ষ্মীপুরের কমলনগর উপজেলার চরফলকন ইউনিয়ন ডিজিটাল সেন্টার পরিষদের বাইরে উপজেলা সদরের প্রাণকেন্দ্রে সম্প্রসারণ করতে হয়েছে। হাজীরহাটে স্থাপিত সেন্টারের নাম দেওয়া হয়েছে ‘কমলনগর কম্পিউটার ট্রেনিং এন্ড ফলকন ইউনিয়ন ডিজিটাল সেন্টার’। এ সেন্টারে ৩ ও ৬ মাস মেয়াদি স্বল্পমেয়াদি বেসিক প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা রয়েছে। প্রশিক্ষণ ছাড়া অন্যান্য সেবাও যথারীতি পাওয়া যাবে এই কেন্দ্র থেকে। গ্রামের তথ্য কেন্দ্রে যেতে সমস্যা হলে এখান থেকেই ইউনিয়নের বাসিন্দারা সব ধরণের সেবা পাবেন।

চরফলকন ডিজিটাল সেন্টারের পরিচালক মো. আরিফুর রহমান বলেন, ‘মানুষের চাহিদার ওপর ভিত্তি করে কেন্দ্রের কার্যক্রম সম্প্রসারণ করা হয়েছে। নতুন কেন্দ্রে প্রশিক্ষণের মাধ্যমে অনেকে ছেলেমেয়ে তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিষয়ে দক্ষ হয়ে উঠবে। তথ্যপ্রযুক্তি খাতে জীবিকার পথ খুঁজে নিতে এলাকার তরুণদের মাঝে বাড়ছে আগ্রহ। প্রশিক্ষণ গ্রহণ থেকে শুরু করে তারা যুক্ত হচ্ছে নানামূখী কর্মকাণ্ডে। কেন্দ্রের দুটো শাখায় বিভিন্ন স্তরের মানুষজন আসছেন তথ্য জানতে, কিংবা প্রয়োজনীয় কাগজপত্র সংগ্রহ করতে।’

চরফলকন গ্রামের যুবক আরিফুর রহমানের হাত ধরে ২০১০ সাল থেকে এ পর্যন্ত এলাকার চার শতাধিক ছেলেমেয়ে তথ্যপ্রযুক্তির প্রশিক্ষণ নিয়েছে। এদের মধ্যে অনেকেই এই খাতেই জীবিকার পথ বেছে নিয়েছে। কেউ সরকারি বেসরকারি চাকরি পেয়েছে। আবার কেউ কেউ কম্পিউটার সেন্টার খুলে বসেছে। চরফলকন ইউনিয়ন ডিজিটাল সেন্টার থেকে ২০১৪ সালে প্রশিক্ষণ নিয়ে ওয়েবসাইট পর্যন্ত তৈরি করতে পারেন দিদার হোসাইন। এখন ঢাকার একটি প্রতিষ্ঠিত আইটি প্রতিষ্ঠানে কাজ করছে। চরফলকন গ্রামের যুবক প্রশিক্ষণ নিয়ে নিজ গ্রামেই কম্পিউটার প্রশিক্ষণ খুলেছে। তোরাবগঞ্জ গ্রামের তানিয়া আক্তার প্রশিক্ষণ নিয়ে তোরাবগঞ্জ ইউনিয়ন ডিজিটাল সেন্টারে উদ্যোক্তা হিসেবে কাজের সুযোগ পেয়েছেন। গ্রামের যুবক আরিফুর রহমান নিজেও তথ্যপ্রযুক্তির সঙ্গে যুক্ত হয়ে নিজের জীবন বদলে ফেলেছেন। রেখেছেন কৃতিত্বের স্বাক্ষর। মাত্র আট বছরে জেলা পর্যায়ে একবার এবং উপজেলা পর্যায়ে পাঁচবার বর্ষসেরা উদ্যোক্তার পুরস্কার পেয়েছেন। লক্ষ্মীপুর সমাজসেবা কার্যালয় থেকে মাত্র ছয় মাসের কম্পিউটার কোর্স সম্পন্নকারী যুবক আরিফের ডাক পরে ইউনিয়ন ডিজিটাল সেন্টারের দায়িত্ব নিতে। সেন্টারের দায়িত্ব নিয়ে আরিফ নিজেকে আরও সমৃদ্ধ করে। সরকারের বিভিন্ন বিভাগের দেওয়া প্রশিক্ষণ পান। গ্রামীণ পর্যায়ে তথ্যপ্রযুক্তির উদ্যোক্তা হিসাবে আরিফুর রহমানের জীবিকা এখন এই খাত।
 


গ্রামের বান্দিারা বলেন, তথ্যপ্রযুক্তিতে দক্ষ হয়ে গ্রামের বহু যুবক কাজের সুযোগ করে নিয়েছে। গ্রামে থেকেই তারা বেশ ভালো আয় রোজগার করছে। তাছাড়া এক সময় আমরা অন্ধকারে ছিলাম। ঢাকায় কী হচ্ছে কিছুই জানতে পারতাম না। এখন জানতে পারি। রাজনৈতিক উত্তাপ কিংবা অন্য কোন কারণে পরিস্থিতি অশান্ত হয়ে উঠলে ইন্টারনেটের মাধ্যমে পাওয়া খবরেই এখন ভরসা। ইন্টারনেটের কল্যাণে গোটা বিশ্বের সঙ্গে সার্বক্ষণিকই সংযুক্ত থাকছে প্রত্যন্তের এই চরফলকন।

নোয়াখালীর সুবর্ণচরের চরবাটা ইউনিয়ন ডিজিটাল সেন্টারেও যুবক-তরুণদের দেখা মেলে। ইউনিয়নের প্রাণকেন্দ্র খাসেরহাট বাজারে এই সেন্টার। কেন্দ্রটিকে ঘিরে এলাকার যুবক-তরুণদের ব্যাপক সাড়া পড়েছে। কেন্দ্রে এসে ফেইসবুক একাউন্ট করে ইন্টারনেট সংযোগের মাধ্যমে তারা তথ্যপ্রযুক্তি বিষয়ক কাজের সঙ্গে সম্পৃক্ত হচ্ছে। এই খাতের অভিজ্ঞতা অর্জনের জন্য নিয়মিত কেন্দ্রে আসছে অনেকে। গ্রামের যুবক-তরুণেরা বিষয়টিকে দেখছে রোজগার কিংবা জীবিকার অবলম্বন হিসেবে। সূত্র বলছে, উপকূলের অধিকাংশ স্থানে ইউনিয়ন ডিজিটাল সেন্টারের সঙ্গে কারিগরি শিক্ষাবোর্ডের অধীনে কম্পিউটার প্রশিক্ষণ সেন্টারের অনুমোদন দেওয়ায় বহু যুবক-তরুণ তথ্যপ্রযুক্তির সঙ্গে সম্পৃক্ত হওয়ার সুযোগ পাচ্ছে। গ্রামের ছোট ছোট বাজারেও অসংখ্য কম্পিউটার সেন্টার গড়ে উঠেছে। আর এসব সেন্টার পরিচালনা করছে এইসব যুবক-তরুণেরা। গ্রামীণ সমাজের নাগরিক জীবনে তথ্যপ্রযুক্তির গুরুত্ব বেড়ে যাওয়ায় গ্রামের এইসব সেন্টারগুলোও বেশ ভালোই চলছে।

সুবর্ণচরের চরবাটা ইউনিয়ন ডিজিটাল সেন্টারের পরিচালক জোবায়ের ইসলাম জানালেন, ‘তথ্যপ্রযুক্তি মানুষের জীবন সহজ করে দেয়। জীবনকে আরও গতিশীল করে। সেবার ধরণও বদলে গেছে। সাধারণ মানুষ এর গুরুত্ব বুঝতে পারছে। ফলে তথ্যপ্রযুক্তি বিষয়ক সেবা গ্রহণকারীর সংখ্যা দিন দিন বাড়ছে। ফলে এই পেশায় আগ্রহ বাড়ছে যুবক-তরুণদের। অতি সহজে আগ্রহীদের প্রশিক্ষণের সুযোগও রয়েছে।’ তিনি আরো বলেন, ‘গত দুই বছরে সুবর্নচরে অন্তত দেড় শতাধিক কম্পিউটার সেন্টার হয়েছে; যেগুলোর উদ্যোক্তা এইসব প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত যুবক-তরুণেরা। এদের রোজগারও বেশ ভালো। তাছাড়া প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত বহু যুবক-তরুণ সরকারি-বেসরকারি চাকরিও পেয়েছেন। এদের দেখে উৎসাহিত হচ্ছে অন্যরাও।’

 

 

রাইজিংবিডি/ঢাকা/২৪ এপ্রিল ২০১৮/তারা

Walton Laptop
 
     
Marcel
Walton AC