ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ৬ আশ্বিন ১৪২৪, ২১ সেপ্টেম্বর ২০১৭
Risingbd
সর্বশেষ:

চতুর্মুখী চাপে বিএনপি

রেজা পারভেজ : রাইজিংবিডি ডট কম
 
   
প্রকাশ: ২০১৭-০৩-০৪ ৭:৪৩:১৭ পিএম     ||     আপডেট: ২০১৭-০৩-২২ ১:২৬:৫০ পিএম

এস কে রেজা পারভেজ : একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে খারাপ সময় কাটিয়ে ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টায় থাকা বিএনপি দলীয় প্রধানের মামলার পরিণতিসহ একাধিক চ্যালেঞ্জ নিয়ে ফের চাপে পড়েছে।

যদিও বিষয়গুলোকে চাপ হিসেবে মানতে নারাজ দলটির নেতারা। তারা বলছেন, বিএনপি সবকিছুই আন্দোলনের অংশ এবং চ্যালেঞ্জ হিসেবে নিয়েছে। শান্তিপূর্ণ আন্দোলনের মাধ্যমেই সব ধরনের চাপ মোকাবিলা করে একটি প্রতিনিধিত্বশীল নির্বাচন দিতে সরকারকে বাধ্য করা হবে।

দলটির বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, দুর্নীতির মামলায় বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার মামলার পরিণতি নিয়ে এই মুহূর্তে বেশ আলোচনা চলছে দলটির ভেতরে-বাইরে। জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট ও জিয়া চ্যারিটেবল ট্রাস্ট মামলার বিচারকাজ দ্রুত গতিতে এগিয়ে যাচ্ছে। বিএনপি নেতারা একপ্রকার ধরেই নিয়েছেন, সরকার খালেদা জিয়াকে নির্বাচন থেকে দূরে রাখতে তাকে সাজা দেবে। যদিও তারা বলছেন, সাজা হলেও উচ্চ আদালতে আপিল করা হবে। সেক্ষত্রে তিনি নির্বাচন করতে পারবেন। তবে শেষ পর্যন্ত কী হয়, তা নিয়ে বেশ চিন্তায় আছেন বিএনপি নেতা-কর্মীরা।

সূত্র বলছে, বিএনপি নেত্রী নির্বাচন করতে না পারলে এবং দুর্নীতি মামলায় তার সাজা হলে বিএনপি পরিস্থিতি কীভাবে মোকাবিলা করবে, তা নিয়ে এরইমধ্যে আলোচনা শুরু হয়েছে। ইতিমধ্যে দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য, ভাইস চেয়ারম্যান, উপদেষ্টাদের নিয়ে একদফা বৈঠক করেছেন খালেদা জিয়া। শিগগিরই আবারও বৈঠক ডাকবেন তিনি।

তবে বিএনপি নেতারা বলছেন, খালেদা জিয়ার সাজা হোক বা না হোক সেটি নিয়ে তারা ভাবছে না। বিএনপিপ্রধান ছাড়া দেশের মাটিতে কোনো নির্বাচন হতে দেওয়া হবে না বলে সরকারকে একপ্রকার হুঁশিয়ারি দিয়েই রেখেছেন তারা।

বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের ভাষ্য, ‘বিএনপিকে বাদ দিয়ে, আমাদের চেয়ারপারসন খালেদা জিয়াকে বাদ দিয়ে এ দেশে কোনো নির্বাচন হবে না। এ দেশের মানুষ কোনোদিনই তা মেনে নেবে না, প্রতিহত করবে।’

শান্তিপূর্ণ কর্মসূচির মাধ্যমে নিরপেক্ষ নির্বাচন আয়োজনের জন্য সরকারকে বাধ্য করা হবে জানিয়ে তিনি বলেন, ‘এখন সময় হয়েছে জেগে ওঠার, প্রতিবাদ করার, সোচ্চার হওয়ার। শান্তিপূর্ণ কর্মসূচির মাধ্যমে এই সরকারকে আমরা বাধ্য করব একটি নিরপেক্ষ, নির্দলীয় সরকারের অধীনে সব দলের অংশগ্রহণে নির্বাচন দিতে; যার মাধ্যমে জনগণের সরকার প্রতিষ্ঠা হবে।’

এদিকে খালেদা জিয়া ছাড়া বিএনপি নির্বাচনে আসবে কি না সেটিও বড় প্রশ্ন হয়ে দেখা দিয়েছে। দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচন বর্জন করা বিএনপি আগামী নির্বাচনেও যদি অংশ না নেয়, তাহলে সংশোধিত নিয়ম অনুযায়ী নির্বাচন কমিশনে দলটির নিবন্ধন বাতিল হয়ে যাবে। আওয়ামী লীগের নেতারা প্রায় একযোগেই বক্তব্য দিচ্ছেন যে, একাদশ জাতীয় নির্বাচনে অংশ না নিলে বিএনপির নিবন্ধন বাতিল হবে। যদিও এক্ষেত্রে দলটির নেতারা বলছেন, বিএনপি দলীয় প্রতীকে সবধরনের স্থানীয় নির্বাচনে অংশ নিচ্ছে। সেহেতু নিবন্ধন বাতিলের কোনো আশঙ্কা নেই। ক্ষমতাসীনরা নিবন্ধন বাতিলের যে কথা বলছেন, তা বিএনপিকে চাপে রাখতেই বলছে বলে মনে করছেন দলটির নেতারা। সরকারের এই নিবন্ধন ফাঁদে বিএনপি পা দেবে না।

নিবন্ধন বাতিল নিয়ে বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান ও প্রবীণ আইনজীবী অ্যাডভোকেট খন্দকার মাহবুব হোসেন বলেন, ‘নির্বাচন কমিশনের নিবন্ধন বাতিলের ভয়ে তার দল প্রহসনের নির্বাচনের ফাঁদে পা দেবে না।’

তিনি আরো বলেন, ‘বিএনপিকে আগামী নির্বাচনে আসতে হবে নতুবা নিবন্ধন বাতিল হবে, এই ভয় দেখিয়ে লাভ হবে না। আমরা স্পষ্ট ভাষায় বলতে চাই, আপনাদের (বর্তমান সরকার) প্রহসনমূলক নির্বাচনের ফাঁদে বিএনপি পা দেবে না। যেকেনো মূল্যে তা প্রতিহত করা হবে।’

গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশে বলা হয়েছে, পরপর দুটি সংসদ নির্বাচনে অংশ না নিলে দলের নিবন্ধন বাতিল হয়ে যাবে। এ অবস্থায় দশম জাতীয় নির্বাচন বর্জন করা বিএনপিকে নিবন্ধন বাঁচাতে একাদশ সংসদ নির্বাচনে অংশ নিতেই হবে। এ বিষয়ে ইঙ্গিত করে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের নেতারা বিএনপিকে একাদশ নির্বাচনের জন্য প্রস্তুতি নিতে পরামর্শ দিচ্ছেন। তবে বিএনপির দাবি, একাদশ সংসদ নির্বাচন হতে হবে তত্ত্বাবধায়ক ব্যবস্থার মতো একটি নির্বাচনকালীন নির্দলীয় সরকারের অধীনে, তা যেকোনো নামেই হোক।

তবে নিবন্ধন বাতিলের যে আশঙ্কা আছে, সেটি আমলে নিচ্ছেন না দলটির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী। কেবল নিরপেক্ষ সরকারের অধীনেই বিএনপি নির্বাচনে অংশ নেবে জানিয়ে তিনি বলেন, ‘একটি রাজনৈতিক দলের প্রতি জনগণের ইচ্ছা-অনিচ্ছাটাই বড় রেজিস্ট্রেশন (নিবন্ধন)।’

তবে আগের নির্বাচন বর্জন করা বিএনপি আগামী নির্বাচনে একটি নির্বাচনকালীন নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে নির্বাচন চাইলেও সেই দাবি পূরণ হবে কি না- তা নিয়ে যথেষ্ট শঙ্কা আছে দলের নেতা-কর্মীদের মধ্যেই। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচনের জন্য আন্দোলন করা বিএনপির এখন দাবি ‘নির্বাচকালীন সহায়ক সরকার’। তবে ক্ষমতাসীন দলের নেতারা বলছেন, সংবিধান অনুযায়ী প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার অধীনেই একাদশ জাতীয় নির্বাচন হবে। এই পরিস্থিতিতে বিএনপির সহায়ক সরকারের দাবি আদায় বেশ চ্যালেঞ্জিং হবে বলে মনে করা হচ্ছে।

বিএনপি নেতাদের বিবেচনায় নতুন নির্বাচন কমিশন নিরপেক্ষ হয়নি, বরং তা আওয়ামী লীগের অনুগত হয়েছে। এরপরও দলটি কোনো কর্মসূচিতে যায়নি। দলটির পর্যবেক্ষণ, নির্বাচনকালীন একটি সহায়ক সরকার থাকলে ইসি সুষ্ঠু নির্বাচন করতে বাধ্য হবে। এজন্য দলটির দৃষ্টি এখন নির্বাচনকালীন সরকার ব্যবস্থার দিকে।

দলীয় সূত্র বলছে, নির্বাচন কমিশন গঠনে ১৩ দফা প্রস্তাবের মতোই শিগগির নির্বাচনকালীন সরকারের রূপরেখা তুলে ধরতে সংবাদ সম্মেলন করবেন বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া। নির্বাচনকালীন সহায়ক সরকারের রূপরেখা নিয়ে কাজ চলছে বলে জানিয়েছে সূত্রটি।

খালেদা জিয়ার মামলার পরিণতি, আগামী নির্বাচন অংশ না নিলে নিবন্ধন বাতিলের হুমকি, নির্বাচনকালীন সরকারের দাবি আদায়, নেতা-কর্মীদের বিরুদ্ধে করা মামলা মোকাবিলা, নির্বাচনের প্রস্তুতি, দল পুনর্গঠনের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ের সামনে দাঁড়িয়ে বিএনপি এখন মহা চ্যালেঞ্জের মুখে দাঁড়িয়ে।

প্রতিষ্ঠার পর থেকে বিএনপি অনেক খারাপ সময় পার করলেও বর্তমান পরিস্থিতি বেশ অস্বস্তিতে রয়েছেন দলটির বিভিন্ন পর্যায়ের নেতা-কর্মীরা।

তবে চতুর্মুখী চাপ মোকাবিলা করে খারাপ সময় অতিক্রমের মাধ্যমে বিএনপি ঘুরে দাঁড়াবে বলে প্রত্যাশা ব্যক্ত করেছেন বিএনপির সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী ফোরাম জাতীয় স্থায়ী কমিটির সদস্য অবসরপ্রাপ্ত লেফটেন্যান্ট জেনারেল মাহবুবুর রহমান। রাইজিংবিডিকে তিনি বলেন, ‘বিএনপি চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করেই পরিস্থিতি উতরে যাবে।’

বিএনপির এই নেতা বলেন, ‘খালেদা জিয়ার মামলা আমরা আইনগতভাবে এবং রাজনৈতিকভাবে মোকাবিলা করব। আর বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতিই একটি নির্বাচনকালীন নিরপেক্ষ সরকারের দাবি রাখে। এজন্যই আমরা আন্দোলন করছি। আশা করি, সরকার গণতন্ত্রকে আর ধাক্কা খেতে দেবে না। কারণ, এবার যদি গণতন্ত্র ধাক্কা খায়, দেশ ধ্বংস হয়ে যাবে।’ 



রাইজিংবিডি/ঢাকা/৪ মার্চ ২০১৭/রেজা/রফিক

Walton Laptop