ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ১৬ চৈত্র ১৪২৩, ৩০ মার্চ ২০১৭
Risingbd
মার্চ
সর্বশেষ:

বিদেশ গিয়ে তাদের স্বপ্ন পরিণত হয় দুঃস্বপ্নে

আহমদ নূর : রাইজিংবিডি ডট কম
 
   
প্রকাশ: ২০১৭-০৩-১২ ১২:১৯:৩৮ পিএম     ||     আপডেট: ২০১৭-০৩-২৫ ৩:৪৫:০২ পিএম

আহমদ নূর : নেশাগ্রস্ত স্বামীর সংসারের প্রতি অবহেলা আর দুই সন্তান নিয়ে অসহায় ছিলেন বগুড়ার শাহীনুর বেগম। সন্তাদের মানুষ করা ও অর্থনৈতিক মুক্তির লড়াইয়ে হিমশিম খাচ্ছিলেন। চিন্তা করছিলেন, কীভাবে পাওয়া যায় এই অর্থনৈতিক দৈন্যদশা থেকে মুক্তি? কীভাবে মানুষ করবেন দুই সন্তানকে।

সময়টা ২০১৪ সালের মাঝামাঝি। পরিচিত এক ভাইয়ের মাধ্যমে শাহিনুর জানতে পারলেন গৃহকর্মী ভিসায় দুবাইয়ে নারী শ্রমিক নেওয়া হচ্ছে, যিনি কিনা মধ্যপ্রাচ্যসহ উন্নত দেশগুলোতেও মানুষ পাঠান। খরচও বেশি না। লাখ খানেক টাকা জোগাড় করতে পারলে যাওয়া যাবে সেখানে। ভালো বেতন দেওয়া হবে। থাকা খাওয়ার রয়েছে সুন্দর পরিবেশ। আর অর্থনৈতিক মুক্তি পাওয়া যাবে চোখের পলকে।

সুযোগটা হাতছাড়া করতে চাননি শাহিনুর। ওই ভাইকে নিজের বিদেশ যাওয়ার আগ্রহের কথা জানালেন। তিনিও পাঠানোর জন্য রাজি হলেন। ৯০ হাজার টাকায় শাহিনুরকে বিদেশে পাঠানোর জন্য রাজি হলেন তিনি। এর পর তার পাসপোর্ট বানানো হলো।

২০১৪ সালের শেষের দিকে হঠাৎ একদিন শাহিনুরকে বলা হয় তার বিদেশ যাওয়ার সময় চলে এসেছে। কোনো প্রস্তুতি ছিল না শাহিনুরের। তবুও দুই সন্তানের মুখের দিকে তাকিয়ে সিদ্ধান্ত নিলেন বিদেশে চলে যাবেন।

এরপর বিদেশে যান শাহিনুরের। কিন্তু যে স্বপ্ন নিয়ে পরিবার-পরিজন ছেড়ে দেশ ছেড়েছিলেন সে স্বপ্ন তার দুঃস্বপ্নে পরিণত হয়। কাটেনি তার অর্থনৈতিক দৈন্যদশা। নিজের ও সন্তানদের ভবিষ্যত এখন ঘোর অন্ধকারে। বিদেশে চরম যন্ত্রণাদায়ক জীবন কাটানোর পর দেশে ফিরে এসেছেন।



শুধু শাহিনুর নয়, পরিবারে স্বচ্ছলতা ফেরানো আর সুন্দরভাবে বাঁচার আশায় বিদেশে গিয়ে সব হারিয়েছেন লেবানন ফেরত বিউটি বেগম, মালেয়শিয়া ফেরত মাহবুবসহ আরো অনেকে।

শনিবার ঢাকার একটি অভিজাত হোটেলে র‌্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র‌্যাব) ও বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব ইন্টারন্যাশনাল রিক্রুটিং এজেন্সিস (বায়রা) আয়োজন করেছিল নিরাপদ অভিবাসন এবং মানবপাচার প্রতিরোধ শীর্ষক সেমিনার। সেখানে বায়রার পক্ষ থেকে দেওয়া আর্থিক অনুদান নিতে এসেছিলেন শাহিনুর বেগমসহ ১০ জন। তারা দালালদের মাধ্যমে বিদেশে গিয়ে কিভাবে সব হারিয়েছেন, সেখানে কেমন যন্ত্রণাদায়ক ছিল তাদের জীবন সেসব সাংবাদিকদের কাছে তুলে ধরেন তারা।

শাহিনুর বলেন, ‘গৃহকর্মীর ভিসায় আমাকে দুবাই নেওয়ার কথা থাকলেও প্রথমে নেওয়া হয় অন্য জায়গায়। আমার ফ্লাইট হওয়ার কথা ছিল ঢাকা থেকে। কিন্তু আমাকে বলা হলো ফ্লাইট হবে চট্টগ্রাম থেকে। পরে সেখান থেকে প্রথম পাঠানো হয় সিরিয়ায়। সেখানে কয়েকদিন রাখার পর লেবাননে পাঠিয়ে আমাকে একটি বাড়িতে বিক্রি করা হয়। এর আগে যারা আমাকে সেখানে রিসিভ করেছিল তারা আমার পাসপোর্ট, ভিসা নিয়ে যায়। সেখানে এক মাসের মতো রাখা হয় আমাকে। সেই বাড়িতে ঘরের কাজ করার পাশাপাশি মালিক আমাকে প্রায়ই শারীরিক নির্যাতন করতো। এক মাস পর তারা আমাকে দুবাইয়ের একটি অফিসে পাঠায়।’

‘দুবাইয়ের অফিস থেকে এক শেখের বাড়িতে কাজে পাঠানো হয়। সেখানে শেখ ও বন্ধুরা আমাকে প্রায়ই শারীরিক নির্যাতন এবং খুব মারধর করতো। ‍বিদ্যুতের তার দিয়ে চাবুক বানিয়ে তারা আমাকে মারত। এখনো শরীরের বিভিন্ন অংশে সেই দাগ আছে। শেখের বাড়িতে প্রায় দুই মাসের মতো ছিলাম। এই দুই মাসে আমাকে বেতন দেওয়া হয়নি। মালিকের কাছে বেতন চাইলে আমাকে বলত, আমাকে কিনে নিয়ে এসেছেন। তখন আমি বুঝতে পারি শেখের কাছেও আমাকে বিক্রি করে দেওয়া হয়েছিল।’

শাহিনুর বলেন, ‘কোনো উপায় না পেয়ে দেশে আসার সিদ্ধান্ত নেই। কিন্তু আমার পাসপোর্ট ভিসা আমার কাছে ছিল না। শেখও দুই মাস পর আমাকে বের করে দেয়। সে আমাকে আগের ওই অফিসে পাঠিয়ে দেয়। সেখানে অফিসের লোকদের বলি আমাকে দেশে পাঠিয়ে দেওয়ার জন্য। তারা দেশে পাঠানোর জন্য টাকা দাবি করে। এরপর তারা আমাকে আরেকটি অফিসে পাঠায়। পরে জানতে পারলাম সেটি পতিতালয়। সেখানে কথা না শুনলে খুব নির্যাতন করতো আমাকে। খাবার দিত না। ঘুষি, লাথি মারত। প্রায়ই তারা পেটে লাথি মারত। এতে কিছুদিন পর আমি অসুস্থ হয়ে যাই।

‘২০১৫ সালের শুরুর দিকে আমি বাড়িতে মাকে ফোন দেই। তাকে আমি আমার সব নির্যাতনের কথা বলি। পরে তিনি র‌্যাবের সঙ্গে যোগাযোগ করেন। র‌্যাব আমাকে সেখান থেকে ছাড়িয়ে আনার ব্যবস্থা করে। অসুস্থ অবস্থায় র‌্যাব দুবাইয়ের একটি হাসপাতালে আমার চিকিৎসার ব্যবস্থা করে দেয়। সেখানে আমি জানতে পারি আমার একটি কিডনি নষ্ট হয়ে গেছে। এর পর দেশে আসার পর ঢাকা মেডিক্যালে আমার চিকিৎসার ব্যবস্থা করে দেওয়া হয়।’



তিনি বলেন, ‘আমাকে সর্বশেষ যেখানে রেখে জোর করে কাজ করানো হতো সেখানে অনেক বাংলাদেশি মেয়ে রয়েছেন। তারা বেশিরভাগই গৃহকর্মীর ভিসায় গিয়েছেন। সেখানে তাদের কথামতো কাজ না করলে খুব নির্যাতন করা হয়।’

তিনি আরো বলেন, আমার স্বামী নেশা করত। বিয়ের পর পরই দুই সন্তান হয়। স্বামী আমাকে ও আমার সন্তানদের কোনো খোঁজ খবর না নেওয়ায় খুবই চিন্তায় থাকতাম। সন্তানদের মানুষ করার জন্য বিদেশে গেলাম। কিন্তু সেখানে আমি প্রতারিত হয়ে আসলাম।

লেবানন ফেরত বিউটি বেগম বলেন, ২০১৫ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে আমাকে লেবানন পাঠানো হয়। সেখানে যাওয়ার পর আমাকে একটি গাড়িতে করে কাজে পাঠানো হয়। যে বাসায় আমাকে কাজ করতে দেওয়া হয়। বাসার সব কাজ আমাকে দিয়ে করানো হতো। তারা খাওয়ার পর যদি খাবার বেঁচে থাকত তাহলে তা আমাকে খেতে দেওয়া হতো। বাড়ির বাইরে গেলে আমাকে তালা দিয়ে দেওয়া হতো।

প্রথম দুই মাস কাজ করার পর তাদের কাছে বেতন চাই। তখন তারা আমার ওপর নির্যাতন চালানো শুরু করে। চার মাস পর মালিকের স্ত্রীর সাথে কথা হলে তিনি জানান, আমাকে কিনে আনা হয়েছে। তারা বেতন দিতে পারবেন না। আমি কাজ করে প্রায়ই অসুস্থ হয়ে পড়ি। পাঁচ মাস পর তারা আমাকে বাড়িতে ফোন করার সুযোগ দিলে বাড়িতে আমার বিপদের কথা জানাই। তখন তারা র‌্যাবের সাথে যোগাযোগ করা হলে তারাই আমাকে দেশে ফিরিয়ে নিয়ে আসে।

মালেয়শিয়া ফেরত মাহবুবের গল্প একটু ভিন্ন। তিনি বলেন, গত বছরের মাঝামাঝি তিনি মালেয়শিয়ায় যান। এয়ারপোর্ট থেকে নামার পরই দুটি মাইক্রোবাসে করে আসা লোকজন তাকে তুলে জঙ্গলে নিয়ে যায়। সাথে থাকা ৪ হাজার রিংগিত শুরুতেই নিয়ে যায়। পরে মুক্তিপণ হিসেবে চাওয়া হয় আরো এক লাখ টাকা। পরে বিষয়টি বাড়িতে জানালে বিষয়টি র‌্যাবকে জানানো হয়। কৌশলে র‌্যাব প্রতারক চক্রকে গ্রেপ্তার করে। পরে মালেয়শিয়া পুলিশের সাথে যোগাযোগ করে মাহবুবকে উদ্ধার করা হয়। তিনি বলেন, সেখানে অনেক বাংলাদেশিকে অপহরণকারী চক্র জিম্মি করে রেখেছিল।



রাইজিংবিডি/ঢাকা/১২ মার্চ ২০১৭/নূর/এসএন

Walton Laptop