ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ১৬ চৈত্র ১৪২৩, ৩০ মার্চ ২০১৭
Risingbd
মার্চ
সর্বশেষ:

শাসনের নামে চলছে শিশু নির্যাতন

তানজিমুল হক : রাইজিংবিডি ডট কম
 
   
প্রকাশ: ২০১৭-০৩-১৭ ২:৫৯:২১ পিএম     ||     আপডেট: ২০১৭-০৩-২৫ ৩:৪২:১০ পিএম
ছাগল চুরির অভিযোগে দুই স্কুলছাত্রকে বেঁধে রাখা হয়েছে

তানজিমুল হক​, রাজশাহী : ববিতা খাতুনের বয়স ১১ বছর। কাজ করত রাজশাহী মহানগরীর বালিয়াপুকুর এলাকার মাসুম আলীর বাড়িতে। একদিন নিজের ইচ্ছায় একটি পিঠা খায় সে। এ অপরাধে তাকে মারধর করেন মাসুমের স্ত্রী কাকন বেগম। মারের চোটে ববিতা জ্ঞান হারিয়ে ফেলে। গত বছরের ফেব্রুয়ারির এ ঘটনায় থানায় মামলা হয়েছে। পুলিশ কাকন বেগমকে আটকও করেছিল সে সময়।

হোমওয়ার্ক করে স্কুলে আসেনি রামিম হাসান ফরহান (৯)। এ জন্য শ্রেণি শিক্ষক তার মাথায় স্কেল দিয়ে জোরে আঘাত করেন। এতে তার মাথা ফেটে যায়। রাজশাহীর সিঅ্যান্ডবি মোড়ের শিমুল মেমোরিয়াল নামের একটি স্কুলে গত বছর এ ঘটনা ঘটে। রামিমের বাবা ফরহাদ মাহমুদ হাসান ওই সময় স্কুল কর্তৃপক্ষের কাছে অভিযোগ করলেও কোনো শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেয়া হয়নি ওই শিক্ষকের বিরুদ্ধে।

গত ১৫ জানুয়ারি জেলার মোহনপুর উপজেলার বড়াইল উচ্চ বিদ্যালয়ের ষষ্ঠ শ্রেণির শিক্ষার্থী আশফিকুর রহমান পলাশ (১২) ক্লাস চলাকালে সহকারী শিক্ষক মাসুমা আক্তারকে বড় আপার পরিবর্তে ‘বুড়ি আপা’ বলে। এতে ক্ষিপ্ত হয়ে ওই শিক্ষিকা তাকে বেত দিয়ে পিটিয়ে আহত করেন। বেত ভেঙে যাওয়ার পর ক্ষান্ত হন ওই শিক্ষক। এ ঘটনায় ওই শিক্ষকের বিরুদ্ধে উপজেলা নির্বাহী অফিসারের কাছে লিখিত অভিযোগ করা হয়। কিন্তু তার বিরুদ্ধেও কোনো ব্যবস্থা নেয়া হয়নি।

গত ফেব্রুয়ারিতে রাজশাহীর শহীদ নাজমুল হক বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ে পিটি করার সময় হিজাব পরে থাকায় কয়েকজন ছাত্রীকে হিজাব খুলে মারধর করেন এক শিক্ষক। এ ব্যাপারে এক শিক্ষার্থীর অভিভাবক ওই শিক্ষকের বিরুদ্ধে শিক্ষা কর্মকর্তার কাছে লিখিত অভিযোগ করেন।

রাজশাহীতে এভাবেই শাসনের নামে চলছে শিশু নির্যাতন- এই অভিযোগ করেছেন স্থানীয়রা।

বাসের সিডি চুরির অভিযোগে নাজমুলের মাথা ন্যাড়া করা হচ্ছে


সম্প্রতি রাজশাহীর বিভিন্ন উপজেলায় শিশু নির্যাতনের এমন কিছু ঘটনা ঘটেছে। গত ১৩ ফেব্রুয়ারি পুঠিয়া উপজেলায় মোবাইল ফোনের মেমোরি কার্ড চুরির অভিযোগে আরিফুল ইসলাম (১২) নামের এক শিশুকে গাছের সঙ্গে বেঁধে নির্যাতন করা হয়। শিশু আরিফুল উপজেলার তারাপুর গ্রামের মহিরুল ইসলামের ছেলে।

প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, ওই দিন দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে তারাপুর এলাকায় মহাসড়কের পাশে গাছে বেঁধে আরিফুলকে নির্যাতন করে একই গ্রামের আসফার আলীর ছেলে এরশাদ আলী ও বরু মোল্লার ছেলে শুভ ইসলাম। এ সময় পবা হাইওয়ে পুলিশ ফাঁড়ির সদস্যরা আরিফুলকে আহত অবস্থায় উদ্ধার করে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি করেন। এ ঘটনায় থানায় মামলা হয়েছে।

এ ঘটনার রেশ কাটতে না কাটতেই গত ২২ ফেব্রুয়ারি সকালে পুঠিয়া উপজেলা সদরে একটি যাত্রীবাহী বাসের সিডি ডিস্ক চুরির অভিযোগে নাজমুল হক (১২) নামের এক শিশুকে ট্রাকের সঙ্গে বেঁধে নির্যাতন করা হয়। শুধু তাই নয়, ওই সময় নাজমুলের মাথা ন্যাড়া করে কালি মাখিয়ে দেয়া হয়। এ ঘটনায় থানায় মামলা হয়। পুলিশ কয়েকজনকে গ্রেপ্তারও করে।

এর পরের ঘটনা রাজশাহীর দুর্গাপুর উপজেলায়। গত ৮ মার্চ উপজেলার আন্দুয়া গ্রামে ছাগল চুরির অভিযোগে জার্জিস আলী (১৫) ও রতন আলী (১৫) নামের দশম শ্রেণির দুই ছাত্রকে গাছের সঙ্গে বেঁধে নির্মম নির্যাতন চালানো হয়। শুধু তাই নয়, দুই স্কুলছাত্রের পরিবারের কাছ থেকে আদায় করা হয় ১৬ হাজার টাকা জরিমানা। এ ঘটনায় নির্যাতিত স্কুলছাত্র জার্জিসের বাবা থানায় মামলা দায়ের করেন।
 

মোবাইল ফোনের মেমোরি কার্ড চুরির অভিযোগে আরিফুল ইসলামকে বেঁধে রাখা হয়


মামলা দায়েরের পর পুলিশ ঝালুকা ইউনিয়নের ৩ নম্বর ওয়ার্ডের সদস্য আব্দুল মোতালেব এবং ৫ নম্বর ওয়ার্ডের সদস্য মির্জা আব্দুল লতিফকে গ্রেপ্তার করে। পরে তারা জামিনে ছাড়া পান। এ মামলার আসামি ইউপি চেয়ারম্যান মোজাহার আলী মণ্ডল ও আরো চারজনকে আদালত জামিন নেন।

রাজশাহী অঞ্চলে নারী ও শিশুদের উন্নয়নে দীর্ঘ দিন ধরে কাজ করছে লেডিস অর্গানাইজেশন ফর সোস্যাল ওয়েলফেয়ার (লফস)। সংস্থাটি খবরের কাগজ থেকে তথ্য নিয়ে প্রতিমাসে রাজশাহীতে নারী ও শিশু নির্যাতনের পরিসংখ্যান তুলে ধরে।

লফসের নির্বাহী পরিচালক শাহনাজ পারভীন বলেন, ‘নির্যাতনকারীর শাস্তি না হওয়া শিশু নির্যাতনের বড় কারণ। পাশাপাশি মানুষের সচেতনতার অভাব রয়েছে। তাই এ ব্যাপারে এখনই সচেতনতামূলক কার্যক্রম হাতে নেয়া জরুরি।’



রাইজিংবিডি/রাজশাহী/১৭ মার্চ ২০১৭/তানজিমুল হক/উজ্জল/শাহনেওয়াজ

Walton Laptop