ঢাকা, শনিবার, ১১ অগ্রহায়ণ ১৪২৪, ২৫ নভেম্বর ২০১৭
Risingbd
সর্বশেষ:
২১ আগস্টের হামলা

মামলার বিচার শেষ হয়নি ১৩ বছরেও

মামুন খান : রাইজিংবিডি ডট কম
 
   
প্রকাশ: ২০১৭-০৮-২১ ৮:১১:৩৩ এএম     ||     আপডেট: ২০১৭-০৮-২১ ১:৫৩:৩০ পিএম

মামুন খান : ২০০৪ সালের ২১ আগস্ট রাজধানীতে আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সামনে জনসভায় গ্রেনেড হামলায় আওয়ামী লীগের মহিলাবিষয়ক সম্পাদিকা ও প্রয়াত রাষ্ট্রপতি জিল্লুর রহমানের স্ত্রী আইভি রহমানসহ ২৪ জনের মৃত্যু হয়।

ওই ঘটনায় দায়ের হওয়া মামলার বিচারকাজ শেষ হয়নি ১৩ বছরেও। এখন পর্যন্ত অধরা রয়েছে ওই ঘটনার মূল কুশীলবদের ১৮ জন। বিদেশে পালিয়ে থাকা কয়েক আসামির অবস্থান সম্পর্কে জানা গেলেও ফিরিয়ে আনার প্রক্রিয়া চলছে ধীর গতিতে। তবে চলতি বছরেই মামলার বিচারকাজ শেষ হবে বলে আশা প্রকাশ করেছে রাষ্ট্রপক্ষ।

২১ আগস্টের ঘটনায় করা দুই মামলায় রাষ্ট্রপক্ষের প্রধান আইনজীবী সৈয়দ রেজাউর রহমান বলেন, ২০০৪ সালের ২১ আগস্ট আওয়ামী লীগকে নেতৃত্বশূন্য করতে নৃশংস হত্যাকাণ্ড চালানো হয়। ওই ঘটনার পর জজ মিয়া নাটক সাজিয়ে তৎকালীন চার দলীয় জোট সরকার এ মামলা ভিন্ন খাতে নেওয়ার অপতৎপরতা চালায়। পরে চার্জশিট হলেও তা সম্পূর্ণ ছিল না। তাই ন্যায়বিচারের স্বার্থে মামলা দুটির অধিকতর তদন্ত হয়। দুই দফা তদন্তেই ছয় বছর সময় ব্যয় হয়।

আসামিপক্ষ বিচার বিলম্ব করছে, জানিয়ে সৈয়দ রেজাউর রহমান বলেন, আসামিপক্ষের আইনজীবীরা বিভিন্ন আদেশের বিরুদ্ধে কয়েক দফা উচ্চ আদালতে যাওয়ায় ২৯২ কার্যদিবস সময় ব্যয় হয়। অন্যদিকে আসামিপক্ষ সাক্ষ্য গ্রহণে সময়ক্ষেপণের জন্য সাক্ষীদের অপ্রাসঙ্গিক জেরা করায় অনেক সময় নষ্ট হয়েছে। আসামিপক্ষ এভাবে সময় নষ্ট না করলে আরো অনেক আগেই বিচার সম্পন্ন হওয়া সম্ভব ছিল।

তিনি আরো বলেন, আমরা রাষ্ট্রপক্ষ এ মামলায় ন্যায়বিচার নিশ্চিত করার চেষ্টা করছি। তবে নির্দিষ্ট করে বিচার শেষ হওয়ায় দিন-ক্ষণ বলা সম্ভব নয়। তবে আশা করছি, চলতি বছরের মধ্যেই অবশিষ্ট বিচারকাজ সম্পন্ন হবে।

মামলার আসামি প্রাক্তন স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী লুৎফুজ্জামান বাবর ও প্রাক্তন উপমন্ত্রী আব্দুস সালাম পিন্টুর আইনজীবী বিএনপি নেতা সানাউল্লাহ মিয়া বিচার বিলম্বের জন্য সরকারকে দায়ী করে বলেন, আসামিপক্ষ অন্যায়ের শিকার হয়েছেন। সরকার মামলাটি রাজনৈতিক মামলায় পরিণত করেছে। মুফতি হান্নানের পুনরায় স্বীকারোক্তি দেখিয়ে বিএনপির সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান তারেক রহমানসহ রাজনৈতিক নেতাদের আসামি করেছেন। যা মামলাটিকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে।

আসামিপক্ষের আরেক আইনজীবী আবদুর রশীদ মোল্লা বলেন, বর্তমান সরকার ও তত্ত্বাবধায়ক সরকার মামলাটিকে রাজনৈতিকভাবে ব্যবহারের কারণেই মূলত বিচারে দীর্ঘসময় লেগেছে। নতুন করে মামলা তদন্তে নেওয়ার কারণেও মামলার বিচার কিছুটা বিলম্ব হয়েছে। আর তদন্ত কর্মকর্তার বক্তব্যের বাইরেও কিছু বক্তব্য রাষ্ট্রপক্ষ সাক্ষীদের দিয়ে বলানোর চেষ্টা করেছে। সে কারণেই জেরায় বেশি সময় লেগেছে। এ মামলায় তদন্ত কর্মকর্তাই শুধু সাত কার্যদিবস সময় নিয়ে তার সাক্ষ্য দিয়েছেন। এখন ওই তদন্ত কর্মকর্তাকে ৫২ জন আসামির পক্ষে যুক্তিসঙ্গত জেরা করতেই দীর্ঘ সময় প্রয়োজন।

আসামিপক্ষের এ আইনজীবী অভিযোগ করেন, আসামিদের পক্ষে যারা সাফাই সাক্ষ্য দিতে আদালতে এসেছেন, তাদের অনেককে বিভিন্নভাবে হয়রানি করা হচ্ছে। সম্প্রতি মামলায় সাফাই সাক্ষ্য শেষে আদালত থেকে বের হওয়ার সময় পুলিশ একজনকে (সাফাই সাক্ষ্যদাতা) গ্রেপ্তার করে। বিষয়টি তাৎক্ষণিকভাবে আদালতকে অবহিত করলে পরবর্তী সময়ে আদালতের হস্তক্ষেপে ওই ব্যক্তিকে ছেড়ে দেওয়া হয়।

আদালত সূত্রে জানা গেছে, পুরান ঢাকার নাজিমুদ্দিন রোডে কেন্দ্রীয় কারাগার সংলগ্ন অস্থায়ী ঢাকার ১ নম্বর দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালে হত্যা ও বিস্ফোরক দ্রব্য আইনে করা মামলা দুটির কার্যক্রম চলে। বিচারক মো. শাহেদ নূর উদ্দিন এ মামলার কার্যক্রম পরিচালনা করেন। হত্যা মামলায় আসামি ৫২ জন ও বিস্ফোরক দ্রব্য আইনের মামলায় আসামি ৪১ জন।

সর্বমোট ৫২ আসামির মধ্যে ৩৪ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল। এদের মধ্যে ৮ জন জামিনে, ২৫ জন কারাগারে ছিলেন। তবে মানবতাবিরোধী মামলাসহ অপর মামলায় তিন আসামির মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হয়েছে। এ কারণে ওই তিনজন ছাড়া বাকিরা কারাগারে রয়েছে। চাঞ্চল্যকর এ মামলায় ১৮ আসামি পলাতক থাকায় তাদের অনুপস্থিতিতেই বিচারকাজ চলছে। একই সঙ্গে পলাতকদের দেশে ফিরিয়ে আনার চেষ্টাও অব্যাহত রয়েছে।

এ মামলায় ২২৫ জনের সাক্ষ্য গ্রহণের পর আসামিদের ফৌজদারি কার্যবিধির ৩৪২ ধারায় পরীক্ষা করা হয়। বর্তমানে আসামিদের সাফাই সাক্ষ্য চলছে। কয়েকজন আসামি তাদের পক্ষে সাফাই সাক্ষী দেওয়ার কথা উল্লেখ করেন। আসামিপক্ষে ১১ জনের সাফাই সাক্ষ্য শেষ হয়েছে। বর্তমানে আসামি মাওলানা শেখ আব্দুস সালামের পক্ষে সাফাই সাক্ষী চলমান রয়েছে। আগামী ২২ ও ২৩ আগস্ট এ মামলায় পরবর্তী সাফাই সাক্ষ্য গ্রহণের দিন ধার্য রয়েছে। এ ছাড়া আরো দুই আসামির পক্ষে ছয়জনের সাফাই সাক্ষ্য দেওয়ার আবেদন আছে।

প্রসঙ্গত, ২০০৪ সালের ২১ আগস্ট আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সামনে জনসভায় গ্রেনেড হামলায় দলের মহিলাবিষয়ক সম্পাদিকা প্রয়াত রাষ্ট্রপতি জিল্লুর রহমানের স্ত্রী আইভী রহমান, প্রাক্তন মেয়র মোহাম্মদ হানিফ, শেখ হাসিনার ব্যক্তিগত নিরাপত্তাকর্মী অবসরপ্রাপ্ত ল্যান্স করপোরাল  মাহবুবুর রশীদ, আবুল কালাম আজাদ, আওয়ামী লীগকর্মী রেজিনা বেগম, নাসির উদ্দিন সরদার, আতিক সরকার, হাসিনা মমতাজ রিনা, সুফিয়া বেগমসহ ২৪ জন নিহত হন। নিহতদের মধ্যে একজনের নাম এখন পর্যন্ত জানা যায়নি।

হামলায় বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, আমির হোসেন আমু, প্রয়াত আওয়ামী লীগ নেতা আবদুর রাজ্জাক ও সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত, ওবায়দুল কাদের, অ্যাডভোকেট সাহারা খাতুন, এ এফ এম বাহাউদ্দিন নাছিম, নজরুল ইসলাম বাবু, আওলাদ হোসেন, সাঈদ খোকন, মাহবুবা পারভীন, নাসিমা ফেরদৌস, রুমা ইসলামসহ কয়েকশ নেতা-কর্মী আহত হন। শেখ হাসিনা অল্পের জন্য প্রাণে বেঁচে গেলেও শ্রবণশক্তি হারান।

ওই ঘটনায় দায়ের করা মামলায় ২০০৮ সালের ১১ জুন তৎকালীন উপমন্ত্রী আব্দুস সালাম পিন্টু, হরকাতুল জিহাদের শীর্ষ নেতা মুফতি হান্নানসহ ২২ জনর বিরুদ্ধে আদালতে প্রথম চার্জশিট দাখিল করে সিআইডি। এরপর ২০০৮ সালের ২৯ অক্টোবর থেকে ২০০৯ সালের ৯ জুন পর্যন্ত ৬১ জনের সাক্ষ্য গ্রহণ করেন ট্রাইব্যুনাল। ২০০৯ সালের ৩ আগস্ট রাষ্ট্রপক্ষের আবেদনে মামলাটি অধিকতর তদন্তের নির্দেশ দেন ট্রাইব্যুনাল। ২০১১ সালের ৩ জুলাই অধিকতর তদন্ত শেষে তারেক রহমানসহ আরো ৩০ জনের বিরুদ্ধে সম্পূরক চার্জশিট দাখিল করে সিআইডি।

২০১২ সালের ১৮ মার্চ বিএনপির সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান তারেক রহমানসহ সম্পূরক চার্জশিটের ৩০ আসামির অভিযোগ গঠন করে ফের বিচার শুরু হয়।

মামলাটিতে খালেদা জিয়ার ভাগ্নে অবসরপ্রাপ্ত লেফটেন্যান্ট কমান্ডার সাইফুল ইসলাম ডিউক, প্রাক্তন আইজিপি মো. আশরাফুল হুদা, শহিদুল হক ও খোদা বক্স চৌধুরী, মামলাটির তিন তদন্ত কর্মকর্তা প্রাক্তন বিশেষ পুলিশ সুপার রুহুল আমিন, সিআইডির সিনিয়র এএসপি মুন্সি আতিকুর রহমান, এএসপি আব্দুর রশীদ ও সাবেক ওয়ার্ড কমিশনার আরিফুল ইসলাম জামিনে আছেন।

অন্যদিকে প্রাক্তন স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী লুৎফুজ্জামান বাবর, প্রাক্তন উপমন্ত্রী আব্দুস সালাম পিন্টুসহ ২৩ জন কারাগারে রয়েছেন। এ মামলার আসামি হুজি নেতা মুফতি হান্নান ও জামায়াত নেতা আলী আহসান মুহাম্মাদ মুজাহিদের অন্য মামলায় মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হয়েছে।

মামলায় বিএনপি নেতা তারেক রহমান, হারিছ চৌধুরী, বিএনপির প্রাক্তন এমপি কাজী শাহ মোয়াজ্জেম হোসেন কায়কোবাদ, হানিফ এন্টারপ্রাইজের মালিক মো. হানিফ, ডিএমপির প্রাক্তন ডিসি (পূর্ব) ওবায়দুর রহমান, ডিএমপির প্রাক্তন ডিসি (দক্ষিণ) খান সাঈদ হাসান, অবসরপ্রাপ্ত লেফটেন্যান্ট কর্নেল সাইফুল ইসলাম জোয়ার্দার, অবসরপ্রাপ্ত মেজর জেনারেল এ টি এম আমিন, গ্রেনেড সরবরাহকারী মাওলানা তাজউদ্দিনসহ ১৮ জন আসামি পলাতক আছেন। তাদের ধরিয়ে দেওয়ার জন্য ইন্টারপোলের মাধ্যমে রেড নোটিশ জারি করা হয়েছে।

আসামিদের মধ্যে তারেক রহমান বর্তমানে লন্ডনে রয়েছেন। এ ছাড়া বিএনপি নেতা শাহ মোয়াজ্জেম হোসেন কায়কোবাদ ব্যাংককে, হানিফ এন্টারপ্রাইজের মালিক হানিফ কলকাতায়, এ টি এম আমিন আমেরিকায়, সাইফুল ইসলাম জোয়ারদার কানাডায়, বাবু ওরফে রাতুল বাবু ভারতে, আনিসুল মোর্সালীন এবং তার ভাই মুহিবুল মুক্তাকীন ভারতের কারাগারে এবং মাওলানা তাজুল ইসলাম দক্ষিণ আফ্রিকায় রয়েছে বলে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কাছে তথ্য রয়েছে।

এ ছাড়া জঙ্গিনেতা শফিকুর রহমান, মুফতি আবদুল হাই, মাওলানা আবু বকর, ইকবাল, খলিলুর রহমান, জাহাঙ্গীর আলম ওরফে বদর, মাওলানা লিটন ওরফে জোবায়ের ওরফে দেলোয়ার, ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) তৎকালীন উপ-কমিশনার (পূর্ব) এবং উপ-কমিশনার (দক্ষিণ) ওবায়দুর রহমান এবং খান সাঈদ হাসান পাকিস্তানে রয়েছেন বলে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা জানতে পেরেছেন।

এদিকে ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলার দায় স্বীকার করে আট আসামি আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছে। তারা হলেন- হুজি নেতা মুফতি হান্নান, মহিবুল্লাহ ওরফে মফিজুর রহমান ওরফে অভি, শরীফ শাহেদুল আলম বিপুল, মাওলানা আবু সাঈদ ওরফে ডা. জাফর, আবুল কালাম আজাদ ওরফে বুলবুল, জাহাঙ্গীর আলম, আরিফ হাসান সুমন ও রফিকুল ইসলাম সবুজ।

 

 

 

 

রাইজিংবিডি/ঢাকা/২১ আগস্ট ২০১৭/মামুন খান/রফিক

Walton
 
   
Marcel