ঢাকা, শুক্রবার, ৩ অগ্রহায়ণ ১৪২৪, ১৭ নভেম্বর ২০১৭
Risingbd
সর্বশেষ:

নেপচুন সম্পর্কে মজার ১০ তথ্য

মহিউল ইসলাম : রাইজিংবিডি ডট কম
 
   
প্রকাশ: ২০১৭-০৭-১৫ ২:০৩:৩৩ পিএম     ||     আপডেট: ২০১৭-০৭-১৫ ২:১৫:২২ পিএম

মহিউল ইসলাম : গ্রহদের মধ্যে সূর্য থেকে সবচেয়ে দূরে অবস্থান নেপচুনের। সূর্য থেকে এর দূরত্ব প্রায় ৪.৫ বিলিয়ন কিলোমিটার বা ৩০.১ অ্যাস্ট্রোনমিক্যাল ইউনিট।

সৌরজগতের চতুর্থ বৃহত্তম এই গ্রহটি মূলত একটি বিশাল গ্যাসের দৈত্য। পৃথিবী এবং নেপচুনের মধ্যে বিশাল দূরত্ব থাকায় গ্রহটি এখনো বিজ্ঞানীদের কাছে এক রহস্যের আঁধার। তবে এখনো পর্যন্ত গ্রহটি সম্পর্কে বিজ্ঞানীরা যেসব সঠিক তথ্য জানতে পেরেছেন সেগুলোর মধ্যে রয়েছে বেশকিছু তথ্য বেশ মজার। চলুন নেপচুনের দশটি মজার তথ্য সম্পর্কে জানা যাক।

সৌরজগতের সবচেয়ে শীতলতম গ্রহ
সূর্য থেকে সবচেয়ে দূরবর্তী গ্রহ হওয়ায় অন্যসকল গ্রহ থেকে এই গ্রহের তাপমাত্রা সবচেয়ে কম। যদিও এর আগে প্লুটোকে সর্বশেষ গ্রহ ধরা হতো এবং তার তাপমাত্রাকেই গ্রহদের মধ্যে সবচেয়ে নিম্ন তাপমাত্রার ধরা হতো। কিন্তু সম্প্রতি গ্রহ তালিকা থেকে প্লুটো বাদ পড়ায় নেপচুনই সৌরজগতের সবচেয়ে শীতলতম গ্রহ। তবে এখনো পর্যন্ত নেপচুনের মতো গ্যাস জায়ান্টের মধ্যে ঢুকে তার সঠিক তাপমাত্রা রেকর্ড করা সম্ভব হয়নি। এদিকে নেপচুনের ক্ষেত্রফলের ওপর ভিত্তি করে এর বায়ুচাপ সম্পর্কে জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা বলছেন, নেপচুনের বায়ুচাপ পৃথিবীর সমুদ্রের সমতলের বায়ুমণ্ডলীয় চাপের সমতুল্য। এই হিসাবের ওপর ভিত্তি করে বিজ্ঞানীরা বলছেন নেপচুনের গড় তাপমাত্রা মাইনাস ২০১.১৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস। আর দূরত্বের সঙ্গে সঙ্গে নেপচুনকে আরো বিশাল শীতল করতে সাহায্য করে গ্রহটির আকাশে ঘনীভূত হয়ে থাকা মিথেন ও অ্যামেনিয়ার বিশালআকৃতির সব মেঘ।

একবারই তার কাছে পৌঁছানো
বিভিন্ন মিশনে পৃথিবী থেকে অনেক মহাকাশযান পাঠানো হয়েছে যেগুলো বিভিন্ন গ্রহের কাছে একাধিকবার গিয়েছে। কিন্তু নেপচুনের কাছাকাছি একবারই যাওয়া সম্ভব হয়েছে, সেটি ১৯৮৯ সালে। যে মহাকাশযানটি নেপচুনের কাছাকাছি গিয়েছিল তার নাম ভয়েজার-২ । ১৯৮৯ সালের ২৫ আগস্ট এই মহাকাশ যানটি গ্রহটির উত্তর মেরুর প্রায় ৩০০০ কিলোমিটার কাছ থেকে ছবি তোলে এবং সঙ্গে নিশ্চিত করে যে ইউরেনাসের মতো নেপচুনেরও চারিদিকে ম্যাগনেটিক ফিল্ড বিদ্যমান। এছাড়া আবিষ্কার করে শনির মতো নেপচুনের চারিদিকের সূক্ষ্ম বলয় রয়েছে। এছাড়া নেপচুনের ওপর এক প্রকার বৃহৎ ঘূর্ণন ঝড়ও প্রত্যক্ষ করে ভয়েজার-২। এই ঝড়ের কারণে পৃথিবী থেকে টেলিস্কোপ দিয়ে দেখার সময় নেপচুনের ওপরে এক ধরনের স্পট দেখা যায় যা ‘নেপচুনস গ্রেট ডার্ক স্পট’ নামে পরিচিত। মজার ব্যাপার হল, নেপচুনের কাছাকাছি গিয়ে ভয়েজার-২ মহাকাশযানটি যখন এসব তথ্য এবং ছবি পৃথিবীতে পাঠাচ্ছিল তা ওই যান থেকে পৃথিবীতে পৌঁছাতে সময় নিয়েছিল ২৪৫ মিনিট। নেপচুনকে আরো ভালোভাবে জানার জন্য ২১ শতাব্দীর মাঝের দিকে তার উদ্দেশে মহাকাশযান প্রেরণের সিদ্ধান্ত তালিকাভুক্ত করেছে নাসা।

সূর্যকে একবার প্রদক্ষিণ করতে ১৬৫ বছর
পৃথিবীর বছর হিসেবে সূর্যকে একবার প্রদক্ষিণ করে আসতে নেপচুনের সময় লাগে ১৬৫ বছর। নিজ অক্ষের ওপর দিয়ে পরিভ্রমণকালে গ্রহটি সেকেন্ডে ৫.৪৩ কিলোমিটার অতিক্রম করে। এর কক্ষপথের গড় দৈর্ঘ্য ২৭৯৮.৬৫৬ মিলিয়ন মাইল। তবে কক্ষপথটি উৎকেন্দ্রিক হওয়ার ফলে কখনো ২৭৭১ মিলিয়ন মাইলে নেমে আসে আবার কখনোবা উন্নীত হয় ২৮২১ মিলিয়ন মাইলে।

গ্যালিলিয়ই এর আবিস্কারক
নেপচুন কে আবিষ্কার করেছেন এটি জ্যোতির্বিজ্ঞানের ইতিহাসের একটি বড় তর্ক। কোনো টেলিস্কোপ দিয়ে গবেষণামূলকভাবে আবিষ্কার করার আগে গাণিতিকভাবে গ্রহটি ১৮৪৫ সালে প্রথম আবিষ্কার করেন জ্যোতির্বিজ্ঞানী লা ভেরিওর। তবে গ্যালিলিওর নোট ঘেঁটে পাওয়া যায় গাণিতিকভাবে না হলেও একজন পর্যবেক্ষক হিসেবে টেলিস্কোপ দিয়ে ১৬১৩ সালে সর্বপ্রথম নেপচুনকে দেখতে পান গ্যালিলিও। যদিও সে সময় তিনি নির্দিষ্ট করতে পারেননি এটি গ্রহ নাকি নক্ষত্র, কারণ নেপচুনের দুর্বল গতির কারণে সে সময়ে এবং তার পরবর্তী সময়ে বেশ কিছু বিজ্ঞানী নেপচুনকে ব্লু স্টার বলে ভুল করেছেন। তবে গ্যালিলিওকেই নেপচুনের আবিস্কারক হিসেবেই ধরা হয়ে থাকে।

সূর্য থেকে প্রচুর দূরত্ব সত্ত্বেও গ্রহের থার্মোস্ফিয়ারের বিশাল উত্তপ্ত
নেপচুনের থার্মোস্ফিয়ারের সন্ধান পাওয়া গিয়েছে এর বায়ুমণ্ডলের এক্সোস্ফিয়ার এবং স্ট্রাটোস্ফিয়ার এর মধ্যবর্তী স্থানে, এই থার্মোস্ফিয়ার মণ্ডলের তাপমাত্রা প্রায় ৪৭৭ ডিগ্রি সেন্টিগ্রেট। যা শুক্রের থার্মোস্ফিয়ারের সমান। সূর্য থেকে এতো দূরে থেকেও এই তাপমাত্রা সেখানে উৎপন্ন করা কিভাবে সম্ভব সেটি নিয়ে এ পর্যন্ত অনেক পরীক্ষা-নিরীক্ষা করেছেন বিজ্ঞানীরা। তবে এখনো পর্যন্ত কোনো সিদ্ধান্তে উপনীত হতে পারেননি।

নেপচুনের বলয়
গ্রহের বলয় বলতে পরিষ্কারভাবে সর্বপ্রথম যার কথা আমাদের মাথায় আছে তার নাম শনি। তবে শনির মতো এতো বড় এবং স্পষ্ট না হলেও নেপচুনেরও বলয় আছে। পাঁচটি সারি সারি বলয়ের মাধ্যমে নেপচুনের বলয় গঠিত। এগুলোর নাম যথাক্রমে এরাগো, গ্যালি, লাসেল, লা ভেরিওর এবং এডামস। যে প্রধান বিজ্ঞানীগণ নেপচুন আবিষ্কারে সাহায্য করেছেন তাদের নামে নামকরণ করা হয়েছে এই বলয়গুলোর। ভয়েজার-২ এর তথ্যের ওপর বিশ্লেষণ করে দেখে গিয়েছে, পাথুরে টুকরো আর ধূলিকণায় তৈরি নেপচুনের এই বলয়গুলো ইউরেনাসের বলয়ের চেয়েও নবীন। ধারণা করা হয় নেপচুনের সঙ্গে তার কোনো চাঁদের ধাক্কা লাগার ফলে এই বলয়গুলো তৈরি হয়েছে। অনেকে মনে করেন নেপচুনের শিথিল হয়ে যাওয়া অংশ বেরিয়ে এসে এই বলয়ের সৃষ্টি করেছে।

নীলের জন্যই নেপচুন
নেপচুন মূলত রোমানদের সমুদ্রের দেবতার নাম। আর সেই নাম দিয়েই গ্রহটিকে নামকরণ করা হয়েছে গ্রহটি নীল বলে। গ্রহকে নাম দেওয়ার প্রথা প্রথম শুরু করে এই রোমানরাই। তারা তাদের চোখে দৃশ্যমান গ্রহ এবং নক্ষত্রদের নাম দিতো তাদের দেবতাদের নামে। টেলিস্কোপ আবিষ্কারের পরেও রোমানদের নাম দেওয়ার এই প্রথা চলতে থাকে। নেপচুন যখন আবিষ্কার হয় এটি পৃথিবীর নীল সমুদ্রের মতোই মনে হয় জ্যোতির্বিদদের কাছে, যে কারণে রোমানদের সমুদ্রের দেবতা নেপচুনের নামেই নামকরণ করা হয় গ্রহটির।

নেপচুনের ভর পৃথিবীর ১৭ গুণ
নেপচুন সৌরজগতের চতুর্থ বৃহত্তম এবং তৃতীয় ভারী গ্রহ যা ভরে ইউরাসকেও অতিক্রম করে। যদিও নেপচুনের সমগ্র ভর বৃহস্পতির মাত্র ৫ শতাংশ।

নেপচুনের চাঁদের সংখ্যা ১৪
আমরা চাঁদ বলতে শুধু আমাদের পৃথিবীর একটি চাঁদকেই বুঝি। কিন্তু গ্রহভেদে তার উপগ্রহ কিংবা চাঁদের সংখ্যা বিভিন্নরকম। যেমন মঙ্গলের চাঁদ দুইটি। কিন্তু নেপচুনের একটি নয়, দুইটি নয়, ১৪টি চাঁদ রয়েছে। নেপচুনের চাঁদদের মধ্যে সবচেয়ে বড় চাঁদের নাম ট্রাইটন। লা ভেরিওরের নেপচুন আবিষ্কারের পরের বছর লাসেল আবিষ্কার করেন নেপচুনের এই উপগ্রহটি। আর ট্রাইটন নেপচুনের আশেপাশে একমাত্র গোলাকার বস্তু, এছাড়া নেপচুনের অন্য উপগ্রহগুলো ঠিক গোলাকার নয়, এবড়োথেবড়ো প্রকৃতির। নেপচুনের অন্য উপগ্রহদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হল নিরেড, প্রোটেউস, থালসা, গাল্যাটা, নায়াড, ডেসপিনা, লরিসা ইত্যাদি। নেপচুনের সর্বশেষ আবিষ্কৃত উপগ্রহের নাম এস/২০০৪ এন১। এটিই নেপচুনের সবচেয়ে ক্ষুদ্রতম উপগ্রহ।

প্লুটোর কারণেই নেপচুন সর্বশেষ গ্রহ
১৯৩০ সালে আবিষ্কারের পর থেকে প্লুটোকেই সৌরজগতের সর্বশেষ গ্রহ হিসেবে ধরা হতো। কিন্তু ২০০৩ সালে ইন্টারন্যাশনাল অ্যাস্ট্রোনমিক্যাল ইউনিয়নের সাধারণ সভায় প্লুটোকে গ্রহের তালিকা থেকে বাদ দেওয়া হয়। কারণ একটি পূর্ণ গ্রহ হতে যে ভরের সঙ্গে সঙ্গে যে সুস্থিতি অর্জন করার প্রয়োজন সেটি প্লুটোর নেই। যে কারণে প্লুটোকে গ্রহের তালিকা থেকে বাদ দিয়ে বামন গ্রহ নাম দেওয়া হয়। এরপর থেকে নেপচুনকেই ধরা হয় সৌরজগতের সর্বশেষ ও পৃথিবীর থেকে সবচেয়ে দূরবর্তী গ্রহ হিসেবে।




রাইজিংবিডি/ঢাকা/১৫ জুলাই ২০১৭/ফিরোজ

Walton
 
   
Marcel