ঢাকা, শুক্রবার, ১৫ বৈশাখ ১৪২৪, ২৮ এপ্রিল ২০১৭
Risingbd
সর্বশেষ:

বাংলার সেরা ছয় ঝরনা

ফাতিমা রুনা : রাইজিংবিডি ডট কম
 
   
প্রকাশ: ২০১৬-১০-৩১ ৬:২১:১৩ পিএম     ||     আপডেট: ২০১৭-০৩-০৮ ৪:২০:২৫ পিএম

ফাতিমা রুনা : প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের লীলাভূমি আমাদের এই জন্মভূমি। দেশের সর্বত্র ছড়িয়ে রয়েছে দেশের স্বপ্নিল সৌন্দর্য। যান্ত্রিক কর্মব্যস্ত জীবনে একটু প্রাণ জুড়াতে ঘুরে বেড়ানোর বিকল্প নেই। চাইলেই সামান্য কিছু প্রস্তুতি নিয়ে বেড়িয়ে আসা যায় দেশের ভেতরের অসামান্য সব দৃষ্টিনন্দন জায়গাগুলোতে। চলুন আজ জেনে নেই বাংলাদেশের কিছু মনোমুগ্ধকর ঝরনার কথা। অপরূপ সেই ঝরনাগুলোর মধ্যে জাদিপাই, খৈয়াছড়া, তৈদুছড়া, বাকলাই, হামহাম ও মাধবকুণ্ড অন্যতম।

 

জাদিপাই ঝরনা : বান্দরবান জেলার জাদিপাই পাড়ায় অবস্থিত এই পাহাড়ি ঝরনা। ঝরনাটির প্রতি ভাঁজে ভাঁজে রয়েছে মাদকতাময় সৌন্দর্য। প্রায় ২৫০ ফুট উপর থেকে অবিরাম ঝরে পড়া পানির তিনটি ধাপে সূর্যকিরণ পড়তেই তৈরি হয় বর্ণিল রংধনু। সবার চোখের আড়ালে বান্দরবানের গহীন অরণ্যে থাকা এই ঝরনা সত্যিই আপনাকে অবাক করবে।

 

জাদিপাই ঝরনা দেখতে হলে প্রথমে আপনাকে যেতে হবে বান্দরবান। ঢাকা থেকে বান্দরবানে চারটি কোম্পানির বাস যায়। ইউনিক, শ্যামলী, এস আলম ও ডলফিন। ভাড়া জনপ্রতি ৪৩০ টাকা। বান্দরবান নেমে যেতে হবে কাইক্ষ্যংঝিরি। স্থানীয় বাসে বা চান্দের গাড়িতে সেখানে দুই ঘণ্টার মধ্যেই পৌঁছে যাবেন। বাসভাড়া ৮০ টাকা। চান্দের গাড়ি রিজার্ভ গেলে পড়বে তিন হাজার ৫০০ থেকে চার হাজার ২০০ টাকা পর্যন্ত। কাইক্ষ্যংঝিরি থেকে রুমাবাজার পর্যন্ত নৌকাভাড়া জনপ্রতি ৩০ টাকা। রিজার্ভ গেলে এক হাজার টাকা। রুমা থেকে যেতে হবে বগা লেক পর্যন্ত। এখানে চান্দের গাড়ি ভাড়া দুই হাজার টাকার মতো। জাদিপাই যেতে হলে আপনাকে এই রুট ধরেই যেতে হবে। এ ক্ষেত্রে গাইড ভাড়া বাবদ খরচ পড়বে দুই হাজার ৫০০ টাকা। বগা লেকে গাড়ি থেকে নেমে পাহাড় ডিঙিয়ে উঠতে পারেন ‘সিয়াম দিদি’র হোস্টেলে। খুব ভালো আপ্যায়ন পাবেন। সেখান থেকে শুধুই হাঁটাপথ। চিংড়ি ঝরনা, দার্জিলিংপাড়া, কেওক্রাডং, পাসিংপাড়া আর জাদিপাইপাড়া পার হয়ে কিছুক্ষণের মধ্যেই পৌঁছে যাবেন জাদুকরি ঝরনা জাদিপাইতে।

 

 

খৈয়াছড়া ঝরনা : খৈয়াছড়া ঝরনা চট্টগ্রামের মিরসরাই পাহাড়ে অবস্থিত। মিরসরাই উপজেলার খৈয়াছড়া ইউনিয়নের বড়তাকিয়া বাজারের উত্তর পাশে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের ৪.২ কিলোমিটার পূর্বে এই ঝরনার অবস্থান। খৈয়াছড়া এলাকার পাহাড়ে অবস্থান বলে এর নামকরণ করা হয়েছে খৈয়াছড়া ঝরনা। একে বাংলাদেশের ‘ঝরনা রানী’ বলা হয়।

 

আপনি যদি ঢাকা থেকে যান তাহলে ঢাকার যে কোনো বাস কাউন্টার থেকে চট্টগ্রামগামী বাসে উঠবেন। চট্টগ্রামের মিরসরাই পার হয়ে বারতাকিয়া বাজারের আগে খৈয়াছড়া আইডিয়াল স্কুলের সামনে ঢাকা চট্টগ্রাম রোডে নামবেন। ঢাকা চট্টগ্রাম রোড থেকে ঝিরি পর্যন্ত আপনি সিএনজি নিয়ে যেতে পারবেন।

 

 

তৈদুছড়া ঝরনা : অসাধারণ এই ঝরনাটি ‘শিবছড়ি ঝরনা’ নামেও পরিচিত। তৈদুছড়া ঝরনা খাগড়াছড়ি জেলার দীঘিনালা উপজেলায় অবস্থিত। ৩০০ ফুট উঁচু পাহাড় হতে গড়িয়ে পড়া পানি এসে পড়ছে পাথুরে ভূমিতে। অন্য সকল ঝরনার মতো এর পানি সরাসরি উপর হতে নিচে পড়ে না।  পাহাড়ের গায়ে সিঁড়ির মত তৈরি হওয়া পাথুরে ধাপগুলো অতিক্রম করে তারপর নিচে পড়ছে। অবর্ণনীয় এই সৌন্দর্য দেখতে তৈদুছড়া যাবেন ভরা বর্ষায়। এখানে মূলত দুটি ঝরনা দেখতে পাবেন। কয়েকবছর আগে এখানে দুটি ঝরনা আবিষ্কৃত হয়।

 

ঢাকা থেকে শ্যামলী, হানিফ ও অন্যান্য পরিবহনের বাসে খাগড়াছড়ি যেতে পারবেন। এরপর আপনি বাসে করে দীঘিনালা যেতে পারবেন। দীঘিনালা হতে সামনে চাপ্পাপাড়া পর্যন্ত যাওয়া যায়। এরপর আর গাড়ি চলার কোনো পথ না থাকায় বাকী পথটুকু হেঁটেই যেতে হয়। দীঘিনালা হতে সব মিলিয়ে তৈদুছড়ি পর্যন্ত পৌঁছতে প্রায় ৪ ঘণ্টার মতো সময় লাগে।

 

 

মাধবকুণ্ড : বাংলাদেশের সুউচ্চ জলপ্রপাত মাধবকুণ্ড। সিলেট বিভাগের মৌলভীবাজার জেলার বড়লেখা নামক উপজেলায় এই সুন্দর নয়নাভিরাম জলপ্রপাতটির অবস্থান। যে পাহাড়ের গা বেয়ে পানি গড়িয়ে পড়ছে সেই পাহাড়টি সম্পূর্ণ পাথরের। ফলে এটি ‘পাথারিয়া পাহাড়’ নামেও পরিচিত। এই পাহাড়ের উপর দিয়ে গঙ্গামারা ছড়া বহমান। বর্ষাকাল এলে মূল ধারার পাশেই আরেকটা ছোট ধারা তৈরি হয় এবং ভরা বর্ষায় দুটো ধারাই মিলেমিশে একাকার হয়ে যায় পানির তীব্র তোড়ে।

 

যদি ট্রেনে যেতে চান তাহলে প্রথমেই আপনাকে যেতে হবে সিলেটের কুলাউড়া জংশন। সেখান থেকে মাধবকুণ্ডের দূরত্ব প্রায় ৩৫ কি.মি.। আপনি সেখান থেকে সিএনজি রিজার্ভ করে সরাসরি মাধবকুণ্ড যেতে পারেন। এছাড়া বাসেও যাওয়া যাবে। এর মধ্যে শ্যামলী, রূপসী বাংলা, হানিফ, সোহাগ, এনা, ইউনিক উল্লেখযোগ্য। সরাসরি বাসে গেলে বড়লেখার একটু আগে ‘কাঠাঁলতলী’ নামক জায়গায় নামবেন। তবে আপনাকে মাধবকুণ্ড চূড়ার কাছে যেতে হলে এখান থেকে অবশ্যই সিএনজি বা রিকশা নিতে হবে।

 

 

হামহাম ঝরনা : হাম হাম কিংবা হামহাম বা চিতা ঝরনা। বাংলাদেশের মৌলভীবাজার জেলার কমলগঞ্জ উপজেলার রাজকান্দি সংরক্ষিত বনাঞ্চলের গভীরে কুরমা বন বিট এলাকায় অবস্থিত একটি প্রাকৃতিক জলপ্রপাত। শ্রাবণের প্রবল বর্ষণে যখন পুরো জঙ্গল ফিরে পায় তার চিরসবুজ রূপ, হয়ে ওঠে সতেজ আর নবযৌবনা। হামহাম ঝরনা তখন ফিরে পায় তার আদিরূপ। অপরুপ সৌন্দর্য। হাম হামের কাছে যাওয়া যতটা সহজ ভাবছেন কাজটা কিন্তু ততটা সহজ নয়। এর গভীর জঙ্গলে রয়েছে সাপ, কুমির বিশেষ করে জোঁকের অত্যাচার। কিন্তু সকল বাধা পেরিয়ে আপনি যখন হাম হামের কাছে পৌঁছাবেন তখন সব ভয়-ক্লান্তি দূর হয়ে যাবে।

 

প্রথমেই আপনাকে যেকোন স্থান থেকে পৌঁছতে হবে সিলেট, শ্রীমঙ্গল কিংবা সরাসরি মৌলভীবাজার। সেখান হতে কমলগঞ্জ। যেকোন ভাবেই আপনি পৌঁছে যেতে পারেন কমলগঞ্জ। কমলগঞ্জ থেকে আদমপুর বাজার পর্যন্ত বাস ভাড়া পড়বে ১০ টাকা। সেখান থেকে যেতে হবে আদিবাসী বস্তি তৈলংবাড়ী কিংবা কলাবন বস্তি পর্যন্ত। সেখান থেকে আরও প্রায় ৮ কি.মি. পথ পায়ে হেঁটে এগিয়ে গেলেই দেখা মিলবে হামহাম জলপ্রপাতের।

 

 

বাকলাই ঝরনা : বাকলাই ঝরনা সম্ভবত দেশের সবচেয়ে উঁচু ঝরনা। বান্দরবানের পাহাড়ের গভীরে বাকলাই গ্রামে অবস্থিত এই ঝরনাটি প্রায় ৩৮০ ফুট উঁচু। বহু বছর ধরে ট্রেকারদের সুপরিচিত ক্যাম্পিং এই বাকলাই । এর সবচেয়ে বড় কারণ এখানে আছে আর্মি ক্যাম্প, যা অভিযাত্রীদের জন্য নিরাপদ। যাই হোক এই বাকলাই-এর পথে পাহাড়ি ছোট নদীও সবার চোখে পরবে।

 

বাকলাই ঝরনা থানচিতে অবস্থিত হওয়ায় আপনাকে প্রথমেই বান্দরবান যেতে হবে। ঢাকা থেকে সড়কপথে বান্দরবানে যেতে প্রায় ৭ ঘণ্টা সময় লাগবে। বান্দরবান থেকে বাস অথবা চান্দের গাড়িতে করে প্রায় সাড়ে চার ঘণ্টায় প্রায় ৭৯ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত থানচিতে পৌঁছতে পারবেন। থানচি বাজার থেকে বাকলাই ঝরনায় যেতে কয়েক ঘণ্টা সময় লাগবে এবং এ সময় আপনাকে বেশকিছু পাড়া অতিক্রম করতে হবে। যেমন টুটংপাড়া, বোর্ডিং হেডম্যানপাড়া, কাইতনপাড়া ইত্যাদি। ঝরনার উপরে উঠতে চাইলে প্রায় এক ঘণ্টা সময় লাগবে।

 

 

সাবধানতা : যাওয়ার আগে অবশ্যই কলাবনপাড়ার স্থানীয়দের কাছ থেকে ভালো-মন্দ জেনে যাওয়া উচিৎ। সঙ্গে সরিষার তেল আর লবণ রাখতে হবে। কেননা জোঁকের আক্রমণ থেকে রক্ষা পেতে এই দুটি ব্যবস্থা কার্যকরী। হাতে একটা ছোট বাঁশের টুকরা বা লাঠি সঙ্গে নেওয়া ভালো। এতে পাহাড়ি পথে শরীরের ভারসাম্য রক্ষা করা থেকে শুরু করে সাপ বা অন্যান্য বন্যপ্রাণী থেকে নিরাপদ থাকা যাবে। সঙ্গে শুকনা খাবার, বিশুদ্ধ পানি আর খাবার স্যালাইন রাখতে ভুলবেন না।

 

 

রাইজিংবিডি/ঢাকা/৩১ অক্টোবর ২০১৬/তারা

ফাতিমা রুনা : প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের লীলাভূমি আমাদের এই জন্মভূমি। দেশের সর্বত্র ছড়িয়ে রয়েছে দেশের স্বপ্নিল সৌন্দর্য।
Walton Laptop