ঢাকা, সোমবার, ৫ ভাদ্র ১৪২৪, ২১ আগস্ট ২০১৭
Risingbd
শোকাবহ অগাস্ট
সর্বশেষ:

খুদে টুরিস্ট গাইড

ছাইফুল ইসলাম মাছুম : রাইজিংবিডি ডট কম
প্রকাশ: ২০১৬-১১-১৮ ৩:৪৮:৫৬ পিএম     ||     আপডেট: ২০১৭-০৮-১৩ ৪:৪৬:৩৮ পিএম
আশ্রাফুল ইসলাম, ছবি: কামরান সোহেল

ছাইফুল ইসলাম মাছুম : স্তরে স্তরে সাজানো পাথর, হাজার রকমের ছোট-বড় পাথর সেখানে। পাথর ছুঁয়ে ছুটে চলছে স্বচ্ছ শীতল জল রাশি। গা ঘেষে চির সবুজ পাহাড়সারি। পূর্ব দিকে ভারতের মেঘালয় রাজ্যের পর্বতমালা, প‌শ্চিমে বগাইয়া গ্রাম, মুসলিম পাড়া। মেঘালয়ের পাহা‌ড়ি ঝরনা থেকে জলের স্রোতধারা এসে মিলছে পিনাই নদীতে। পিনাই নদীর স্থানীয় আরেক নাম বিছানাকান্দির গাঙ। সুউচ্চ পর্বতমালার পাদদেশ ও পিনাই নদীর তীর মূলত ‘বিছানাকান্দি’ নামে পরিচিত। জল পাহাড়ের অপূর্ব সৌন্দর্য  উপভোগ করতে সিলেটের বিছানাকান্দিতে বছরজুড়েই নামে পর্যটকদের ঢল।

 

দেশি-বিদেশি পর্যটকদের সহযোগিতায় এগিয়ে আসেন স্থানীয়রা। দর্শনার্থীদের সুবিধার্থে গড়ে উঠেছে ছোট ছোট ব্যবসা প্রতিষ্ঠান, খাবার হোটেল। দর্শনার্থীদের সহযোগিতায় এগিয়ে এসে মাত্র এক বছরেই খুদে টুরিস্ট গাইড হিসেবে পরিচিতি পেয়েছেন স্থানীয় মুসলিম পাড়ার আশ্রাফুল ইসলাম। তার বয়স আট। দর্শনার্থীদের সঙ্গে দেখা হলে, হাসি মুখে তার প্রথম সম্ভাষণ, ‘স্যার আমি আপনাদের হেল্প করি?’

 

এই খুদে টুরিস্ট গাইড দর্শনার্থীদের পথ দেখিয়ে নিয়ে যান ঝরনাপাড়ে, জল-পাথরে গোসলের সময় দেন ব্যাগ ও জুতার নিরাপত্তা, কখনো ছবি তুলে দেন। কখনো দর্শনার্থীদের নৌকাযোগে নিয়ে যান পাংতুমাই হয়ে জাফলং-এর দিকে। প্রতি বৃহস্পতিবার কৌতূহলী দর্শনার্থীদের নিয়ে যান ভারতের মেঘালয় রাজ্যের সীমান্ত হাটে। পর্যটকদের সঙ্গে থেকে বেশ কয়েকটি ইংরেজি শব্দ মুখস্থ হয়ে গেছে আশ্রাফের।

 

 

বাড়ির কাছেই বগাইয়া প্রাথমিক বিদ্যালয়। পারিবারিক দারিদ্র্য নিত্যসঙ্গী। যে কারণে কখনোই স্কুলের সীমানায় যাওয়া হয়নি তার। বাবা বিল্লাল শীতের মৌসুমে পিনাই নদীতে  পাথর শ্রমিকের কাজ করেন। বর্ষায় চলে যান পরিবার থেকে বহু দূরে। চট্রগ্রামের হালিরশহরে রাজমিস্ত্রির কাজ করেন। ছয় ভাই-বোনের বড় পরিবারে, আশ্রাফ ৩য়। দরিদ্র পরিবারে তিন বেলা আহার জুটানো যেখানে ভাগ্যের ব্যাপার, সেখানে পড়ালেখা করার স্বপ্ন দেখাও যেন পাপ।

 

প্রতিদিন রুটিন করেই দর্শনার্থীদের সঙ্গে সময় কাটান আশ্রাফুল। দিন শেষে খুশি মনে দর্শনার্থীরা কিছু টাকা দেন আশ্রাফুলের হাতে। তাতেই সে বেশ খুশি। দু মাস আগে জমানো ২১০ টাকা দিয়ে পর্যটকদের জন্য বড় ছাতা কিনেছেন আশ্রাফুল। প্রচণ্ড রোদ ও বৃষ্টির সময় পর্যটকদের ছাতা ভাড়া দেন। খুদে টুরিস্ট গাইড আশ্রাফুল জানান, প্রতিদিন ছাতা ভাড়া ও গাইড হিসেবে যে টাকা পান, তার থেকে কিছু টাকা পরিবারকে দেন। আশ্রাফুলের ইচ্ছা বড় হয়ে সামর্থ্য হলে বিছানাকান্দিতে আবাসিক হোটেল গড়ে তুলবেন। যাতে দূর থেকে আসা দেশি-বিদেশি পর্যটকরা পাহাড়ের পাদদেশে বিছানাকান্দিতে রাত্রি যাপন করতে পারে।

 

কীভাবে যাবেন বিছানাকান্দি : রাজধানী ঢাকাসহ দেশের যেকোনো জেলা থেকে সর্বপ্রথম আপনাকে আসতে হবে সিলেটে।  এখানে পর্যটকের থাকার জন্য অনেক হোটেল-মোটেল রয়েছে। ৩০০ থেকে শুরু করে ছয় হাজার টাকা পর্যন্ত রুম ভাড়া পাওয়া যায় সিলেটে। নিরাপত্তা ব্যবস্থাও বেশ ভালো। বিছানাকান্দি যেতে হলে সর্বপ্রথম আপনাকে নগরীর আম্বরখানা পয়েন্ট যেতে হবে। সেখান থেকে বিমানবন্দর রোড ধরে সিএনজিযোগে যেতে হবে বিছানাকান্দি। সিএনজি বা লেগুনা হাদারপার বাজার পর্যন্ত রিজার্ভ করে গেলে ভালো হয়। নয়তো যানবাহন সংকটে ফিরতে সমস্যা হবে। সিএনজি পাঁচজন মিলে নিলে জনপ্রতি ৪০০ টাকায় সাধারণত ভাড়া নেওয়া হয়। তবে লোকাল গেলে ভাড়া জনপ্রতি ১০০ টাকা। হাদারপার থেকে পিনাই নদী হয়ে নৌকাযোগে বিছানাকান্দি যেতে ভাড়া গুনতে হবে এক হাজার ৫০০ থেকে দুই হাজার টাকা। নৌকা ভাড়া ঠিক করার সময় আপনাকে দরদাম ঠিক করে নিতে হবে। তা না হলে অতিরিক্ত ভাড়া চেয়ে বসতে পারে। বিছানাকান্দি যেতে হয় সিলেটের আম্বরখানা পয়েন্ট হয়ে এয়ারপোর্ট রোড দিয়ে।  অথবা সারিঘাট হয়ে সিলেট-জাফলং সড়ক ধরেও যেতে পারেন হাদারপার বাজার পর্যন্ত। বিছানাকান্দি গিয়ে পথঘাট চিনে নিতে খুদে টুরিস্ট গাইড আশ্রাফুল ইসলামের খোঁজ নিতে পারেন। সে জন্য রইল তার পরিবারের একটি ফোন নম্বর :  ০১৭১০৬৪২৫১৭

 

 

খাবার-দাবার : বিছানাকান্দিতে আগে থাকা-খাওয়ার তেমন ভালো ব্যবস্থা ছিল না। তবে এখন পিনাই নদীর পানিতে খাবারের জন্য রয়েছে  দৃষ্টিনন্দন ‘জলপরী ভাসমান রেস্টুরেন্ট’। দর্শনার্থীরা চাইলে আনন্দ-ফূ‌র্তির পর জলপরীতে ফ্রেশ হয়ে খেয়ে নিতে পারেন দুপুরের খাবার। এছাড়া অনেক দোকান  রয়েছে, যেখানে পাবেন ভাজা পোড়া নাস্তাসহ রকমারি খাবার।

 

 

রাইজিংবিডি/ঢাকা/১৮ নভেম্বর ২০১৬/তারা

Walton Laptop