ঢাকা, শুক্রবার, ১৫ বৈশাখ ১৪২৪, ২৮ এপ্রিল ২০১৭
Risingbd
সর্বশেষ:

আভিজাত্যে নন্দিত টিপু সুলতানের প্রাসাদ

ফেরদৌস জামান : রাইজিংবিডি ডট কম
 
   
প্রকাশ: ২০১৬-১২-০৬ ১:৪২:৪২ পিএম     ||     আপডেট: ২০১৭-০৩-০৮ ৪:১৩:৪১ পিএম
প্রাসাদজুড়ে রাতের আলোকসজ্জা

ফেরদৌস জামান : আমরা জানি, ইন্ডিয়ার উন্নত জায়গাগুলোর মধ্যে ব্যাঙ্গালুরু একটি। মহানগর হিসেবে সেখানকার সংস্কৃতি ইন্ডিয়ার অন্যান্য বড় শহরের তুলনায় বেশ এগিয়ে। ভালোভাবে নিত্য জীবন যাপনের পাশাপাশি সেখানে চিত্ত বিনোদনেও রয়েছে বেশি রুচির প্রকাশ। যদি ভ্রমণের কথাই বলি, আমি যে সময় সেখানে ছিলাম, দেখেছি ভ্রমণ তাদের জীবনের গুরুত্বপূর্ণ অনুষঙ্গ। একে কেন্দ্র করে স্থানীয়ভাবে গড়ে উঠেছে আলাদা একটি বিশেষ শিল্প।

 

শহরের প্রধান প্রধান জায়গায় গেলে চোখে পড়ে টুর অ্যান্ড ট্রাভেল এজেন্সির অনেক অফিস। সেখানে পর্যটক আকর্ষণে ডিসপ্লে করা থাকে চমকপ্রদ অনেক কিছু্। স্থানীয় নানান ঐতিহাসিক স্থান ও পর্যটন আকর্ষণের যত জায়গা আছে সে সবের ছবি তো থাকেই। এজেন্সির লোকেরা কখনও বা ফুটপাতে এসে চলাচলকারী মানুষের হতে তুলে দেয় বিভিন্ন ভ্রমণ প্যাকেজের লিফলেট। সুযোগ পেলে তারা সেগুলো থেকে দু’চার কথা বর্ণনা করারও চেষ্টা করে। এমনিভাবে আর একটু অগ্রসর হতে পারলেই তারা গ্রাহকদের অফিসে আমন্ত্রণ জানিয়ে চা-কফিতে আলাপ জমিয়ে তোলে। তারপর গ্রহকের চাহিদা ও রুচি অনুযায়ী প্রদর্শন করে তাদের বিভিন্ন প্যাকেজ। প্যাকেজও রয়েছে অনেক। ব্যাঙ্গালুরু শহরের গুরুত্বপূর্ণ স্থান ঘুরে দেখার জন্য আধা বেলা, এক বেলার প্যাকেজ যেমন রয়েছে, শহরের আশপাশে স্বল্প দূরত্বের প্যাকেজও রয়েছে। অর্থাৎ আপনি যেভাবে চাইবেন তারা চেষ্টা করবে সেভাবে।

 

দূরবর্তী জায়গার জন্য বিশেষ প্যাকেজের ব্যবস্থা তো আছেই। শহরের গুরুত্বপূর্ণ সড়কগুলোর পাশে টুর অপারেটরদের এমন আয়োজন ব্যক্তিগতভাবে আমার নিকট ছিল সম্পূর্ণ নতুন একটি বিষয়। মফস্বল শহরের একজন সাধারণ নাগরিক হিসেবে স্বাভাবিকভাবেই মনের ভেতর একটি ভাবনা কাজ কারত- এমন করে ঘোরাঘুরির কী দরকার? ঘুরতে যাব তার জন্য আবার নিজেকে অন্যের নিকট সপে দিতে হবে কেন? অনেক সময় এমনও দেখেছি, ভ্রমণ শেষে বাস থেকে পর্যটকরা নামছে, তাদের চোখে-মুখে তৃপ্তি আর স্বার্থকতার ঝলমলে বহিঃপ্রকাশ। সম্পূর্ণ ব্যাপারটি আমাকে এক ধরণের ভাবনায় ফেলে দিত। কারণ আজ থেকে ১৫-১৬ বছর আগে আমরা এমন আয়োজনের মাধ্যমে ভ্রমণের কথা ভাবতে পারতাম না। তার মানে টুর অপারেট করার মত কোন প্রতিষ্ঠান যে বাংলাদেশে তখন ছিল না তা নয়। একেবারেই হাতে গোন দু’চারটি প্রতিষ্ঠান থাকলেও বর্তমানের মত মধ্যবিত্তের এতটা নাগালের মধ্যে ছিল না তাদের সেবা। আর মফস্বল শহরে তো এসব ছিল ভাবনার অতীত।

 

দিনের আলোয় মহীশূর প্রাসাদ 

 

যাইহোক, এভাবে প্রতিদিন ফুটপাথ দিয়ে হাটি আর দেখতে থাকি ব্যাঙ্গালুরুর ভ্রমণ আয়োজন। সব থেকে বেশি চোখে পড়ে মহীশূর প্যালেসের ছবি সংবলিত অফার। এত চমৎকার একটি প্যালেস, প্রথম দেখাতেই যে কারও মনে আগ্রহ চেপে বসার মতো। এর মধ্যে নিজ উদ্যোগে ভ্রমণ যে একেবারে থেমে আছে তা নয়। আশপাশের দু’একটি জায়গায় ঘেরাঘুরি এক রকম চলমান। ক্রমবর্ধমান এই ভ্রমণের ঝোঁক একদিন আমাকে টেনে নিয়ে যায় মহানগরের ট্রাভেল এজেন্সি পাড়ায়। একটি দুইটি করে অফিস ঘুরছি আর ধারণা নিচ্ছি তাদের অফার সম্পর্কে। বিশেষ করে মহীশূর প্যালেস ভ্রমণের প্যাকেজ। অবশেষে সিদ্ধান্ত নেই দুই দিন পরে ইতিহাসখ্যাত মহীশূর প্যালেস দেখতে রওনা করছি। দুই দিন কাটল অনেক ভাবনা এবং আয়োজনের মধ্য দিয়ে। কার সাথে যাচ্ছি, কারা হবে সহযাত্রী, তাছাড়া মানুষ হিসেবে তারা কেমন হবে ইত্যাদি।

 

নির্দিষ্ট দিন নির্ধারিত স্থান থেকে বাস ছেড়ে দিল মহীশূরের উদ্দেশ্যে। ব্যাঙ্গালুরুর অবস্থান সমুদ্র সমতল থেকে প্রায় নয়শ মিটার উঁচুতে। শহর ছেড়ে বাস ক্রমেই প্রবেশ করল পাহাড়ি পথে। জানালা দিয়ে শুধু বাহির দেখছি আর দেখছি! এরই মধ্যে খাতির জমে উঠল পাশের আসনে বসা স্কুল পড়ুয়া ভিবেক কানাড়ির সাথে। নবম শ্রেণির ছাত্র হলেও ভিবেক বেশ সচেতন। বাবা-মা’র সাথে সেই ছোটবেলা থেকে দেশ-বিদেশের বিভিন্ন জায়গা ভ্রমণ করে ইতিমধ্যেই অর্জন করেছে ব্যাপক অভিজ্ঞতা। এদিকে ভিবেকের তুলনায় আমার অভিজ্ঞতা একেবারেই তুচ্ছ। দু’জনের বয়সের ব্যাবধান চার বছর হলেও বন্ধুত্ব জমে উঠতে তা বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারেনি। জানালার ফাঁক দিয়ে প্রকৃতির বৈচিত্র দর্শন আর ভিবেকের অভিজ্ঞতা থেকে দু চারটি কথা, কীভাবে যে কেটে গেল অতটা সময় বুঝতে পারিনি। অথচ, গত দুই দিন কী ভাবনাতেই না ছিলাম!  ঘুঁচে গেল আমার সমস্ত ভাবনা, পৌঁছে গেলাম প্রাসাদের নগরী মহীশূর।

 

দিনের আলোয় মহীশূর প্রাসাদ

 

আশপাশের বেশ কয়েকটি স্থাপনা নিদর্শন পরিদর্শন করতে করতে কেটে গেল অনেকটা সময়। এরপর সর্বশেষ লক্ষ্য মহীশূর প্রাসাদ। প্রাসাদটি একটি দূর্গ মাঝে অবস্থিত। একজন অভিজ্ঞ গাইড বর্ণনা করছেন মহীশূরের বিস্তারিত। কেউ শুনছে তো কেউ নিজ খেয়ালে চলমান। ভারতবর্ষ সম্পূর্ণরূপে আয়ত্বে এনে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি যেদিন ঘোষণা করতে পেরেছিল, সেই দিনটি ছিল ১৭৯৯ সালের ৪ মে। এই দিন মহীশূরের বাঘ (শের-ই-মহীশূর) বলে খ্যাত টিপু সুলতানকে তারা হত্যা করতে সক্ষম হয়। এরপর ওয়াদিয়ার বংশ মহীশূরের রাজ সিংহাসনে পূনঃঅধিষ্টিত হয়। বর্তমান প্রাসাদটির স্থলে ছিল একটি কাঠ নির্মিত প্রাসাদ, যা ১৮৯৭ সালে এক ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে পুড়ে ভস্ম হয়ে যায়। তৎকালীন রাজা ছিলেন রাজর্ষী কৃষ্ণরাজা ওয়াদিয়ার। মহারাজা একই জায়গায় নতুন একটি প্রাসাদ নির্মাণ করেন। প্রাসাদের নকশা প্রনয়ণ ও নির্মাণের দায়িত্ব দেওয়া হয় ইংরেজ স্থপতি লর্ড হেনরি আরউইনকে। রাজ পরিবার ছিল দেবতা চামুন্ডির ভক্ত। সুতরাং দেবতার প্রতি ভক্তি ও আনুগত্যের স্বাক্ষরস্বরূপ প্রাসাদ নির্মিত হয়েছে চামুন্ডি পাহাড়মুখী করে। দীর্ঘ প্রায় ১৫ বছর ধরে চলে নির্মাণ কাজ। অবশেষে ১৯১২ সালে তা শেষ হয় এবং ব্যায় হয় তৎকালীন ৪৫ লক্ষ মূদ্রা। নির্মাণের ক্ষেত্রে ভারতীয় সাংস্কৃতিক ও ধর্মীয় ঐতিহ্যের অভূতপূর্ব সংমিশ্রণ ঘটানো হয়েছে। ফলে ভারতবর্ষে আগ্রার তাজমহলের পর দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে এই প্রাসাদ। প্রতি বছর প্রায় ৬৫ লাখ দেশী-বিদেশী পর্যটক মহীশূরের প্রাসাদ পরিদর্শন করে।

 

দিনটি ছিল রবিবার। সুতরাং দর্শনার্থীর ভিড় ছিল লক্ষ করার মতো। গুম্বুজগুলি অনেক দূর থেকেই দেখা দিল। বিশেষ করে দেড়শ ফুট উঁচু গুম্বুজটি প্রাসাদের নিশানা হিসেবে সবার আগে দেখা দেয়। যতই এগিয়ে যাচ্ছি সুবিশাল স্থাপনাটি স্পষ্ট হয়ে উঠছে। চারিপাশে সাজানো বাগান পেরিয়ে কংক্রীটের চমৎকার পাথওয়ে। প্রাসাদে রয়েছে তিনটি প্রবেশ দ্বার। সাধারণ দর্শনার্থীদের জন্য দক্ষিণের দ্বার উন্মুক্ত। চত্বরে প্রবেশের পর পাথওয়ে দিয়ে অগ্রসর হতে লাগলাম। তিন তলা বিশিষ্ট প্রাসাদের সমস্ত খুঁটি দামি ও বিরল মার্বেল পাথরে মোড়ানো। কোনো গুম্বুজের শীর্ষদেশ সোনালী পাত, আবার কোনোটি অন্যান্য ধাতব পাতে ঢেকে দেওয়া। চোখ ধাধানো  এমন অপরূপ নির্মাণশৈলী দেখে মনে হলো- না জানি কি পরিমাণ আভিজাত্যে ভরা থাকত এখানকার বাসিন্দাদের জীবন!

 

প্রাসাদের অভ্যন্তরে সংরক্ষিত রাজা ওয়াদিয়ারের সিংহাসন

 

ভিবেক বাবা-মাকে ছেড়ে বলতে গেলে আমার সাথেই আছে। ওদিকে তার বাবা-মা’রও যেন কোনো চিন্তা নেই। রাজার প্রধান দরবার হল এখনও পূর্বের রূপে অক্ষত। রয়েছে একটি বিশাল সংগ্রহশালা, যেখানে প্রদর্শিত রয়েছে ঊনবিংশ শতকের স্থানীয় বিভিন্ন মূর্তি। আরও রয়েছে ইয়োরোপ থেকে আমদানী করা বহু মূল্যবান ধাতব ও প্রস্তর নির্মিত ভাস্কর্যের সমাহার। প্রাসাদের এই অংশের সর্বাপেক্ষা আকর্ষণীয় বস্তুটি হলো একটি কাঠের হাতি, যা ৮৪ কেজি সোনার পাত দিয়ে মোড়ানো। বর্তমানে মহীশূর প্রাসাদের সর্বাপেক্ষা আকর্ষণীয় আয়োজনটি হলো- রাতের প্রাসাদে আলোকসজ্জা। গাইড জানাল, দর্শনার্থীদের অধিক বিনোদন দেওয়ার লক্ষ্যে সম্পূর্ণ প্রাসাদ ভবনে সংযুক্ত করা হয়েছে গুনে গুনে ৯৬ হাজার বৈদ্যুতিক বাতি। সন্ধ্যা সাতটার পর বাতির আলোয় জ্বলে ওঠে সমস্ত প্রাসাদ। নিখুঁতভাবে স্থাপন করা একেকটি বাতি থেকে বিচ্ছুরিত আলোয় এক মনোরম আলো-আঁধারীর খেলা জমে ওঠে। শত শত দর্শনার্থী অথচ কারও মুখে কোনো কথা নেই। সৌন্দর্যের বিস্ময়কর ছোঁয়ায় সকলেই যেন হতবাক! কেবল দু’একজনকে মৃদু স্বরে বলতে শোনা গেল, জীবন স্বার্থক হলো!

 

মহীশূরের মতো জায়গায় গেলে ধারণা পাওয়া যায় যে, ইতিহাসের অতীত নিদর্শনে আধুনিকতার শৈল্পীক ছোঁয়া দিতে পারলে তা কতটা অধিক চিত্তাকর্ষক ও শিক্ষণীয় হয়ে উঠতে পারে। মূলত এই দৃশ্য উপভোগ করাই দর্শনার্থীদের প্রধান লক্ষ্য। আমার ক্ষেত্রে ঠিক একই ব্যাপার ঘটেছিল। রাস্তার পাশে টুর অপারেটরদের প্রদর্শিত ছবিতে প্রাসাদের এই রূপটি ছিল আকৃষ্ট হওয়ার প্রধান কারণ। প্রাকৃতিক সৌন্দর্য উপভোগে সমস্ত ভারতে যেমন রয়েছে বহু বৈচিত্রতা, তেমনি এখানকার বিভিন্ন সময়ের বাস্তবতার নীরব সাক্ষী হিসেবে রয়েছে হাজারও স্থাপনা নিদর্শন। যেদিক থেকে ছোট্ট আয়তনের আমাদের বাংলাদেশও কম যায় না। সুতরাং দৈনন্দিন জীবনযাপন থেকে সময় সুযোগ করে ঘর থেকে একটু বের হলেই রয়েছে জানার ও শেখার অনেক কিছু।

 

 

রাইজিংবিডি/ঢাকা/৬ ডিসেম্বর ২০১৬/তারা

Walton Laptop