ঢাকা, শুক্রবার, ৯ চৈত্র ১৪২৩, ২৪ মার্চ ২০১৭
Risingbd
মার্চ
সর্বশেষ:

প্রথম তুষার আর মেরি ক্রিসমাস || শান্তা মারিয়া

শান্তা মারিয়া : রাইজিংবিডি ডট কম
 
   
প্রকাশ: ২০১৬-১২-২৭ ৩:৫৮:২৮ পিএম     ||     আপডেট: ২০১৭-০১-০৫ ১০:৩৩:২৪ পিএম

(চকবাজার টু চায়না : পর্ব-২৬)

আকাশ থেকে পাখির সাদা পালক হয়ে ঝরে পড়ছে তুষারকণা। শুভ্র আবরণে ঢেকে যাচ্ছে বেইজিং। কি যে অপরূপ সেই দৃশ্য! ২০১২ সালে ডিসেম্বরের ২ তারিখে প্রথম তুষারপাত হলো বেইজিংয়ে। আমি আগে ইউরোপ আমেরিকায় তুষারপাত দেখেছি। বরাবরই এই দৃশ্য আমাকে মুগ্ধ করে। মনে পড়ে যায় হ্যান্স ক্রিশ্চিয়ান অ্যান্ডারসনের চিরায়ত রূপকথা ‘স্নো কুইন’-এর গল্প।  তবে আগে তুষারপাত দেখলেও সেটা দেখেছি অল্প সময়ের জন্য। সেসব দেশে তো আর দীর্ঘদিন বাস করিনি, বেড়াতে গেছি।

বেইজিংয়ে তুষার দেখার অনুভূতি তাই একেবারেই আলাদা।

 

অক্টোবর থেকেই বেইজিংয়ে ঠান্ডা পড়তে থাকে। নভেম্বরে রীতিমতো ওভারকোট পরার শীত চলে আসে। পুরো নভেম্বর মাস বেশ তীব্র শীত থাকে। ইনার পরতে হয়। ডিসেম্বরে তো শীতের মাত্রা আরও বাড়ে। তবে সবচেয়ে বেশি শীত পড়ে জানুয়ারিতে।

ডিসেম্বরে তুষার পড়বে এই আশায় এবং এর প্রস্তুতি হিসেবে আগেই বরফে পরার উপযোগী ভারী ওভারকোট, উলের ইনার, নিগার্ড, ভারী উলের হাতমোজা, উলের কানঢাকা, টুপি, মাফলার, বরফে চলার জন্য ভেতরে ফার লাগানো হাইবুট ইত্যাদি কিনেছিলাম। পরে বুঝেছি আমি যে পরিমাণে শীতের পোশাক কিনেছি তা দিয়ে শুধু বেইজিং নয় মস্কোর শীতও সামাল দেয়া যাবে।

 

হেমন্ত বা লেট অটামে গাছের পাতাগুলো লাল হলুদ কমলা বিভিন্ন রঙে রঙিন হয়ে উঠেছিল। বাতাসে ভাসছিল পাকা ফলের সুঘ্রাণ। শীতের বাতাসে সেসব পাতা ঝরে পড়তে শুরু করল। বাতাসে হুহু করে কেমন একটা মন খারাপ করা সুর। রাস্তার ধারে, পার্কে আর কমিউনিটিতে নাচের আসর বন্ধ হয়ে গেল। পথের ধারের ওপেন এয়ার ক্যাফেগুলো রাতারাতি চারদেয়ালের ভিতর বন্দী হয়ে পড়লো। শীত মানেই হাত-পা গুটিয়ে গুটিশুটি মেরে আগুনের ধারে বসা। শীত মানেই ঘরের জানালা বন্ধ। হিটার চালু। শরতের সব আনন্দ উচ্ছ্বাস যেন ফুরিয়ে এলো। শীতের সময় অবশ্য নতুন ফ্যাশনের পোশাক কেনা এবং তা পরার মজা আলাদা।

 

আমি বেশ আগ্রহ নিয়েই প্রথম তুষারের প্রতীক্ষায় ছিলাম। তবু সকালে জানালা দিয়ে পুরো শাদা পথ দেখে একটু ঘাবড়ে গেলাম কারণ এখন এরমধ্য দিয়ে আমাকে অফিসে যেতে হবে? পড়ে-টরে যাবো না তো?

আগেরদিন রাতেই আকাশটা মেঘলা করে ছিল। মনে হচ্ছিল সীসার মতো ভারী হয়ে নেমে এসেছে আকাশ। ভোরে উঠে আমার ঘরের জানালা দিয়ে তাকাতেই দেখি সিআরআই ভবনের দিকে যাবার পুরো পথ আর ক্যান্টিনের পথ সাদা তুষারে ঢেকে গেছে। এরই মধ্যে সহকর্মী মুন ফেন শিং প্রকাশ ফোন করে বললেন, শীতের প্রথম তুষার নিয়ে একটি ভিডিও অনুষ্ঠান করবেন। আমি যেন দ্রুত তৈরি হয়ে সিআরআই ভবনের সামনে চলে আসি। একটি চরম ভারী ওভারকোট গায়ে চাপিয়ে রওনা হলাম চীন বেতার ভবনের দিকে। গরম দেশের মানুষ আমরা। যতই উৎসাহ আর জীবনী শক্তি থাকুক না কেন তুষার, বরফ ইত্যাদি সম্পর্কে একটা ভয় মনের কোণে কাজ করেই। তাছাড়া বাঙালি সহকর্মী সালাহউদ্দিন অনেক আগে থেকে ভয় দেখাচ্ছিলেন যে, বেইজিংয়ের শীত নাকি সহ্য করার মতো নয়। বরফ হাতে লাগলে ফ্রস্টবাইট হবে, হাত-পা কেটে ফেলে দিতে হবে। বরফে পা পিছলে গেলে হাত-পা ভাঙবে। প্রতিবছরই নাকি বাংলা বিভাগের কেউ না কেউ হাত-পা ভাঙে শীতকালে। কার্যত দেখলাম এগুলো ভয় দেখানো ফাঁকা আওয়াজ ছাড়া আর কিছুই নয়।

 

যাই হোক, একটু ভয়ে ভয়ে তুষারের উপর পা ফেলে হাঁটছিলাম। কই কিছুই তো সমস্যা হচ্ছে না। পায়ের নিচে মুড়মুড় করছে টাটকা তুষারকণা। পথের ধারের পাতাবাহার গাছগুলোর উপর বিছিয়ে আছে তুষার। যেন কাঁচের টুকরোয় গড়া গাছ।

তুষারের ভিতর দিয়ে যাবার সময় খুব যে ঠান্ডা লাগছিল তাও কিন্তু নয়।

আমার সঙ্গে প্রথম তুষারপাত দেখা, বেইজিংয়ের দৃশ্য ইত্যাদি নিয়ে চমৎকার একটি ভিডিও বানিয়েছিলেন সেদিন প্রকাশ। অনুষ্ঠানটি পরে আমরা বিভাগের সবাই মিলে উপভোগ করেছিলাম। আমার বাড়ির লোকদের ফোন করে জানিয়ে দিয়েছিলাম যেন চীন বেতারের ওয়েবসাইটে গিয়ে অনুষ্ঠানটি দেখে।

 

 

তুষারঢাকা বেইজিংয়ের দৃশ্য আমার সত্যি খুব ভালো লাগতো। কমিউনিকেশন ইউনিভার্সিটি অব চায়নাতে আমি খণ্ডকালীন চাকরি করতাম বাংলা শিক্ষক হিসেবে। সেই সুবাদে তুষার ঢাকা শীতের সকালে যখন সেই ক্যাম্পাসে যেতাম তখন তুষারমোড়া ফারগাছগুলো দেখে মনে হতো রূপকথার রাজ্যে চলে গেছি।

একদিন খোলা প্রান্তরে ও পাহাড়ি পথে তুষারের রূপ দেখার জন্য চলে গেলাম উপকণ্ঠে। সেখানে সাদা তুষারে ঢাকা একটি পার্কে বেশ অনেকক্ষণ কাটালাম। তুষারের বল বানিয়ে খেলাও চললো বেশ মজা করে। সেই পার্কটির কাছেই তুষারের চাদর গায়ে ওয়েস্টার্ন হিলস দাঁড়িয়ে আছে শ্বেতশুভ্র সৌম্য চেহারায়।

 

শীতে সব পার্কেই স্লেজে চড়া আর স্কি করার ব্যবস্থা থাকে। আমি স্কি করতে পারি না। শেখার ইচ্ছা ছিল। বেইজিংয়ে আরো কয়েক বছর থাকলে হয়তো শেখা হয়ে যেত। বরফের উপর কুকুরে টানা স্লেজে চড়ে ঘুরতেও দারুণ মজা!

ডিসেম্বরে হাড় কাঁপানো শীত, তুষারের বল ছোঁড়া আর ওভারকোট সোয়েটারের বাহারের মধ্যে গুটি গুটি পায়ে এগিয়ে এলো ক্রিসমাস। বেশ আগে থেকেই সিআরআই ভবনে সাজ সাজ রব। প্রবেশমুখে সাজানো হয়েছে বিশাল ক্রিসমাস ট্রি। সঙ্গে আছে সান্তা ক্লজ, রেইনডিয়ার, আর স্লেজ। প্রতিটি ফ্লোরে আবার আলাদা আলাদা ক্রিসমাস ট্রি সাজানো হয়েছে। সেইসব ক্রিসমাস ট্রিতে ঝুলছে লাল-সাদা মোজা। আর মোজার ভেতর চকলেট, লজেন্স, ক্যান্ডি রাখা হয়েছে। প্রতিদিন যে যার ইচ্ছা মতো নিচ্ছি।  সারা ভবনে ঝুলছে ক্রিসমাস বেল।

 

 

সানলিথুন, ওয়াংফুচিং-এর মতো বিদেশির অনাগোনা বেশি এমন এলাকায় তো বটেই অন্যান্য এলাকাতেও রাস্তায় রাস্তায় শোভা পাচ্ছে ক্রিসমাসট্রি। আমাদের বাসভবন মিডিয়া সেন্টারের লবিতে বিশাল এক ক্রিসমাস ট্রি আর সান্তাক্লজ ও রেইনডিয়ার সাজানো হয়েছে। চারদিকে উৎসবের আমেজ। ক্যারিফোর, ওয়ালমার্টসহ বিভিন্ন সুপারশপে ক্রিসমাস ট্রি, ট্রি সাজানোর ডেকোরেশন পিস আর নানা রকম খেলনার সমাহার। সারাক্ষণ বাজছে ‘জিংগেল বেল জিংগেল বেল’ গান।

ক্রিসমাসের জন্য আমিও ঘর সাজালাম নানা রকম খেলনা দিয়ে। আর অফিসে আমার বসার জায়গায় শোভা পেল সান্তাক্লজের পুতুল আর ছবি। শুধু কি তাই? নিজের জন্য কিনলাম লাল-সাদা ক্রিসমাস টুপি, লাল-সাদা ড্রেস আরও কত কি।

হিন্দি বিভাগের অনিল পান্ডেও ঘর সাজিয়েছে সান্তা ক্লজের ছবিতে। আর আমার দুই রুমমেট আগাথা ও নিনাও ঘরবাড়ি সাজাতে ব্যস্ত।

 

ক্রিসমাস ইভে আমি আর শিহাব গেলাম ওয়াং ফু চিংয়ে ঘুরতে। পথে পথে সেদিন প্রচুর মানুষ। অনেকগুলো ক্রিসমাস ট্রি সাজানো রয়েছে এই রাস্তায়। সবাই ছবি তুলছে। আমাদের সঙ্গে ছবি তুলতেও ব্যস্ত চীনা বন্ধুরা। এদিন ম্যাকডোনাল্ডস-এও অনেক মজা। ক্রিসমাস ক্যান্ডি ফ্রি। গরম গরম ফ্রেঞ্চ ফ্রাই, বার্গার আর ম্যাক কফি যেন সন্ধ্যাটিকে উষ্ণতায় ভরিয়ে তুললো আরও।

 

ঘুরতে ফিরতে, গান শুনতে, মজা দেখতে দেখতে কখন যে রাত বারোটার ঘরে পৌঁছে গেল ঘড়ির কাঁটা বুঝতেই পারিনি। আমার জীবনের অন্যতম সেরা একটি ক্রিসমাস শুরু হলো। মেরি ক্রিসমাস।

 

 

রাইজিংবিডি/ঢাকা/২৭ ডিসেম্বর ২০১৬/তারা

Walton Laptop