ঢাকা, সোমবার, ১১ বৈশাখ ১৪২৪, ২৪ এপ্রিল ২০১৭
Risingbd
সর্বশেষ:

ছবির মতো দেশ || শান্তা মারিয়া

শান্তা মারিয়া : রাইজিংবিডি ডট কম
 
   
প্রকাশ: ২০১৭-০২-১৮ ১০:৫৯:১৫ এএম     ||     আপডেট: ২০১৭-০২-১৮ ১১:০০:০২ এএম
দ্য হেগ শহরে সন্ধ্যা

(লক্ষ্মণরেখার বাইরে ৩য় পর্ব)

সবুজ ঘাসে ছাওয়া একটি মাঠ। তার মধ্যে দিয়ে বয়ে যাচ্ছে সাদা ফেনিল দুধের নদী। দেখে চমকে উঠতে হয়। তবে নেদারল্যান্ডসের খামারগুলোতে এটা বেশ পরিচিত দৃশ্য। দুগ্ধ উৎপাদনের জন্য নেদারল্যান্ডসের খ্যাতি বিশ্বব্যাপী।

বিশেষ করে পনির ও চকলেট তৈরিতে এই দেশের জুড়ি নেই। দুগ্ধখামারগুলোতে গরু রাখার ভবন আর দুগ্ধ প্রক্রিয়াজাতকরণের ভবন আলাদা। এক ভবন থেকে অন্য ভবনে বিশালাকৃতির কাচের নলের ভিতর দিয়ে দুধ নেওয়া হয়। স্বচ্ছ কাচ দূর থেকে দেখা যায় না। বরং দূর থেকে দেখলে মনে হয় সবুজ মাঠের ভিতর দিয়ে দুধের নদী বয়ে যাচ্ছে।

নেদারল্যান্ডস সত্যিই ছবির মতো সাজানো দেশ। আমি যখন বেশ ছোট তখন আমাদের বাড়িতে একটি ক্যালেন্ডার ছিল। সেটি হল্যান্ডের কোনো  প্রতিষ্ঠানের হবে। সেই ক্যালেন্ডারের বারোটি পাতায় বারোটি সুন্দর ছবি ছিল। সবগুলো ছবিই হল্যান্ডের প্রাকৃতিক দৃশ্যের। আমি মুগ্ধ হয়ে ছবিগুলো দেখতাম। মনে মনে কল্পনা করতাম যেন সেই সবুজ মাঠে ঘুরে বেড়াচ্ছি। ২০০৭ সালে নেদারল্যান্ডস গিয়ে দেখলাম সেই কবেকার ক্যালেন্ডারটির ছবিগুলো যেন জীবন্ত হয়ে উঠেছে।

                                                  লেখক ও নেদারল্যান্ডের বন্ধু ক্যারেন

দ্য হেগ থেকে যাচ্ছিলাম ইউট্র্যাক্ট বলে অন্য একটি শহরে। ট্রেনে চেপে। ইউরোপের ট্রেনে যারা চেপেছেন তারা জানেন এগুলো কত সুন্দর। পরিস্কার পরিচ্ছন্ন। সাজানো গোছানো। ভিড়ভাট্টার বালাই নেই। ট্রেনে ভ্রমণ এখানে সত্যিই আনন্দদায়ক। আমি ও ঢাকায় অক্সফ্যাম জিবির কর্মী মৃগাঙ্ক শেখর ভট্টাচার্য গেছি বাংলাদেশ থেকে। সঙ্গে আছেন অক্সফ্যাম নভিবের কর্মী ক্যারেন। ক্যারেন বলল আগে ট্রেন, স্টেশন, সবকিছুই আরো সুন্দর ছিল। কিন্তু আলজেরিয়া ও আফগানিস্তান থেকে অনেক শরণার্থী এসেছেন। তাদের কারণেই স্টেশন নাকি একটু নোংরা দেখা যাচ্ছে।

ট্রেনে চোখে পড়ল বেশ কজন যাত্রী যাদের চেহারা দেখলে আলজেরিয়ান বলে চেনা যায়। ট্রেনে চড়ে যাবার সময় দেখছিলাম হল্যান্ডের চমৎকার প্রাকৃতিক দৃশ্য। বিখ্যাত উইন্ডমিল। সবুজ মাঠ বা মিডো।

আমস্টারডাম শহরটাও দারুণ সুন্দর। বলতে গেলে ছবির মতোই সাজানো। প্রতিটি বাড়ির সামনে ছোট্ট বাগান। যারা বহুতল বাড়িতে থাকেন তারাও ব্যালকনিতে একচিলতে বাগান করতে ভোলেন না। ফলে প্রতিটি ব্যালকনিতেই ফুলের সমারোহ দেখা যায়। এমন পুষ্পপ্রেমিক শহর যে অন্যদিক থেকেও সাজানো হবে সেটা তো না বললেও চলে। টিউলিপ ওদের বিখ্যাত ফুল। ওরা টিউলিপ রপ্তানিও করে। নেদারল্যান্ডস এর বিখ্যাত ফ্লাওয়ার মার্কেটেও গেলাম। এখানে ছোট বড় অসংখ্য ফুলের দোকান। কোটি কোটি টাকার ফুল আমদানি রপ্তানি হয় এই মার্কেট থেকে। আমস্টারডামের ডামস্কোয়ারের কাছেই এই মার্কেট। এখানে ফুলের চারা, বীজ ইত্যাদিও বিক্রি হয় দেদারছে। টিউলিপ ফুলের বালব বা কন্দ বিক্রি হয়। এই কন্দ থেকেই নতুন ফুলের চারা উঁকি দেয় বসন্তে। এখানে সুভ্যেনিরের দোকানও রয়েছে। এই সব দোকানে বিক্রি হচ্ছে কলম, ছোট ছোট শোপিস। শিল্পী ভ্যান ঘগ, উইন্ডমিল, ফুলে ভরা ব্যালকনিসহ বাড়ি মোট কথা যে বা যা কিছু হল্যান্ডের ঐতিহ্যবাহী তারই ছোট ছবি, পেপার ওয়েট, শোপিস, পাওয়া যাচ্ছে। কোনটি আবার ম্যাগনেট দিয়ে আটকানো চলে ফ্রিজের গায়ে। কাঠের ক্লোগ বা চওড়া জুতা হল্যান্ড এর বিখ্যাত লোকজ শিল্প। এগুলোর আকৃতিতে কাঠ, সিরামিক, কাপড় বিভিন্ন কিছুতে তৈরি জুতার শোপিস পাওয়া যাচ্ছে। আমি কিনলাম সিরামিকের একটা জুতোর শোপিস। এটার ভিতরে রয়েছে টিউলিপের একটি বাল্ব। বাড়তি পাওনা বলা চলে। দেশে ফিরে টবে বুনে দিয়েছিলাম বাল্বটি। আমার দুভার্গ্যবশত কিছুই গজায়নি। তবে সিরামিকের সেই জুতাটি আজও আছে।

নেদারল্যান্ডস এর আমস্টারডাম শহরে লেখক


ছোটবেলায় শুনেছিলাম সাইকেল অথবা গরুর গাড়ি চাপা পড়লে নাকি ঢাকা ও কলকাতা শহর থেকে বের করে দেওয়া হয়। নেদারল্যান্ডস-এ এসে দেখি এখানে সাইকেল চাপা পড়ার ব্যাপক আশঙ্কা রয়েছে। শহরসুদ্ধ মানুষ সাইকেল চড়ে ঘোরে এখানে। নবীন প্রবীণ, শিশু, যুবক, নারী, পুরুষ, বৃদ্ধ, রোগা কেউই সাইকেল চড়ায় পিছিয়ে নেই। ছোট্ট শিশুকে সাইকেলের সামনে কিংবা পেছনের ক্যারিয়ারে বসিয়ে দিব্যি চলছেন মা-বাবা। অধিকাংশ লোকই   অফিসে যান সাইকেলে চড়ে। স্টেশনেও রাখা আছে প্রচুর সাইকেল। হয়তো শহরতলীতে থাকেন কেউ। বাড়ি থেকে সাইকেলে রেল স্টেশনে এলেন। সাইকেলটা রেখে দিলেন স্টেশনে। তারপর ট্রেনে চড়ে শহরে পৌঁছালেন। এখান থেকে আরেকটি সাইকেলে চড়ে চলে গেলেন গন্তব্যে। এমন নিয়মিত সাইকেল চালানোর কারণেই হয়তো এখানকার নারী-পুরুষ  শিশু, বৃদ্ধ সবাই দারুণ সুঠাম দেহের অধিকারী। আমাদের সঙ্গী ক্যারেনও দারুণ সুস্বাস্থ্যের নারী। দুই সন্তানের মা। কিন্তু দেহে বাড়তি মেদের ‘ম’ ও নেই। কত রকম যে সাইকেলের বাহার। ডবল সাইকেল, সিঙ্গেল সাইকেল, জোড়া লাগানো তিনধাপি সাইকেলসহ (যাতে তিনজন একসঙ্গে চড়তে পারেন) আরো কতরকম। শিশুরা সকালে দলবেঁধে সাইকেলে চেপে স্কুলে যায়। সাইকেল ভাড়াও পাওয়া যায় ঘণ্টা বা দিনচুক্তিতে। আরো আছে ডিজিটাল সাইকেল। এসব ডিজিটাল সাইকেল ভাড়া নিতে হলে অগ্রিম টাকা দিতে হয়। নির্দিষ্ট ঘণ্টার পর সাইকেলটি আপনি বন্ধ হয়ে যায়।

নেদারল্যান্ডস এ শুধু ফুলের মার্কেটই নয়, আছে পনিরের ও হীরার মার্কেটও। পনির আমার দারুণ প্রিয় খাদ্য। যদিও অ্যালার্জির কারণে খুব অল্পই খেতে পারি। পুরানো ঢাকার সাদা পনির খেয়ে বড় হয়েছি। হল্যান্ডের পনিরের মার্কেটে এত ধরনের পনির রয়েছে যে হিসেব করে শেষ করা যায় না।

আমার মতো হালকা মানিব্যাগের মানুষের হীরার মার্কেটে যাওয়ার যদিও কোনো অর্থ হয় না তবু চোখের সুখ বলেও একটা কথা আছে। আমস্টারডাম হীরা কাটিং এবং হীরার গয়না তৈরির জন্য বিশ্বে প্রচুর খ্যাতির অধিকারী। এখানকার হীরার মার্কেট, অলংকারের দোকানে চোখ ধাঁধানো গয়নার বাহার দেখলে মাথা সত্যিই ঘুরে যায়। তবে দেখেই শান্তি। কেনার কথা কল্পনাও করি না। হীরা কেনার জন্য মন যখন আকুলি বিকুলি করছে তখন নিজেকেই বললাম, আমি এমন কোনো সম্রাট শাহজাহান নই যে হীরা রত্ম সংগ্রহ করতে হবে।

দ্য হেগ শহরের চাকচিক্যও কম নয়। হোটেলের জানালা দিয়ে ভোরবেলা চোখে পড়ে রাস্তা পরিষ্কারের জন্য অটোমেটিক ঘুরন্ত ব্রাশ লাগানো গাড়ি চলছে। রাস্তায় একটা ধুলাও পড়ে থাকছে না। শুধু তাই নয়। বহুতল ভবনগুলোও ধোঁয়া মোছা হচ্ছে সিড়ি লাগানো গাড়ির মাধ্যমে। আমি যখন এই শহরে যাই তখন লেট অটাম। গাছের পাতা ঝরে পড়ছে লাল, হলুদ কত বর্ণে বর্ণিল হয়ে। মনে হচ্ছিল ভ্যান ঘগের আঁকা কোনো ছবির মধ্যেই যেন ঢুকে পড়েছি। ঝরা পাতার মন কেমন করা দৃশ্য আর বাতাসে শীতের আগমনী সুর। একটু একটু বৃষ্টিও ঝরছে মাঝে মধ্যে। নেদারল্যান্ডসের সেই কটি দিন যেন শিল্পীর তুলিতে আঁকা ছবি হয়েই ঠাঁই করে নিয়েছে স্মৃতির ফোল্ডারে।




রাইজিংবিডি/ঢাকা/১৮ ফেব্রুয়ারি ২০১৭/মারিয়া/সাইফ

Walton Laptop