ঢাকা, রবিবার, ১২ চৈত্র ১৪২৩, ২৬ মার্চ ২০১৭
Risingbd
মার্চ
সর্বশেষ:

অপরূপ সৌন্দর্যের রাতারগুল

ইয়াসিন : রাইজিংবিডি ডট কম
 
   
প্রকাশ: ২০১৭-০২-২৮ ২:০০:১৯ পিএম     ||     আপডেট: ২০১৭-০২-২৮ ২:০৭:১৯ পিএম

ইয়াসিন হাসান : বাংলাদেশ ক্রিকেট লিগের খেলা কভার করতে সিলেটে আসা। ঢাকা থেকে সিলেটের প্রতিনিধির সঙ্গে কথা বলে জানলাম এখানে ঠান্ডা একেবারেই নেই। কিন্তু শনিবার ভোর সোয়া পাঁচটায় গ্রীন লাইনের বিজনেস ক্লাসের বাস থেকে নামতেই দেখি উল্টো চিত্র!

কনকনে ঠান্ডা, সঙ্গে প্রচন্ড ঠান্ডা বাতাস। মনে হচ্ছিল বাসেই ভালো ছিলাম। সেখানেই থাকা যেত! যাক, কোনো রকমে একটা সিএনজি ধরে চলে এলাম জিন্দাবাজার। হোটেল গোল্ডেন সিটিতে আগেই রুম বুকিং করেছিলেন সহকর্মী। হোটেলে উঠে গরম পানিতে গোসল করে দিলাম লম্বা এক ঘুম।

সকাল ১০টায় সিলেট স্টেডিয়ামে ওয়ালটন সেন্ট্রাল জোন ও বিসিবি নর্থ জোনের অনুশীলন। সকালে অনুশীলন দেখে দুপুরে হোটেলে এসে দুই ঘণ্টার মতো কাজ করলাম। দুপুর সাড়ে তিনটায় হোটেল থেকে নেমে রিকশায় গেলাম পানসিতে। পানসি সিলেটের বিখ্যাত হোটেল। ভোজনরসিকদের প্রিয় একটি জায়গার নাম পানসি। রিকশা থেকে নামতেই ওয়ালটন সেন্ট্রাল জোনের ম্যানেজার মিলটন আহমেদ ভাইয়ের ফোন-‘আপনি কোথায়?’

উত্তর দিলাম, ‘পানসিতে, লাঞ্চ করব।’

তিনি বললেন, ‘অর্ডার দিয়েছেন?’

‘না।’

‘ওখানে অর্ডার দিয়েন না। চলেন আরেকটা ভালো জায়গায় খাই। আমি দুই মিনিটের মধ্যে গাড়ি নিয়ে আসছি।’
 



ওয়ালটন সেন্ট্রাল জোন সিলেটে উঠেছে নির্ভানা ইন হোটেলে। পানসি থেকে নির্ভানা ইনের দূরত্ব দুই মিনিটের। খানিকটা জ্যাম ঠেলে মিলটন ভাই চলে এলেন পাঁচ মিনিটের মধ্যে। গাড়িতে উঠে দুজন কথা বলছি বিসিএল, সিলেট স্টেডিয়ামসহ অন্যান্য অনেক প্রাসঙ্গিক বিষয় নিয়ে। হঠ্যাৎ আমার মনে পড়ল, আমরা তো খাওয়ার জন্য বেরিয়েছি। কিন্তু গাড়ি যাচ্ছে জাফলং যাওয়ার রাস্তায়। এর আগে একাধিকবার জাফলং গিয়েছি বলে রাস্তাটা আমার পরিচিত। ড্রাইভারকে জিজ্ঞেস করলাম, ‘এদিকে কোথায় যাচ্ছে?’

‘বুড়ো’ ড্রাইভার বললেন, ‘স্যার তো রাতারগুল যেতে বলল।’

মিলটন ভাইকে জিজ্ঞেস করলাম, ‘এটা কী হলো?’

উনি বললেন, ‘আরে চলেন। পরিকল্পনা করে কি কখনো কিছু হয়।’

আমি সম্মতি দিলাম। আসলেও পরিকল্পনা করে কিছু হয় না। হুটহাট ভ্রমণের সিদ্ধান্তগুলো সবসময়ই মজার। আলাদা রকমের রোমাঞ্চ, আলাদা রকমের অ্যাডভেঞ্চার থাকে।

জিন্দাবাজার থেকে প্রায় ৩০ কি.মি. গাড়ি চলার পর পৌঁছলাম রাতারগুলের মূল রাস্তায়। সেখানে ২০-২২ বছর বয়সি এক তরুণকে জিজ্ঞাসা করতেই বলল, ‘আরও ১৫ কি.মি. ভিতরে রাতারগুল।’
 



আবারও গাড়ি চলতে শুরু করল। গ্রামের আঁকাবাঁকা পথ। সরু রাস্তা। ধীর গতিতে গাড়ি চালাচ্ছেন আমাদের ‘পাইলট’। অনেকদিন পর গ্রামের আবহ পেয়ে আমার বেশ ভালো লাগছিল। শুনশান নীরবতা। কোনো কোলাহল নেই। পথ চলতে চলতে চোখে পড়ল ক্রিকেট টুর্নামেন্ট হচ্ছে একটি মাঠে। একটু এগুতেই দেখতে পেলাম পিকনিকের বাস থামিয়ে ফুটবল খেলছে একদল কিশোর। ঘণ্টাখানেক পর আমরা পৌঁছে গেলাম রাতারগুলের খুব কাছাকাছি গোয়াইনঘাটে।

টোল প্লাজায় গাড়ি থামল। রাতারগুলের বনে ঢুকতে প্রয়োজন হয় ছোট্ট নৌকার। টোল প্লাজা থেকে জানলাম, সাড়ে ছয়শ টাকায় এক ঘণ্টার জন্য মিলবে একটি নৌকা। সেখান থেকে প্রায় ২ কি.মি. পায়ে হাঁটার পর পৌঁছালাম রাতারগুল ঘাঁটে।

নৌকায় উঠে আমি মুগ্ধ। কোমর ডুবিয়ে দাঁড়িয়ে আছে সারি সারি গাছ। শীতকাল বলে পানি এখন নিচে নেমে গেছে, নইলে গাছগুলোর গলা ডুবে যেত পানিতে।  স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা গেল, বর্ষকালে এখানকার সৌন্দর্য মনমুগ্ধকর। নিস্তব্ধ বিকেলে নৌকার বৈঠার ছলাৎ ছল ছলাৎ ছল শব্দ ও রাতারগুল অন্যরকম এক আবহ। যতই গভীরে ঢুকছি ততই মুগ্ধ হচ্ছি।

‘বাংলার অ্যামাজন’ নামে পরিচিত রাতারগুল সারি সারি গাছের বিশাল এক জঙ্গল। বিশ্বে স্বাদু পানির জলাবন আছে মাত্র ২২টি। এর একটি রাতারগুল। ‘বাংলার অ্যামাজন’ বলার পেছনের কারণ হচ্ছে পৃথিবীর সবচেয়ে বড় সোয়াম্প বন অ্যামাজন। এ সোয়াম্পের মতোই স্বাদু পানির বন রাতারগুল।

বর্ষাকালে এই বন অথৈ জলে ভেসে থাকে। বর্ষাশেষে পানি নেমে যায়। তবে রাতারগুলের একেক সময়ের সৌন্দর্য্য একেক রকম। বর্ষায় এক রকম, শীতে অন্যরকম। তবে স্থানীয়দের মতে এপ্রিল থেকে অক্টোবর পর্যন্ত রাতারগুলে আসার সেরা সময়। বনের আয়তন তিন হাজার ৩২৫ দশমিক ৬১ একর। এর মধ্যে ৫০৪ একর বন ১৯৭৩ সালে বন্যপ্রাণীর অভয়ারণ্য ঘোষণা করা হয়।  ২৫ প্রজাতির উদ্ভিদ রয়েছে এ বনে। এছাড়া বন বিভাগ হিজল, বরুণ, করচসহ কিছু জলবান্ধব জাতের গাছ লাগিয়েছে এ বনে। সিলেটের শীতলপাটি তৈরির মূল উপাদান মুতার বড় অংশ এই বন থেকেই আসে।
 



আমাদের মাঝি জানাল, বনে অজগর, গুঁইসাপ, মেছোবাঘ, কাঠবিড়ালি, বানর, ভোদড়, বনবিড়াল, বেজি ঘুরতে দেখা যায়। এছাড়া পাখিদের মধ্যে  ঘুঘু, চড়ুই, সাদা বক, মাছরাঙা, টিয়া পাওয়া যায়। তবে পড়ন্ত বিকেলে আমরা শুধুমাত্র একটি বানরের দেখা পেলাম।

ওয়াচ টাওয়ারে গিয়ে পুরো রাতারগুলের সৌন্দর্য দেখা গেল। ওপর থেকে মনে হচ্ছিল সবুজের আচ্ছাদনে ঢেকে আছে পুরো রাতারগুল। ওখান থেকেই সূর্যাস্ত উপভোগ করলাম। সূর্য লাল আভায় ঈষৎ ছায়া জলে এক অপূর্ব রূপ ধারণ করেছিল অপরূপ সৌন্দর্যের অসম্ভব সুন্দর রাতারগুল। শীতের শেষে বসন্তের রাতারগুল উপভোগ হলো মিলটন ভাইয়ের শেষ মুহূর্তের পরিকল্পনায়। এবার বর্ষার রাতারগুল উপভোগের প্রহর গুণতে থাকা!

আলোকচিত্র: মিলটন আহমেদ



রাইজিংবিডি/সিলেট/২৮ ফেব্রুয়ারি ২০১৭/ইয়াসিন/তারা

Walton Laptop