ঢাকা, সোমবার, ৬ অগ্রহায়ণ ১৪২৪, ২০ নভেম্বর ২০১৭
Risingbd
সর্বশেষ:

ঘোড়ায় চড়িয়া শান্তা কাঁদিয়া চলিল

শান্তা মারিয়া : রাইজিংবিডি ডট কম
 
   
প্রকাশ: ২০১৭-০৩-২৫ ৬:১১:৪৪ পিএম     ||     আপডেট: ২০১৭-০৯-০৬ ২:০০:১৮ পিএম

(লক্ষ্মণরেখার বাইরে: ৮ম পর্ব)

শান্তা মারিয়া: থান্ডার বার্ড রাইডিং স্ট্যাবল। ইংরেজিতে স্ট্যাবল আর বাংলায় আস্তাবল। দুটোই শুনলে যেমন নোংরা, গোবর ও বিচালির পচা গন্ধে ভরপুর বলে মনে হয় তেমন কিছুই না। বরং চারদিক ছবির মতো ঝকঝকে, চকচকে। অনেক বছর আগে টিভি সিরিজ ডালাস এ এমন চকচকে ঘোড়ার আস্তাবল দেখেছি। আরও দেখেছি অসংখ্য ওয়েস্টার্ন মুভিতে। যেখানে কাউবয়, র‌্যাঞ্চমালিক আর আউট ল এর দল বন্দুক পিস্তল নিয়ে ধুন্ধুমার লড়াই করে। সেবা প্রকাশনীর ওয়েস্টার্ন সিরিজের বইগুলো গোগ্রাসে গিলেছি একসময়। গ্রেগরি পেক, জন ওয়েন, হেনরি ফন্ডা, পল নিউম্যানকে কত দেখেছি ওয়েস্টার্ন মুভিতে। রাইডিং স্ট্যাবল এ যাচ্ছি এমন কথা শোনার পর থেকেই আনন্দে ঘুম হারাম হয়ে গেছে।

ঘটনাটা ২০০৬ সালে। সেপ্টেম্বর মাস। স্থান ওকলাহমা স্টেট। মহাদেশ আমেরিকা।

লিডারশিপ ইন জার্নালিজম নামে একটি সংক্ষিপ্ত ফেলোশিপ প্রোগ্রামে অংশ নিতে ওকলাহমায় গিয়েছি আমরা দশজন সাংবাদিক। এদের মধ্যে বেশ কয়েকজন এখন রীতিমতো তারকা। তখনও তারা সেরকম তারকা হয়ে ওঠেননি অবশ্য। দশজনের নামের তালিকা দিচ্ছি প্রথমে। শাহনাজ মুন্নি, রোজিনা ইসলাম, শাহনাজ বেগম, লাবণ্য কাবিলী, নাজমুন মিলি, সালমা ইয়াসমিন,  নাসিমা খান মন্টি, রাজি, নাসরাত আশিয়ানা চৌধুরি এবং আমি।

আমেরিকার ওকলাহমা স্টেটের ওকলাহমা বিশ্ববিদ্যালয়ের গেলর্ড কলেজের প্রফেসর জো ফুট এই প্রোগ্রামের মূল আয়োজক। সব টাকা পয়সা দিচ্ছে অবশ্য ইউ এস স্টেট ডিপার্টমেন্ট। ফলে আমরা রীতিমতো মার্কিন সরকারের অতিথি। সেজন্যই ভিসা পেতে কোনো সমস্যা হয়নি। কর্মশালায় লেখাপড়া করছি, সেই সঙ্গে বেড়ানোও চলছে ধুমিয়ে। যাই হোক এরই মধ্যে একদিন প্রফেসর জো ফুট ঘোষণা করলেন তিনি আমাদের নিয়ে যাবেন ঘোড়ায় চড়তে। ওকলাহমার পাশের স্টেট হচ্ছে টেক্সাস। এসব স্টেটের ঐতিহ্য হলো ঘোড়ায় চড়া।



পরদিন সকাল সাতটার মধ্যে আমি তৈরি। ব্লু জিন্স, রেড শার্ট, লেদার বুট। নিজেকে ওয়েস্টার্ন মুভির নায়িকা ভাবতে কে বারন করেছে? প্রফেসর ফুটও কাঁটায় কাঁটায় সাড়ে সাতটায় হাজির। এই সময়নিষ্ঠায় আমি খুব স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করি। কারণ আমারও ঠিক সময়ে সব জায়গায় উপস্থিত থাকার একটা বদনাম রয়েছে। আমার সফরসঙ্গীরা এই ধরনের বদনাম থেকে মুক্ত। তাই তারা একটু সময় নিয়েই তৈরি হলেন। শহরের একপ্রান্তে রাইডিং স্ট্যাবল।

দূর থেকে থান্ডার বার্ড নামটা দেখেই মনে শিহরণ জাগলো। বাহ। বিশাল গেট দিয়ে ভিতরে ঢুকে কাঠের দোতলা বাড়ি। ঠিক যেন ওয়েস্টার্ন মুভির সেট। অফিস ঘরটা মানে পুরো বাড়িটাই মুভির মতো করেই সাজানো। আমাদের প্রত্যেককে একটা করে কি যেন কাগজে সই করতে হলো। সেটা কীসের কাগজ সেকথা পরে বলবো। একটু রহস্য থাকা ভালো।

আমাদের প্রত্যেকের জন্য একটা করে কাউবয় হ্যাট এবং সানগ্লাস দেওয়া হলো। এগুলো অবশ্য ঘোড়ায় চড়ার পর আবার ফেরত দিতে হবে।

এইবার সবাইকে নিয়ে যাওয়া হলো ঘোড়ার আস্তাবলের সামনে। আস্তাবল থেকে একটি একটি করে ঘোড়াকে বের করা হচ্ছে আর আমাদেরকে একজন একজন করে সেটার পিঠে উঠিয়ে দেওয়া হচ্ছে। এতক্ষণ আমার ধারণা ছিল বোধহয় প্রত্যেকের সঙ্গে একজন করে সহিস বা গাইডজাতীয় কেউ থাকবে। কিন্তু দেখলাম নাহ, তেমন কেউ নেই। তার মানে একেবারে একাই উঠতে হবে। প্রফেসর ফুট শিখিয়ে দিলেন বাঁদিকের লাগাম ধরে টানলে ঘোড়া হাঁটবে আর ডানদিকের লাগাম ধরে টানলে ওটা দৌড়াবে। ভালো তো। ঘোড়ারও ডানপন্থা বামপন্থা আছে তাহলে। বলতে বলতেই রোজিনাকে দেখলাম ঘোড়ায় চড়ে বসতে। দিব্যি আনন্দে হেলতে দুলতে যাচ্ছে। আমাকে বলা হলো আমার জন্য ছোট একটা ঘোড়া আনা হচ্ছে। কারণ আমার আকৃতিও তো সকলের চেয়ে ছোট। শাহনাজ মুন্নির ঘোড়ার নাম লোনসাম। ও বেশ স্বচ্ছন্দেই উঠে গেল। সবশেষে আমার পালা। আমার ঘোড়ার নাম বেটসি। ও নাকি মেয়ে ঘোড়া। ফলে কম দুরন্ত। ছোট ঘোড়া বলে যেটিকে আনা হলো তার আকৃতি দেখে তো ভিরমি খাওয়ার জোগাড়। বিশাল উঁচু। বিরাট লম্বা। হাতি-ঘোড়া কথাটা কেন বলে এবার বুঝলাম। হাতির কাছাকাছিই হবে বোধকরি এটা । আমি এর আগে কোনোদিন ঘোড়ায় চড়িনি। এমনকি আমাদের চিড়িয়খানার ছোট টাট্টুতেও নয়। এই বিশাল দানব দেখে তো হতবুদ্ধি হয়ে পড়েছি। এর মধ্যে আমাকে ঠেলে ঘোড়ায় উঠিয়ে দেওয়া হয়েছে। ওরে বাবা এটা তো এবার দেখি দুলকি চালে চলতেও শুরু করেছে। এই আমেরিকান ঘুড়ীটা বোধহয় মনে করেছে ওর পিঠে একটা মশা বসেছে। ও সমানে পিঠ ঝাঁকাচ্ছে। কি যেন বলেছিলেন প্রফেসর? ও হ্যা, বাম লাগাম ধরে টানতে হবে। কিন্তু বেটসি সেই লাগামের টান শোনার পাত্রী নয় মোটেই। ও ছুটতে চাইছে কদমে। আমি তখন বাবারে মারে করে রীতিমতো চ্যাঁচাচ্ছি। কারণ এতক্ষণে আমার মাথায় ঢুকেছে যে আসলেই আমি ঘোড়ায় চড়ে বসেছি। এবং সেটা আমাকে যেকোন সময় পিঠ থেকে ফেলেও দিতে পারে।  যত সুরা আর দোয়া দরুদ জানা ছিল সব পড়ছি। আমার চিৎকার শুনে পিছনে অন্য একটি ঘোড়ায় আসীন প্রফেসর ফুট চেঁচিয়ে সাহস দিচ্ছেন, ডোন্ট ওরি শান্তা, আয়্যাম রাইট বাহাইন্ড ইউ। আমি তার আওয়াজ পেয়ে চেচাঁলাম ফুট ফুট প্লিজ হেলপ। ভয়ের চোটে তখন কি আর স্যার, প্রফেসর এসব কথা মনে থাকে? ফুট আবার উত্তর দিলেন ডোন্ট ওরি। নাথিং উইল হ্যাপেন্ড। যাব্বাবা। কেউই দেখি আমাকে বাঁচাতে আসছে না। অগত্যা কি আর করা। ঘোড়াকেই বললাম, ‘মা তুই থাম’। বলেই বুঝলাম ওতো আমেরিকান, বাংলা বুঝবে না। তাই ইংরেজিতে শুরু করলাম, ‘বেটসি বেবি, সুগার বেবি, ডোন্ট রান বেবি, জাস্ট ওয়াক।’



এদিকে আরেক বিপদ। শাহনাজ মুন্নির ঘোড়া লোনসাম এগিয়ে আসছে আমার বেটসির দিকে। সম্ভবত এটা ওর বান্ধবী। এসে নাকের সঙ্গে নাক ঠেকিয়ে কুশল বিনিময় করল। তারপর দুটোই দুলকি চালে চলতে লাগলো পাশাপাশি। বলছি বটে দুলকি চাল। কিন্তু ওর ওই দুলকি চালের ঠেলাতেই হালকা পাতলা এই আমি একবার ছিটকে উপরে উঠছি আবার ঘোড়ার পিঠে ধপাস করে নামছি। তখন আমার ওজন ছিল ৩৫ কেজি। এই হালকা ওজন নিয়ে ঘোড়ার পিঠে বসে থাকাই মুশকিল।

চূড়ান্ত ভয় পেলেও একটু এদিক ওদিক তাকালাম। দুর্দান্ত সুন্দর দৃশ্য। টুরিস্টদের জন্যই মনে হয় পুরো এলাকা বিশেষভাবে সাজানো। একদিকে ছোট্ট একটা জলাশয়। কি নীল তার জল। আবার কখনও বনের ভিতর দিয়ে যাচ্ছে ঘোড়া। মরুভূমির ভিতর দিয়ে গেল কিছুক্ষণ। তারপর বিশাল উদার প্রান্তর দিয়ে চললো। একবার চোখে পড়লো একটি গাছে দুজন আউট ল’কে ফাঁসি দিয়ে ঝুলিয়ে রাখা হয়েছে। এগুলো আসলে পুতুল। দেখতে মনে হয় একেবারে আসল। একদিকে ট্রেইলের চিহ্ন কাঠের ফলক দিয়ে দেখানো।  মোটকথা পুরো এলাকা ওয়েস্টার্ন মুভির আমেজ দেওয়ার জন্যই বিশেষভাবে তৈরি।

এসব দেখছি আর সমানে চেঁচিয়ে যাচ্ছি। ফুটও সমানতালে উত্তর দিচ্ছেন। যাহোক দু’ঘন্টা(আনুমানিক) হর্স রাইডিংয়ের পর থামলো। যেখান থেকে উঠেছিলাম সেখানেই আবার ফিরে এসেছি।

ঘোড়া থেকে নামানোর পর আমরা দোতলা বাড়িটির ভিতরে যখন গেলাম আমাদের প্রত্যেককে এক গ্লাস করে ফলের জুস খাওয়ানো হলো। এবার বুঝলাম কি লেখা ছিল ওই কাগজে। ওটা নাকি একটা অঙ্গীকারনামা। ওখানে বলা আছে আমি স্বেচ্ছায়, সজ্ঞানে এই রাইডিংয়ে অংশ নিয়েছি। ঘোড়ার পিঠ থেকে পড়ে আহত বা নিহত হলে তার জন্য কেউ দায়ী নয়। কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে এজন্য কোনো ইনশিওরেন্স ক্লেইম করা যাবে না। কি সর্বনাশ। এবার মনে পড়লো সুপারম্যান(এই ভূমিকায় যিনি অভিনয় করতেন) তো এই ঘোড়ার পিঠ থেকে পড়েই মারা গিয়েছিলেন। হায় হায়। আগে জানলে কি আর উঠতাম। তবে, তাহলে তো এত সুন্দর দৃশ্য দেখা থেকেও বঞ্চিত হতাম। ভাগ্যিস আগে জানিনি। সাংবাদিকতা পেশাটাই তো এমন। কখন কি ঘটবে কেউ জানে না। এরপর পেশাগত জীবনে অনেক প্রতিকূল পরিস্থিতিতে পড়েছি। তখনি মনে পড়েছে সেই হর্স রাইডিং এর কথা। যেন শুনতে পাই শিক্ষক জো ফুট বলছেন, ডোন্ট ওরি শান্তা। আয়্যাম রাইট বাহাইন্ড ইউ। প্রবীণ শিক্ষক, শ্রদ্ধেয় জো ফুটের সেই কথাটি আজও আমাকে সাহস জোগায়, জীবনে এগিয়ে যেতে বলে।  

 

 

রাইজিংবিডি/ঢাকা/২৫ মার্চ ২০১৭/তারা

Walton
 
   
Marcel