ঢাকা, শনিবার, ১১ অগ্রহায়ণ ১৪২৪, ২৫ নভেম্বর ২০১৭
Risingbd
সর্বশেষ:

পানের দেশ মহেশখালীতে

ফেরদৌস জামান : রাইজিংবিডি ডট কম
 
   
প্রকাশ: ২০১৭-০৬-০৯ ৪:৫৩:৫৫ পিএম     ||     আপডেট: ২০১৭-০৬-০৯ ৫:০৪:৫১ পিএম

(চর থেকে চিরসবুজের ডাকে : ৮ম কিস্তি)

ফেরদৌস জামান: দ্বীপজেলা ভোলার একটি মাত্র জায়গা গন্তব্য স্থির করে ঘর থেকে বেরিয়ে পরা, অতঃপর একটির পর একটি নতুন গন্তব্যের দিকে ছুটে চলা। এভাবেই চলেছি ক’দিন। আজ যেখানে অবস্থান করে সময় অতিবাহিত করছি, এই অতিবাহিত সময়ের মধ্য দিয়েই নির্মাণ হয়ে চলেছে এরপরের গন্তব্য। অর্থাৎ কাল কোথায় যাবো আজ তা অজানা। আমাদের এবারের লক্ষ্য কক্সবাজার জেলার বিচ্ছিন্ন এক দ্বীপ। পরিচিত জায়গা, আগেও একবার দেখা হয়েছে। এবার যে সুজিতের খাতিরে যাওয়া ঠিক তা নয়, কারণ জায়গাটি আমারও অনেক পছন্দের। নেই কোনো ভিড়, হোটেল-মোটেল এবং তথাকথিত টুরিস্ট, ট্রাভেলারের উৎপাত। তবে তার আগে আমাদের সাজেক ভ্রমণসঙ্গী ছয় বন্ধুর দলকে বিদায় জানাবার পর ভেবেছিলাম খাগড়াছড়িতে আরও একটি দিন থেকে যাব। বেশ কয়েক বছর আগে সদর থেকে অনেক দূরে এক গুহা দেখতে গিয়ে সর্বাত্মক চেষ্টার পরও ব্যর্থ হয়ে ফিরে আসতে হয়েছিল।

 


বাজারে বসে জায়গাটি সম্বন্ধে খোঁজখবর নেয়ার চেষ্টা চালালাম। ফল যা দাঁড়াল তা হলো, অনভিপ্রেত ভীতির সঞ্চার। শেষ প্রচেষ্টা হিসেবে সচেতন গোছের এক চাকমা যুবকের শরণাপন্ন হলাম। বিস্তারিত শুনে তার এক কথার পরামর্শ- যাওয়া ঠিক হবে না। ভেবেছিলাম এতদিনে পরিস্থিতির উন্নতি ঘটে থাকবে কিন্তু যা জানলাম তাতে মনে হলো, উন্নতি বৈ অবনতিই অধিক হয়েছে। এর সমাধান কোথায় জানি না বললে ঠিক হবে না, বরং সমাধানের জন্য আমাদের সদিচ্ছা কতটুকু আছে সেটিই বিবেচ্য। এবারের ভ্রমণে এ নিয়ে আরও একটি ব্যর্থতা যুক্ত হলো।

দ্বীপে যেতে হলে সর্বপ্রথমে খাগড়াছড়ি থেকে চট্টগ্রাম যেতে হবে। বৃষ্টি শুরু হলো। শুধু বৃষ্টি নয় প্রবল বর্ষণ! থেমেও গেল বিশ মিনিটের মধ্যে। বৃষ্টির পর প্রকৃতি তার প্রকার বা ধরন ভেদে একেক রকম রূপ ধারণ করে, সাথে প্রাণ জুড়ানো গন্ধ! পাহাড়ি বৃক্ষ ও লতাপাতার প্রজাতী সমতলের তুলনায় ভিন্ন তাই চলাফেরা করতে এমনিতেই মাটি আর লতাপাতার মিলমেশে এক ধরনের গন্ধ অনুভূত হয়ে থাকে। বৃষ্টির পর তাতে আরও কি যেন যুক্ত হয়ে বাতাসে ছড়িয়ে পড়ে কয়েক গুণ বাড়তি রূপে। খাগড়াছড়ি বাস টার্মিনালে গেলে চট্টগ্রামগামী দিনের শেষ বাসটি মিলে যায়। কক্সবাজারের দিকে যাওয়ার সরাসরি বাস নেই। সুতরাং, চট্টগ্রাম পর্যন্ত প্রায় পাঁচ ঘণ্টার লক্কর ঝক্কর জার্নিকেই নিয়তি হিসেবে মেনে নিতে হলো। সংবাদ পেয়ে চট্টগ্রামে আজিম উদ্বিগ্ন- কখন বাস ছাড়বে, কতক্ষণ লাগবে, কোন বাস ইত্যাদি প্রশ্নবাণে সে জর্জরিত করতে লাগল আমাদের! বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তি প্রস্তুতিকালে প্রায় এক বছর আমার পাশের ফ্লাটে থাকতো সে। চট্টগ্রামের উপর দিয়ে যাই আসি কিন্তু তার সাথে একটিবারের জন্যও দেখা করি না। এ নিয়ে তার ভারি অভিমান।

 


মহানগরীর দুই নম্বর গেট এলাকায় তার সাথে দেখা হলো। তিন বছর পর দেখা, সেই বাচ্চা ছেলেটি আর নেই; অনেক বড় হয়ে গেছে। ওর বড় ইচ্ছা আমাকে একদিন বিশ্ববিদ্যালয়ে নিয়ে যাবে, বন্ধুদের সাথে আলাপ পরিচয় করিয়ে দেবে এবং ঘুরে ঘুরে দেখাবে সব কিছু। কিন্তু হুট করে চলে আসায় তা হয়ে উঠল না। তা নিয়েও তার আফসোসের অন্ত নেই। সকালে বিদায় নিয়ে বহদ্দারহাট গিয়ে গাড়ির জন্য অপেক্ষায় আছি। এখান থেকে এক বিশেষ পরিবহনের ব্যবস্থা আছে- মাইক্রোবাস সার্ভিস। ভেতরে বাসের মতো সারি সারি আসন পাতা। গাদাগাদি করে যাত্রী তোলা হয়, চলে বেপরোয়া গতিতে। মূলত সময় বাঁচাতেই মানুষ ঝুঁকি নিয়ে এই আজব পরিসেবা গ্রহণ করে। একটি টয়োটা হায়েস মাইক্রোবাসে কত মানুষ তোলা যেতে পারে, সর্বোচ্চ বারো জন? কিন্তু আমরা ওঠার পর একে একে ছেলেবুড়ো মিলে লোক তোলা হলো বাইশ জন! এই পরিস্থিতিতে চাইলেও নেমে যাওয়ার উপায় নেই কারণ আসন ছেড়ে উঠে মানুষের চাপ গলিয়ে নামতে চাওয়া যুদ্ধের সামিল। সংরক্ষিত বনাঞ্চল চুনতির মাঝ দিয়ে মহাসড়ক। জায়গায় জায়গায় লেখা ‘হাতি চলাচল।’

একটু উস্কে দিতেই গল্প শুরু হয়ে গেল। এরপর শুধু আচ্ছা আচ্ছা, জি জি আর মাঝেমধ্যে মাথাটা হা বা না-সুচক নাড়ানো, ব্যাস। প্রথমে মইক্রোবাস সেবার নামে মানুষ মারার ব্যবস্থা; এই ধরনের প্রসঙ্গে ক্ষুব্ধ বক্তব্যে সময় অতিবাহিত হলো। ওদিকে চালক গালের ভেতর পান ঠেসে বিনা প্রতিক্রিয়ায় গাড়ি হাঁকিয়ে চলছেন। এসব তাদের গা সওয়া। এবারের প্রসঙ্গ ডুলাহাজরা এবং হাতি।  প্রসঙ্গ ছুড়ে দিতেই খপ করে ধরে ফেললেন সামনে বসা কালো চশমা পড়া লোকটি। কয়েক বছর আগেও এই সমস্ত জায়গা দিয়ে হাতি পারাপার করত। এখন শুধু লেখাই আছে, হাতি আর পারাপার করে না! কথা আর একজন কেড়ে নিয়ে বলল, শুধু কি হাতি; এসব বনে হরিণও ছিল প্রচুর, ধরে ধরে কত খেয়েছি! পরেক্ষণেই আফসোস- হায়রে কোথায় হারিয়ে গেল সেই প্রাণীগুলো!  

প্রসঙ্গক্রমে বলতে হয় উত্তরবঙ্গ; যেখানে প্রাকৃতিক বনজঙ্গল খুবই সামান্য, সেই উত্তরবঙ্গেও অনেক প্রাণী ছিল। আজকে তার সম্পূর্ণটাই বিলুপ্তপ্রায়। লোকশ্রুত ভীমের জাঙ্গাল (উঁচু বাঁধের মতো) বগুড়া থেকে শুরু করে বৃহত্তর রংপুরের একাধিক জেলা হয়ে ভারতবর্ষের কামরূপ পর্যন্ত সংযুক্ত ছিল। সেই জাঙ্গাল আজও অনেকখানি অস্তিত্বশীল, যা বগুড়ায় স্থানীয়ভাবে ‘গড়’ বলে পরিচিত। বগুড়া শহর থেকে মাত্র পাঁচ কিলোমিটার উত্তরে এই ভীমের জাঙ্গালের নিচেই আমার জন্ম নিবাস। সম্পূর্ণ জাঙ্গাল বহু আগে থেকেই গাছপালায় আবৃত জঙ্গলমাত্র। ছোটবেলা দেখেছি পার্শ্ববর্তী জেলা থেকে সাঁওতালরা তীর-ধনুক নিয়ে দুই-তিন দিনের জন্য শিকারে আসত। বিশেষ করে সজারু, খড়া এবং গাওড়াই বেশি ধরা পরত। বিড়াল প্রজাতীর হলেও আকারে বড়, বিড়ালের মতো গৃহস্থের বাড়িতে থাকে না; সুযোগ বুঝে জঙ্গল থেকে বেরিয়ে হাস-মুরগি ধরে নিয়ে পালায়। এই প্রাণীটি স্থানীয়ভাবে গাওড়া বলে পরিচিত। আর খড়া অপর একটি প্রাণীর স্থানীয় বা আঞ্চলিক নাম, দেখতে সাদা ধবধবে খরগোশের মতো তবে পায়ের খুরা ছাগলের ন্যায়। সুতরাং, ধরতে পারলে স্থানীয়রাও খেত। দুই-তিন দিনে সাঁওতালরা অনেকগুলি করে গাওড়া, সজারু আর খড়া শিকার করে আগুনে ঝলসে লাঠিতে ঝুলিয়ে নিয়ে যেত। মাত্র কয়েক বছর আগের কথা এসব। জায়গায় জায়গায় কেটে সমতল করে ঘরবাড়ি নির্মাণ অথবা কৃষি জমিতে রুপান্তর করা হলেও ভীমের জাঙ্গাল এখনও আছে। কিন্তু হারিয়ে গেছে সেই সমস্ত প্রাণী। এসব মনে পড়লে মাইক্রোবাসের যাত্রীদের মতো একই সুরে বলতে ইচ্ছে করে, হায়রে কোথায় হারিয়ে গেল! এখন প্রাণীও নেই, সাঁওতালরাও আর আসে না। সময়ের সাথে সাথে তাদেরও পেশার পরিবর্তন ঘটছে।

ঘটনাক্রমে কয়েক মাস আগে পরিচয় হয় মামুন ভাইয়ের সাথে। আলাপ হচ্ছিল এসব বিষয় নিয়েই। সিটি ব্যাংক-এর কর্মকর্তা মামুন ভাই কাছে ডেকে বললেন, তার এক বন্ধুর ক্যামেরায় তিনি বুনো গাই এবং পাইথনের মতো প্রাণীর ছবি দেখেছেন, যা এই চুনতি এলাকা থেকে তোলা। সুতরাং এই বনাঞ্চল কতটা সমৃদ্ধ ছিল তা ভাববার বিষয় বটে। বছরের পর বছর আত্মঘাতি উন্নয়ন পরিকল্পনা ও তার বাস্তবায়নের মাধ্যমে সমৃদ্ধি আমরা কতখানি আনতে পেরেছি জানা নেই, তবে এসবের কারণে প্রাণ-প্রকৃতি যে অবলীলাক্রমে ধ্বংস করে চলেছি তাতে দ্বিমতের সুযোগ আছে বলে মনে হয় না।

 


আমরা গন্তব্যে চলে এসেছি। এখান থেকে ব্যাটারিচালিত অটেরিকশায় দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে যেতে হবে নতুনবাজার। গানওয়ালা রিকশা, দারুণ বাদ্যে বাজতে থাকল হিন্দি গান। প্রথমে অস্বস্তি লাগল, রাস্তার সব লোক তাকিয়ে আছে। পরে অবশ্য ভালোই লাগল। আমরা দুইজনসহ গাড়িতে এক খুনখুনো বৃদ্ধ, ফোকলা মুখে হেসে বলল, এখনই তো সময়, এই বয়েসে আনন্দ করবে না তো কবে করবে?

কথা মন্দ বলেননি, জীবনের অভিজ্ঞতা থেকেই বলা। নদীটি মহেশখালীকে মূল ভূ-খণ্ড থেকে আলাদা করে দিয়েছে। সেতু পেরিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে আমাদের রিকশা। মৎসজীবী প্রধান এলাকা, মাছের গন্ধ এখান থেকেই শুরু হলো। রাস্তার পাশে লবণের ঘের তার পেছনে পাহাড়। মহেশখালী বাংলাদেশের একমাত্র পাহাড়ি দ্বীপ। জানা যায় কয়েকশ বছর আগে এক ভূমিকম্পনের প্রভাবে কক্সবাজারের মূল ভূ-খণ্ড থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। পানের বরজ ঘেরা পথ দিয়ে এগিয়ে যাচ্ছি নতুন বাজারের দিকে। চট্টগ্রামের লোকগীতি গায়িকা শেফালী ঘোষের কণ্ঠে চট্টগ্রামের আঞ্চলিক জনপ্রিয় গানে পানের উল্লেখ পাওয়া যায়- ‘যদি সুন্দর একখান মুখ পাইতাম, মহেশখালীর পান খিলি তারে বানাই খাওয়াইতাম...’

আমরা এখন শেফালী ঘোষের পানের দেশ মহেশখালীতে। এখানকার অধিবাসীদের অন্যতম সুপ্রাচীন ও ঐতিহ্যবাহী পেশা পান চাষ। পাহাড়ি এলাকা হওয়ায় এর ভূমি পান চাষের জন্য বিশেষ উপযোগী। মহেশখালীর পানের বিশেষত্ব হলো মিষ্টি স্বাদ, যার করণে তা সারাদেশে বিখ্যাত। এক সময় মহেশখালীর মিষ্টি পান মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে রপ্তানী হতো। অধিকন্তু, এখানকার পানের সুনাম দেশের সীমানা পেরিয়ে এশিয়া মহাদেশ ছাড়া ইউরোপ-আমেরিকাতেও ছড়িয়ে রয়েছে। এমনও জানা যায় আফ্রিকা মহাদেশের কিছু কিছু দেশও বাদ যায় না। সমগ্র বাংলাদেশের দুই তৃতীয়াংশ মিষ্টি পান মহেশখালী দ্বীপে উৎপাদিত হয়ে থাকে। সুতরাং, এখানকার মানুষের ঐতিহ্যের প্রতি সম্মান প্রদর্শনপূর্বক আমাদের উচিৎ এক্ষূণি এক খিলি পান খাওয়া। পান খেয়ে ঠোঁট রাঙ্গিয়ে আবারও বাহন বদল করে চললাম নৌকা ঘাটের টানে। লবণ ঘেরের পাশ দিয়ে উঁচু বাঁধ, তার উপর দিয়ে পথ। চোখ যতদূর যায় কেবলই লবণ ঘের। ঘাটে গিয়েই মিলে যায় দ্বিপে যাওয়ার দিনের একমাত্র নৌকাটি। কেবলই এসে ঘাটে ভিড়ল, আর একটু দেরি হলেই নিশ্চিত একটা বেকায়দায় ফেঁসে যেতে হতো। নৌকা চালক আমাকে দেখে ঠিকই চিনে ফেললেন। তাতে আমার বেশ ভালোই লাগল।

 

 

রাইজিংবিডি/ঢাকা/৯ জুন ২০১৭/তারা

Walton
 
   
Marcel