ঢাকা, শুক্রবার, ১২ শ্রাবণ ১৪২৪, ২৮ জুলাই ২০১৭
Risingbd
সর্বশেষ:

মৈনট ঘাট : এক টুকরো কক্সবাজার

ফেরদৌস জামান : রাইজিংবিডি ডট কম
প্রকাশ: ২০১৭-০৬-২১ ৯:১৪:২৭ পিএম     ||     আপডেট: ২০১৭-০৬-২১ ৯:১৪:২৭ পিএম

ফেরদৌস জামান : যান্ত্রিক জীবনের সমাচারের সাথে কিছু কাল আগ থেকে আমাদের চাহিদার মধ্যে ক্রমেই যুক্ত হয়ে চলেছে ভ্রমণ বিষয়টি। ভ্রমণ মানুষকে সমৃদ্ধ করে। খুলে দেয় চোখ আর ভাবতে শেখায় জীবনের মর্মার্থ। তা ছাড়া আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মের দেখার দৃষ্টি বিনির্মাণ ও মানসিকতা গঠনে ভ্রমণের তুলনা নেই।

উন্নত বিশ্বের মানুষগুলি ভ্রমণকে দৈনন্দিন চাহিদার একটি অনুসঙ্গ মনে করে। সে লক্ষে প্রতিদিনের খরচের হিসেবের পাশাপাশি কিছু দিন পরপর নতুন কিছু দেখতে বের  হবার জন্য ভ্রমণ খরচটাও আলাদা করে রাখে। বিষয়টি যেন তাদের সংস্কৃতিরই একটি অংশ।

বর্তমানে ইতিবাচক এই প্রবণতাটি আমাদের মাঝেও বাসা বেঁধেছে। পরিবার পরিজন তথা বন্ধুবান্ধব মিলে কিছু দিন পরপর অথবা বিশেষ কোনো ছুটিতে বাইরে কোথাও যাওয়া চাই। একটা সময় আমরা পাগলপারা হয়ে ছুটেছি ঐ কক্সবাজার, সিলেট আর সুন্দরবনে। তাতে করে ভ্রমণে আসতো না বৈচিত্র্যতা। বর্তমানের চিত্র সম্পূর্ণ ভিন্ন। আমাদের ভ্রমণ তালিকায় দৈনন্দিন যুক্ত হচ্ছে নতুন নতুন জায়গা। আমাদের আশপাশেই যে প্রকৃতির কত কত আয়োজন রয়েছে তার ঠিক নেই! ভ্রমণ অনুসন্ধানিদের কল্যাণে দিনকে দিন সেগুলি বেড়িয়ে আসছে। এক সময় দেখা যেত যান্ত্রিক নগরী ঢাকার আশেপাশে ঘোরার জায়গার স্বল্পতার কারণে ছুটির দিনগুলো অনেকেই ঘুমিয়ে কাটাতো। বলা যায় সেদিন ফুরিয়ে আসছে। ছুটির দিনে অথবা কর্মব্যস্ততার ফাঁকে চাইলে ঘুরে আসতে পারি সম্প্রতি মিনি কক্সবাজার বলে ব্যাপক পরিচিতি প্রাপ্ত মৈনট ঘাট। ঢাকার খুব কাছেই পদ্মা নদীর উত্তাল ঢেউ দেখতে আর পদ্মার বুকে নৌকা ভ্রমণের স্বাদ নিতে যাওয়া যেতে পারে ঢাকা দোহার উপজেলার মৈনট ঘাটে। পর্যটক মাত্রই সেখানে গেলে পদ্মার অপরূপ জলরাশি দেখে মুগ্ধ না হয়ে উপায় নেই। বিস্তীর্ণ জলরাশি থেকে ছুটে আসা আছড়ে পরা ঢেউ আর নদীর বুকে জেলেদের সারি সারি নৌকা দেখলে মনে হবে কক্সবাজার সমুদ্র সৈকতে আছি।

সাধ থাকলেও সাধ্য না থাকায় আমাদের চারপাশের ভ্রমণ পিপাসু বহু মানুষই দূরে কোথাও যেতে পারে না। ফলে বাড়ছে হতাশা। মৈনট ঘাট সবার কাছে খুব একটা পরিচিত নয়। যে কারণে হতাশাগ্রস্ত মানুষগুলি ছুটিছাটা দেখে হুট করেই বের হতে পারছে না মৈনট ঘাটের মতো একটি জায়গা দেখতে। এখানকার সৌন্দর্য দিনের একেক সময় একেক রকম। ভোরবেলা যেতে পারলে দেখা যায় সারারাত জেলেদের ধরা ইলিশসহ বিভিন্ন প্রজাতির মাছের বাজার। চাইলে তুলনামূলক সস্তা দামে এখান থেকে মাছও কেনা যেতে পারে।

এখানকার সৌন্দর্য উপভোগ করার শ্রেষ্ঠ সময় বর্ষাকাল। এই ঈদের ছুটিতে কোনো একটি দিন প্রিয়জনদের নিয়ে ছুট দেওয়া যেতে পারে মিনি কক্সবাজার মৈনট ঘাটের উদ্দেশে। পদ্মার পাড়ে বসে সূর্যাস্ত উপভোগ করার মত ব্যাপরটি জীবনের অভিজ্ঞতার খাতায় যুক্ত হতে পারে বিশেষ একটি ঘটনা হিসেবে। ছুটির দিনগুলোতে স্থানীয় তথা দূরদূরান্ত থেকে যাওয় মানুষেরা পদ্মার বুকে স্পিডবোট আর ট্রলার নিয়ে ঘুরে বেড়ায় মুক্ত বিহঙ্গের মত। সারা দিনের ভ্রমণের জন্য এটি একটি আদর্শ জায়গা হিসেবে গণ্য হতে পারে। পাশাপাশি দর্শন দেওয়া যেতে পারে নবাবগঞ্জের জজবাড়ি, উকিলবাড়ি, আনসার ক্যাম্প, খেলারাম দাতার বাড়িসহ আরো কিছু দর্শনীয় স্থান। নদীর ওপারেই দেখা যায় ফরিদপুরের চর ভদ্রাসন। চাইলে পরিকল্পনায় নৌ-বিহারে ভদ্রাসন ভ্রমণের বিষয়টি যুক্ত হতে পারে। স্পিডবোটে বিশ মিনিটেই পৌঁছা যায়, ভাড়া জনপ্রতি ১৭০ টাকা। এ ছাড়া রয়েছে ট্রলার ও ইঞ্জিন যুক্ত ছোট নৌকা। ভ্রমণকে আরো অধিক উপভোগ্য করে তুলতে ৫০০ থেকে ৭০০ টাকায় অনায়াসেই রিজার্ভ করা যেতে পারে নৌকা অথবা ট্রলার।

 



যেভাবে যেতে হবে : রাজধানী ঢাকা থেকে মৈনট ঘাটে যাওয়ার সব থেকে সহজ ও সুবিধাজনক উপায়টি হচ্ছে বাস যোগে। গুলিস্তানের গোলাপ শাহ মাজারের সামনে থেকে সরাসরি মৈনট ঘাটের উদ্দেশে ছেড়ে যায় যমুনা পরিবহনে বাস। প্রায় বিশ মিনিট পরপর বাস ছেড়ে যায়। জনপ্রতি ভাড়া পড়বে ৮০ থেকে ৯০ টাকা। বাস ছেড়ে দেওয়ার দুই থেকে আড়াই ঘণ্টার মধ্যে নামিয়ে দেবে মৈনট ঘাট। সারাদিন অতিবাহিত করার পর ফেরার সময় একই বাসে আবার ঢাকায় চলে আসতে হবে। সেক্ষেত্রে স্মরণ রাখা দরকার মৈনট থেকে ঢাকার উদ্দেশে শেষ বাসটি ছেড়ে দেয় সন্ধ্যা ৬টায়। ঋতু ভেদে কখনও কখনও সময়ের রকমফের হয়ে থাকে। ব্যক্তিগত গাড়ি নিয়ে যেতে চাইলে একই রুট ধরে অর্থাৎ বাসের রুটেই যেতে হবে। তা ছাড়া ব্যক্তিগত গাড়ি করে ঢাকা থেকে স্বল্প দূরত্বে এটি ভ্রমণ উপযোগী একটি জায়গা।

থাকা খাওয়ার ব্যবস্থা : মৈনট ঘাটে অদূর ভবিষ্যতে ব্যাপক পর্যটক সম্ভাবনা থাকায় ইতিমধ্যেই বিভিন্ন উদ্যোক্তা প্রতিষ্ঠান হোটেল, মোটেল বা রেস্টহাউজ নির্মাণে এগিয়ে আসার কথা ভাবতে শুরু করেছে। তবে ঠিক এখনই সেখানে রাত্রি যাপনের মত কোনো ব্যবস্থা হয়ে ওঠেনি। সুতরাং, বর্তমানে এক দিনের ভ্রমণ পরিকল্পনাই এখানকার জন্য উপযুক্ত। তা ছাড়া ঢাকা থেকে খুব সহজেই দিনের দিন ঘুরে আসা সম্ভব। আর খাওয়া দাওয়ার ক্ষেত্রে বলতে গেলে বেশির ভাগ মানুষেরই ইচ্ছা থাকে পদ্মার তীরে বসে পদ্মার ইলিশ খাওয়া। মৈনট ঘাটে খাবারের হোটেল আছে। এর মধ্যে আতাহার চৌধুরীর হোটেল এবং জুলহাস ভূঁইয়ার হোটেল হতে পারে খাবার খাওয়ার উপযুক্ত জায়গা। ১২০ থেকে ১৫০ টাকায় ইলিশ মাছ ভাজা দিয়ে চমৎকার খাওয়া হয়ে যায়। বড় ইলিশ খেতে চাইলে তার দাম একটু বেশি পড়ে যায়। ইলিশ ছাড়াও রয়েছে বোয়াল, চিংড়িসহ পদ্মা নদী অন্যান্য টাটকা মাছের বিভিন্ন পদ। নিকটেই কার্তিকপুর বাজারে ফাস্টফুডসহ একাধিক খাবারের দোকান বা হোটেল আছে। কার্তিকপুরের আর একটি খ্যাতি রয়েছে, তা হল এখানকার ঐতিহ্যবাহী মিষ্টি। নিরঞ্জন মিষ্টান্ন ভান্ডার, রণজিৎ মিষ্টান্ন ভান্ডার এবং মুসলিম সুইটসসহ রয়েছে আরো বেশকিছু মিষ্টির দোকান। দুইশ থেকে চারশ টাকা কেজি দরে পাওয়া যায় খাঁটি ছানায় তৈরি বিভিন্ন পদের মিষ্টি।

টিপস : সাঁতার না জানা থাকলে গোসল করার সময় নদীর বেশি গভীরে যাওয়া অনুচিৎ। পরিবেশের কথা ভেবে অপচনশীল দ্রব্য যেমন-পানির প্লাস্টিক বোতল, খাবার প্যাকেট, পলিথিন ইত্যাদি যেখানে সেখানে ফেলা থেকে বিরত থাকা। নৌ-ভ্রমণের সময় অবশ্যই লাইফ সেভিং জ্যাকেট পরিধান করা। প্রতিটি লেনদেনের আগেই দামদর ঠিক করে নেওয়া।



রাইজিংবিডি/ঢাকা/২১ জুন ২০১৭/ফেরদৌস জামান/সাইফ

Walton Laptop