ঢাকা, শুক্রবার, ৭ আশ্বিন ১৪২৪, ২২ সেপ্টেম্বর ২০১৭
Risingbd
সর্বশেষ:

ভক্তপুরের প্রাচীন সৌরভ || শান্তা মারিয়া

শান্তা মারিয়া : রাইজিংবিডি ডট কম
 
   
প্রকাশ: ২০১৭-০৭-১০ ৭:১২:৪২ পিএম     ||     আপডেট: ২০১৭-০৭-১৭ ৩:৩৫:৪৩ পিএম

(লক্ষণরেখার বাইরে-২০)
নেপাল বললেই আমার চিরদিন প্রথমে মনে পড়েছে গৌতম বুদ্ধের কথা। কারণ নেপালের লুম্বিনী এই মহামানবের জন্মস্থান। শুধু নেপাল নয়, প্রাচীন ভারত বর্ষের বিভিন্ন শহরের কথাও মনে ভাসে। অযোধ্যা, কোশল, কাঞ্চি, মগধ, উজ্জয়িনী- আরো কত নাম! এসব শহরে যদি টাইম মেশিনে চড়ে চলে যেতে পারতাম- এই ইচ্ছা কিছুটা হলেও মিটল ভক্তপুর গিয়ে। নেটজ-এর হাবীব মুনীর ভাই বেশ পড়াশোনা করা মানুষ। তিনিই আমাদের টিম লিডার হয়ে নিয়ে গেলেন ভক্তপুরে। কাঠমান্ডু শহর থেকে ১৩-১৬ কিলোমিটার পূর্বে জায়গাটি এক সময় বিখ্যাত মল্ল রাজাদের রাজধানী ছিল।

ভক্তপুরের ইতিহাস কয়েক হাজার বছরের। শহরের মধ্যে বড় খোলা জায়গা। এর নাম ভক্তপুর দরবার স্কোয়ার। তার চারপাশে অনেক মন্দির আর প্রাসাদ। পুরো জায়গাটা এখন টুরিস্টদের জন্য সংরক্ষিত। ভক্তপুরে একসময় লিচ্ছবিদের জনপদ ছিল। ১২শ শতকে এখানে মল্ল রাজাদের রাজধানী গড়ে ওঠে। মল্ল রাজারা ভক্তপুরে অনেক মন্দির, প্রাসাদ তৈরি করেন এবং একে নেপালের সাংস্কৃতিক রাজধানীতে পরিণত করেন। এখানে ভৈরোনাথের মন্দির, কাশী বিশ্বনাথের মন্দিরসহ অনেকগুলো বিখ্যাত মন্দির আছে। ভক্তপুরে রয়েছে ৫৫ জানালাবিশিষ্ট একটি মধ্যযুগীয় প্রাসাদ। এর মধ্যে একটি সোনার তৈরি মন্দিরও রয়েছে। একটি প্রাসাদে রয়েছে ন্যাশনাল আর্ট গ্যালারি। এই আর্ট গ্যালারিতে এত অদ্ভুত সুন্দর সব সামগ্রী আছে যে, পুরো একটি দিন ধরে দেখলেও শেষ হবে না।

নেপালের পুঁথি বিখ্যাত। এই পুঁথিগুলো নানা রকম ছবি আর নকশাশোভিত। পুঁথি দেখতে গিয়ে মনে পড়ে গেল নেপালের রাজদরবারেই হরপ্রসাদ শাস্ত্রী খুঁজে পেয়েছিলেন বাংলা ভাষার আদি নিদর্শন চর্যাচর্য বিনিশ্চয় নামের পুঁথিটি। এখানে মধু কৈটভবধ আর শ্রীকৃষ্ণের জীবনের ও বিষ্ণুর বিভিন্ন অবতারের অসাধারণ সব পেইন্টিং রয়েছে। এখানে মহাভারতের বিভিন্ন ঘটনাভিত্তিক পেইন্টিং রয়েছে। কিছু কিছু পেইন্টিং-এ দেখলাম মোগলরীতির শিল্পকলার সুস্পষ্ট প্রভাব। বোঝাই যায় এগুলো মধ্যযুগের শিল্পকলার নিদর্শন। সহস্র হাতবিশিষ্ট একটি শিবচিত্র দেখলে অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকতে হয়। নেপালের চিত্রকলা অতি প্রসিদ্ধ। একটা জিনিস ভাবতে খুব অবাক লাগে। এত শত বছর আগের ছবি কিন্তু এখনও কি জেল্লাদার রং!

 


এরই মধ্যে তান্ত্রিক একটি শিবলিঙ্গ মন্দির রয়েছে। মন্দিরটিতে অবশ্য কিছু দূর প্রবেশাধিকার রয়েছে সকলের জন্য। মন্দিরের গর্ভগৃহে বিগ্রহ রয়েছে। সেখানে হিন্দু ও বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বী ছাড়া আর কারও প্রবেশ নিষেধ। আমাদের সহযাত্রী ডিয়ার্ক শ্বেতাঙ্গ মানুষ। তাই তাকে ঢুকতেই দেবে না। আর অনীক আসাদ ভাই ঘোষিত নাস্তিক। তিনিও ঢুকবেন না। আমার এসব প্রেজুডিস নেই। মন্দিরের চৌকাঠে প্রণাম ঠুকে এবং ঘণ্টা বাজিয়ে দিব্যি ঢুকে পড়লাম। কপালে লাল টিপ আমার এমনি ব্র্যান্ডিং যে আমার ধর্ম বিশ্বাস নিয়ে কেউ কোথাও প্রশ্নই তোলে না।

এই মন্দিরের সঙ্গেই আছে নাগপুহুরি বা নাগপুকুর। ঘাট বাঁধানো বড় একটি পুকুর। মাঝখানে বড় নাগের ফণা মাথা তুলে রয়েছে। অদ্ভুত এর কারুকার্য। এখানে অবশ্য সকলেই ঢুকতে পারেন। পুকুরটিতে যেতে হলে সিঁড়ি ভেঙে প্রায় একতলা পর্যন্ত মাটির নিচে নামতে হয়। মনে হচ্ছিল পাতালপুরী যাচ্ছি। সেখানে রয়েছে নাগদের রাজত্ব আর পাতালকন্যা মণিমালা।

ভক্তপুরে বিষ্ণুমন্দির আর ভগবতী দুর্গার মন্দিরও বেশ বিখ্যাত। দুর্গা মন্দির দেখলেই আমার বাংলাদেশের দুর্গাপূজার আমোদ উৎসবের কথা মনে পড়ে যায়। কেন যেন দুর্গা প্রতিমাকে আমার বরাবরই বাঙালি নারী বলে মনে হয়। তাই নেপালে এত এত শিব, বিষ্ণু, হনুমান আর কৃষ্ণ মন্দিরের ভিড়ে দুর্গা মন্দিরে দুর্গাকে দেখে বেশ আপন বলে মনে হলো। যদিও এই ভগবতীর মুখের আদল আমাদের বাঙালি মেয়ের মতো স্নিগ্ধ নয়। একটু যেন রাগী রাগী ভাব। ভগবতীর মন্দিরটি ১৫ তলা উঁচু।  অনেকগুলো মন্দির আর প্রাসাদই ১৯৩৪ সালের ভূমিকম্পে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির মুখে পড়ে। পরে আবার এগুলো পুনঃর্নির্মাণ করা হয়। মন্দিরে ওঠার সিঁড়ির দুপাশে রয়েছে মাতৃকামূর্তি। সাম্প্রতিক ভূমিকম্পেও ভক্তপুরের বেশ ক্ষতি হয়েছে। সেগুলোও আবার গড়ে তোলা হচ্ছে দেখলাম।

 


একেকটি মন্দিরের কাঠের ও পাথরের কারুকার্য এমনি মনোমুগ্ধকর যে মনে হয় সারাদিন ধরে হা করে বসে এগুলো দেখি। কিন্তু হায়! সে সময় কোথায়?

ভক্তপুর যেদিন যাই সেদিন ছিল মেঘলা। মাঝে মাঝেই মেঘ ঘনিয়ে আসছে । পাহাড়ের একদিকে গাড়ি রেখে তারপর ধীরে ধীরে ঢাল বেয়ে উঠতে হয়। পুরো ভক্তপুর শহরটি টুরিস্টদের জন্য সংরক্ষিত। সেখানে সন্ধ্যার পর কারও প্রবেশাধিকার নেই। তবে আশেপাশে স্থানীয় লোকজনের ঘরবাড়ি আছে।

মেঘলা বিকেলে একটু পর ঝিরিঝিরি বৃষ্টি নামল। একটা প্রাচীন ভবনের বারান্দায় গিয়ে দাঁড়ালাম। সবাই ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে। এদের সবাইকে একসঙ্গে জড়ো করে তবে ফেরার পালা। এর মধ্যে তাকিয়ে ছিলাম আকাশের দিকে। আকাশে মেঘ জমা হয়েছে স্তরে স্তরে। যেন বহু শতাব্দির পুঞ্জিভূত ইতিহাস জমা হয়েছে ভক্তপুরের আকাশে। এরই মধ্যে পশ্চিম দিগন্তে মেঘ সরে গিয়ে এক চিলতে আলো এসে পড়লো। বহু যুগের ওপার থেকে অস্তমুখী সূর্যের আলো এসে স্পর্শ করলো ভক্তপুরের আকাশ।

 

 

রাইজিংবিডি/ঢাকা/১০ জুলাই ২০১৭/তারা

Walton Laptop