ঢাকা, শনিবার, ১২ ফাল্গুন ১৪২৪, ২৪ ফেব্রুয়ারি ২০১৮
Risingbd
অমর একুশে
সর্বশেষ:

সেই রমণী সত্যি ধন্যবাদ পাবার যোগ্য

ফেরদৌস জামান : রাইজিংবিডি ডট কম
 
   
প্রকাশ: ২০১৮-০১-১৫ ৫:০৭:২৯ পিএম     ||     আপডেট: ২০১৮-০১-১৫ ৫:০৮:১০ পিএম

(ভিয়েতনামের পথে: অষ্টম পর্ব)

ফেরদৌস জামান: কথা অনেক হয়েছে, এখন দুপুরের খাবার খাওয়ার উপযুক্ত সময়। ওদিকে পাহাড় চূড়ার মন্দিরটাও দেখতে হবে। যা করার তা এই দিনের মধ্যেই করতে হবে। কালকের জন্য ফেলে রাখা যাবে না। কারণ ভ্রমণ পরিকল্পনা সংশোধন করে মে হং সনের জন্য এই দিনটিই শুধু রাখা হয়েছে। পরের দিন সকাল সকাল পাই নামক আরেক নতুন গন্তব্যে ছুটব।

সুইডিশ শিক্ষকের সাথে আলাপ করে দেখা গেছে একান্তই শুয়ে বসে আরাম করে সময় কাটানোর ইচ্ছা না থাকলে এখানে এক দিনই যথেষ্ট। তার দেয়া নির্দেশনা অনুযায়ী পূর্ণ প্রস্তুতি নিয়ে বের হলাম। প্রথমে যেতে হবে বিমানবন্দরের পাশের বাজারে। এখানেই রয়েছে সুলভ মূল্যে ভালো খাবারের দারুণ সব দোকান! কাঠের একটা তোরণের নিচ দিয়ে সমনে এগোলেই বাজার। বাজারের মুখেই ডানপাশে মোটর গ্যারেজ। এটার কথাই তিনি বারংবার বলেছিলেন। গ্যারেজের পাশের রেস্টুরেন্টে খাবার না পেয়ে প্রবেশ করলাম বাজারের ভেতরে। বেশিরভাগ দোকান বন্ধ, তবুও যে কয়টা খোলা সেগুলো দেখে ভালো লাগল। দেখতে দেখতে ওপারে গিয়ে উপস্থিত হলে রাস্তার পরেই বিমানবন্দরের প্রাচীর। ফুটপাত ধরে সমনে এগিয়ে চোখে পড়ল মুরগি, মাছ ও অন্যান্য মাংস ভেজে লাল করে রাখা টুকরোগুলো। কতক্ষণ আগে ভেজে রাখা তা অনুমান করা কঠিন। অতএব, এখনই যে পদটা রান্না করে দিতে পারবে সেটাই পরিবেশনের কথা বলে ভেতরে গিয়ে বসে পড়লাম। একে একে চলে এলো বাহারি রঙের মরিচ, লেবু আরও কী কী সব সালাদের পদ। প্রধান খাবারটা আসতে সময় লাগবে। পাশেই উন্মুক্ত রন্ধনশালায় রান্না চলছে। কীভাবে রান্না হচ্ছে তা দেখার আগ্রহ প্রকাশ করলে সাদরে আমন্ত্রণ জানানো হলো। এটা কী, ওটা কী এমন অনেক প্রশ্ন করলেও উত্তর খুব কম পেলাম। মানুষগুলো শুধু খিলখিল করে হাসে। যেন এমন খদ্দের আগে কখনও পায়নি। অনেক যত্ন করে একটার পর একটা উপকরণ যোগে রান্নার কাজ এগিয়ে চলছে। ভেতরটা ঘুরে দেখতে চাইলে তাতেও আপত্তি নেই। উভয় পক্ষের আচার আচারণে পরিবেশটা এমন হলো যেন রেস্টুরেন্ট নয়, কোনো আত্মীয় বাড়িতে দাওয়াত খেতে এসেছি।

 


রেস্টুরেন্টের পরিবেশ দেখেই বুঝেছিলাম এটা তাদের পারিবারিক ব্যবসা। কাজের ফাঁকে ফাঁকে বৃদ্ধ মহিলা ভাঙা দেরাজের উপর দায়ের মতো বস্তুর আঘাতে ঠকাস ঠকাস শব্দ তুলে কিছু একটা করছেন। সাধারণ কোনো কাজ নয়, অবশ্যই বিশেষ কিছু হবে। বসে বসে এমনটাই ভাবছিলাম। বৃদ্ধা বোধহয় এবার আমার কৌতূহলের গভীরতা পরিমাপ করতে পারলেন এবং আন্তরিক ইশারায় একজন বোবা মানুষকে যেভাবে ডাকে ঠিক সেভাবে কাছে ডেকে নিলেন। কালো এবং শক্ত খোলসের গোটাগুলোতে দায়ের পেট দিয়ে মাঝাড়ি আঘাত দিলে ফেটে তার ভেতর থেকে বাদামের মতো শাঁস বেরিয়ে আসছে। এতক্ষণ তিনি সেটাই খাচ্ছিলেন। আমাকে যে শুধু দেখাতে নয় বরং খাওয়ার জন্য ডেকেছেন প্রথমে তা বুঝতে পারিনি। ভাঙার কায়দা রপ্ত করতে সাহায্য করার পর নিজ ভাষায় যা বললেন তাতে অনুমান করা যায়- ইচ্চে মতো খেতে মানা নেই।

 


খাবার চলে এলো, যথারীতি দুইজনের দুই রকম। তারা তিনজনই কাছে এলেন। অনুমান করা যায় আমাদের এতক্ষণের কর্মকাণ্ডের ফলে তারা খাওয়ার দৃশ্য দেখায় আগ্রহী হয়ে উঠেছে। আবার ইতস্ততও করছে আমরা অস্বস্তি বোধ করি কি না এ নিয়ে। সেটা যে হবার নয় অঙ্গভঙ্গিমায় তা বোঝানোর পর আরও একটু নিকটে এলেন এবং খুশি হয়ে মড়মড়ে ভাজা শুকনা মরিচ গুঁড়ার বাটি বাড়িয়ে দিলেন। আরও খানিকটা নিকটে এসে দেখিয়ে দিলেন পরিবেশিত অতিরিক্ত উপকরণগুলো খাবার কোন পর্যায়ে যোগ করতে হবে বা ছিটিয়ে দিতে হবে। পরস্পরের খাবার ভাগাভাগি করে খেয়ে এই বলে বেরিয়ে এলাম যে, রাতের খাবার খেতে আবারও আসছি। খাওয়ার পর একটু মিষ্টি জাতীয় কিছু খেতে পারলে মন্দ হতো না। এমনটা ভাবতে ভাবতে রেস্টুরেন্ট থেকে বের হয়েছি, সামনেই এক বৃদ্ধা কিছু একটা বিক্রি করছে। মোটর সাইকেলের সাথে জুড়ে দেয়া আলাদা একটা অংশ। তাতে রাখা বাক্স থেকে কিছু একটা তুলে দুই চাকা পাউরুটির মধ্যে দিয়ে পরিবেশিত হচ্ছে। পাউরুটিতে চেপে দেয়া ছোট্ট দুই স্কুপ আইসক্রীমে একটা কামড় বসানোর পর মনে হল এত চমৎকার স্বাদের মিষ্টান্ন আর কখনও খাওয়া হয়নি। দাম মাত্র আট বাথ।

ওয়াট ফ্রাথাট ডই কং মু-এর অর্থ কী হতে পারে তা আমাদেরকে ভাবনায় ফেলে দিলো। এই চার শব্দের কোনো একটা দিয়ে হয়তো জায়গাটার নাম বোঝানো হয়েছে, আবার কোনোটার অর্থ হতে পারে খোদ মন্দির। বাক্যের অর্থ জানার বৃথা চেষ্টা না করতে চেয়েও একজনকে জিজ্ঞেস করলে শেষ পর্যন্ত ব্যর্থই হতে হলো। পথের অপর পাশে মেহগুনি রঙের তোরণ। ভেতরের অংশের দুইপাশে সোনালি রঙের হা-করা দুইটা সিংহ এবং বাইরের দিকে দুইটা ড্রাগন। সম্ভবত এটাই মন্দিরের প্রবেশ পথ। কয়েকটা সিঁড়ি ভেঙে উপরে গেলেই পাহাড়ের গা বেয়ে ঢালু পথের শুরু। সেগুন গাছের তল দিয়ে রেলিং বাঁধা পথ ঘুরিয়ে-পেঁচিয়ে উঠে গেছে। মাঝে মাঝে ভক্ত-দর্শনার্থীদের বিশ্রামের জন্য বসার জায়গা। লাল, হলুদ রঙের সিমেন্টের ইট বিছানো পথ ক্রমেই উঠে গেছে উপর থেকে আরও উপরের দিকে। এক পর্যায়ে গিয়ে মিলিত হয়েছে অপর দিক থেকে উঠে আসা অন্য এক পথের সাথে। যে পথ দিয়ে মোটর সাইকেল বা গাড়ি নিয়ে আরোহণ করা যায়। এখান থেকেই শুরু হয়েছে মূল মন্দিরে আরোহণের সিঁড়ি। উপরে দেখা যাচ্ছে সিঁড়ির শেষ প্রান্ত। এরপর আর কিছুই নয়, শুধু বিস্তীর্ণ আকাশ। তারপর কি আছে, কষ্ট করে এত উপরে উঠে আসার সেটাই আকর্ষণ। শেষ প্রান্তের সিঁড়ির উভয় পাশ থেকে ড্রাগনের মতো রেলিং নেমে এসেছে একেবারে গোড়ালী পর্যন্ত। সন্তর্পণে উপরে উঠে যা দেখলাম তা বুঝে ওঠার প্রয়োজনীয়তা ভুলে বেশ কিছুক্ষণ শুধু নির্বাকই থেকেছি। ধবধবে সাদা সুউচ্চ মঠজোড়াকে কেন্দ্র করে নির্বাক বসে আছে কিছু মানুষ। চেয়ারে বসা সাদা পোশাকের প্রতিটা মানুষের হাতে পদ্মপাতা এবং পাতার মাঝে দুই-একটা হলুদ গাঁদা ফুল। এরা ছাড়া অন্য সকলেই কালো পোশাক পরা। ভিক্ষুগণ তাদের চিরাচরিত গেরুয়া বসনে আবৃত।

 


আরোহণের দীর্ঘ পথ এতটাই নীরব-নিথর ছিল যে, কিছু পাখির ডাক ছাড়া কানে অন্য কিছুই যায়নি। আর মানুষ বলতে সারাটা পথে আমরাই দুজন। অথচ, এখানে এত মানুষ। একটু এগিয়ে দেখা যাচ্ছে ভিক্ষুগণ খুর দিয়ে চেয়ারে বসা লোকগুলোর মাথা কামিয়ে দিচ্ছেন। কামানো চুল রাখা হচ্ছে হাতে ধরা পদ্মপাতায়। কেউ কেউ তাদের সাথে ছবিও তুলছে। মানুষের ভিড় দেখে অনুমান করা যায় এদের প্রতিজনের সাথেই কেউ না কেউ আছে। ঘোরের মাঝে কেটে গেল বেশ খানিকটা সময়, জানা হলো না এই আনুষ্ঠাকিতার উদ্দেশ্য ও পটভূমি। প্রথমে ভাবলাম পূজার উদ্দেশ্যে উৎসর্গের স্থানীয় বিশেষ কোনো রীতি হয়ে থাকবে। পাশের জনকে জিজ্ঞেস করে কিছুই জানা গেল না। এভাবে আরও কয়েকজনের কাছে জানতে গিয়ে ব্যর্থ হলাম। আমি কী বলি আর তার প্রতিউত্তরে তারা কী বলে তা বুঝে ওঠা মুশকিল। কেউ কেউ তো ইংরেজি শুনে আগেই হাত তুলে ক্ষমাপ্রার্থী। বোধহয় আধাঘণ্টারও বেশি সময় পেরিয়ে গেল। একজনকেও খুঁজে পাচ্ছি না যাকে দেখে মনে হবে আমাদের তাৎপর্যটা জানাতে পারবে। সমাগত সকল নারীদের মাঝে সবচেয়ে লম্বা রমণীই আমার এবারের লক্ষ্য। মিহি কালো পোশাকের মাঝ থেকে দুধে-আলতা মুখখানি বোরিয়ে আছে। অনেক ভিড় আর বিষয়বস্তুর মাঝে এমন সৌন্দর্য চোখ এড়াবার নয়। তার ব্যাপারে একটু বেশিই আত্মবিশ্বাসী হয়ে এগিয়ে গেলাম। এগিয়ে যেতে যেতে ভাবছি আমার অনুমান সত্যে পরিণত হতে আর মাত্র কয়েক কদম বাকী। কাছে গিয়ে জানতে চাইলে সংক্ষেপে এবং অতি কষ্টে তিনি আমার কৌতূহল মেটাতে সক্ষম হলেন। ধর্মের অনুরাগী প্রিয় রাজার মৃত্যুতে শোকাহত ভক্তগণ এই প্রক্রিয়ায় শোক জ্ঞাপন করছেন। দুধে-আলতা রমণীর কাছ থেকে এর চেয়ে এক লাইনও বেশি জানতে পারিনি তবে সে সত্যিই ধন্যবাদ পাবার যোগ্য।

মঠের সম্মুখ চত্বরের প্রান্তে রেলিং ধরে দাঁড়ালে দৃষ্টিগোচর হয় পাহাড়-পর্বতবেষ্টিত ছোট্ট মে হং সন শহরের পুরোটা। ঠিক মাঝখানে লেক, যেন অনেক কিছুর মাঝে অত্যন্ত যত্ন করে কেউ এক বাটি পানি রেখে দিয়েছে। এই লেকের কোনো পাড়েই আমাদের থাকার জায়গা। অর্থাৎ গেস্ট হাউজ। কিন্তু লেকের কোন প্রান্তে বা ঠিক কোন জায়গাটায় হতে পারে তারই অনুসন্ধানে চললো আমাদের দীর্ঘ গবেষণা। শহরের পূর্ব প্রান্তে ছোট্ট বিমানবন্দরের রানওয়ে স্পষ্ট দেখা যায়। তাতে একটা বিমানও রয়েছে। মন্দিরের জন্য শহরের মাথার উপর এমন জায়গা নির্বাচন নিঃসন্দেহে অতুলনীয়। চারদিকে পাহাড় আর তার মাঝে একটা উপত্যকা। কত সুন্দর শহর! মূলত লেকটাকে কেন্দ্র করেই চারধারে বিস্তৃত হয়েছে শহরের পরিধি। এই শহর দেখার জন্য সারা পৃথিবী থেকে কত মানুষ এসেছে তার ঠিক নেই! এতটুকু জায়গার মধ্যে হাট-বাজার, বিনোদন কেন্দ্র থেকে শুরু করে একটা বসতির জন্য প্রয়োজনীয় প্রায় সবই আছে।   

 


মঠ দুটোর পেছনে এবং পাশেই বিভিন্ন উচ্চতায় ও ব্যবধানে রয়েছে আরও কয়েকটা মন্দির গৃহ। এক জায়গায় প্রার্থনার জন্য সমবেত হয়েছে অনেক মানুষ। বিশেষ এই উৎসর্গ আনুষ্ঠান উপলক্ষেই হয়তো এই প্রার্থনার আয়োজন। পাশে সামিয়ানার নিচে ভোজন পর্ব চলমান। খাবারের সুগন্ধে আচ্ছন্ন পরিমণ্ডল পেরিয়েই কয়েকটা দোকান নিয়ে ক্ষুদ্র বাজার। কাঠ, বাঁশ ও ধাতব নির্মিত হস্তশিল্পের চমৎকার পণ্য সম্ভার। প্রতিটা পণ্য এত সুদৃশ্য ও আকর্ষণীয় যে সব কিনতে ইচ্ছা হয়। বিশেষ করে পিতল-কাঁসার তৈরি বিভিন্ন আকৃতি ও ধরনের বৌদ্ধ মূর্তিগুলো সংগ্রহ করার জন্য উপযুক্ত একেকটা সামগ্রী। এখান থেকে পাঁচ মিনিট হাঁটলে চূড়ার পশ্চিম প্রান্ত। সোজা এগোলে আরেকটা মন্দির। ঠিক তার ডান পাশটায় সুদৃশ্য পর্বতমালার পাদদেশে সূর্য অস্ত যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে। এই পর্বত সারির ওপারেই আরেক দেশ মিয়ানমার। এখান থেকে পেছনে পাথর কেটে বানোনো এবড়োথেবড়ো সিঁড়ি মাড়িয়ে কয়েক মিটার উপরের চূড়াটায় সর্বশেষ মন্দির। জনমানবহীন মন্দিরে কেবল একজন নারী প্রার্থনার উদ্দেশ্যে হাঁটু মুড়ে কতক্ষণ যাবৎ বসে আছেন কে জানে? সবুজের সমারোহ আর সীমাহীন নীরবতার মাঝে এখানেই দাঁড়িয়ে আছে মহামতি বুদ্ধের সুউচ্চ মূর্তি। কয়েক মিনিটের মধ্যেই সূর্যটা ডুব দেবে। সাথে সাথে অন্ধকারে ঢেকে যাবে আশপাশের সমস্ত কিছু। আর আকাশে ভেসে উঠবে চকচকে একটা চাঁদ অথবা অজস্র তারা। (চলবে)

 

 


রাইজিংবিডি/ঢাকা/১৫ জানুয়ারি ২০১৮/তারা

Walton
 
   
Marcel