ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ১ ভাদ্র ১৪২৫, ১৬ আগস্ট ২০১৮
Risingbd
শোকাবহ অগাস্ট
সর্বশেষ:

কামরূপ-কামাখ্যায় তুক-তাক শিখে এসে

তপন চক্রবর্তী : রাইজিংবিডি ডট কম
 
     
প্রকাশ: ২০১৮-০৫-২৬ ৪:০৯:৩৬ পিএম     ||     আপডেট: ২০১৮-০৫-২৮ ৪:২২:৪০ পিএম

(রবীন্দ্রনাথ কেনো বারবার শিলং যেতেন: দ্বিতীয় পর্ব)

তপন চক্রবর্তী:
চেরাপুঞ্জির প্রায় শীর্ষদেশের এক পাহাড় থেকে জলপ্রপাতটি দেখা যায়। শুকনো মৌসুমে পাহাড় থেকে সিঁড়ি বেয়ে অনেক নিচে নেমে জলপ্রপাতের কাছে যাওয়া যায়। শীর্ষদেশে বেশ ক’টি দোকান ও রেস্তোরাঁ রয়েছে। এখানে আস্ত দারুচিনি গাছের ডাল ও কাণ্ড কিনতে পাওয়া যায়। চেরাপুঞ্জির ঐতিহাসিক নাম ‘সোহরা’। রাস্তার মাইলস্টোনে এখনো সেই নাম ব্যবহৃত হচ্ছে। এটি পূর্ব খাসি জেলার এক শহর।

চেরাপুঞ্জির তাপমাত্রা ১১.৫-২০.৬ ডিগ্রি সেলসিয়াস। পৃথিবীর সবচেয়ে বেশি বৃষ্টিপাত হয় বলে চেরাপুঞ্জি পৃথিবীখ্যাত। বছরে গড়ে প্রায় ৯,৩০০ সেন্টিমিটার বৃষ্টিপাত হয়। চেরাপুঞ্জি সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে ১৪৮৪ মিটার উচ্চতায় অবস্থিত। এর সেভেন সিস্টার বা সাত বোন জলপ্রপাত পর্যটকদের আকর্ষণ করে। তবে বর্ষাকালে পাহাড়ের দৃশ্যপট বদলে যায়। সহস্র ধারায় জল নামতে থাকে। এই জল থেকেই সৃষ্টি হয়েছে মেঘালয়ের উমইয়াম ও উমঙ্গট নামের দুটি প্রধান নদী। অবশ্য ঘোর বর্ষায় পাহাড়ের গা বেয়ে অজস্র ঝরনা নামে। পর্যটকেরা সাধারণত বর্ষায় চেরাপুঞ্জি যান না। চেরাপুঞ্জির সসিনর্যাম গ্রামেই সবচেয়ে বেশি বৃষ্টি পড়ে। আমরা মে মাসের প্রথম সপ্তাহে গিয়েছিলাম। তখন প্রখর রৌদ্রতাপে প্রাণ ওষ্ঠাগত প্রায়। চেরাপুঞ্জিতে এই সময় কালেভদ্রে বৃষ্টি হয়। তবে বৃষ্টি যে কোনো সময় হুট করে নেমে আসতে পারে। এই অভিজ্ঞতা হয়েছে পরে। চেরাপুঞ্জির শীর্ষ থেকে নেমে আসার পথে একটি প্রাকৃতিক সুড়ঙ্গ আছে। পাহাড়ে খানিকটা উৎরাই বেয়ে উঠে সুড়ঙ্গে ঢুকতে হয়। আমি ঝুঁকি নেইনি। সাথীরা গিয়েছিল। প্রায় দুই কিলোমিটারের এই সুড়ঙ্গ নাকি রোমাঞ্চকর!
 


শিলং পৌঁছি বিকেল প্রায় পাঁচটায়। আমাদের গাড়ি পার্ক করা হয় শহরের কেন্দ্রে পুলিশ বাজারে। সুব্রত, শেখর, গণেশ হোটেল ও মানি চেঞ্জারের তালাশে বেরিয়ে পড়ে। আমি আর গৌতম গাড়িতে। গাড়ি থেকে বাঁয়ে ব্রাহ্ম হোমের একটি গেস্ট হাউস দেখতে পাচ্ছিলাম। আমার ষষ্ঠ ইন্দ্রিয় জানান দিচ্ছিলো, হোটেল পাওয়া মুশকিল হবে। কারণ শহরময় পর্যটকে সয়লাব। হলোও তাই। ওরা পঞ্চাশটি হোটেল দেখে হতাশ হয়ে এসে দুঃসংবাদ জানাল। আমি চট করে নেমে লাঠি হাতে ব্রাহ্ম গেস্ট হাউসে গিয়ে রিসেপশনের মহিলাকে রুম বরাদ্দের আবেদন জানালে তিনি দুঃখ প্রকাশ করলেন। আমি তার হাতে আমার ভিজিটিং কার্ড দেই। তিনি এক পলক নজর বুলিয়ে সঙ্গে সঙ্গে ভেতরে পাঠালেন। মিনিটের মধ্যে দীর্ঘদেহী, সুশ্রী, প্রবীণ ও সৌম্য চেহারার এক ভদ্রলোক এসে আমার সঙ্গে শুভেচ্ছা বিনিময় করে অভয় বাণী শোনালেন।

ভদ্রলোকের নাম শ্রীসুরজিত দত্ত। আমরা ক’জন জানতে চাইলেন। পাঁচজন শুনে তাঁকে চিন্তিত দেখালো। বললেন, মহিলা আছেন কি না? নেই শুনে তিনি স্বস্তিবোধ করলেন। তিনি ডরমেটরিতে খাটিয়া ঢোকানোর ব্যবস্থা করে বললেন, একজনকে ফ্লোরে মাদুরের উপর রাত কাটাতে হবে। কাল ওনার ব্যবস্থাও হবে। গাড়ি থেকে ব্যাগ নামিয়ে এনে ডরমেটরিতে রাখা হলো। চার সিটের ডরমেটরিতে আট জনের ব্যবস্থা। তিন সিটে বাংলাদেশের তিন যুবক ছিলেন। তাদের মধ্যে একজন সিলেট জালালাবাদ কলেজের নবীন অধ্যাপক। ব্যাগ নিয়ে অন্যেরা ডরমেটরিতে গেলে আমি সুরজিত বাবুকে বললাম, আমি কেবল প্রাচ্যের স্কটল্যান্ড দেখতে আসিনি। রবীন্দ্রনাথের বাসভবন দেখার খুব ইচ্ছা, যে ভবনে বসে তিনি তাঁর অমর সৃষ্টি রচনা করেছেন।  তিনি আমাকে রিলবং যাবার পরামর্শ দিলেন।
 


চেরাপুঞ্জির পাহাড়ি সড়ক মসৃণ ও ছিমছাম। চেরাপুঞ্জি পেরিয়ে শিলং শহরে ঢুকি। শিলং-এর রাস্তা যেনো আয়নার মতো স্বচ্ছ, ঝকঝকে পরিষ্কার। রাস্তায় এক টুকরো কাগজ, পলিথিন ব্যাগ নেই। মাঝে মাঝে শহরে থুথু ফেলারও নিষেধাজ্ঞা চোখে পড়েছে। সবচেয়ে বড় বিস্ময় রাস্তায় শ’য়ে শ’য়ে কার ছুটছে। কেউ হর্ন বাজাচ্ছেন না। কেউ কাউকে ওভারটেক বা আন্ডারটেক করছেন না। অ্যাম্বুলেন্সের কর্ণভেদী বিকট আওয়াজ নেই। লাল পতাকা দেখে সবাই সরে গিয়ে পথ করে দিচ্ছেন। পুলিশের জলপাই রঙের পতাকা দেখেও একই আচরণ। সন্ধ্যায় নৈশভোজের জন্য শহরে বের হই। লোকজন ট্রাফিক পুলিশের অনুমতি ছাড়া রাস্তা পার হচ্ছেন না। মানুষ উচ্চস্বরে কথা বলছেন না। মনে হচ্ছে কেউ প্রকৃতির নৈঃশব্দ্য ভাঙতে রাজী নন। শহরজুড়ে পরিকল্পিতভাবে পাইন, দেবদারু ও অন্যান্য গাছের সারি। শিলং শহরে স্থানীয় মানুষ থেকে পর্যটকের সংখ্যাই বেশি মনে হলো। ভেজ, ননভেজ, বাঙালি, পাঞ্জাবি, দক্ষিণ ভারত ও পৃথিবীর অন্যান্য দেশের মানুষের রসনা তৃপ্তির ব্যবস্থা রয়েছে।

মেঘালয় উত্তর-পূর্ব ভারতের ছোট এক পাহাড়ি রাজ্য। খাসিয়া, জয়ন্তিকা ও গাড়ো পাহাড় নিয়ে এই রাজ্য গড়া হয়েছে। এর রাজধানী শিলং পূর্ব খাসি জেলার পাহাড়ে অবস্থিত। এটি সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে ১৪৯৬ মিটার উঁচুতে এবং এর উচ্চতম শৃঙ্গের নাম শিলং পিক। এর উচ্চতা ১৯৯৬ মিটার। ২০১১ সালের জনসংখ্যা গণনা অনুযায়ী এর লোক সংখ্যা প্রায় দেড় লাখ। ব্রিটিশ সরকার ১৮৬৪ সালে এই শহরের পত্তন ঘটায়। তখন শিলং অবিভক্ত আসামের রাজধানী ছিল। ১৭৭২ সালের ২১ জানুয়ারি মেঘালয়ের জন্ম। এই সময় থেকে গৌহাটি আসামের রাজধানীর মর্যাদা পায়। শিলং-এও বেশ বৃষ্টিপাত হয়, তবে চেরাপুঞ্জির তুলনায় অনেক কম। তাপমাত্রা ঊর্ধ্বে প্রায় ২৪ ডিগ্রি ও নিচে ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস। ১৮৯৭ সালে এখানে রিখটার স্কেলের ৮.১ মাত্রায় ভূমিকম্প হয়। ফলে এতদঞ্চলের ভূমিরূপ পরিবর্তিত হয়। মেঘালয়ে শতকরা ৮৫ ভাগ খ্রিষ্ট ধর্মাবলম্বী। এখানে খাসি জনসংখ্যা বেশি। তারপর জয়ন্তিয়া ও গারো জনসংখ্যা। ভাষা মূলত খাসি ও ইংরেজি। শিক্ষিতের হার শতকরা ৯৫-এর উপরে। শতকরা ৯১ ভাগ মহিলা শিক্ষিত। শিলং শহরে খ্রিষ্টান ৪৬ শতাংশ, হিন্দু ৪২ শতাংশ, মুসলিম ৫ শতাংশ এবং বাদবাকি বৌদ্ধ জৈন সব মিলিয়ে। অধিকাংশই উচ্চশিক্ষিত। এখানে এপ্রিল থেকে জুন মাসের মধ্যে ভ্রমণ করতে পারলে ভালো। এখানকার কমলা খুব সুস্বাদু। এটিই চেরাপুঞ্জির প্রধান রপ্তানিযোগ্য ফসল।
 


২০১৮ সালের মে মাসের ৩ তারিখ বৃহস্পতিবার রাত সাড়ে এগারোটার বাসে আমরা সিলেটের উদ্দেশ্যে রওনা দেই। শুক্রবার রাত ডাউকিতে কাটিয়ে শনিবার সকালে চেরাপুঞ্জি। বিকেলে শিলং। পরদিন অর্থাৎ রবিবার ভোর ছয়টায় সনাতন ধর্মাবলম্বীদের ঐতিহাসিক কামাখ্যা-কামরূপ মন্দির দর্শনের উদ্দেশে রওনা দেই। ভোরের আগে সাফাই কর্মীরা রাস্তা পরিষ্কার করে রেখেছেন। শিলং থেকে গৌহাটির ১০০ কিলোমিটার পথ চড়াই-উৎরাই, পাহাড়ের অসংখ্য বাঁক পেরিয়ে যেতে হয়। তাতেও সময় লাগে দুই থেকে আড়াই ঘণ্টা। বুঝতেই পারছেন রাস্তা কতো ভালো হলে এতো কম সময়ে এই দূরত্ব অতিক্রম করা যায়। কামাখ্যা মন্দির নীলাচল পাহাড়ের উপর অবস্থিত। আট থেকে সতের শতকের মধ্যে এই পাহাড় ও মন্দিরের নানা পরিবর্তন সাধিত হয়। আমরা পথে নাস্তা করতে গিয়ে প্রায় ৪৫ মিনিট সময় ব্যয় করি। তবুও বেলা নয়টার মধ্যে পৌঁছে যাই। পাহাড়ের চূড়ায় পৌঁছার প্রায় আধ কিলোমিটার আগে অপর এক গাড়ি চালকের পরামর্শে গাড়ি রাস্তার পাশে পার্ক করে আমরা পদব্রজে উৎরাই ভেঙে চলতে থাকি। অবাক হয়ে তাকিয়ে দেখি অসংখ্য গাড়ি ও দর্শনার্থী। উপরে গাড়ি পার্কিং লটে প্রায় পাঁচ শতাধিক গাড়িতে ভর্তি।

রাস্তার একপাশে পূজার ডালি বিক্রির দোকান। সব দোকানে কমন ফুল জবা ও ফল নারিকেল। সনাতন ধর্মাবলম্বীদের অনেকে বাড়ির ভীত প্রদান বা নূতন গাড়ি চালু করার আগে নারকেল ভাঙে। নারকেল সুস্বাদু ফল সন্দেহ নেই। কিন্তু এর সঙ্গে শুভাশুভের কি সম্পর্ক তা আমার জানা নেই। যতোই এগোই ততোই দর্শনার্থীর ভিড়। সঙ্গে ছাগ-শাবকের আর্তনাদ। অনেকে প্রায় মুমূর্ষু দুই আড়াই কেজি ওজনের ছাগ-শিশু (পাঁঠা) কামাখ্যা মাকে নিবেদনের জন্য ঢাক-ঢোল, কাঁশর বাদ্য বাজিয়ে নেচে গেয়ে চলেছেন। রাস্তার পাশে কিছু দূরে দূরে হরেক রকম সাজে সাধু সন্ন্যসীদের নানা ধরনের কসরৎ দেখানো চলছে। কথিত আছে, এখানকার সাধুরা নাকি মন্ত্রসিদ্ধ। এঁরা নানা তুক-তাক, বশীকরণ, বাণমারা ইত্যাদিতে সিদ্ধহস্ত। দক্ষিণার বিনিময়ে এরা মানুষকে তা শেখায়। শেখর তার বৌকে ফোনে বলছিলো, ‘বেশি মেজাজ দেখিও না, কামরূপ-কামাখ্যা যাচ্ছি। তুক-তাক শিখে এসে সব মেয়ে মানুষকে বশে নিয়ে আসবো। তখন টের পাবে কত ধানে কত চাল।’
 


কিছুদূর ওঠার পর লেখা রয়েছে ‘এখানে জুতা ও স্যান্ডেল’ রাখা হয়। জুতা রাখার জন্য বেশ ক’টি দোকান। দর্শনীর বিনিময়ে জুতা রাখতে হয়। এরপর খালি পায়ে হাঁটা। শীর্ষে গিয়ে চক্ষু ছানাবড়া! বিশাল লাইন। মায়ের বেদীর কাছে পৌঁছতে অন্তত তিন ঘণ্টা সময় লাগবে। অতক্ষণ দাঁড়ানো সম্ভব নয় ভেবে আমি, গৌতম ও সুব্রত বসে পড়ি। গণেশ ও শেখর লাইনে দাঁড়ায়। এরা ইমিগ্রেশন কাস্টমস-এ যেমন করে ‘ম্যানেজ’ করে এখানেও দুনম্বর পথে ‘ম্যানেজ’ করে ঘণ্টাখানেকের মধ্যে ফুল নারিকেল হাতে এসে হাজির। ততক্ষণে আমরা গাড়িতে চলে গিয়েছিলাম। (চলবে)

 

 

রাইজিংবিডি/ঢাকা/২৬ মে ২০১৮/তারা

Walton Laptop
 
     
Walton