ঢাকা, শুক্রবার, ২ অগ্রহায়ণ ১৪২৫, ১৬ নভেম্বর ২০১৮
Risingbd
সর্বশেষ:

বন্ধু স্মরণে একক ম্যারাথন

গাজী মুনছুর আজিজ : রাইজিংবিডি ডট কম
 
     
প্রকাশ: ২০১৮-১০-১৩ ১২:৪৩:৫০ পিএম     ||     আপডেট: ২০১৮-১০-১৩ ৩:৫৭:৫৩ পিএম
ছবি : আমিনুল

গাজী মুনছুর আজিজ: লাবনী সৈকত পয়েন্ট থেকে সাত অক্টোবর যখন একা ম্যারাথন শুরু করি, ঘড়ির কাঁটা তখন সকাল ছয়টা ছুঁয়েছে। পূব আকাশে সূর্য কেবল উঠছে। কক্সবাজারে বেড়াতে আসা পর্যটকদের ঘুম তখনও ভাঙেনি। পথে মানুষ বা যানবাহনের চলাচল কম। তাই আমার একা একা দৌড়ানো দেখছেন পথের পাশের কৌতূহলী দোকানদার, রিকশা বা অটোরিকশাঅয়ালা। সুগন্ধা সৈকত, কলাতলী সৈকত মোড় পার হয়ে অল্প সময়ের মধ্যে পা রাখি মেরিন ড্রাইভে। এ পথে এটি আমার দ্বিতীয় একক ম্যারাথন। এভারেস্টজয়ী প্রয়াত বন্ধু সজল খালেদকে স্মরণ করে এই আয়োজন। তার স্মরণে ২০১৭ সালে প্রথমবার এ পথে একক ম্যারাথন করেছিলাম।

হ্যাচারি জোন পার হয়ে যখন দরিয়া নগর সৈকত বা ইকোপার্ক আসি, তখন সূর্য কেবল তেজ দিতে শুরু করেছে। দরিয়া নগর থেকেই শুরু রামু উপজেলার সীমানা। মূলত দরিয়া নগর থেকেই মেরিন ড্রাইভের আসল সৌন্দর্য উপভোগের শুরু। পশ্চিমে বিশ্বের দীর্ঘতম সমুদ্র সৈকত। পূবে সবুজে ঘেরা খাড়া পাহাড়। এরই মাঝে গাছগাছালি ছায়া পিচঢালা পথ। এ পথের সৌন্দর্য উপভোগ্য হবেই। আর এ সৌন্দর্য বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে দিতেই সজল খালেদ বাংলা মাউন্টেইনিয়ারিং অ্যান্ড ট্রেকিং ক্লাবের ব্যানারে এ পথে ২০০৮ সালে প্রথমবার বাংলা ম্যারাথনের আয়োজন করে। উদ্দেশ্য ছিল মেরিন ড্রাইভটিকে পরিচিত করে তোলা এবং এর মাধ্যমে পর্যটনের উন্নয়ন। সে চেয়েছিল এ পথে নিয়মিত আন্তর্জাতিক মানের ম্যারাথন প্রতিযোগিতা হোক। সেই লক্ষ্যে ২০০৯ ও ২০১০ সালেও তার উদ্যোগে ও এক্সট্রিমিস্টের আয়োজনে এ পথে ম্যারাথন হয়েছিল। তিনবারের ম্যারাথনেই আমি অংশ নিই ও সফলভাবে সম্পন্ন করি। ২০১৩ সালে এভারেস্ট জয় করে সজল এভারেস্টের কোলে ঘুমিয়ে পড়ে অনন্তকালের জন্য। তারপর বাংলা ম্যারাথনের নামে এ পথে আর কেউ দৌড়ায়নি। আমার ম্যারাথনের উদ্দেশ্যও একই। এ পথে ম্যারাথন প্রতিযোগিতার মাধ্যমে দেশি-বিদেশি পর্যটকদের আকর্ষণ, পর্যটনের উন্নয়ন এবং সৈকত ও সৈকত পাড়ের জীববৈচিত্র্য রক্ষার তাগিদ। পাশাপাশি এ ম্যারাথনের মাধ্যমে পথটিকে সজল খালেদের নামে নামকরণের আহবান জানাই।

বেলা বাড়ছে। বাড়ছে সূর্যের তেজ। অক্টোবরের শুরু হওয়াতে হিমছড়ি বা ইনানীর উদ্দেশ্যে পর্যটকদের খোলা জিপ, মাইক্রোবাস বা অটোরিকশার আনাগোনা একটু কমই আছে; বলা যায় পথ অনেকটা ফাঁকা। তবে দেশি-বিদেশি বিভিন্ন সেবা সংস্থার অসংখ্য গাড়ির যাতায়াত আছে। কারণ টেকনাফ ও উখিয়ায় রোহিঙ্গা শরণার্থীর ক্যাম্প আছে। সেই ক্যাম্পের উদ্দেশ্যে এসব গাড়ির যাতায়াত। সেজন্য অনেকটা সাবধানে এগোই। এ পথের সৌন্দর্য বৃদ্ধি করতে কক্সবাজার উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ সড়ক আলোকায়ন কার্যক্রম করছে। এরই অংশ হিসেবে পথের বিদ্যুতের খুঁটিগুলোতে নান্দনিক চিত্রকর্ম আঁকা হয়েছে। দেখতে ভালোই লাগছে। উদ্যোগটি প্রশংসনীয়। এছাড়া পথের দুইপাশের গাছগুলোর জন্য পথটিকে সত্যিই মায়াময় মনে হয়।

হিমছড়ির কিছুটা আগে চোখে পড়ল পাহাড়ি বুনো ঝরনা। ঝরনাটি চিকন। তবে পানি পড়ছে ভালোই। এ ঝরনার কলতান শুনে এগোই। আসি হিমছড়ি জাতীয় উদ্যানের সামনে। উদ্যানের সাইনবোর্ডে লেখা: এ উদ্যান এশিয়ান হাতির আবাসস্থল। উদ্যানের পর হিমছড়ি সৈকত। সকাল হওয়াতে সৈকত এলাকাকার দোকান বা রেস্টুরেন্ট সব খোলেনি। পর্যটকদের পদচারণাও কম। হিমছড়ির পর পথের ডানপাশ বা পশ্চিমপাশটায় গাছগাছালি খুব একটা নেই। আর সাগরটাও একেবারে পথঘেঁষা। সাগরঘেঁষা পথেই চলছি। শুনছি সাগরের ঢেউয়ের গর্জন। ভালোই লাগছে। পেঁচারদ্বীপ এসে এক দোকান থেকে পানি কিনে পান করলাম। পথের এ অংশের দুই পাশেই গাছগাছালিতে ভরা। এছাড়া এ পথে আরও কয়েকটি ঝরনার দেখা মিলল।
 


সকাল হওয়াতে সাগরপাড়ের ছেলেমেয়েরা ইউনিফর্ম পরে স্কুলের দিকে যাচ্ছে। তারা ভাবছে আমি বিদেশি-সেজন্য তারা জিজ্ঞাসা করছে ‘হাউ আর ইউ’? উত্তরে বলি ‘ফাইন’। তারা সরল মুখে হাঁসে। সাগড়পাড়ের পাহাড়ি বাগানে সুপারির ফলন ভালো হয়। দেখি পথের পাশে পাকা সুপারির স্তূপ করে বিক্রেতা বসে আছেন পাইকারের অপেক্ষায়। মংলাপাড়া পাড়ি দিয়ে উঠি রেজুখালের ব্রিজে। তারপর সোনারপাড়া। এটি উখিয়া এলাকা। এখানকার পথের দুইপাশেও সুবজ গাছে ঠাসা। তবে পথে মানুষজন তেমন নেই। তাই একলা চলতে হচ্ছে। কিছুটা আসার পর আবার পথের ডানপাশ গাছবিহীন। ফলে এ পথটুকও সাগরঘেঁষা। আর পথটা বামে মোড় নেওয়াতে সাগরটাকে সামনেই মনে হয়। পার হই জালিয়া পালং।

সাগড়পাড়ের জেলেরা পথের পাশে মাছের শুঁটকি রোদে দিয়েছেন। সাগরপাড়ের এমন নানা দৃশ্য দেখতে দেখতে চরপাড়া, নিদানিয়া হয়ে ১১টার আগেই আসি ইনানী সেতুর কাছে এবং পূর্ণ করি ম্যারাথনের অর্ধেক পথ। এখানে একটু পানি বিরতি দিয়ে আবার চলা শুরু করি লাবনীর উদ্দেশ্যে। পর্যটকদের আনাগোনা কম। তবু পথের পাশে ডাব ঝুলিয়ে বিক্রেতারা বসে আসেন। বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে সূর্যের তেজ বেশ বেড়েছে। গরমও পড়ছে। একটু আরাম পেতে ডাব খাই। ভালোই লাগল। ডিসেম্বর-জানুয়ারির দিকে যখন এ পথে আসি, তখন ডাবের পাশাপাশি সাগরের পাড়ে চাষ করা ছোট ছোট তরমুজ, শসা মেলে এ পথে।

ধীরে ধীরে এগোই। কখনও দৌড়ে, কখনও হেঁটে। অবশ্য অধিকাংশ সময়ই হেঁটেছি। কোনো প্রতিযোগিতা নয়। তাই আগে-পরে যাওয়ারও চিন্তা নেই। তবে আস্তে আস্তে শরীরে ক্লান্তি ভর করছে। ক্লান্তিকে পাত্তা দেই না। পিপাসা মেটাই পথের পাশ থেকে কেনা লোকাল মেড আইসক্রিম খেয়ে। পানি কিনে পান করি হিমছড়ি এসে। তারপর আবার ছুট। দরিয়া নগর এসে আরেকবার পানি পান।

পথের অনেক লোক, অনেক অটোরিকশাঅয়ালা সকালে আমাকে দৌড়ে যেতে দেখেছেন। আবার বিকেলে ফিরতেও দেখছেন। তাই তাদের কৌতূহলী প্রশ্ন-ভাই এতো দৌড়ান কেন? বলি বন্ধুকে স্মরণ করে। তারা অবাক হয়! তাদের বিস্তারিত বলি। এমন অভিজ্ঞতা আগের বারও হয়েছে। এছাড়া পথে পথে ম্যারাথনের ছবিগুলো তুলেছেন বন্ধু আমিনুল। ৪টার সময় লাবনী সৈকত পয়েন্টে এসে শেষ করি ম্যারাথনের ২১.১৯৫ কিলোমিটার পথ।




রাইজিংবিডি/ঢাকা/১৩ অক্টোবর ২০১৮/তারা

Walton Laptop
 
     
Marcel
Walton AC