ঢাকা, সোমবার, ১১ চৈত্র ১৪২৫, ২৫ মার্চ ২০১৯
Risingbd
সর্বশেষ:

শীতের মায়ায় পরিযায়ী পাখির ছায়ায়

গাজী মুনছুর আজিজ : রাইজিংবিডি ডট কম
 
     
প্রকাশ: ২০১৮-১২-২৭ ২:০৩:৩৯ পিএম     ||     আপডেট: ২০১৮-১২-২৭ ৬:০২:৩৩ পিএম

গাজী মুনছুর আজিজ: পাখি দেখা কোনো বিষয়? না, অনেকের কাছে কোনো বিষয় নয়। আবার অনেকের কাছে নেশার মতো। আর তাই তারা পাখি দেখার জন্য ছুটে বেড়ান দেশের এক প্রান্ত থেকে অন্যপ্রান্তে। প্রশ্ন করতে পারেন- চারপাশের গাছগাছালি, বন-বাদারে, নদী-নালা, খাল-বিলে তাকালেই তো কতো পাখি দেখা যায়, তাহলে আবার কষ্টকরে এদিক-সেদিক যাওয়ার কী প্রয়োজন? হ্যাঁ, অবশ্যই ঠিক। তবে এর বাইরে বিশেষ কিছু স্থানে, বিশেষ কিছু পাখি, বিশেষ কিছু সময়ে বসবাস করে। কারণ সব পাখি সব স্থানে সব সময় থাকে না। আর সেসব পাখির খোঁজেই আমাদের দেশের একদল পাখিপ্রেমী ঘুরে বেড়ান দেশময়।

পাখিবিদ ইনাম আল হকের মতে বাংলাদেশে প্রায় ৬৫০ প্রজাতির পাখি দেখা যায়। এর ৩৫০ প্রজাতি আবাসিক ও ৩০০ প্রজাতি পরিযায়ী। যে পাখি সারা বছর দেশে থাকে তারা আবাসিক। আর যে পাখি বছরের কিছু সময় অন্যদেশে থাকে তারা পরিযায়ী। অনেকে পরিযায়ী পাখিদের ভুল করে ‘অতিথি পাখি’ বলেন। পাখিগুলো মোটেই অতিথি নয়, এরা এদেশেরই পাখি। শুধু বেঁচে থাকার তাগিদে পারিযায়ী পাখিদের প্রায় আশি শতাংশ গ্রীষ্ম মৌসুমে হিমালয়ের কাছাকাছি অঞ্চলের দেশ ও বিশ শতাংশ সুদূর সাইবেরিয়াসহ মধ্য ও উত্তর এশিয়ায় চলে যায়। কারণ গ্রীষ্ম মৌসুমে তাদের খাবার ও বসবাসের স্থান বাংলাদেশে থাকে না। সেজন্যই তারা গ্রীষ্ম মৌসুমে অন্য দেশে থাকে এবং শীতের সময় বাংলাদেশে ফিরে আসে।



তবে সব পরিযায়ী শীতের সময় আসে না। ৩০০ প্রজাতির মধ্যে ১০-১২টি প্রজাতির পাখি গ্রীষ্ম মৌসুমে এদেশে আসে। বাকিরা শীতেই আসে। এছাড়াও দুই-তিনটি প্রজাতির পাখি বছরের বিভিন্ন সময় বিক্ষিপ্তভাবে ঘুরতে ঘুরতে এদেশে আসে অল্প সময়ের জন্য- তাদের বলা হয় পান্থ-পরিযায়ী। আবাসিক পাখি সারা বছর বাড়ির আশপাশে, বন-বাদারে, নদী-নালা, খাল-বিলে দেখা গেলেও পরিযায়ী পাখিদের অধিকাংশ দেখা যায় শীত মৌসুমে।

শীতের সময় জলচর পরিযায়ী পাখিদের বড় একটি অংশ দেখা যায় উপকূলীয় এলাকার কাদাচরগুলোতে। মেঘনা নদীসহ উপকূলীয় এলাকার বিভিন্ন নদীর মোহনায় জেগে ওঠা এসব কাদাচরের অধিকাংশ ভোলা, নোয়াখালী, পটুয়াখালী, বরগুনা, বরিশালসহ আশপাশের অঞ্চলে রয়েছে। এসব চরের মধ্যে আছে- হাতিয়ার দমারচর, নিঝুমদ্বীপ, জাহাজমারার চর, মোক্তারিয়ার চর, গাজীপুরা চর, মদনপুরা চর, মধুপুরা চর, দাশের হাটের চর, মনপুরার চর, তুলাতুলী চর, মাঝের চর, বালুর চর, বগার চর, হাজীপুর চর, রগকাটার চর, লতার চর, যাদবপুর চর, উড়ির চর, শাহজালাল চর, আমানত চর, ঢালচর, ঠেংগার চর, কালাকাইচ্ছা চর, পিয়াল চর, পাতাইলা চর, ছোট বাংলার চর, চর মোন্তাজ, কালাম চর, খাজুর গাইচ্ছা চর, সামছু মোল্লার চর, বোয়ালখালীর চর, বড় রাণীর চর, ছোট রাণীর চর, টেগরার চরসহ আরও অনেক নতুন নতুন জেগে ওঠা নাম না-জানা ছোট-বড় চর।



সব চরে আবার সব জলচর পরিযায়ী পাখি বিচরণ করে না। আবার জলচর হলেও কিছু পাখিকে ‘সৈকত পাখি’ বলা হয়। কারণ তারা সৈকতের কাছাকাছি থাকতে পছন্দ করে। এছাড়া উপকূলের চরগুলোর মধ্যে কিছু বিশেষ চর আছে, যে চরে বিশেষ কিছু পাখির বিচরণও রয়েছে। যেমন- হাতিয়ার দমারচর মহাবিপন্ন দেশি-গাঙচষা পাখির একমাত্র আবাস। এ চরে মাঝেমধ্যে মহাবিপন্ন চামচঠুঁটো বাটান পাখিও দেখা যায়। এছাড়া কালামাথা কাস্তেচরা, ইউরেশীয় চামচঠুঁটি, নদীয়া পানচিলসহ আরও অনেক বিপন্ন পাখির বিচরণ ভূমিও এই চরে। উপকূলে জলচর পাখিদের অরেকটি বড় বিচরণভূমি চর শাহজালাল। ভোলার চরফ্যাশনের মেঘনার মোহনায় জেগে ওঠা এ চরের বয়স প্রায় ২০ থেকে ২২ বছর। শীত মৌসুমে এ চরে একসঙ্গে প্রায় ৫০ থেকে ৬০ প্রজাতির হাজার হাজার পাখি দেখা যায়। এসব পাখির মধ্যে অনেক বিপন্ন বা মহাবিপন্ন পাখিও রয়েছে।

এসব চরে শীত মৌসুমে যেসব পাখি বেশি দেখা যায় তার মধ্যে আছে- দেশি কানিবক, গো বগা, মাঝলা বগা, ধুপনি বক, কালামাথা কাস্তেচরা, পাতি চকাচকি, খয়রা চকাচকি, ইউরেশিও সিঁথিহাঁস, পাতি তিলিহাঁস, পাতি শরালি, উত্তুরে লেঞ্জাহাঁস, উত্তুরে খুন্তেহাঁস, পাকড়া উল্টোঠুটি, ছোট নথজিরিয়া, কালালেজ জৌরালি, নাটা গুলিন্দা, ইউরেশিও গুলিন্দা, ছোট পানচিল, ছোট পানকৌড়ি, জুলফি পানচিল, ছোট বগা, বড় বগা, পিয়ং হাঁস, গিরিয়া হাঁস, প্রশান্ত সোনাজিরিয়া, মেটে জিরিয়া, পাতি লালপা, পাতি সবুজপা, পাতি বাটান, টেরেক বাটান, জুলফি পানচিল, খয়রামাথা গাঙচিল, কাসপিয়ান পানচিল, চামচঠুঁটো বাটান, খুন্তেবকসহ বিভিন্ন প্রজাতির পাখি।



বিশ্বব্যাপী পাখি নিয়ে গবেষণা করছে ওয়েটল্যান্ডস ইন্টারন্যাশনাল। এ সংস্থার এশিয়া অঞ্চলের সংগঠনের নাম এশিয়ান ওয়াটার বার্ড সেনসাস। এ সংস্থা প্রতি বছর শীত মৌসুমে এশিয়ার দেশগুলোয় একযোগে জলচর পাখিশুমারি করে। এ সংস্থার বাংলাদেশের জাতীয় সমন্বয়ক বাংলাদেশ বার্ড ক্লাবের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি ইনাম আল হক। তার তত্বাবধানে বাংলাদেশ বার্ড ক্লাবের উদ্যোগে বাংলাদেশের বিভিন্ন উপকূলীয় এলাকা ও হাওরের জলাশয়ে জলচর পাখি শুমারি হয়। এ বছরের জানুয়ারিতেও শুমারি হয়েছে। শুমারিতে উপকূলের প্রায় ৩০টি চরে প্রায় ৫০ প্রজাতির প্রায় ৬০ হাজার পাখির দেখা পাওয়া গেছে। জলচর সৈকত পাখির আরেকটি বড় অংশ দেখা যায় কক্সবাজারের মহেশখালীর সোনাদিয়াদ্বীপসহ আশপাশের ছোট ছোট দ্বীপগুলোর নরম চরে। এ চরের অন্যতম বাসিন্দা চামচঠুঁটো বাটান পাখি। এ পাখির জন্য এ চর আন্তর্জাতিকভাবে পরিচিত। পাখি গবেষকদের মতে পৃথিবীতে চামচঠুঁটো বাটান পাখি আছে প্রায় ২০০। এর মধ্যে সোনাদিয়ার সৈকত এলাকা পৃথিবীর প্রায় ১০ শতাংশ চামচঠুঁটো বাটানের শীতের নিরাপদ আবাস হিসেবে পরিচিত। এমন আরও অনেক পাখিই আমাদের উপকূলীয় এলাকা ও সোনাদিয়া দ্বীপে দেখা যায়। এসব এলাকায় বসবাস করা বিপন্ন পাখির তালিকায় রয়েছে নর্ডম্যান সবুজপা, প্রায়-বিপদগ্রস্তের তালিকায় রয়েছে কালামাথা কাস্তেচরা, এশীয় ডাউইচার, কালালেজ জৌরালি, ইউরেশিয় গুলিন্দা এবং সংকটাপন্নের তলিকায় রয়েছে বড় নট ও দেশি গাঙচষা।

২০১০ সালে ইনাম আল হকের তত্বাবধানে দেশে প্রথম বারের মতো সোনাদিয়া দ্বীপের কয়েকটি পরিযায়ী পাখির পাখায় ট্রান্সমিটার স্থাপন ও পাখির পায়ে রিং পরানো হয় গবেষণার উদ্দেশ্যে। এই দ্বীপ ছাড়াও এখানকার শাহপরীর দ্বীপেও শীত মৌসুমে অনেক প্রজাতির হাজার হাজার পাখি বসবাস করে। উপকূল ছাড়াও জলচর পরিযায়ী পাখিদের আরেকটি বৃহৎ বিচরণভূমি সিলেটের হাওরাঞ্চল। বিশেষ করে মৌলভীবাজার ও সুনামগঞ্জের হাকালুকি হাওর, হাইল হাওর, বাইক্কাবিল, টাঙ্গুয়ার হাওরসহ আশপাশের বিভিন্ন হাওর শীতের সময় পরিযায়ী পাখিদের স্বর্গরাজ্যে পরিণত হয়। এসব হাওরে ৬০ থেকে ৭০ প্রজাতির পরিযায়ী দেখা যায়। শীতের সময় এসব হাওরের বিলে যেসব পরযায়ী পাখি দেখা যায় তার মধ্যে আছে-ছোট ডুবুরি, বড় খোঁপাডুবুরি, বড় পনকৌড়ি, ছোট পনকৌড়ি, উদয়ী গয়ার, দেশি কানিবক, ধুপনি বক, লালচে বক, বড় বগা, ছোট বগা, মাঝলা বগা, গো বগা, এশীয় শামখোল, কালামাথা কাস্তেচরা, পাতি শরালি, মেটে রাজহাঁস, খয়রা চকাচকি, পাতি চকাচকি, তিলিহাঁস, পিয়াং হাঁস, সিঁথিহাঁস, ফুলুরি হাঁস, পাতি তিলিহাঁস, উত্তুরে খুন্তেহাঁস, উত্তুরে ল্যাঞ্জাহাঁস, গিরিয়া হাঁস, পাতি ভুতিহাঁস, বেয়ারের ভুতিহাঁস, টিকি হাঁস, মরচেরঙ ভুতিহাঁস, কোড়া, ধলাবুক ডাহুক, পাতি মানমুরগি, বেগুনি কালেম, পাতি কুট, নেউ পিপি, দল পিপি, কালাপাখ ঠেঙ্গি, মেটেমাথা টিটি, হট টিটি, উত্তুরে টিটি, প্রসান্ত সোনাজিরিয়া, ছোট নথজিরিয়া, কেন্টিশ জিরিয়া, ছোট ধুলজিরিয়া, ছোট বাবুবাটান, পাতি চ্যাগা, ল্যাঞ্জা চ্যাগা, কালালেজ জৌরালি, তিলা লালপা, পাতি লালপা, পাতি সবুজপা, বিল বাটান, বন বাটান, পাতি বাটান, লাল নুড়িবাটান, গুলিন্দা বাটান, ছোট চাপাখি, টেমিকেংর চাপাখি, খয়রামাথা গাঙচিল, কালামাথা গাঙচিলসহ বিভিন্ন পাখি।



হাকালুকি হাওর, হাইল হাওর, টাঙ্গুয়ার হাওর, বাইক্কাবিলসহ আশপাশে যে হাওর রয়েছে তার মধ্যে ছোট-বড় অনেক বিল আছে। পাখিরা এসব বিলের পানিতে ও নরম কাদায় বাস করে। হাকালুকি হাওরের বিলগুলির মধ্যে আছে জলা বিল, বালুজুড়ি, মাইসলা, কুকুরডুবি, ফুয়ালা, পোলাভাঙ্গা, হাওড়খাল, কোয়ার কোণা, মালাম বিল, গোয়ালজুড়, চাড়ুয়া, তেকোনা, ভাইয়া, গজুয়া, রঞ্চি, হারাম, বিড়াল খালসহ বিভিন্ন বিল। এসব বিলেও প্রতিবছর শীত মৌসুমে পাখিশুমারি করা হয় বাংলাদেশ বার্ড ক্লাবের উদ্যোগে। এ বছরের ফেব্রুয়ারিতেও শুমারি করা হয়েছে। এছাড়া শুমারির পাশাপাশি এসব বিলের কিছু প্রজাতির পাখির পায়ে কয়েক বছর ধরে রিং পরানো হয়েছে গবেষণার উদ্দেশে। এছাড়াও দেশের বিভিন্ন জলাশয়, নদী-নালা, খাল-বিলে পরিযায়ী পাখি দেখা যায়। তবে একসঙ্গে ঝাঁকে-ঝাঁকে হাজার-হাজার বিভিন্ন প্রজাতির পাখি দেখতে হলে উপকূলের কাদাচর আর হাওরের বিলের বিকল্প নেই।

ছবি : লেখক




রাইজিংবিডি/ঢাকা/২৭ ডিসেম্বর ২০১৮/তারা

Walton Laptop
 
     
Walton AC