ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ৪ মাঘ ১৪২৫, ১৭ জানুয়ারি ২০১৯
Risingbd
সর্বশেষ:

হিমালয়ের দেশে বিপজ্জনক পর্বতশিখরে

ইকরামুল হাসান শাকিল : রাইজিংবিডি ডট কম
 
     
প্রকাশ: ২০১৯-০১-১০ ৬:২৬:০৭ পিএম     ||     আপডেট: ২০১৯-০১-১৬ ২:১০:৫৮ পিএম

ইমিগ্রেশন অফিসার পাসপোর্ট হাতে নিয়ে জিজ্ঞেস করলেন- নেপাল যাচ্ছি কেন? আমিও সবগুলো দাঁত বের করে খুবই আনন্দের সাথে জানালাম- আমরা পর্বতারোহণে যাচ্ছি। শুনে অফিসার একটু ঝামেলায় পরে গেলেন বলে মনে হলো। তিনি পাশের জনকে জিজ্ঞেস করলেন- স্যার, ইনি পর্বতারোহণ করতে যাচ্ছেন। একে কোন ক্যাটাগরিতে এন্ট্রি দেব? পাশের জন বলে দিলেন- স্পোর্টসে দিন। বুঝতে পারলাম পর্বতারোহণও যে স্পোর্টস তিনি জানেন না। তার মতো অনেকেই এটা জানেন না। পর্বতারোহণ হলো এক্সট্রিম স্পোর্টস। ডব্লিউ ডব্লিউ গ্রাহামের সেই বিখ্যাত উক্তি মনে পড়ে গেল: more for sports and adventures.

এয়ারপোর্টের ওয়েটিং রুমে বসে আছি। দেশের সবচেয়ে পুরনো ও নামি পর্বতারোহণ সংগঠন বিএমটিসি। সেই ক্লাবের ২৯তম হিমালয়ান অভিযানের অংশ আমি। একইসঙ্গে এই অভিযানের কনিষ্ঠ সদস্যও আমি। এবারের লক্ষ্য ৬ হাজার ২৪৯ মিটার উঁচু লারকে পর্বত শিখর। হিমালয়ের মানাসলু অঞ্চলে এটি অবস্থিত। প্রেসক্লাবে প্রেস কনফারেন্স হলো উৎসবমুখর আয়োজনে যা দেশের প্রায় সবগুলো সংবাদমাধ্যম স্বতঃস্ফূর্তভাবে প্রকাশ করলো। যা আমাদের উদ্যম বাড়িয়ে দিলো কয়েক গুণ। নেতৃত্বে দেশের সবচেয়ে অভিজ্ঞ ও সফল, সেইসঙ্গে দু’বারের এভারেস্ট আরোহী প্রথম বাংলাদেশি এম এ মুহিত। দলে আরও আছেন পাঁচটি করে ছয় হাজার মিটারি পর্বত আরোহণকারী অভিজ্ঞ পর্বতারোহী কাজী বাহলুল মজনু বিপ্লব ও নূর মোহাম্মদ, একটি ছয় হাজার মিটারি পর্বত আরোহণকারী সম্ভাবনাময় নারী পর্বতারোহী শায়লা পারভীন বিথী এবং সাথে যাচ্ছেন লারকে পাস ট্রেকিং-এ রিয়াসাদ সানভি। তার লক্ষ্য মানাসলু পরিক্রম সম্পন্ন করা, সেই সঙ্গে পাঁচ হাজার মিটারের উপরের উচ্চতায় তার শরীর কতটা কাজ করে তা দেখে নেওয়া। সব ঠিক থাকলে তিনি পরবর্তীতে পর্বতারোহণের প্রশিক্ষণ নেবেন। আমি এর আগে একটি ছয় হাজার মিটারি পর্বত আরোহণ করেছি। দ্বিতীবারের মতো পর্বত অভিযানে যাচ্ছি। লাল সবুজের পতাকা ও আমার ক্লাব বিএমটিসি’র প্রতিনিধিত্ব করতে। এরচেয়ে আনন্দের কিছু নেই আমার কাছে। সময়মতো আমরা বিমান বাংলাদেশের একটি বিমানে উঠে বসেছি। ঘণ্টাখানেক বিমানের ভিতরে বসে থাকার পর পাইলট জানালেন, সার্ভিস কারের ধাক্কায় বিমান কিছুটা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তাই এই ফ্লাইট যাবে না। আমাদের সবাইকে বিমান থেকে নেমে ওয়েটিং রুমে অপেক্ষা করতে বলা হলো। আমাদের জন্য অন্য আরো একটি ফ্লাইট রেডি করা হচ্ছে।

 


বিকেল তিনটার দিকে আমাদের নিয়ে নেপালের উদ্দেশ্যে একটি বিমান আকাশে উড়লো।  ককপিট থেকে জানানো হলো বিমানটি প্রায় ৩৬ হাজার ফুট উপর দিয়ে উড়বে। আকাশ অতটা পরিষ্কার না। থোকায় থোকায় মেঘ জমে আছে। ক্ষণে ক্ষণে মেঘের ভিতরে ঢুকে যাচ্ছে বিমান। মেঘের ধাক্কায় মৃদু কাঁপছে। যদিও বিমানে ওড়ার অভিজ্ঞতা আগেও হয়েছে, তারপরও কিনা আমিও ভয়ে কাঁপছি! মেঘ ফুঁড়ে আমরা উপস্থিত হলাম একেবারে পরিষ্কার আকাশে। অবাক হয়ে বিমানের জানালা দিয়ে একটু নিচেই দেখতে পেলাম রামধনু। নতুন বলে সানভি ভাইকে ডান দিকে জানালার পাশে বসানো হয়েছে, যাতে মেঘের উপরে ভাসমান এভারেস্টসহ শ্বেতশুভ্র শৈলশ্রেণী দেখতে পারেন। প্রথমবার যখন এসেছিলাম তখন আমাকেও জানালার পাশে বসিয়েছিলেন। কি দুর্ভাগ্য! আবার মেঘেরা কোত্থেকে যেন এসে হাজির হলো। তাদের রাজত্ব চললো সেই ত্রিভুবন আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের মাটি স্পর্শ করার আগ পর্যন্ত। এ যাত্রায় আর সানভি ভাইয়ের রাজ দর্শন হলো না। অবশ্য আমাদের এ অভিজ্ঞতা ইতোমধ্যেই হয়েছে।

বিমান কাঠমাণ্ডুর আকাশে এসেও এয়ারপোর্টে নামছে না। আকাশেই ঘুরছে। এয়ার ট্রাফিকের কারণেই নামতে দেরি হচ্ছে। প্রায় আধঘণ্টা আকাশে অপেক্ষা করার পর এয়ারপোর্ট ট্রাফিক কন্ট্রোল থেকে নামার অনুমতি পেলো। বিমান থেকে নেমে সব আনুষ্ঠানিকতা শেষ করে ত্রিভুবন আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের বাইরে যখন এলাম তখন ঘড়ির কাটা বিকেল পাঁচটার ঘর অতিক্রম করেছে। আমাদের জন্য আগে থেকেই অপেক্ষা করছিলেন এজেন্সি ক্লাইম্বালায়ার ফিনজো। তিনি নেপালি রীতিতে উত্তরীয় দিয়ে আমাদের বরণ করে নিলেন। আমরা বড় মাইক্রোবাসে থামেলে চলে গেলাম। এই থামেলেই আমাদের হোটেল ঠিক করা হয়েছে এজেন্সির পক্ষ থেকে।

 



ভোরেই ঘুম থেকে ওঠতে হলো। আমরা থামেলের গলি পথ ধরে হাঁটতে হাঁটতে চলে এলাম অসাম বাজারে। চারপাশে পুরনো দালানে ঘেরা ছোট্ট একটি বাজার। এই বাজারে আগেও এসেছি। এখানে চা পান করে কিছু সময় বাজার ঘুরে দেখে আবার হোটেলে ফিরে এলাম। হোটেলের কমপ্লিমেন্টারি ব্রেকফাস্টে জ্যাম-জেলি, মধু, ব্রেড, পটেটো স্ম্যাশ সঙ্গে মাসালা চা দিয়ে পেট পুজো বেশ হলো। শুরু হলো আমাদের পর্বতারোহণের জিনিসপত্র কেনা। এই থামেলের প্রায় প্রতিটা দোকান মুহিত ভাইয়ের নখদর্পণে। প্রায় সব দোকানি তার পরিচিত। নর্থফেস, মাউন্টেন হার্ডওয়্যারের মতো ব্র্যান্ড শপ থেকে শুরু করে খুচরা পাইকারি দোকান। নর্থফেস, হিমালয়ান গাইড শপ, মাকালু ই-ট্রেডার্স কেনাকাটা শেষ করা হলো। দেখা হলো মিংমা শেরপার সঙ্গে। তিনি ও মুহিত ভাই অনেকে দিন ধরেই একসঙ্গে অভিযান করছেন। তিনি এখন ব্যস্ত আছেন চৌদ্দটি আট হাজার মিটার পর্বত আরোহণের মিশন নিয়ে। থামেলের অন্য সব দোকানের মতো একটি খাবারের দোকানও আছে পরিচিত। সেটা হলো আন্টির দোকান। এখানে প্রায় বেশির ভাগ সময় আমাদের খাওয়া হয়। আর এই আন্টির দোকান বিদেশীদের কাছে এতই প্রিয় যে, খাবারের সময় বিশাল লাইনে দাঁড়িয়ে খেতে হয়। নেপালী খাবার আমার কখনো খারাপ লাগেনি। আমি বেশ স্বাদ নিয়ে খেতে পারি। নেপালের রাই শাক আমার খুবই প্রিয়।

কেনাকাটার ফাঁকে আমরা এজেন্সি ক্লাইম্বালায়ার অফিসেও গিয়েছি। পরিচিত হয়েছি এজেন্সির কর্ণধার দাওয়া শেরপার সাথে। অভিযানের শেরপা গাইডদের সঙ্গেও পরিচয় হলো। আমাদের সাথে এই লারকে অভিযানে যাচ্ছেন তিনজন অভিজ্ঞ ক্লাইম্বিং গাইড। যার দলনেতা বিনায়ক জয় মাল্লা। তিনি গত বছর লারকে পর্বত শিখরে সফল অভিযান করেছেন। তার ঝুলিতে আছে এভারেস্ট, মানাসলুর মতো পর্বত আরোহণের অভিজ্ঞতা। তিনি জাতিতে শেরপা নন। ত্রিভুবন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে তিনি স্নাতক সম্পন্ন করেছেন। সুঠাম দেহের অধিকারী মাল্লা তিনবার নেপালের ওয়াল ক্লাইম্বিং প্রতিযোগিতায়  চ্যাম্পিয়ন। সঙ্গে আছেন তাশি শেরপা। এভারেস্ট, মাকালু সামিট রয়েছে তার। আর একজন নিমা আমাদের সঙ্গে পরে যোগ দেবেন বেসক্যাম্পে। ক্লাইম্বালায়ার দাওয়া শেরপা অভিযানের দলনেতা মুহিত ভাইয়ের সঙ্গে প্রয়োজনীয় আলাপ সেরে নিলেন। সারাদিন কেটে গেলো বিভিন্ন কাজে। সন্ধ্যায় রাতের খাবার খেয়ে হোটেলে ফিরেই শরু হলো আমাদের ব্যাগ গোছগাছ করার পালা। রাত ১২টা বেজে গেলো। তাই দেরি না করে সবাই ঘুমিয়ে পরলাম।  

 



সকালের নাস্তা সেরে আমরা এজেন্সির ঠিক করা বাসে উঠে বসলাম। আজ আমরা যাবো আরুঘাট। সেখান থেকেই শুরু হবে আমাদের মূল অভিযান। ফোর হুইলার বিশ সিটের বাস। ক্লাইম্বিং গাইড, পোর্টার সব চলেছি একসঙ্গে। কাঠমাণ্ডু ভ্যালির ঘিঞ্জি ঠেলে ঘণ্টাখানেক সময় লেগে গেলো বাস পোখারা হাইওয়েতে আসতে। বাসের জানালা দিয়ে দূরে দেখা যাচ্ছে বরফরে চাদর মোড়ানো পর্বত চূড়া।  পোখড়া হাইওয়ের দিয়ে আমাদের বাস এগিয়ে চলছে। আমাদের সাথে গ্লেসিয়ার গলা খরস্রোতা ত্রিশুলী নদী আপন গতিতে বয়ে চলছে। এই নদীকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে অসংখ্য পর্যটন স্পট। কেবল কার, রাফটিং এর রোমাঞ্চকর সব রাইডস। ঘাটবেসীতে এসে বাসের চাকা পাংচার হয়ে গেলো। রাস্তার পাশের এক হাইওয়ে রেস্টুরেন্টে বাস রাখা হলো। সৌভাগ্যই বলা চলে। বাসের চাকা সারাতে বেশ সময় লেগে গেলো। এই সুযোগে আমাদের দুপুরের খাবারের যাত্রাবিরতিও হয়ে গেলো।

দুপুরের খাবারের সাথে বোনাস হিসেবে পেলাম ত্রিশুলী নদীর পাড়ে বসে সেই নদীর তাজা মাছ ভাজা। সামনে তো আর কপালে মাছ জুটবে নেমে আসার আগ পর্যন্ত। খাবার খেতে খেতে বাসের চাকাও সারানো হয়ে গেছে। বাস আবার চলতে শুরু করলো। খায়রেনি নামক জায়গা থেকে বাস হাইওয়ে ছেড়ে কাচা সরু রাস্তায় ঢুকে পড়লো। রাস্তার বিভিন্ন জায়গায় মেরামতের কাজ হচ্ছে। ফলে রাস্তার অবস্থা আরো বেশি নাজুক। এ যেন কোন রাস্তা না, রোলার কোস্টার চলছে। একমাত্র আল্লাহ বলতে পারবেন ভরা বর্ষায় এই রাস্তায় কিভাবে মানুষ চলাচল করে। এখন এই চলার পথে যদি কপাল গুণে বৃষ্টি হয় তাহলে কি হতে পারে কল্পনার অতীত। আল্লাহ আল্লাহ করছি যেন বৃষ্টির হেয়লীপনা না হয়। যদিও সূর্য আমাদের সাথেই আছে। ধুলোর অত্যাচার আগে কখনো এতোটা কপালে জোটেনি। চারপাশ অন্ধকার। কিচ্ছু দেখা যাচ্ছে না। তারপরও জানালা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে আছি। বাইরের অপরূপ পাহাড়ের ভাঁজে ভাঁজে যে সৌন্দর্য্য দেখার লোভে। ছোটবেলায় দেখা গ্রামের মহিলাদের মাটির হাড়িতে গরম বালিতে মুড়ির চাল ঢেলে হাতে নিয়ে ঝাকিয়ে মুড়ি ভাজার কথা মনে পড়ে গেলো। যেন তেমনিভাবে বাসটাকে বাইরে থেকে কেউ একজন ঝাকাচ্ছে। পেটের ভিতরের নাড়িভুড়ি পর্যন্ত উল্টাপাল্টা হয়ে যাচ্ছে মনে হচ্ছে। এই হেলেদুলে ঝাকুনির মধ্যে এবং দম বন্ধ করা চারপাশ অন্ধকার করে আসা ধুলায় নূর ভাই সামনের সিটে বসে কি ভাবে ঘুমাচ্ছেন তা হয়তো তিনি নিজেও বলতে পারবেন না। মুহিত ভাই, বিথী, বিপ্লব ভাই, সানভি ভাইও হেলেদুলে ঘুমিয়ে জেগে আছে। মুহিত ভাইয়ের ছোট স্পিকারে গান বাজছে। কিন্তু এই ভয়ঙ্কর রাস্তায় তেমন উপভোগ করতে পারলাম না। দুই হাত দিয়ে শক্ত করে সামনের সিট ধরে বসে বাসের ঝাকুনি দুলুনির সাথে তাল মিলাচ্ছি। আমি ধুলা সহ্য করতে পারি না। তাই নাক মুখ ঢেকে আছি। দীর্ঘ ভয়ানক বাস যাত্রায় চড়াই-উৎরাই পার করে একেবারে সমতল মালভূমির উপর চলে এলাম। এই মালভূমির নাম সাইল্যানটার। নেপালের সবচেয়ে বড় ও লম্বা মালভূমি। ঠিক আমাদের দেশের গ্রামাঞ্চলের মতোই দেখতে। এখানে মূলত কৃষি কাজ আর পশুপালন হয়ে থাকে। এটা দার্দিং জেলার একটি অঞ্চল। (চলবে)



রাইজিংবিডি/ঢাকা/১০ জানুয়ারি ২০১৯/তারা 

Walton Laptop
 
     
Marcel
Walton AC