ঢাকা, রবিবার, ১২ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৬, ২৬ মে ২০১৯
Risingbd
সর্বশেষ:

পাহাড়ি দ্বীপ মহেশখালীতে একদিন

ফয়সাল উদ্দিন নিরব : রাইজিংবিডি ডট কম
     
প্রকাশ: ২০১৯-০২-১৯ ৫:৩৯:৪৩ পিএম     ||     আপডেট: ২০১৯-০২-১৯ ৫:৩৯:৪৩ পিএম
Walton AC

ফয়সাল উদ্দিন নিরব : দ্বীপ উপজেলাগুলোর মধ্যে মহেশখালী একমাত্র পাহাড়ি দ্বীপ। এ দ্বীপটি ভ্রমণের ইচ্ছে ছিল অনেক আগে থেকেই। আমার জন্মস্থান হাতিয়া দ্বীপে। সে সুবাদে পাহাড়ি এ দ্বীপটি ভ্রমণ আমার জন্য ছিল রোমাঞ্চকর। সকাল ৭টায় কক্সবাজার সদর থেকে অটোরিকশায় চড়ে ৬নং জেটিঘাটে এসে নামলাম। এখান থেকে মহেশখালীর উদ্দেশ্যে স্পিডবোট এবং নৌকা ছেড়ে যায়। এছাড়া অন্য পথে আসা যায়, চট্টগ্রাম থেকে সড়ক পথে চকরিয়া থেকে বদরখালী হয়ে মহেশখালী।৬নং জেটিঘাট থেকে উঠলাম স্পিডবোটে। ১০ জন যাত্রী হলেই স্পিডবোট ছাড়ে, ভাড়া জনপ্রতি ৭৫ টাকা। নৌকায় ভাড়া ৩০ টাকা। স্পিডবোটে সময় লাগবে ১৫ মিনিট, নৌকায় ৪৫ মিনিট।

১৫৫৯ সালে প্রচণ্ড এক ঘূর্ণিঝড় এবং জলোচ্ছ্বাসে মূল ভূ-খণ্ড থেকে আলাদা হয়ে মহেশখালীর সৃষ্টি। বঙ্গোপসাগরের মোহনায় এর অবস্থান। চারদিকে জলবেষ্টিত দ্বীপটির চারপাশে ঝাউবন, দূর থেকে মনে হবে সবুজের প্রাচীর। ঠিক ১৫ মিনিটের মধ্যে স্পিডবোটটি ঘাঠে পৌঁছে গেল। এই জেটিঘাটটি ১৯৮৯ সালে কক্সবাজার পানি উন্নয়ন বোর্ড স্থাপন করে। ঝাউবনের মধ্যে দিয়ে ১৮২টি পিলারের ওপর জেটি দণ্ডায়মান। জেটি স্থাপন হওয়ার আগে মহেশখালীর যাতায়াত ব্যবস্থা ছিল নাজুক। বোট থেকে নেমে ঝাউবনের মধ্যে দিয়ে চলে যাওয়া সরু জেটি ধরে হাঁটতে শুরু করলাম। দু’পাশে ঝাউবন, সুনসান নীরবতা, সাঁইসাঁই বাতাস সময়টাকে আরো রোমাঞ্চকর করে তুলেছে। জেটির শেষ প্রান্তে এসে মিলল রিকশা এবং টমটম।



স্থানীয় একজনের সঙ্গে কথা বলে টমটমে চেপে বসলাম লবণ মাঠের উদ্দেশ্যে। মহেশখালী দ্বীপ বাংলাদেশে লবণ চাষের জন্য অন্যতম। এর কারণ হলো, এখানের পানিতে লবণের ঘনত্ব অনেক বেশি। এখানে প্রায় ১২ হাজার লবণ চাষি রয়েছে। এই উপজেলার ধলঘাটা, তাজিঘাটা, ঘাটিভাঙা, গোরকঘাটা, কতুবজোম ইউনিয়নে লবণ চাষ হয়। ফকিরকোনা নামক স্থানে টমটম থেকে নামলাম। যেদিকে চোখ যায় শুধু লবণের মাঠ। মহেশখালীর অন্যতম দর্শনীয় স্থান লবণ মাঠ। হাঁটা শুরু করলাম। কিছুদূর এগোতেই কয়েকজন লবণ শ্রমিক এগিয়ে এলো কৌতূহলবশত। তাদের সঙ্গে পরিচিত হয়ে বেশ কিছুক্ষণ কথা বললাম। তাদের একজন জয়নাল উদ্দিন (২০) বেশ কয়েক বছর এই লবণ মাঠে শ্রমিক হিসেবে কাজ করছেন। লবণের দাম কম তাই তার কণ্ঠে হতাশার সুর, লবণের দাম কম হলে মালিক ঠিকমতো টাকা দিতে গড়িমসি করেন। লবণ মাঠ থেকে বেরিয়ে রিকশায় নতুন বাজার হয়ে ডাকবাংলো। এখানেই অবস্থিত ৩০০ বছরের পুরোনো বৌদ্ধ বিহার। ৫ টাকা দিয়ে টিকিট কেটে ভিতরে প্রবেশ করলাম। অসাধারণ স্থাপত্য নিদর্শন, দৃষ্টিনন্দন, কারুকার্যখচিত বৌদ্ধবিহার। কথা হলো বিহারের ম্যানেজার ওনাচেন-এর সঙ্গে। তিনি জানান, এই বিহারটির সর্বশেষ সংস্কার কাজ করা হয় ২০০৪ সালের ৭ ডিসেম্বর। বাংলাদেশে পিতলের বড় বৌদ্ধ মূর্তিগুলোর মধ্যে এখানে রয়েছে দ্বিতীয় বৃহত্তম মূর্তি। এটি স্থাপন করা হয় ১২২ বছর পূর্বে। প্রতিদিন অনেক ভক্ত ও পর্যটক এই বৌদ্ধ বিহার ঘুরতে আসেন। এটিও মহেশখালীর দৃষ্টিনন্দন স্থাপনার মধ্যে একটি। ম্যানেজারের সঙ্গে কথা শেষ করে বেরিয়ে পড়লাম আমার পরবর্তী গন্তব্যে ঐতিহাসিক আদিনাথ মন্দির দেখতে। এটি গোরকটা ইউনিয়নের ঠাকুরতলা গ্রামের মৈনাক পাহাড়ের চূড়ায় অবস্থিত। হিন্দু সম্প্রদায়ের দেবতা মহাদেবের নামানুসারে মন্দিরের নামকরণ করা হয়েছে। অন্যদিকে আদিনাথ-এর অন্য নাম মহেশ, যা থেকে মহেশখালী নামের সৃষ্টি। আদিনাথ মন্দিরের ম্যানেজার দুলাল কান্তির সঙ্গে কথা হলো বেশ কিছুক্ষণ। তিনি জানান, প্রতিদিন হাজার হাজার দর্শনার্থী এখানে ঘুরতে আসেন। হিন্দু, মুসলমান, বৌদ্ধ, খ্রিস্টান সকল ধর্মের মানুষের জন্য এটা উন্মুক্ত। এই মন্দির অসম্প্রদায়িকতার প্রতীক। কারণ মন্দির কমপ্লেক্সের ভিতরে বৌদ্ধ বিহার ও মসজিদ রয়েছে। সমতল থেকে প্রায় ৮৫.৩ মিটার উঁচুতে (২৮০ ফুট উপরে) অবস্থিত এই মন্দির। প্রতি বছর মার্চের ৪ তারিখ চতুর্দশী মেলা বসে এখানে, লাখ লাখ মানুষের মিলনমেলা হয়। তখন এই স্থানটি হয়ে ওঠে বাঙালির ঐতিহ্যের ধারক-বাহক।



হিন্দুশাস্ত্র মতে, কয়েক হাজার বছর পূর্বে ত্রেতাযুগে মন্দিরের গোড়াপত্তন হয়েছে। ত্রেতাযুগে রাম ও রাবণের যুদ্ধ হয়। এ যুদ্ধে রামকে পরাজিত করার জন্য রাবণ উপাসনা করে মহাদেবের কাছে অমরত্ব বর কামনা করেন। মহাদেব রাবণকে শর্ত দিলেন কৈলাস থেকে শিবরূপী শিবলিঙ্গ বহন করে লঙ্কায় নিয়ে এসে পূজা করতে হবে। পথে কোথাও রাখা যাবে না। রাখলে তা আর উঠানো যাবে না। রাবণ শর্ত মোতাবেক শিবকে নিয়ে রওনা দিলেন। কিন্তু যাত্রা পথে এই মৈনাক পাহাড়ে শিবকে রেখে রাবণ প্রকৃতিক ডাক সেরে ফিরে এসে শিবকে উঠাতে চাইলে তা আর উঠানো সম্ভব হয়নি। আর এই মৈনাক পাহাড়েই হয়ে গেল শিবের অবস্থান।

এর আবিষ্কার সর্ম্পকে স্থানীয়ভাবে একটি জনশ্রুতি রয়েছে। এলাকাবাসীর মতানুসারে, এই তীর্থ আবিষ্কৃত এবং মর্যাদা পায় নূর মোহাম্মদ শিকদার নামক একজন সচ্ছল মুসলিম ধর্মালম্বীর মাধ্যমে। তাঁর একটি গাভী হঠাৎ দুধ দেওয়া বন্ধ করে দেয়। এ ঘটনায় তিনি রাখালের উপর সন্ধিহান হন। রাখাল বিষয়টির কারণ অনুসন্ধানে রাতের বেলায় গোয়ালঘরে গাভীটিকে পাহারা দেয়ার ব্যবস্থা করে দেখতে পায় গাভীটি গোয়ালঘর হতে বের হয়ে একটি কালো পাথরের উপর দাঁড়ায় এবং গাভীর বাট থেকে আপনা আপনি ওই পাথরে দুধ পড়তে থাকে। দুধ পড়া শেষ হলে গাভীটি পুনরায় গোয়ালঘরে চলে যায়। রাখাল বিষয়টি নূর মোহাম্মদ শিকদারকে জানালে তিনি গুরুত্ব না দিয়ে গাভীটি বড় মহেশখালী নামক স্থানে সরিয়ে রাখেন। একদিন শিকদার স্বপ্নাদেশ পান গাভীটিকে সরিয়ে রাখলেও তার দুধ দেওয়া বন্ধ হবে না বরং সেখানে তাকে একটি মন্দির নির্মাণ ও হিন্দু জমিদারদের পুজোদানের বিষয়ে বলতে হবে। স্বপ্নানুসারে শিকদার সেখানে একটি মন্দির নির্মাণ করেন এবং তা ধীরে ধীরে শিব তীর্থে পরিণত হয়।



মন্দিরের উপর থেকে সিঁড়ি বেয়ে নামার সময় পরিচয় হয় গাজীপুর এমএইচ আরিফ কলেজের বাংলা প্রভাষক আবদুল্লাহ আল মামুনের সঙ্গে। তিনি জানান, পুরো ৫০ জনের একটা দল এসেছেন। মহেশখালীর পান, শুঁটকির সুনাম জগৎজোড়া, তাই জায়গাটি ঘুরে দেখার পাশাপাশি পান ও শুঁটকি কেনার ইচ্ছে রয়েছে তাদের। মন্দিরের নিচেই চোখে পড়বে বেশ কিছু পোশাকের দোকান। সব দোকানদার রাখাইন তরুণী। হাতে কাজ করা কাপড়, চাদর, থ্রি পিস থরে থরে সাজানো। কাপড়ের দোকানগুলোর পাশে দ্বীপের ডাব পাবেন। ৩০ টাকা খরচ করলেই ফ্রেশ ২ গ্লাস ডাবের পানি খেয়ে গলা ভেজাতে পারবেন।



এ দ্বীপে আরও ঘুরতে পারবেন রাখাইন পাড়া, পানের বরজ, শুঁটকি মহাল, চিংড়ি ঘের, চরপাড়া সৈকত এবং সোনাদিয়া দ্বীপ। তবে সোনাদিয়া দ্বীপ যেতে হলে আপনাকে হাজার পনেরশ টাকা খরচ করে স্পিডবোট ভাড়া নিতে হবে। মহেশখালীতে থাকার তেমন আবাসিক হোটেল নেই। একদিনেই পুরো দ্বীপটি ঘুরে শেষ করতে পারবেন। বেলা পড়েছে। আমি হাঁটা ধরেছি জেটির উদ্দেশ্যে। জেটি ধরে হাঁটছি। ঝাউবনের সাঁইসাঁই বাতাস আর পাখির ডাকে শেষ বেলাটা আরো মনোমুগ্ধকর হয়ে উঠেছে। আজ এ পর্যন্তই। কক্সবাজার ঘুরতে আসলেই অবশ্যই পাহাড়িয়া এ দ্বীপটি ঘুরে আসবেন।



রাইজিংবিডি/ঢাকা/১৯ ফেব্রুয়ারি ২০১৯/ফিরোজ

Walton AC
     
Walton AC
Marcel Fridge