ঢাকা, রবিবার, ১২ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৬, ২৬ মে ২০১৯
Risingbd
সর্বশেষ:

চুনিয়ার পূর্ণিমার রাত অন্তরে পশেছে || ৪র্থ কিস্তি

মাহমুদ নোমান : রাইজিংবিডি ডট কম
     
প্রকাশ: ২০১৯-০৩-১৯ ৫:০৭:১৩ পিএম     ||     আপডেট: ২০১৯-০৩-২২ ৩:২৮:০৭ পিএম
Walton AC

মাহমুদ নোমান: রাত তখন ৮টা। ময়মনসিংহের বিখ্যাত পদমোড়লের বাড়ি আসকিপাড়ায়, গেইট দিয়ে ঢুকতেই ঘরের কর্তা রঞ্জিত রুগা হাসিমুখে চেয়ার এগিয়ে দিলেন। আমার সম্পর্কে টুকিটাকি জানলেন। যেখানে বসেছি সে ঘরটা ছাড়িয়ে লঙ্গরখানায় নিয়ে গেলেন। চু আনলেন। আমি না করাতে ‘আরে মিয়া’ বলে খাইয়ে দিলেন। সম্মান রক্ষার্থে গিলেছি। মহিলাটির পরিচয় জানলাম এতোক্ষণে। নাম তুলি চিসিম। রঞ্জিত রুগার স্ত্রী। বলতে গেলে আসকিপাড়া নয়, মান্দিদের মধ্যে বাঙালি বা বিভিন্ন অতিথিদের আতিথ্য দিতে তুলি চিসিমের নাম উল্লেখযোগ্য। আমাদের রাতে ঘুমানোর জন্য আরেকটা বাড়ি মানে দক্ষিণের বাড়িটাতে নিয়ে গেলেন। ঢুকতে সিঁড়িতে পদমোড়লের ইয়া বড় ছবি দেখে তো ঘুম আসে না। একেবারে মহাত্মা গান্ধীর ছবি যেন। এতো বড় বাড়ি, তাও সেকেলের জমিদার বাড়ি। দ্বিতীয় তলায় ১০-১২টা রুমে প্রতিটাতে বিছানা পাতা। দেয়ালে দেয়ালে ছবি, বিভিন্ন সেকেলে কারুকাজ, বুকসেলফসহ এলাহি কারবার। এতো বড় বাড়িতে একা ঘুমাতে দেয়া কতোটা অমানবিক, ঘুমাতে গিয়ে বুঝলাম। আমাকে যে রুমে থাকতে দিলো সে রুমের দরজাও বন্ধ করার সাহস হলো না। পূর্ণিমাও বুঝি আমার মতো ভীত হয়ে ছিল...।



রাতের অতি রোমাঞ্চ বা ভয়ের মিশেলে সে রাত স্মরণীয়। বিছানাটি আমার জীবনের অতি মায়ার পদভার বহন করে আছে। সকালে পুকুরঘাটে জাল পেয়ে পুকুরে ছড়িয়ে দিলাম। একটা বড়পুঁটি এলো, আবার ছেড়ে দিলাম। কিছু রাজহাঁস পুকুরে খেলছিল। পুকুরপাড়ে বড় একটি লিচুগাছ। তার সামনে আমাদের বসতে দিয়েছিল গতকাল রাতে। বিশাল রান্নাঘরের চুলা সকাল থেকে দাউদাউ। দেশি মোরগের ধড়পাকড়ের চেঁচামেচি, জবাইয়ের শোরগোল সকালে। কাজের অনেক লোক, কেউ রাঁধছে, কেউ সারাবাড়ির গাছের পাতা পরিষ্কার করছে, কেউ কেউ বিলে। রঞ্জিত রুগা আমাদের গ্রাম ঘুরিয়ে দেখালেন ধানবিলের আলে হেঁটে হেঁটে। ঘরে আসতে বিন্নিভাত দিলেন সবজি ভাজি দিয়ে। নেশার ওপর নেশা, চোখ পুড়ছে। রাতে চু, ঘুম হয়নি তদুপরি বিন্নিভাত। দুপুরে পদমোড়লের কবরে প্রার্থনা করতে ফাদারসহ এলেন ২৫-৩০ জন। রাজীব নূর, ফারহা তানজিম তিতিল, জুয়েল বিন জহির, এমনকি ইজাজ আহমেদ মিলনও তখন এসে হাজির। সারাবাড়ি ঘিরে শত শত ফুলের গাছ। বিভিন্ন রঙের গোলাপ ফুলের আড়ালে চলছে সেলফি আর ফটোসেশন। আমিও তাঁদের মধ্যে হারিয়ে গেলাম। পদমোড়লের বাড়িতে সে একটি রাত, আমাকে সারাজীবনের জন্য একটা জায়গায় থামিয়ে দিলো, আমিও সে রাতের মায়ায় সদা অস্থির।



পদমোড়লের বাড়ির স্মৃতি রোমান্থনে কয়েকটা দিন কাটিয়ে দিলাম পূর্ণিমাদের বাড়ি ফিরে। এবং অধীর আগ্রহে, ভেতরের হুলস্থূল রোমাঞ্চে অপেক্ষা করছি মান্দিদের সবচেয়ে বড় অনুষ্ঠান ওয়ানগালার জন্য। এটাই এবার চুনিয়ায় আসার অন্যতম কারণ। বিশেষত নতুন ফসল ঘরে তোলার সময় দেবতার উদ্দেশ্যে নিবেদিত পূজায় মহানন্দে পালিত হয় ওয়ানগালা। এটাকে মান্দিদের নবান্ন উৎসবও বলতে পারেন। পুরো চুনিয়া গ্রাম এটাকে ধর্মীয় উৎসব থেকে ছাড়িয়ে সামাজিক উৎসব হিসেবে পালন করছে। কেননা ওয়ানগালা মূলত সাংসারেক ধর্মের একটা উৎসব। কিন্তু এটিকে এখন মান্দিদের প্রধান উৎসব বলাটাই সমীচীন। নভেম্বরের ৭, ৮ ও ৯ তারিখ ওয়ানগালা পালিত হবে। জুয়েল বিন জহির ওয়ানগালা একটা শেষ হবার পরে আরেকটা শুরুর আগপর্যন্ত বুঝি তৎপর থাকে, এমনটাই মনে হলো পরিচয়ের এই কয়েকটা মাসে। এমন মান্দি অন্তঃপ্রাণ বাঙালি আমার জানামতে দেখিনি। পূর্বের প্রায় দেড়যুগের বেশি সময় ধরে জুয়েল বিন জহিরের বিশেষ তৎপরতায়, পরাগ রিছিল, ফারহা তানজিম তিতিল, পাভেল পার্থ ও আরো অনেক মাটির মানুষের কর্মসৃজনে এই চুনিয়ার আজকের ওয়ানগালা। এবারের ওয়ানগালা জুয়েল বিন জহির বিশেষভাবে করার তাগিদ দিয়ে আসছেন। কেননা জনিক নকরেকের বয়সের চিন্তা সবাইকে ভাবাচ্ছে। ১১৪ বছর পেরিয়ে গেছে, ভাবনাটা সত্য হওয়া সেকেন্ডে সম্ভব। তাছাড়া জনিক আচ্ছু পৃথিবী ত্যাগ করলে সাংসারেক ধর্মের রীতিনীতি বিশেষভাবে কেউ জানে না। সাংসারেক ধর্মের রীতিনীতি জানার জন্য হলেও ওয়ানগালার কোনো আয়োজন কমতি রাখতে রাজি নয়। যথারীতি এবারের ওয়ানগালার খামাল (সাংসারেক ধর্মের পুরোহিত) জনিক নকরেক। নব্য ধার্মিকদের হিংস্র বিরুদ্ধ বাতাসে অনড় সাংসারেকের শেষ জীবন্ত কিংবদন্তী। (চলবে)
 

 



রাইজিংবিডি/ঢাকা/১৯ মার্চ ২০১৯/তারা

Walton AC
     
Walton AC
Marcel Fridge