ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ৬ অগ্রহায়ণ ১৪২৬, ২১ নভেম্বর ২০১৯
Risingbd
সর্বশেষ:

অনুপ্রেরণার মোনাজাতউদ্দিন

রফিকুল ইসলাম মন্টু : রাইজিংবিডি ডট কম
     
প্রকাশ: ২০১৮-১২-২৯ ১:০৭:২১ পিএম     ||     আপডেট: ২০১৯-০২-১৮ ১:২৩:১৩ পিএম

রফিকুল ইসলাম মন্টু : চারণ সাংবাদিক মোনাজাতউদ্দিনের সঙ্গে আমার পরিচয় স্কুল জীবনে। তখন বরগুনা জেলা স্কুলের অষ্টম শ্রেণিতে পড়ি। প্রতিদিন মোনাজাত ভাইয়ের সঙ্গে দেখা না হলে মন খারাপ হতো। চমকে যাওয়ার মতই ব্যাপার! আমি সেই দক্ষিণের জেলা বরগুনা, আর মোনাজাত ভাই উত্তরের জেলায় চষে বেড়ান। প্রতিদিন দেখা হয় কীভাবে! আসলে সেই সময় থেকে সংবাদ-এ প্রকাশিত প্রতিবেদনের ভেতরেই আমি কল্পনায় এঁকেছি মোনাজাত ভাইয়ের ছবি। প্রতিদিন একবার কিংবা একাধিকবার তার লেখা না পড়তে পারলে ভালো লাগতো না। লেখার ভেতরেই তাঁকে খুঁজেছি। মনে হয় দেখা পেয়েও গেছি। ১৯৯৫ সালের ২৯ ডিসেম্বর থেকে তাঁকে আর দেখি না।

আমাকে খবরের নেশায় পেয়ে বসে ছাত্রজীবনে। আর নেশার শুরুর দিকটায় পাই মোনাজাত ভাইকে। বরগুনা জেলা সদর থেকে প্রায় আড়াই কিলোমিটার দূর থেকে স্কুলে আসতাম। সারা দিন ক্লাসে। স্কুল ছুটির পর আমার ছিল আরেকটা স্কুল। সহপাঠীরা যখন বাড়ি যাওয়ার ব্যস্ততায়, তখন সবাইকে ছেড়ে আমি যেতাম সংবাদ পত্রিকা খুঁজতে। যেখানে মোনাজাত ভাইয়ের দেখা মিলবে। নিজের পয়সা দিয়ে সংবাদ রাখা সম্ভব নয়। বরগুনা শহরের একটি দোকান, নাম জনতা স্টোর। স্টেশনারি মালামাল বিক্রেতা। সংবাদ পত্রিকাটি সেখানে পেতাম। সপ্তাহের ছয় দিন স্কুল ছুটির পরে ওই দোকানই ছিল আমার মোনাজাত শেখার পাঠশালা। কাগজ হাতে নিয়ে ‘মোনাজাতউদ্দিন’ নামটিই খুঁজতাম। যেন সেটাই আমার নিজের লেখা। অধিকাংশ সময় একই পত্রিকায় মোনাজাত ভাইয়ের একাধিক প্রতিবেদন পাই। পড়তাম কয়েকবার। একদিন পরে কাগজটি পুরানো হলে আমি নিয়ে যেতাম।

প্রকাশিত সংবাদ-প্রতিবেদন কেটে সংরক্ষণের চর্চাও শুরু হয় মোনাজাত ভাইয়ের লেখা কাটিংয়ের মধ্য দিয়ে। তাঁর লেখাগুলো পড়ে মন ভরতো না। তাই কেটে রাখতাম। পরে আবার পরতাম। আমার স্কুলের লেখা খাতাগুলো জমা করে রাখতাম। সেগুলোতে সংবাদ এ প্রকাশিত মোনাজাত ভাইয়ের প্রতিবেদনগুলো লাগিয়ে রাখতাম। তখনও কোনো পত্রিকায় লেখা শুরু করিনি। মোনাজাত পড়ার রেশ ধরে বরগুনার বাজার রোডের সেই জনতা স্টোরের মালিক আমাকে ডাকতেন ‘মোনাজাত’ বলে। কোনো কোনো দিন সেই দোকানি বলতেন, ‘কিরে মোনাজাত। আজ তো সংবাদ আসেনি।’ মনটা তখন খুব খারাপ হয়ে যেতো।

এভাবেই আমার জীবনে মোনাজাত চর্চা অব্যাহত থাকে। পর্যায়ক্রমে মোনাজাত ভাইয়ের লেখা কাটিংয়ের পাশাপাশি নিজের লেখা কাটিংয়ের সময় আসে। ১৯৮৪ সালে সাপ্তাহিক নবঅভিযান দিয়ে আমার লেখা শুরু হয়। তখন নিজের লেখাও কেটে পেস্ট করে রাখতে থাকি। ঠিক পরের বছর ১৯৮৫ সালে পত্রিকাটি দৈনিক হলে আমার সংবাদ ক্লিপিংয়ের সংখ্যা বাড়তে থাকে। বলা যায়, বাস্তবে মোনাজাত ভাইয়ের সাক্ষাৎ না পেলেও তার লেখা পড়ে পড়েই আমার সংবাদ লেখা শেখা। এক পর্যায়ে আমি জাতীয় পত্রিকার পাশাপাশি স্থানীয় পত্রিকায় কাজ করি। এতদিনে মোনাজাত ভাইয়ের সঙ্গে যেন আত্মার সম্পর্ক তৈরি হয়ে গেছে। ১৯৯৫ সালের ২৯ ডিসেম্বর আমি বরগুনার স্থানীয় একটি পত্রিকা অফিসে বসেছিলাম। হঠাৎ খবর আসে, মোনাজাত ভাই নেই। ফেরির ছাদ থেকে পড়ে প্রাণ হারান তিনি। আমাকে আহত করার জন্যে এই সংবাদটুকুই যথেষ্ট ছিল। আমি আর স্থির থাকতে পারিনি। অঝোরে কেঁদেছি- যেন কোনো স্বজন হারিয়েছি।
 

স্থানীয় সাংবাদিকতার স্তর পেরিয়ে আমি ঢাকায় মূলধারার সাংবাদিকতায় যোগ দেই ২০০২ সালে। এক পর্যায়ে শ্রদ্ধেয় সাংবাদিক মনজুরুল আহসান বুলবুল ভাইয়ের হাত ধরে সংবাদ এ যোগ দেই ২০০৪ সালের এপ্রিলে। আমি যেন সাংবাদিকতায় এক ভিন্নমাত্রা পেয়ে যাই। এটা মোনাজাত ভাইয়ের সংবাদ। যেখানে তিনি উত্তরের গ্রামীণ পর্যায়ের অসংখ্য সংবাদ-প্রতিবেদন লিখেছেন। সংবাদে থাকাকালে আমি বেশ কয়েকবার উত্তরের জেলায় ঘুরেছি অফিসের এসাইনমেন্ট নিয়ে। তার আগে ভোরের কাগজে থাকাকালেও মোনাজাত ভাইয়ের সংবাদ ক্ষেত্র সরেজমিনে দেখার সুযোগ হয়েছে আমার। পরবর্তীতে প্রথম আলোতে থাকাকালেও মোনাজাত ভাইয়ের অনেক স্থান দেখেছি, তাঁর অনেক চরিত্রের সঙ্গে কথা বলার সৌভাগ্য হয়েছে। একজন জয়পুর হাটের পাঁচবিবির আহসান হাবীব। তাঁকে খুঁজে বের করি। আহসান হাবীব নামটি পাই মোনাজাত ভাইয়ের প্রতিবেদনে। মোনাজাত ভাইয়ের প্রসঙ্গ তুলতে আহসান হাবীব আর চোখের পানি ধরে রাখতে পারেনি। সংবাদ চরিত্রের সঙ্গে মোনাজাত ভাই কতটা মিশে যেতেন, এটা তারই প্রমাণ।

উত্তরের জেলা রংপুর, নীলফামারী, কুড়িগ্রাম, লালমনিরহাট, জয়পুরহাট, গাইবান্ধা ঘুরে কাজ করার সময় প্রতিটি নিঃশ্বাসেই মোনাজাত ভাইকে মনে পড়েছে। বিভিন্ন জনের সঙ্গে মোনাজাত ভাইয়ের প্রসঙ্গ নিয়ে আলোচনা হয়। গাইবান্ধার পত্রিকা স্টলে মোনাজাত ভাইয়ের একটি বাঁধা করা ছবি দেখে খুবই ভালো লাগে। গোলাপী রঙয়ের একটি শার্ট পড়া ওই ছবি। শুধু সাংবাদিকদের মাঝেই নয়, মোনাজাত ভাই বেঁচে আছেন সকল স্তরের মানুষের মাঝে। এটা আমি অনুভব করি মোনাজাত ভাইয়ের এলাকা ঘুরে। উত্তরাঞ্চল ঘুরে তথ্য সংগ্রহ করতে গিয়ে মোনাজাত ভাইয়ের কাজের এলাকা এবং চরিত্রগুলোর সাক্ষাৎ হওয়ায় নিজে খুবই অনুপ্রাণিত হই। জয়পুরহাটের পাঁচবিবির এক আখ চাষীর সঙ্গে দেখা করি তাঁর বাড়িতে গিয়ে। মোনাজাত ভাই সম্পর্কে তিনিও বললেন অনেক কথা। চিলমারীর সেই ঐতিহাসিক চরিত্র ‘বাসন্তীর’ সঙ্গে দেখা করি। বাসন্তী মোনাজাত ভাইয়েরও একটি চরিত্র।

ঢাকায় সংবাদ-এ কাজ করার সময় মোনাজাত ভাইকে নিয়ে মাথায় আরেক ভূত চাপলো। সত্তর-আশির দশকের সংবাদ-এর পুরানো কপিগুলো আগারগাঁওয়ের জাতীয় গ্রন্থাগারে সংরক্ষিত আছে। সংবাদ-এ মোনাজাত ভাইয়ের সকল লেখা সংগ্রহের লক্ষ্যে এই গ্রন্থাগারের খোঁজ। গ্রন্থাগারের বেজমেন্টে ধুলো ময়লায় ঢাকা এক কক্ষে রয়েছে বাঁধাই করা অনেক পত্রিকা। সেখান থেকে সংবাদ ফাইল নিয়ে টেবিলে বসে পাতা উল্টে উল্টে মোনাজাত ভাইয়ের লেখা নোটবুকে লিখতে শুরু করি। ইচ্ছে ছিল সংবাদ-এ প্রকাশিত মোনাজাত ভাইয়ের সকল লেখা একত্রিত করা। লেখার ভেতর দিয়ে হয়তো আরো নতুন কিছু শিখতে পারব, একইসঙ্গে মোনাজাত ভাইয়ের লেখার একটি তালিকাও তৈরি হয়ে যাবে। এটা হয়তো অন্যান্য কাজে লাগতে পারে। সময়ের অভাবে কাজটি আর এগোয়নি।

একটা পর্যায়ে আমি লক্ষ্য করি, আমাদের সংবাদপত্র ও সাংবাদিকতার গণ্ডি থেকে মোনাজাত ভাই ঝাপসা হতে বসেছে। এই প্রজন্মের দু’চারজন সাংবাদিকের সঙ্গে মোনাজাত ভাই সম্পর্কে আলাপ করতে গিয়ে অবাক হই। অনেকে মোনাজাত ভাইয়ের নামটিও ঠিকভাবে বলতে পারছে না। এ অবস্থাটা আমাকে খুব কষ্ট দেয়। এই কষ্ট লাঘবের লক্ষ্যে আমার সংবাদক্ষেত্র উপকূল অঞ্চলে মোনাজাতউদ্দিনের মৃত্যু দিবস পালনের উদ্যোগ নেই। প্রতিবছর একটি পেপার তৈরি হয় এবং সেটি বিতরণ করা হয় সবার মাঝে। উদ্দেশ্য ছিল এই প্রজন্মের সাংবাদিকদের অনুসন্ধানী চোখটা একটু খুলে দেওয়া। কিন্তু এ ধরনের উদ্যোগ চালিয়ে নেওয়া খুবই কঠিন। এর সঙ্গে অর্থ এবং সংশ্লিষ্টদের মনযোগ খুবই জরুরি। মোনাজাত ভাইয়ের আদর্শ প্রতিষ্ঠায় আরো উদ্যোগ ছিল। তার মধ্যে ‘চারণ সাংবাদিক মোনাজাতউদ্দিন স্মৃতি পুরস্কার’ উল্লেখযোগ্য। প্রয়ানের পরের বছর থেকেই আমাদের প্রিয় দীনেশ দাশ এ উদ্যোগ নিয়েছিলেন। মনে আছে, প্রথমবার রংপুরের মাহবুব রহমান, দ্বিতীয়বার যশোরের ফখরে আলম এবং তৃতীয় বছর ১৯৯৮ সালে আমি এই সম্মানজনক পুরস্কারটি অর্জন করি। পুরস্কার অর্জনের এই খবরটি আমাকে কতটা আনন্দিত করেছিল, তা প্রকাশ করা কঠিন।

মোনাজাতউদ্দিন আমাদের দেশের গ্রামীণ সাংবাদিকতার পথিকৃৎ। প্রত্যন্ত গ্রামের আড়ালে থাকা খবরগুলো কীভাবে শহরের চশমা আঁটা চোখের সামনে তুলে আনতে হয়, তা শিখিয়েছেন এই মানুষটি। আমাদের সৌভাগ্য এই মানুষটি আমাদের আগে জন্মেছিলেন। আগে জন্মেছিলেন বলেই আমরা তাঁর কাছ থেকে একটি গাইডলাইন পেয়েছি। তাঁর ভাবনাকে কেন্দ্র করে অনেককিছু ভাবতে পারছি। চর্চার ক্ষেত্র হিসাবে তাঁর লেখাগুলো সামনে রাখতে পারছি। মোনাজাত ভাইয়ের বইগুলো কতবার যে পড়েছি, তার হিসেব নেই। এখনও পড়ি। যেখানেই যাই না কেন, মোনাজাত ভাইয়ের একখানা বই আমার সঙ্গে থাকে। মন খারাপ থাকলে, অন্যমনষ্ক হয়ে গেলে মোনাজাত ভাইয়ের বইয়ের পাতায় মনযোগ দেই। মন ভালো হয়ে যায়, আবার কাজের মধ্যে ডুবি। মোনাজাত ভাইয়ের বাক্য গঠন, শব্দ চয়ন- এ এক অন্যরকম মাদকতা।

আজ ২৯ ডিসেম্বর ২০১৮, মোনাজাত ভাইয়ের ২৩তম মৃত্যুবার্ষিকী। এই দিনে তাঁর প্রতি বিনম্র শ্রদ্ধা। প্রত্যাশা করি- এদেশের সাংবাদিকতায় মোনাজাত চর্চার ক্ষেত্র প্রসারিত হোক, মোনাজাতউদ্দিন বেঁচে থাকুন আমাদের মাঝে।




রাইজিংবিডি/ঢাকা/২৯ ডিসেম্বর ২০১৮/ইভা

ইউটিউব সাবস্ক্রাইব করুন