ঢাকা, বুধবার, ৫ অগ্রহায়ণ ১৪২৬, ২০ নভেম্বর ২০১৯
Risingbd
সর্বশেষ:

অপরাধী কারাগারে নয়, থাকবে পারিবারিক পরিবেশে

হাসান মাহামুদ : রাইজিংবিডি ডট কম
     
প্রকাশ: ২০১৯-১০-১১ ৮:২৮:০৩ এএম     ||     আপডেট: ২০১৯-১০-১১ ৩:০৪:০৬ পিএম
প্রতীকী ছবি

অনেক আসামির জেল খেটে বের হয়ে বড় ধরনের অপরাধী হওয়ার নজির রয়েছে। সাধারণত কারাগারকে সংশোধনাগার হিসেবে বিবেচনা করা হয়। কিন্তু কারাগারে লঘু অপরাধীও দাগি আসামির সংস্পর্শে আসার সুযোগ পায়। যা পরবর্তীতে গুরুতর অপরাধের প্রবণতা তৈরি হতে পারে। এসব বিষয় বিবেচনায় শাস্তি প্রদানকেই সংশোধনের মাধ্যম করতে চাইছে সরকার।

মূলত লঘু অপরাধে দণ্ডিতদের কারাবদ্ধ না রেখে সরকার কর্তৃক নির্ধারিত কোনো পারিবারিক পরিবেশে রেখে তাকে সংশোধনের সুযোগ দেয়া হবে। কাউন্সেলিং করা হবে। এজন্য তৈরি করা হচ্ছে প্রবেশন আইন।

প্রবেশন বলতে কোনো অপরাধীকে তার প্রাপ্য শাস্তি স্থগিত রেখে, কারাবদ্ধ বা আবদ্ধ না রেখে সমাজে খাপ খাইয়ে চলার সুযোগ প্রদান করাকে বোঝায়। প্রবেশন ব্যবস্থায় প্রথম ও লঘু অপরাধে আইনের সাথে সংঘর্ষে বা সংস্পর্শে আসা ব্যক্তিকে কারাগারে না রেখে আদালতের নির্দেশে প্রবেশন অফিসারের তত্ত্বাবধানে এবং শর্ত সাপেক্ষে তার পরিবার ও সামাজিক পরিবেশে রেখে কৃত অপরাধের সংশোধন ও তাকে সামাজিকভাবে একিভূতকরণের সুযোগ দেয়া হয়।

প্রবেশন আইনের খসড়া তৈরি করেছে সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়। আইনে বিষয়গুলোর উল্লেখ রয়েছে। এতে আরো বলা হয়েছে, আদালত যদি উপযুক্ত মনে করে যে, আইনের অধীনে প্রবেশন আদেশের শর্তাবলী পালনে অঙ্গীকারাবদ্ধ করে অপরাধী তার সংশোধন ও পুনর্বাসনে উপকৃত হতে পারে। তখন আদালতে নিয়োজিত প্রবেশন অফিসারকে অপরাধীর চরিত্র, প্রাক বংশ পরিচয়, পারিবারিক পারিপাশ্বিক ও তথ্যাদি বা অবস্থাদি তদন্ত করে একটি প্রাক দণ্ডাদেশ প্রতিবেদন আদালতের কাছে দাখিল করার অনুরোধ করতে পারবে। তদন্তে প্রবেশন অফিসার যদি বুঝতে পারেন যে, অপরাধীর প্রবেশনের বা সমাজভিত্তিক সংশোধনের সুযোগ রয়েছে, তা হলে তিনি প্রবেশনের সুপারিশ করবেন।  আদালত মামলার কাগজপত্র ও সার্বিক অবস্থা পর্যালোচনা করে স্ব-উদ্যোগেও প্রবেশন মঞ্জুর করতে পারেন।

শিশুদের পাশাপাশি কিশোর-কিশোরী, প্রাপ্তবয়স্ক নারী-পুরুষরাও প্রবেশন পেতে পারবেন। মৃত্যুদণ্ড বা যাবজ্জীবন দণ্ডপ্রাপ্ত আসামি প্রবেশন পাবেন না।

আইনে একটি ‘জাতীয় প্রবেশন বোর্ড’ গঠনের কথা বলা হয়েছে। এই বোর্ডের সভাপতি হবেন সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী। জাতীয় সংসদের স্পিকার কর্তৃক মনোনীত দুজন সংসদ সদস্য থাকবেন। একজন হবেন সরকারদলীয়। অন্যজন বিরোধীদল থেকে মনোনয়ন পাবেন। বোর্ডে সদস্য হিসেবে আরো থাকবেন উপ-মহাপুলিশ পরিদর্শক পদমর্যাদার একজন কর্মকর্তা। সমাজকল্যাণ সচিব, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সুরক্ষা ও সেবা বিভাগ কর্তৃক যুগ্মসচিব পদমর্যাদার কর্মকর্তা। থাকবেন সংশ্লিষ্ট আরো ১১ জন কর্মকর্তা।

জাতীয় প্রবেশন বোর্ডের পাশাপাশি বিভাগীয় পর্যায় থেকে শুরু করে জেলা, উপজেলা, শহর এবং পৌরসভা পর্যায়ে প্রবেশন বোর্ড গঠন করার কথা বলা হয়েছে।

মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, প্রবেশন অফেন্ডার্স অব অ্যাক্ট ১৯৬০ অনুযায়ী, ২০১৭ সালের ৪ ডিসেম্বর রাজশাহী জেলার চিফ জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেসিতে দেশে প্রথম প্রবেশন দেয়া হয়। এরপর ২০১৮ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত দেশে মোট ২১৪টি মামলায় সাজা হয়। এর মধ্যে মাত্র ১০টি মামলায় প্রবেশন দেয়া হয়। আইন প্রণেতারা মনে করছেন, লঘু অপরাধে দণ্ডিত অপরাধীরা সুযোগ পেলে নিশ্চয়ই সংশোধিত হবে। প্রস্তাবিত আইনের খসড়া প্রণয়নের সময় বিষয়টি সংশ্লিষ্টদের বিবেচনায় ছিল বলে জানা গেছে।

আইনে আরো বলা আছে, প্রবেশন চলাকালে যে অপরাধের জন্য শাস্তি প্রদান করা হয়েছিল, সেই অপরাধ আবার করলে প্রবেশন বাতিল হবে। সেক্ষেত্রে তাকে কারাভোগ বা প্রচলিত আইনে শাস্তি ভোগ করতে হবে। শিশুর প্রবেশনের ক্ষেত্রে শিশু আইন-২০১৩ এর বিধানাবলী প্রযোজ্য হবে।

আইনে আপিলেরও সুযোগ রাখা হয়েছে। বলা হয়েছে, যে ক্ষেত্রে কোনো অপরাধের জন্য অপরাধীকে দোষী সাব্যস্ত করে ধারা ৪ বা ৫-এর অধীন প্রদত্ত নিঃশর্তের বা শর্তাধীন অব্যাহতি অথবা প্রবেশনাদেশের বিরুদ্ধে কোনো আপিল বা রিভিশন দায়ের করা হয়। সেক্ষেত্রে আপিল বা রিভিশন আদালত বিধি অনুযায়ী যেকোনো আদেশ প্রদান করতে পারবে। অথবা ধারা ৪ বা ধারা ৫-এর অধীন প্রদত্ত আদেশ বাতিল বা সংশোধন করতে পারবে এবং তার পরিবর্তে  আইন অনুমোদিত যেকোনো দণ্ড প্রদান করতে পারবে। কোনো আপিল বা রিভিশন আদালত অপরাধীকে দণ্ড  প্রদানকারী মূল আদালত কর্তৃক প্রদত্ত দণ্ডের বেশি কোনো দণ্ড দিবে না।

আদালত চাইলে প্রবেশনের সময় বাড়াতে বা কমাতে পারবে। আইনে আরো বলা হয়েছে, সরকার, প্রবেশন কার্যক্রম বাস্তবায়ন, প্রয়োজনীয় সহযোগিতা নিশ্চিতকরণ, পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়নের জন্য অধিদপ্তরের প্রবেশন অধিশাখা এবং ক্ষেত্রমত প্রত্যেক বিভাগ, জেলা, উপজেলা এবং মেট্রোপলিটন এলাকায় প্রয়োজনীয় সংখ্যক জনবল ও যানবাহনসহ প্র‌বেশন কার্যালয় প্রতিষ্ঠা করবে। তবে জেলা এবং মেট্রোপলিটন এলাকাধীন প্রবেশন কার্যালয় সংশ্লিষ্ট আদালত ভবনে অবস্থিত হবে।

আইনজীবী খুরশীদ আলম খান এ বিষয়ে রাইজিংবিডিকে বলেন, এটি ভালো উদ্যোগ, সাধুবাদ পাওয়ার যোগ্য। কিন্তু আমার ব্যক্তিগত মতামত হচ্ছে আইনটি করার আগে অবশ্যই প্রবীণ আইনজীবী, সাবেক বিচারপতি, জুডিস প্রভৃতির মতামত নিয়ে পরিপূর্ণ ভেটিং (আইনি মত) করা দরকার। কারণ কিছু আইনের ক্ষেত্রে আমরা দেখেছি সীমাবদ্ধতা থেকে যায়। যার কারণে পরবর্তীতে ওসব আইন কাজে আসে না।

তিনি বলেন, এই উদ্যোগটি খুব ভালো। তাই এই আইনের ক্ষেত্রেও আমি বলবো, প্রয়োজনে সরকার আরো সময় নিক, পরামর্শ নিক, ভেটিং করুক। তারপর আইন পাস   করুক। কারণ আইনে কোনো গ্যাপ থাকলে পরবর্তীতে উচ্চ আদালতে আপিল হতে পারে। এমনও হতে পারে আইনটি বাতিলও হয়ে যেতে পারে।

সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব জুয়েনা আজিজ রাইজিংবিডিকে বলেন, আমাদের ফৌজদারি বিচার ব্যবস্থার মাধ্যমে সকল ক্ষেত্রে অপরাধীকে শাস্তি আরোপ করা আইন সমর্থন করে না। কেননা সাজা প্রদানের অন্যতম উদ্দেশ্য হচ্ছে সংশোধনমূলক। প্রতিহিংসামূলক নয়। প্রবেশন আইনটিও তেমন একটি আইন হতে যাচ্ছে।

তিনি বলেন, আমরা আশা করছি, আইনটি বাস্তবায়নের মাধ্যমে আমরা লঘু অপরাধীদের সঠিক পথে আনতে পারবো।

তিনি বলেন, আইনের ড্রাফটিং শেষ হয়েছে। এর ওপর সংশ্লিষ্টদের মতামত নেয়া হয়েছে। প্রয়োজনে আরো পর্যালোচনা হবে। আইন মন্ত্রণালয়ের ভেটিংয়ের পর জাতীয় সংসদে আইনটি পাস করা হবে।


ঢাকা/হাসান/সাইফ

ইউটিউব সাবস্ক্রাইব করুন