ঢাকা, শুক্রবার, ৮ ফাল্গুন ১৪২৬, ২১ ফেব্রুয়ারি ২০২০
Risingbd
সর্বশেষ:
ফিল্ম রিভিউ

আলফা: লাশের দিকে তাকানো জীবন

টোকন ঠাকুর : রাইজিংবিডি ডট কম
     
প্রকাশ: ২০১৯-০৫-০৬ ২:৫০:০৬ পিএম     ||     আপডেট: ২০১৯-০৫-০৬ ৬:৩৭:২৪ পিএম
‘আলফা’ চলচ্চিত্রের একটি দৃশ্য

একটি ভালো ছবি ঠিক একবার দেখেই কিছু মন্তব্য করা যায় হয়তো; লেখা যায় না। লিখতে গেলে একাধিকবার দেখে লেখার সুযোগ থাকলেই ভালো। ‘আলফা’ আমি একবার দেখেছি ‘সীমান্ত সম্ভার’-এ। এই সিনেপ্লেক্সে এটিই আমার প্রথম ছবি দেখা। ‘আলফা’র প্রণেতা নাসির উদ্দিন ইউসুফ। ঢাকার সাংস্কৃতিক মণ্ডলে তাঁর নাম ‘বাচ্চু ভাই’। ‘আলফা’ বাচ্চু ভাইয়ের তৃতীয় ছবি। অনেক আগে সম্ভবত গত শতাব্দীর লেইট এইটিজে তিনি নির্মাণ করেন ‘একাত্তরের যীশু’ এবং তাঁর গত-সাম্প্রতিককালের ছবি ছিল ‘গেরিলা’, যেটি মুক্তিযুদ্ধের গল্প। ‘গেরিলা’র মূল প্রেরণা সৈয়দ শামসুল হকের একটি লিখিত ফিকশন।

স্বাধীনতা-উত্তর বাংলাদেশের মঞ্চ নাটকের বিস্তারে একটি প্রভাবশালী নাম নাসির উদ্দিন ইউসুফ। ‘ঢাকা থিয়েটার’ তাঁর নাটকের দল। আমি তখনো ঢাকায় আসিনি কিন্তু ঢাকা থিয়েটার প্রযোজিত একটি নাটক দেখেছি কুষ্টিয়া শিল্পকলা একাডেমির মঞ্চে, ১৯৮৯ সালে। নাটকের নাম ‘মুনতাসীর ফ্যান্টাসী’। সেলিম আল দীনের লেখা নাটকের নির্দেশক নাসির উদ্দিন ইউসুফ এবং ‘মুনতাসীর ফ্যান্টাসী’র একটি চরিত্রে অভিনয় করতে দেখলাম স্বয়ং নির্দেশককেও। শুনলাম, অভিনেতা আফজাল হোসেন দলের সঙ্গে আসতে পারেননি বলে নাটকের একটি চরিত্রে অভিনয় করলেন নির্দেশক নিজে। সে সময় ঝিনেদা থেকে কুষ্টিয়ায় নাটক দেখতে গেছি এর একটি বড় কারণ, অভিনেতা হুমায়ুন ফরিদীকে দেখব বলে। আরেকটি কারণ, আমি ঝিনেদা থিয়েটারের সদস্য হয়েছিলাম এর আগেই। সারাদেশেই তখন বাংলাদেশ গ্রাম থিয়েটার কার্যক্রম চলছিল দারুণ গতিতে। বাংলাদেশ গ্রাম থিয়েটার একটা মুভমেন্টের মতো, ভাবতে পারতাম। সারাদেশে বাংলাদেশ গ্রাম থিয়েটার-এর তখন আড়াইশোর অধিক শাখা। বিভিন্ন অঞ্চল বিভিন্ন নামেই প্রকাশিত কিন্তু কেন্দ্রীয়ভাবে সব্বাই বাংলাদেশ গ্রাম থিয়েটার-এর অংশ। ঢাকা থিয়েটার সারাদেশের সব শাখা সংগঠনকে নেতৃত্ব দিচ্ছে, আদতে নেতৃত্ব দিচ্ছেন নাসির উদ্দিন ইউসুফ। মাইকেল মধুসূদন দত্তের অঞ্চলের মধ্যে যশোর-টশোর মিলিয়ে যে কয়েকটি দল দারুণ সক্রীয় সেগুলোর মধ্যে আমাদের শহর ঝিনাইদহে ছিল ‘ঝিনেদা থিয়েটার’। আমি সেই দলের সদস্য, আমাদের দলের সিনিয়র সদস্যরা তখন বলতেন, ‘যেহেতু তুমি গ্রাম থিয়েটার করো, মানেই ধরো ঢাকা গেলেই তুমি ঢাকা থিয়েটারের সদস্য হয়ে যাবা। মানে তুমি ঢাকাই গেলেই তোমাকে ঢাকা থিয়েটারের লোকজন চিনে নেবে, জায়গা দেবে।’  ঢাকা থিয়েটারের লোকজন বলতে আমাদের মফস্বল থেকে তখন আমি যা জানতাম সেই কলেজে পড়ার সময়, সেলিম আল দীন, নাসির উদ্দিন ইউসুফ, শিমুল ইউসুফ, রাইসুল ইসলাম আসাদ, হুমায়ুন কবির হিমু, পীযূষ বন্দ্যোপাধ্যায়, হুমায়ুন ফরিদী, আফজাল হোসেন, জহিরুদ্দিন পিয়ার, সুবর্ণা মুস্তাফা বা আরো কারো নাম হয়তো। সেই ঢাকা থিয়েটারের কেন্দ্রীয় সম্মেলন হচ্ছিল সে বছর কুষ্টিয়ায়, এর আগের দিন ঝিনেদার বাসস্ট্যান্ডে আমি বাস কাউন্টারের মধ্যে দুজন মানুষকে আবিষ্কার করি এবং কথা বলি, যাদের লেখা গ্রন্থ কিছু পড়ে ফেলেছি তখন এবং বইয়ের ফ্ল্যাপের ছবি দেখার অভিজ্ঞতা থেকেই চিনেছি, তাঁরাও কুষ্টিয়া যাচ্ছিলেন গ্রাম থিয়েটার সম্মেলনে। সেই দুজনের সঙ্গে পরবর্তী সময়ে আমার বিস্তারিত আলাদা করে সুসম্পর্কও গড়ে উঠেছিল। সেই দুজন হচ্ছেন সৈয়দ শামসুল হক এবং সেলিম আল দীন। তাঁরা বসেছিলেন সেদিন বাস কাউন্টারে, কুষ্টিয়া অভিমুখী যাত্রী হয়ে। এরপর আমি খুলনা চলে যাই এবং একদিন খুলনা শহরে, হতে পারে ১৯৯১ বা ৯২ সালে; ‘একাত্তরের যীশু’ প্রদর্শনের জন্য ঢাকা থেকে আসে। আমি তখন খুলনা আর্ট কলেজের ছাত্র। খুলনার শিববাড়ি মোড়ের জিয়া হল মিলনায়তনে প্রদর্শন করা হয় নাসির উদ্দিন ইউসুফের প্রথম ছবি ‘একাত্তরের যীশু’। টিকিট মূল্য কেন ৫০ টাকা, সেই কারণে আমরা কিছু বন্ধু সেদিন ছবিটা দেখতে পারলাম না। আমাদের হিসেবে খুলনায় বসে বেশি টাকার টিকিট মূ্ল্য-হেতু সেদিন ‘একাত্তরের যীশু’ দেখতে না-পারায় হলের বাইরে বিরাট গোলমাল পাকিয়ে দিলাম। খানিকটা হৈ চৈ করেই তবে ক্লান্ত হয়েছি সেদিন। যদিও ছবিটির আয়োজকেরা আমাদের কয়েকটি টিকিট ফ্রি দিতে চাইলেও সে বয়সে আমাদের কী যে মেজাজ! দেখিনি। এরপর ঢাকায় এসেও আর ‘একাত্তরের যীশু’ দেখার সময় ও সুযোগ মেলেনি। তবে ‘গেরিলা’ দেখেছি। কিন্তু এই লেখার উপলক্ষ ‘গেরিলা’ নয়, সদ্য মুক্তিপ্রাপ্ত পরিচালকের তৃতীয় ছবি ‘আলফা’ নিয়ে লিখতে বসেই হঠাৎ ‘ঘুমিয়ে পড়া  অ্যালবাম’ খুলে এসব ছবি বেরিয়ে পড়ল। পুরনো সময়টা একটু দেখেও নিলাম, জীবনের এই এক মজা- মজায়, কে না মজতে চায়?
 

‘আলফা’ চলচ্চিত্রের একটি দৃশ্য


‘আলফা’ এমন একটি ছবি, অর্থনৈতিকভাবে নিন্মবর্গের বাসিন্দারাই যেখানে লিড প্রোটাগনিস্ট। বস্তির লোকজন, গার্মেন্টস শ্রমিক, হিজড়া, মর্গের ডোম থানা পুলিশ- এদেরকেই দেখতে হবে ছবিতে। আর আলফা? আলফা চরিত্রে দেখি একাডেমির বাইরে বিকশিত এক আর্টিস্টকে, যে বাস করে লেকের জলের মধ্যে বাঁশখুটি দিয়ে বানানো একটি ঘরে। সে গাধার পিঠে তার টিনের ট্রাঙ্ক চাপিয়ে শহরের রাস্তায় ঘোরে, ট্রাঙ্কের মধ্যে তার  শিল্পকর্মসম্ভার। ঠিক এ ছবির গল্পকাঠামো খুঁজে দেখার ইচ্ছে জাগে না দেখতে বসে। কবিতা পাঠের আনন্দে যেমন গল্পের অন্বেষণ থাকে না পাঠকের মনে, ‘আলফা’ দেখার পর ছবির গল্পটা কি- তাও আমার কাছে মুখ্য হয়ে থাকল না। দেখলাম, ‘আলফা’র মধ্যে চিত্রিত ঢাকা মহানগর কিংবা বাংলাদেশ, উপস্থিত বাংলাদেশের  সমকাল। এরকম বহুমাত্রায় চিত্রিত সমকাল, এমন নিপুণ করে আঁকা ছবি সিনেমা হলে গিয়ে বসে দেখার সুযোগ আমার আর হয়নি। নিজেকে অতিক্রম করে যাওয়া এত সহজ কথা নয়, সচরাচর এ দেশে তা হতেও দেখি না, গান-গল্প-কবিতা-চিত্রকলা- প্রায় সব ক্ষেত্রেই একজন সিনিয়র শিল্পীর কাজের গতিপ্রকৃতি আমাদের জানা হয়ে যায়। ‘আলফা’র নির্মাতা এমনটি ভাবার সুযোগ দিলেন না। আমার মনে হয়েছে, নিজেকে তিনি নবায়ন করে নিয়েছেন এমনভাবে, এতে একটি নতুন মেজাজের ছবি পেয়ে গেলাম আমরা। নিজের সীমানা ভেঙে বেরিয়ে যাওয়া ছবি নির্মাণ করলেন পরিচালক। খুব ভালো একটি ছবি দেখার আচ্ছন্নতা নিয়ে বেরিয়ে রাস্তায় হাঁটতে হাঁটতে মনে হচ্ছিল, শিল্পীসত্তার সমুজ্জ্বল শক্তির দৃষ্টান্ত দেখানো পরিচালক বাংলাদেশেও আছেন। বহুমাত্রার পুঞ্জীভূত স্তর নিয়ে ‘আলফা’ ছাপিয়ে উঠেছে একটি উদাহরণযোগ্য ছবি হয়ে। এটা আমাদেরই ছবি, আমাদের ক্ষয়ে যাওয়া বাংলাদেশের ছবি। হয়তো ক্ষয়ে যেতে যেতেও ক্ষত বুকে চেপে রেখে স্বপ্ন দেখার ছবি।

যুবক আর্টিস্ট আলফা জলের উপরে যে টং ঘরে থাকে, সেই ঘরের নিচে ভেসে আসে একটি পিঠ মোড়া করে বাঁধা, জলে উপুড় হয়ে থাকা লাশ। আর্টিস্ট সেই লাশ সরিয়ে জলে ভাসিয়ে দেয়, লাশটি আবার ভেসে আসে। আর্টিস্ট থানায় গিয়ে পুলিশে খবর দিলে পুলিশ এসে দেখে- লাশ নেই। কিন্তু সেই লাশ ফিরে আসে পুনরায়। সেই লাশ কার? সেই লাশের কোনো প্রিয়জন আছে? বউ, সন্তান, মা আছে? এই লাশ ক্রসফায়ারের লাশ, যার প্রিয়জনরা জানেই না, তাকে মেরে ফেলা হয়েছে, সে আর কোনোদিন বাড়ি ফিরবে না। সেই লাশ কি বাংলাদেশ? বাংলাদেশ নামক রাষ্ট্রে ক্রসফায়ারে কত লোক মারা পড়েছে আজ পর্যন্ত? সমকালীন বাংলাদেশের ‘ক্রসফায়ার’ প্রসঙ্গটা যেন জাদুবাস্তবতার মোড়কে আবৃত একটি অধ্যায়, সব্বাই জানে ও বোঝে। অমানবিকতার এই সাক্ষ্য কী সূক্ষ্মভাবে নাসির উদ্দিন ইউসুফ ফ্রেমে ফ্রেমে তুলে এনেছেন ‘আলফা’ ছবিতে। একালের এক গরিব রাষ্ট্রের বিচার ব্যবস্থার চিত্রও প্রকাশিত ‘ক্রসফায়ার’ বা ‘ক্লিন হার্ট’-শব্দের মধ্যে। পুঁজি সমর্থিত অল্প আয়ের মানুষের জীবনের মূল্য কত কম, দরদের সঙ্গে নির্মাতা দেখিয়েছেন ছবিতে। মানবিকতাবিরোধী রাজনৈতিক প্রয়োজনে ঢাকার জীবনযাত্রায় গার্মেন্টসে আগুন লাগানো বা রাস্তায় গাড়ি পুড়িয়ে মানুষ হত্যা আমাদের চেনা অভিজ্ঞতা, ‘আলফা’তে সেটি প্রকাশিত। ‘আলফা’ দেখায়, বাংলাদেশে লিস্ট ধরিয়ে দিয়ে একজনের পর একজন ব্লগার হত্যাকাণ্ড ঘটেছে, প্রচণ্ড ধর্মীয় গোঁড়ামির উত্থান ঘটছে, এর মধ্যেই বিলবোর্ডে উঠছে নতুন পণ্যের বিজ্ঞাপন। বাংলাদেশ কোথাও এগিয়ে যাচ্ছে, তবে সেটি সামনের দিকে না পেছনের দিকে, সেটিই লক্ষযোগ্য।

‘আলফা’ চলচ্চিত্রের একটি দৃশ্য


একজন হিজড়া  বা সমাজের নন-কনভেনশনাল চরিত্রের এ রকম মমতাময়ী উপস্থিতি ইতোপূর্বে আমার আর দেখা হয়নি, এ দেশের ছবিতে। ‘আলফা’ অনেক স্ট্রোক বেইজড ছবি, একজন আর্টিস্টের মনোজগতের ছবির ভেতর দিয়ে সংবেদনার ভেতরে জারিত নির্মাতার শিল্পীসত্তাটি খুবই চোখে পড়ে। পরিচালক শিল্পী হয়ে উঠেছেন, সমকালীন তরুণের মতো অ্যক্টিভিস্ট হয়ে উঠেছেন, এই ছবিতে। সামগ্রিকভাবে বাংলাদেশের ছবিকে এক টানে তিনি অন্য এক উচ্চতায় নিয়ে গেছেন- ‘আলফা’র নির্মাণ মানেও সেই স্বাদ ফুটে ওঠে। সাউন্ড, মিউজিক, চিত্রায়ণ, সম্পাদনা- সব কিছুতেই কোথাও যেন অতিক্রম করে যাওয়ার এক গভীর প্রত্যয় লক্ষণীয়। মিথ, ম্যাজিক ও সমকাল মিলিয়ে দিলো আলফা। জলে ভাসমান ক্রসফায়ারের লাশের সঙ্গে কথা বলে আর্টিস্ট আলফা। লাশের শরীরে প্যান্টের পকেট থেকে একটি ছবি বের করে আলফা, যে ছবিটি হয়তো তার শিশু পুত্রের, ছবির উল্টো পিঠে ঠিকানা লেখা ছিল। কিন্তু পুলিশ লাশ তুলে নিয়ে গেলেও ঠিকানা অনুযায়ী লাশ ফেরত যায় না, জনৈক সুলায়মানের লাশ জলে ভেসে যায়। লাশ খোয়াজ খিজিরের উদ্দেশ্যে জলে ভাসিয়ে দেয় আর্টিস্ট আলফা। বহু অসঙ্গতি, অনিয়মের দিকে উঁকি দিয়ে ক্যামেরা জলে ভেসে যাওয়া লাশের দিকে তাক করা থাকে। হাহাকার লাগে। কষ্ট চাপি বুকের মধ্যে। ছবি শেষ হয়ে আসে। কিন্তু মোটেও ‘আলফা’ দেখে প্রেক্ষাগৃহ থেকে বেরিয়ে আসার পরই ছবিটা শেষ হয়ে যায় না, বরং ছবিটা ফের স্ক্রিনিং শুরু হয় মাথার ভেতরে। ছবিটা ফের দেখতে থাকি, একা, হাঁটতে হাঁটতে, নিজের ঘরে বসে, জানলা দিয়ে তাকাই, দেখি আলফা গাধা টেনে নিয়ে হেঁটে যাচ্ছে মহানগরীর উপকণ্ঠের দিকে, যেখানে বঞ্চিত শ্রমজীবী মানুষের জীবন উন্মুখ হয়ে আছে বেঁচে থাকবার আশায়।

‘আলফা’ দেখতে বসে এমন এক মগ্নতা আসে, মনে হয়, ছবি দেখছি না, মানুষের দগদগে উপাখ্যান দেখছি, শান্ত স্বরে জীবনের কলরব শুনছি। কিন্তু বাউল যখন বস্তি এলাকার মঞ্চে দাঁড়িয়ে কীর্তন গাইছেন, মঞ্চের ব্যাকড্রপে দেখি একটি ওয়াজ মাহফিলের পোস্টার সাঁটানো, আর যারা কীর্তনের শ্রোতা-দর্শক, মোটা দাগে সব্বাইকে মুসলিম মনে হলো- এটা কীভাবে সঙ্গত হলো, ধরতে পারিনি। ইন্টেনশনালি?
আর্টিস্ট আলফা তার মনোজগতের মধ্যে যে পাহাড়ি উপত্যকার জঙ্গল ধরে হাঁটে, সেখানে একবার তাকে অজ্ঞান হয়ে পড়ে যেতে দেখি। তারপর শিকারী আদিবাসিরা তাকে খুঁজে পেয়ে প্রত্ন-পদ্ধতির চিকিৎসা দিতে থাকে। আলফা হয়তো সমাজের নিয়মিত চরিত্র নয়, অবশ্য আর্টিস্ট মাত্রই সমাজের অনিয়মিত চরিত্র, চিরকাল, সব দেশেই। আলফা সমুদ্রের জলে বা বিস্তীর্ণ চরাচরের মধ্যে প্রজাপতির মতো ডানা মেলে দেয়, সে দৃশ্য দেখতে দেখতে মনে হচ্ছিল, নির্মাতার চৈতন্যে যে কবি আত্মগোপন করে আছে, আমি সেই কবির আপন-মাধুরীর ক্যাথারসিসে জড়িয়ে যাচ্ছি। গভীর কোনো শূন্যতার মধ্যে হারিয়ে যাচ্ছি। জীবনযাপনের বাইরেও জীবন আমাদের কোথাও নিয়ে যেতে চায় ‘আলফা’ সে রকম জীবন্ত হয়ে ওঠে।

মানবিকতার সঙ্কট, অর্থনৈতিক বৈষম্যের উদাহরণ, বস্তির জীবনের ছাপচিত্রে ফলিত ‘আলফা’। রাষ্ট্র, ব্যক্তি, ক্রসফায়ার, লাশ, লাশের সঙ্গে শিল্পীর কথোপকথন, লাশ হিন্দুর না মুসলমানের, সেই অমীমাংসায় থানার দারোগার উত্তর- ‘কাটা’। মানে নুনুর মাথা কাটা। মহররমের তাজিয়া বা আত্মত্যাগের রক্তাক্ত মিছিল, বস্তি ও মাদক বিক্রেতা, ক্ষুধা- কত কী টুকরো টুকরো অনুষঙ্গে ‘আলফা’ ঠাসা, বুনোট। ‘আলফা’ ঢাকার একটি পরিণত ছবি, যে রকম ম্যাচিউর ছবি ঢাকায় হয় না বলেই বাংলাদেশি ছবি এখনো সাবালক হয়ে ওঠে না। পরিচালকের প্রজ্ঞার পরিমিত ব্যবহার ঢাকার ছবিতে বিরল ব্যাপার। কোনোরকমে একটি চটকদারি প্রেম-ট্রেম নিয়েই তো চলছে বেশ। বুঝতে পারি, পড়াশোনার প্রস্তুতি, মানুষ দেখার পর্যাপ্ত অনুশীলন নেই এমন লোকেরাই ভীষণ ব্যস্ত এখনো সিনেমার কারবার নিয়ে। ঘনত্ব নেই, দুই মাসও থাকে না ছবির ঘ্রাণ, এমন ছবিকেও ছবি  বলে হম্বিতম্বি চলতে থাকে আমাদের দেশে। আমাদের এমনই অভ্যাস। নির্মাতার মধ্যে শিল্পীর ধ্যানী মর্ম-ধর্মের চেয়ে ব্যবসায়ীক ফাটকা পলিসির প্রভাবই বেশি লক্ষযোগ্য, আমার বাংলাদেশে। যদিও এই দশা কন্টিনিউ করার নয়, এটা একটা শূন্যতা। এরকম শূন্যতার মধ্যে ‘আলফা’ আশা জ্বালায়, চলচ্চিত্রের স্বপ্নচারীদের সাহসী হবার অভিপ্রায় বাড়িয়ে দেয়।

৬ মে, ২০১৯; ৩৬ ভূতের গলি, ঢাকা




রাইজিংবিডি/ঢাকা/৬ মে ২০১৯/তারা