ঢাকা, মঙ্গলবার, ২৫ অগ্রহায়ণ ১৪২৬, ১০ ডিসেম্বর ২০১৯
Risingbd
সর্বশেষ:

ইস্তাম্বুল: নীল জলে পা ডুবিয়ে যে নগর থাকে অপেক্ষায়

ফাতিমা জাহান : রাইজিংবিডি ডট কম
     
প্রকাশ: ২০১৯-১০-১৩ ১:৩৯:১১ পিএম     ||     আপডেট: ২০১৯-১০-১৩ ২:০০:১৩ পিএম

তোপকাপি প্যালেসের হাম্মাম এতটা মনোরম নয়, যতটা ডলমাবাহচে প্যালেসের। এমন নয় যে, এ প্রাসাদের কোথাও ছবি তোলা নিষেধ। হাম্মাম আর কিছু প্যাসেজে ছবি তোলার অনুমতি আছে দেখলাম। সেখানে দর্শনার্থীদের ছবি তোলার ভিড়ও বেশ।

হাম্মামের পর লম্বা প্যাসেজ, প্যাসেজের কাচ ঘেরা সারি সারি জানালা দিয়ে দেখা যাচ্ছে বসফরাস। জানালার ওপরে বাহারি রঙের কাচের নকশা। প্যাসেজ পার হলে সুলতানের আরো কয়েকটি অভ্যর্থনা কক্ষ, যার বর্ণনা দিতে হয় পুরনো আমলের রাজকীয় সিনেমার ফর্দ ধরে। এরপরের কক্ষে মিউজিয়ামে  রাখা আছে  সুলতানের ব্যবহৃত ব্যক্তিগত জিনিসপত্র। এই যেমন বিউটি বক্স যা আপাদমস্তক সোনা দিয়ে তৈরি, এমনকি চিরুনী, কাঁচি, আয়নাতেও সোনার ছোয়া। সুলতানের হুক্কা বা শিশা পানের পাত্র, যা আসল ক্রিস্টালে নির্মিত, দাবা খেলার টেবিল যা হাতির দাঁত দিয়ে নির্মিত, বিভিন্ন সময়ে ব্যবহৃত সুলতানের সোনার ব্যাজ, সুলতানের ব্যবহৃত বন্দুক যার গায়ে সোনার কারুকাজ ইত্যাদি।

 

ক্রিস্টাল, সোনা ও হীরের তৈরি বোতল ও গ্লাস

মিউজিয়াম থেকে বের হয়ে প্যাসেজ পার হলে প্রাসাদের সবচেয়ে আকর্ষণীয় কক্ষ ‘সেরেমোনিয়াল হল’, যেখানে বিভিন্ন অনুষ্ঠান পালন করা হতো। এ কক্ষের ছাদ, স্তম্ভ, দেয়ালের কারুকাজ যেমন রাজকীয় তেমনি শৌখিন ও অন্যান্য কক্ষের চেয়ে দৃষ্টিনন্দন। ছাদে সোনালীর সাথে নীল মিশিয়ে চিত্রকলায় এক মায়াবী আবহাওয়ার সৃষ্টি করা হয়েছে, হলের মাঝখানে ঝুলছে পৃথিবীর সর্ববৃহৎ ঝাড়বাতি যা সম্পূর্ণ বোহেমিয়ান ক্রিস্টাল দিয়ে তৈরি। গ্রেট ব্রিটেন থেকে আনা সাড়ে চার টন ওজনের এ ঝাড়বাতিতে আটকে আছে ৭৫০টি বাতির প্রাণ। এক সময় এখানেই সম্রাটের প্রাসাদ মেতে উঠতো আনন্দ উৎসবে। আসতো বিভিন্ন রাজ্য থেকে অতিথি, হতো কুশল বিনিময় আর গানবাজনা।

ক্ষমতার লোভে সম্রাট ভাইদের মাঝে রেশারেশি ও হানাহানি লেগেই থাকত। প্রাসাদের নির্মাতা সুলতান আব্দুল মেজিদ বেশিদিন প্রাসাদে অবস্থান করতে পারেননি। তাকে হটিয়ে ক্ষমতায় আসেন সুলতান আব্দুল আজিজ। সুলতান আব্দুল হামিদ (২) প্রাসাদে অবস্থান করেছিলেন মাত্র ২৩৬ দিন ইয়েলদিয প্রাসাদে চলে যাবার আগে। এরপর প্রাসাদটি খালি পরে থাকে বেশ কয়েক বছর। অটোম্যান খিলাফতের অবসান ঘটলে কামাল আতাতুর্ক শেষ চার বছর অনিয়মিতভাবে এ প্রাসাদে অবস্থান করেন। যদিও তাকে সমাহিত করা হয় আঙ্কারায়।

 

সিঁড়ি, ডলমাবাহচে প্যালেস

প্রাসাদের সংগ্রহালয়ে বিখ্যাত শিল্পী যেমন আইভান আইভাযোভস্কি, গুস্তাভ বাওলাংগের, জিয়ান লিওন জেরোমে প্রমুখের ২০২টি দুর্লভ চিত্র রয়েছে। অর্ধেক দিন লাগিয়ে ডলমাবাহচে প্যালেস ঘুরে এখন বাজে বিকেল ৬টা। অনেক সময় আছে বসফরাসের তীরে গিয়ে গায়ে হাওয়া লাগানোর। আবার ট্রাম ধরে চললাম কারাকোয় স্টেশনের দিকে। উদ্দেশ্য বসফরাসের তীরে সূর্যাস্ত দেখা, এরপর জাহাজে চেপে খানিক ভ্রমণ করা।

বিকেলবেলা বসফরাসের তীরজুড়ে হরেক মানুষের মেলা। বেশিরভাগ স্থানীয়। কেউ বাচ্চা নিয়ে এসেছে তো কোন যুগল মান অভিমানের পালা চুকাতে এসেছে। অথবা কেউ স্বাস্থ্য রক্ষার জন্য জগিং করতে এসেছেন। আমাদের দেশের মত এদেশে কেউ কারো দিকে তাকিয়ে থাকে না। দেশে রাস্তা দিয়ে চলতে গেলে অকারণে মানুষের অপলক তাকিয়ে থাকা আমি এখনো সহজভাবে নিতে পারি না। একটা মানুষকে অস্বস্তিতে ফেলার জন্য অমন তাকানোই যথেষ্ট। তুরস্ক মুসলমান রাষ্ট্র কিন্তু নারীদের পোশাকের ওপর নেই কোন আরোপ। পাবলিক প্লেসে নারীদের ধূমপান করতেও দেখেছি। কারো এতে কিছুই এসে যাচ্ছে না।

 

সেরেমোনিয়াল হল, ডলমাবাহচে প্যালেস

বসফরাসের তীরে কিছুক্ষণ কাটিয়ে চলে গেলাম জাহাজ বন্দরে যা আরেক পাশে, হেঁটেই যাওয়া যায়। সাতটার সময় জাহাজ ছাড়ল। জাহাজের ভেতর সংগীত নৃত্য ইত্যাদির ব্যবস্থা ছিল। তুর্কী গান আমার খুব প্রিয় আর দরবেশ ঘূর্ণায়মান নাচও খুব আগ্রহভরে দেখি। কিন্তু এসব দেখার জন্য তো আমি জাহাজে চড়িনি। আমি বসফরাস দেখতে চাই। আরো কাছে থেকে বসফরাসের গন্ধ পেতে চাই। চলে গেলাম জাহাজের ডেকে। সেখানে কেউ নেই। সবাই হলের ভেতরে বেলি ড্যান্স দেখায় ব্যস্ত। বসফরাস সবসময়ই শান্ত, কৃষ্ণসাগর আর ভূমধ্যসাগরকে সংযুক্ত করে সে আছে ভীষণ আনন্দে! এই নীল জলের মায়ায় কত জেলে মাছ ধরতে পাড়ি দেয় সীমাহীন যাত্রায়। সব মানুষের মনেই থাকে একজন বোহেমিয়ান, জীবনে একবার হলেও ঘর ছেড়ে যেতে ইচ্ছে করে বহুদূর বন্ধনহীন। আমাকে যেতে হবে আরো দূরে, পূর্ব থেকে পশ্চিমে, উত্তর থেকে দক্ষিণে। কে জানে বা আরো দূরে অজানারে জানার মায়ায়।

বসফরাসকে জানিয়ে গেলাম আমার যাত্রাসূচী। কে জানে আবার কবে দেখা হয়!

** ইস্তাম্বুল: নীল জলে পা ডুবিয়ে যে নগর থাকে অপেক্ষায় || ষষ্ঠ পর্ব


ঢাকা/তারা                 

ইউটিউব সাবস্ক্রাইব করুন