ঢাকা, সোমবার, ৭ শ্রাবণ ১৪২৬, ২২ জুলাই ২০১৯
Risingbd
সর্বশেষ:

ঈদের ছুটিতে ত্রিপুরা

ইকরামুল হাসান শাকিল : রাইজিংবিডি ডট কম
     
প্রকাশ: ২০১৯-০৬-০৩ ৫:৫২:৩৭ পিএম     ||     আপডেট: ২০১৯-০৬-১৫ ৩:০৪:১৯ পিএম
ঈদের ছুটিতে ত্রিপুরা
Voice Control HD Smart LED

ইকরামুল হাসান শাকিল: ঈদের ছুটিতে বেড়ানো বেশি হয়। কেউ দেশের ভেতরে, আবার কেউ দেশের বাইরে বেড়াতে যান। প্রতিবেশী দেশ ভারত, নেপাল ও ভুটানের দিকেই বেশি মানুষের আগ্রহ। কম সময়ে এবং কম খরচে সহজেই ঘুরে আসা যায় এসব দেশ থেকে। যারা ভারতে ঘুরতে যান তাদের মধ্যে বেশির ভাগ মানুষ দার্জিলিং, কলকাতা, দিল্লি, আগ্রা, কাশ্মির, মানালি যান। তবে আমাদের সব থেকে কাছে ভারতে প্রকৃতির অপরূপ সুন্দর জায়গা আছে। যা আমরা অনেকেই জানি না। আসুন তেমনি একটি জায়গা নিয়ে আজ আপনাদের ভ্রমণ পিপাসা মেটাতে কিছু তথ্য দিয়ে সহযোগিতা করি।

ত্রিপুরাকে উত্তর-পূর্ব ভারতের সবচেয়ে দূরর্বতী স্থান হিসেবে গণ্য করা হয়ে থাকে। ভারতের দ্বিতীয় ক্ষুদ্রতম রাজ্য হলো ত্রিপুরা। ছোট হলেও এটি সুন্দর একটি রাজ্য। শান্ত সরল ও মনোরম পরিবেশ। এই রাজ্যের ইতিহাস মহাভারতের সময় থেকে সূচনা হয়েছে। ধারণা করা হয়ে থাকে যে ভূমি অধিষ্ঠাত্রী দেবী ‘ত্রিপুরা সুন্দরী’র নামানুসারে এই নামটি নামাঙ্কিত করা হয়েছিল। ত্রিপুরা পূর্বে মাণিক্য রাজবংশের মহারাজাদের দ্বারা শাসিত ছিল। ১৯৪৭ সালে স্বাধীনতা লাভের পর এই রাজ্যটি ভারতের সঙ্গে মিলিত হয় এবং ১৯৭২ সালে ত্রিপুরা একটি রাজ্য হিসেবে স্বীকৃতি অর্জন করে। এই রাজ্যটির পূর্বে মিজোরাম, উত্তর-পূর্ব দিকে আসাম এবং উত্তর, দক্ষিণ এবং পশ্চিম দিকে বাংলাদেশ দ্বারা পরিবেষ্টিত।

 



কখন যাবেন: ত্রিপুরা ভ্রমণের  সেরা সময় সেপ্টেম্বর থেকে মার্চ। তাছাড়া সারা বছরই ঘুরতে পারবেন প্রকৃতির মনোরম পরিবেশে।  ঢাকা থেকে সরাসরি বাসে যেতে পারেন আগরতলা। ভাড়া হাতের নাগালে। আবার ট্রেনেও যেতে পারবেন। সেক্ষেত্রে আপনাকে ঢাকা থেকে আখাউড়া যেতে হবে ট্রেনে। সেখান থেকে অটো, সিএনজি, মাইক্রোবাসে আখাউড়া স্থলবন্দর যেতে হবে। ইমিগ্রেশন শেষ করে ট্যাক্সি অথবা বাসে আগরতলা শহরে ঢুকে পড়বেন। সময় লাগবে ১৫ থেকে ২০ মিনিট। শহরের রাস্তাগুলো বেশ পরিষ্কার। এবার আসুন কিছু দর্শনীয় স্থান সম্পর্কে জেনে নেই-

ত্রিপুরার বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্য: ত্রিপুরার অভয়ারণ্য স্পষ্টভাবে উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় ভারতীয় রাষ্ট্রের বিভিন্ন প্রাকৃতিক ঐতিহ্যকে ব্যাখ্যা করে। এই রাজ্যে চারটি অভয়ারণ্য রয়েছে যেগুলি বন্যপ্রাণীদের আশ্রয়স্থল হিসাবে এবং প্রকৃতির একটি অত্যাশ্চর্য আলো-আঁধারি নিয়ে অবস্থিত। গোমতী বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্য, রৌয়া বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্য, সিপাহীজলা বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্য ত্রিপুরাকে করেছে সমৃদ্ধ। এই অভয়ারণ্যে  হাতি, হরিণ, সম্বর, বাইসন-এর জন্য বিখ্যাত। রোয়া অভয়ারণ্যটি সমৃদ্ধ ঔষধি, পশুখাদ্য, অর্কিড এবং অন্যান্য উদ্যানজাত গাছপালার জন্য সুবিখ্যাত।

 



ত্রিপুরার মন্দির: ত্রিপুরার মন্দিরগুলি হলো এই রাজ্যের পর্যটনের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। ত্রিপুরার মন্দিরগুলি সেখানকার স্থাপত্য এবং ভাস্কর্যর জন্য সুপরিচিত এবং সারা বিশ্বের হাজার হাজার পর্যটকদের আকর্ষিত করে। বিখ্যাত মন্দিরগুলোর মধ্যে ভুবনেশ্বরী মন্দির অন্যতম। এই মন্দিরটি গোমতী নদীর তীরে অবস্থিত যা ১৬৬০-১৬৭৫ সালে মহারাজা গোবিন্দ মাণিক্য দ্বারা নির্মিত। হিন্দুদের ৫১টি পীঠস্থানের একটি হলো এই ত্রিপুরা সুন্দরী মন্দির। ত্রিপুরার সবচেয়ে জনপ্রিয় পর্যটনস্থানের একটি হলো কমলাসাগর কালী মন্দির যা বাংলাদেশ সীমান্তে অবস্থিত।

উনকোটি। অর্থাৎ কোটির থেকে এক কম। উনকোটি পর্যটকদের কাছে অত্যন্ত আকর্ষণীয়। রাজধানী আগরতলা থেকে ১৬৫ কিলোমিটার দূরে কৈলাসহর। কৈলাসহর থেকে ৮ কি.মি. দূরে রঘুনন্দন পাহাড়। এই পাহাড়ের গায়ে খোদাই করা অসংখ্য দেব-দেবীর মূর্তি। এই মূর্তিগুলো সম্ভবত সপ্তম থেকে নবম শতাব্দীর। প্রাচীন এই মূর্তিগুলোই পর্যটকদের ডেকে আনে। সঙ্গে রয়েছে এখানকার প্রাকৃতিক পরিবেশ। পাহাড়ি ঝরনা থেকে অবিরল জলের ধারা বয়ে চলছে। জায়গাটি পর্যটন কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত হলেও ভারতীয় প্রত্নতাত্ত্বিক গবেষণা কেন্দ্র পুরো উনকোটির দায়িত্বে। প্রতিবছর মকসংক্রান্তি ও অশোকাষ্টমীতে মেলা বসে। আগে ভক্তরা করলেও এখন ত্রিপুরা সরকারই এই মেলার আয়োজন করে।

 



নীরমহল। ইংরেজিতে ওয়াটার প্যালেস। আগরতলা থেকে ৫৫ কিলোমিটার দূরে মহারাজার অবসর বিনোদনের এই মহলটি এখন পর্যটকদের আকর্ষণের মূলকেন্দ্র। ১৯৩০ সালে মহারাজ বীরবিক্রম কিশোর মাণিক্যের আমলে নির্মিত প্রাচীন স্থাপত্যের এক অসাধারণ নিদর্শন। প্রাসাদটিতে ত্রিপুরার ঐতিহ্য মাথায় রেখে হিন্দু ও মুসলিম উভয় স্থাপত্যেরই ছোঁয়া রয়েছে। বিশাল প্রাসাদকে ঘিরে রয়েছে প্রায় ৫ কিলো ৩০০ মিটারের এক দীঘি। দীঘির নাম রুদ্রসাগর। প্রায় আধা ঘণ্টা নৌবিহারের পর পৌঁছানো যায় আসল প্রাসাদে। প্রতি শীতে আয়োজন করা হয় নীরমহল পর্যটন উৎসবের। উৎসবে তুলে ধরা হয় রাজ্যের উপজাতি ও বাঙালি সংস্কৃতিকে। রুদ্রসাগরের পারেই গড়ে উঠেছে ত্রিপুরা পর্যটন নিগমের অতিথিশালা সাগরমহল। পর্যটকদের থাকা-খাওয়ার অসাধারণ বন্দোবস্ত রয়েছে এখানে। ছোটদের বিনোদনের জন্য রয়েছে একটি পার্ক। স্থানীয়দের মনসামঙ্গল কীর্তন বাড়তি পাওনা। মেলাঘরের এই নীরমহলের কাছেই সোনামুড়া  বক্সনগর। ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তে কাছে এই সোনামুড় ও বক্সনগরও পর্যটকদের কাছে বেশ আকর্ষণীয়। বক্সনগরে খনন করে পাওয়া গিয়েছে বৌদ্ধ বিহার।

বিলোনিয়ায়। বিলোনিয়া বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ ইতিহাসের একটি ঐতিহাসিক স্থান। এখানে রয়েছে ভারত-বাংলাদেশ মৈত্রী উদ্যান। রয়েছে বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের স্মৃতিবিজড়িত অনেক ঘটনা। এই স্থানেই স্বাধীনতা যুদ্ধের কে ফোর্স-এর অধিনায়ক খালেদ মোশাররফের নেতৃত্বাধীন বাহিনী প্রশিক্ষণ নিয়ে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে গেরিলা যুদ্ধ করে বাংলাদেশের স্বাধীনতা অর্জনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। বাংলাদেশের সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী দীপু মনি ত্রিপুরার রাজধানী আগরতলা থেকে ১৩০ কিলোমিটার দক্ষিণে বিলোনিয়ার চোত্তাখোলায় মুক্তিযুদ্ধ স্মরণে স্মারক উদ্যানের উদ্বোধন করেছিলেন। আমরা সবাই স্মারক উদ্যানের গল্প শুনে অবিভূত হলাম। সবচেয়ে উঁচু টিলার ওপর ৭ মার্চের ঐতিহাসিক ভাষণের আদলে বঙ্গবন্ধুর ৩২ ফুট দীর্ঘ একটি ভাস্কর্য ও সাভারের জাতীয় স্মৃতিসৌধের আদলে স্তম্ভ তৈরি করা হয়েছে। ভাস্কর্যের পেছনে থাকবে টেরাকোটায় চিত্রিত সাতচল্লিশ থেকে একাত্তর পর্যন্ত বাংলাদেশের অভ্যুদয়ের নানা বাঁক। রাজ্য সরকারের দায়িত্বশীল এক কর্মকর্তা জানান, টিলা যেখানে জলাশয়ে মিশেছে, সেখানে দু-তিনজন মুক্তিযোদ্ধার কবরের খোঁজ পাওয়া গেছে। এ ছাড়া সবচেয়ে উঁচু টিলাটিসহ কয়েকটি টিলায় খোঁজ মিলেছে চারটি বাংকারের।

 



এক নজরে ত্রিপুরার পরিদর্শনযোগ্য স্থানসমূহ: ত্রিপুরার সবুজ উপত্যকা, পাহাড়ি স্রোত, পাহাড় এবং উপত্যকা দ্বারা পরিবেষ্ঠিত। ত্রিপুরার জনপ্রিয় আকর্ষণীয় স্থানগুলো হলো কমলাসাগর হ্রদ, ডামবুর হ্রদ, উজ্জায়ান্তা প্রাসাদ, নীড়মহল, কুঞ্জবন প্রাসাদ, ত্রিপুরা সরকারী যাদুঘর, জাম্পুই পাহাড় ইত্যাদি। আপনি যদি ত্রিপুরার সমৃদ্ধ বন্যপ্রাণীর সাক্ষী হতে চান তাহলে গোমতী অভয়ারণ্য, তৃষ্ণা অভয়ারণ্য, রোয়া অভয়ারণ্য এবং সিপাহীজলা অভয়ারণ্যগুলি পরিদর্শন করতে পারেন। যারা ধর্মীয় স্থান ভ্রমণ করতে চান তাদের জন্যও এখানে অনেক মন্দির এবং বৌদ্ধ মন্দির রয়েছে যেমন ত্রিপুরা সুন্দরী মন্দির, কমলাসাগর কালী মন্দির, ভুবনেশ্বরী মন্দির, দক্ষিণ ত্রিপুরার মনু বকুল বৌদ্ধ মন্দির, আগরতলার বেণুবন বিহার বৌদ্ধ মন্দির, উত্তর ত্রিপুরার পেচারথাল বৌদ্ধ মন্দির।

ছবি: শেখ মেহেদী মোর্শেদ



রাইজিংবিডি/ঢাকা/৩ জুন ২০১৯/তারা

Walton AC
ইউটিউব সাবস্ক্রাইব করুন
       

Walton AC
Marcel Fridge