ঢাকা, মঙ্গলবার, ২৫ অগ্রহায়ণ ১৪২৬, ১০ ডিসেম্বর ২০১৯
Risingbd
সর্বশেষ:

এফআইআর ছিঁড়ে আসামি ছাড় : ওসির বিরুদ্ধে তদন্ত কমিটি

রুমন চক্রবর্তী : রাইজিংবিডি ডট কম
     
প্রকাশ: ২০১৭-০৪-০৪ ৩:১৮:০১ পিএম     ||     আপডেট: ২০১৭-০৪-০৪ ৩:১৮:০১ পিএম

কিশোরগঞ্জ প্রতিনিধি : জেলার কটিয়াদী মডেল থানার ওসি মো. আহসানউল্লাহর বিরুদ্ধে এফআইআর বইয়ের পাতা ছিঁড়ে অপহরণ মামলার আসামি ছেড়ে দেওয়ার অভিযোগে তদন্ত কমিটি গঠিত হয়েছে।

মোটা অঙ্কের ঘুষের বিনিময়ে কটিয়াদি থানার ওসি এ কাজ করেছেন বলে অভিযোগ করা হয়েছে। তিন মাস গোপন থাকলেও সম্প্রতি ঘটনাটি জানাজানি হয়।

এর আগে অভিযোগকারী বিষয়টি স্থানীয় সাংবাদিকদের জানায়। পরে এই নিয়ে বেশ কয়েকটি স্থানীয় পত্রিকায় প্রতিবেদন প্রকাশিত হলে ‍পুলিশ প্রশাসন থেকে তদন্ত কমিটি গঠন করে। হোসেনপুর সার্কেলের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মো. জামাল উদ্দিন বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।

কটিয়াদী থানা সূত্র ও সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, গত ২২ জানুয়ারি রাত সোয়া ১২টায় কটিয়াদী মডেল থানায় নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনের একটি মামলা রুজু করা হয়। কটিয়াদী থানার বীর নোয়াকান্দি গ্রামের মৃত আফাজ উদ্দিনের ছেলে আসাদ মিয়া বাদী হয়ে দায়ের করা মামলাটির নম্বর-১৩। এফআইআর বইয়ের ক্রমিক নং- ০১৭১৭১৩ তে লিপিবদ্ধ করা মামলাটি তদন্তের দায়িত্ব দেওয়া হয় থানার এসআই মো. মঈন উদ্দীনকে।

কিন্তু ওইদিনই এফআইআর বইয়ের ওই পাতাটি ছিঁড়ে পরের পাতায় একই নম্বরে ( নম্বর: ১৩) আরেকটি মামলা রুজু করা হয়। একই নম্বরের দ্বিতীয় ওই মামলাটির বাদী কটিয়াদী থানার ভোগপাড়া এলাকার কুদ্দুছ মিয়ার মেয়ে পারভীন আক্তার। আদালতের সংশ্লিষ্ট শাখায়ও পারভীন আক্তার বাদী হয়ে দায়ের করা মামলাটির নথি থানা থেকে পাঠানো হয়।

গত ২১ জানুয়ারি বিকেল ৩টায় কটিয়াদী উপজেলার বীর নোয়াকান্দি গ্রামের আসাদ মিয়া তার মেয়েকে (১৪) একই গ্রামের জমির উদ্দিনের ছেলে রবিন মিয়া অপহরণ করেছে বলে থানায় অভিযোগ নিয়ে যান। ওসির কথামতো আসাদ মিয়া বাদী হয়ে কটিয়াদী মডেল থানায় ওইদিনই একটি লিখিত অভিযোগ করেন। পরে বাদীর অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে ওসির নির্দেশে উপপরিদর্শক মো. মঈন উদ্দীন ওইদিন রাত ১০টার দিকে অভিযান চালিয়ে মূল আসামি রবিন মিয়াকে আটক ও মেয়েটিকে উদ্ধার করে থানা হাজতে রাখেন। রাত সোয়া ১২টার দিকে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে মামলাটি ওসি মো. আহসান উল্লাহ রেকর্ড করেন।

পরদিন মোটা অঙ্কের টাকার বিনিময়ে আসামিপক্ষের সঙ্গে ওসি আহসান উল্লাহর মধ্যে একটা রফদফা হয়। ডাক্তারি পরীক্ষার জন্য মেয়েটিকে সিভিল সার্জনের কার্যালয়ে পাঠানো হলেও আসামিদের সঙ্গে যোগসাজস করে ডাক্তারি পরীক্ষা ছাড়াই তাকে আবার থানায় ফিরিয়ে আনা হয়। তুলে দেওয়া হয় বাবা আসাদ মিয়ার কাছে। আর আসামিকে আদালতে চালান না দিয়ে রাতের আঁধারে থানা থেকে ছেড়ে দেন।

এর মধ্যে ওসি রুজুকৃত মামলার এফআইআর কপি মূল বই থেকে ছিঁড়ে ফেলেন। পরবর্তীতে এই ১৩ নং মামলার স্থলে বইয়ের পরের পাতায় আদালত নির্দেশিত একটি অভিযোগ মামলা হিসেবে রেকর্ড করা হয়। সেই মামলাটির বাদী ছিল পারভীন আক্তার। কিশোরগঞ্জ আদালতের দাখিল করা অভিযোগের ভিত্তিতে মামলাটি রেকর্ড করার পর বিধি অনুযায়ী মামলার এফআইআর কপি আদালতের সংশ্লিষ্ট শাখায় পাঠানো হয়।

মামলার বাদী মো. আসাদ মিয়া জানান, তার নবম শ্রেণি পড়ুয়া মেয়ে স্কুলে যাওয়া-আসার পথে একই এলাকার মৃত আফাজ মিয়ার ছেলে রবিন মিয়া উত্যক্ত করতো।  গত ২১ জানুয়ারি বিকেল ৪টার দিকে তার মেয়েকে রবিনের নেতৃত্বে কয়েকজন সহযোগী অপহরণ করে।

তিনি বলেন,‘ এদিন থানায় এজাহার দেওয়ার পর রাতেই মামলাটি রেকর্ড করা হয়। পরদিন দুপুরে আমার মেয়ের ডাক্তারি পরীক্ষার জন্য একজন কনস্টেবল আমাকেসহ কিশোরগঞ্জ নিয়ে যান। কিন্তু সিভিল সার্জন অফিসে পৌঁছার আগেই আমাদের সঙ্গে থাকা কনস্টেবলের কাছে একটি ফোন আসে। তখন আমার মেয়ের মেডিক্যাল পরীক্ষা না করিয়েই কিশোরগঞ্জ জেলাখানা মোড় এলাকা থেকে আমাদের কটিয়াদী থানায় ফিরিয়ে আনা হয়। ওসি সাহেব আমার মেয়েকে নিয়ে বাড়ি চলে যেতে বলেন। ’

এ ব্যাপারে কটিয়াদী মডেল থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) মো. আহসান উল্লাহর সঙ্গে মুঠোফোনে যোগাযোগ করলে তিনি তার বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, আমি এলাকায় ভালো কাজ করি বলেই একটা গোষ্ঠী আমার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করছে।

এফআইআরের কপি সাংবাদিকদের হাতে আছে, তাহলে আপনি কিসের ভিত্তিতে অভিযোগ অস্বীকার করছেন? এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, তারা কোথায় এ কাগজ পেল, তা আমি বলতে পারব না।

এফআইআর বইয়ের কাগজ সামান্য কাটা ছেঁড়া থাকতে পারে।

তিনি বলেন, ওই মামলাটি দায়ের করা হলে অবশ্যই আদালতে যেত।

এদিকে জেলা পুলিশ অফিস সূত্রে জানা গেছে, এ ঘটনায় হোসেনপুর সার্কেলের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মো. জামাল উদ্দিনকে প্রধান করে এক সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। কমিটিকে তদন্ত করে জেলা পুলিশ সুপারের কাছে প্রতিবেদন দাখিল করতে বলা হয়েছে।

হোসেনপুর সার্কেলের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মো. জামাল উদ্দিন ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে রাইজিংবিডিকে বলেন, অভিযোগের বিষয়ে তদন্ত শুরু হয়েছে।

তিনি আরো জানান, তাকে প্রধান করে পুলিশ সুপার গত ২ এপ্রিল একটি তদন্ত কমিটি গঠন করেছেন। একই নম্বরে দুটি মামলা রুজু, এফআইআর বই থেকে মামলার কাগজ ছিঁড়ে ফেলা এবং অন্যান্য বিষয়ে তদন্ত করে প্রতিবেদন দাখিল করতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

তিনি বলেন, ‘যত দ্রুত সম্ভব এ ঘটনা তদন্ত করে পুলিশ সুপারের কাছে তদন্ত প্রতিবেদন দাখিল করা হবে।’



রাইজিংবিডি/কিশোরগঞ্জ/৪ এপ্রিল ২০১৭/রুমন চক্রবর্তী/রুহুল

ইউটিউব সাবস্ক্রাইব করুন